তালসারির ঢেউ — দ্বিতীয় পর্ব
কেওড়াতলার ছায়া
__________
কেওড়াতলা মহাশ্মশানে সেদিন অন্যরকম একটা ভারী বাতাস ছিল।
গোয়েন্দা অর্ণব মিত্র ভিড়ের একটু দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালেন না —শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। প্রসেনজিৎ, পরমব্রত, রুদ্রনীল, সুদীপ্তা — টলিউডের চেনা মুখগুলো সজল । পাড়া-প্রতিবেশী এসেছেন। সবাই বলছেন একই কথা — এই মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না।
কিন্তু অর্ণবের চোখ অন্য কিছু খুঁজছিল।
পরিবারের ইচ্ছায় কোনো আড়ম্বর ছিল না। বিজয়গড়ের বাড়ি থেকে সরাসরি শ্মশানে নিয়ে আসা হয়েছে রাহুলের দেহ। দেহ শায়িত রাখার অনুমতিও দেয়নি পরিবার।
তারপরেও সংঘাত।
শ্মশানের ভেতরে ঢোকার প্রশ্নে কথা কাটাকাটি হয়ে গেল কয়েকজনের মধ্যে। অর্ণব দেখলেন, একটা থমথমে উত্তেজনা শ্মশান চত্বর ছেয়ে ফেলেছে।
তাঁর সহকারী প্রদীপ পাশে এসে বলল, "স্যার, ঝামেলা হলো। সায়নী ঘোষকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে, এটা নিয়ে কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।"
অর্ণব চুপ করে রইলেন।
শোকের সময়েও মানুষ পক্ষ নেয়। এটাই মানুষের স্বভাব।
কিন্তু অর্ণব শুধু শ্মশানের সংঘাত দেখতে আসেননি। তালসারি থেকে ফিরে তাঁর মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে —
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট।
তমলুক থেকে কলকাতায় দেহ আনার পর ময়নাতদন্ত হয়েছিল। সেই রিপোর্টের একটা কপি অর্ণবের হাতে এসেছে।
রিপোর্টের একটি লাইন তাঁকে বারবার ভাবাচ্ছিল।
"প্রচুর পরিমাণে বালি প্রবেশের ফলে ফুসফুস আকারে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। এই অবস্থা সম্ভব কেবল অনেকক্ষণ জলের নীচে থাকলে।"
অর্ণব চোখ বন্ধ করলেন।
শুটিং ইউনিটের কেউ বলেছিলেন রাহুলকে ডুবতে দেখার পরপরই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ফুসফুসের এই অবস্থা বলছে — রাহুল অনেকক্ষণ জলের নীচে ছিলেন।
তাহলে কি কেউ দেখেনি? নাকি কেউ দেখেও সরে গিয়েছিল?
শুটিংয়ের জন্য ওড়িশা পুলিশের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। এটা ইতিমধ্যে প্রমাণিত। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন — মূল অভিনেতা সৈকতে একা, ঢেউ আসছে, জোয়ার আসছে — অথচ পুরো ইউনিট গাড়ি নিয়ে চলে গেল?
এটা গাফিলতি, নাকি পরিকল্পনা?
শ্মশান থেকে ফেরার পথে প্রদীপ একটা কাগজ এগিয়ে দিল।
"স্যার, এটা পড়ুন। একজন সাংবাদিক পাঠিয়েছেন।"
অর্ণব পড়লেন।
সাতের দশকের অভিনেত্রী কেয়া চক্রবর্তী — মৃত্যু হয়েছিল জলে ডুবে।
গায়ক জুবিন গর্গ — 'চিরদিনই তুমি যে আমার' ছবিতে রাহুলের ঠোঁটে যে 'পিয়া রে' গানটা আজও জীবন্ত, সেই গানের গায়ক — তাঁরও মৃত্যু হয়েছিল সমুদ্রে তলিয়ে গিয়ে।
আর এখন রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জী।
তিনজন শিল্পী। তিনটি মৃত্যু। সবই জলে।
অর্ণব একটু শিউরে উঠলেন। কাকতাল, হয়তো। কিন্তু গোয়েন্দার জীবনে কাকতালের জায়গা কম।
"প্রদীপ," তিনি বললেন, "কেয়া চক্রবর্তীর মৃত্যুর সময়কার কেসফাইল খোঁজো। যদি পাওয়া যায়।"
পরদিন সকালে অর্ণব বসলেন ওড়িশা পুলিশের তদন্তকারী অফিসার পট্টনায়েকের সাথে ভিডিও কলে।
"রিপোর্ট বলছে রাহুল অনেকক্ষণ জলের নীচে ছিলেন," অর্ণব সরাসরি বললেন। "ইউনিটের কেউ সেটা দেখেনি, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।"
পট্টনায়েক একটু অস্বস্তিতে পড়লেন। "আমরাও সেই প্রশ্নটা করছি, মিত্রবাবু। ইউনিটের লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও।"
"সমুদ্রে নামার জন্য কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি — এটা কি ইউনিটের সবাই জানত?"
"জানার কথা। কিন্তু এই শুটিংয়ে নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। লাইফগার্ড নেই, রেসকিউ টিম নেই, কিছুই না।"
অর্ণব টেবিলে আঙুল ঠোকালেন। "একজন লোককে একা সমুদ্রে ছেড়ে যাওয়া — এটা শুধু গাফিলতি হতে পারে না। কেউ না কেউ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে থাকার দরকার নেই।"
"কে সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?"
"সেটাই খুঁজছি।"
অর্ণব ফোন করলেন প্রোডাকশন ম্যানেজার নীলেশ শর্মাকে।
"নীলেশবাবু, একটা প্রশ্ন। সেদিন প্যাক আপের পর সবাই কখন চলে গেল?"
"বিকেল চারটার আগেই।"
"রাহুল জলে নামলেন কখন?"
"সাড়ে তিনটা থেকে চারটার মধ্যে।"
"তাহলে রাহুল জলে থাকা অবস্থাতেই লোকজন চলে যেতে শুরু করেছিল?"
ফোনে নীরবতা।
"নীলেশ?"
"আমি... আমি ঠিক মনে করতে পারছি না।"
"পারছেন না, নাকি বলতে চাইছেন না?" অর্ণব শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে বললেন। "ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে রাহুল অনেকক্ষণ জলের নীচে ছিলেন। সেই সময়টায় আপনারা কোথায় ছিলেন?"
এবার নীলেশের গলা ভাঙল।
"স্যার... রিঙ্কুদা বলেছিল সবাইকে চলে যেতে। বলল রাহুলদা একা থাকতে চান, বিরক্ত করলে রাগ করবেন। আমি... আমি ভেবেছিলাম ঠিকই বলছেন।"
"রিঙ্কু সবাইকে সরিয়ে দিয়েছিল?"
"হ্যাঁ। আর তারপরেই হঠাৎ চিৎকার শুনলাম — রাহুলদা ডুবছেন।"
অর্ণবের হাত শক্ত হয়ে গেল।
রিঙ্কু শুধু হুমকির ফোন দেয়নি। সে ইচ্ছা করে সাক্ষীদের সরিয়ে দিয়েছিল।
প্রদীপ সেদিন রাতে একটা পুরনো ফাইল এনে দিল।
কেয়া চক্রবর্তীর মৃত্যুর কেস। সত্তরের দশকের। ধুলো পড়া কাগজ।
অর্ণব পাতা উল্টালেন।
তখনকার তদন্তে দুর্ঘটনা বলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একটা নোটে তৎকালীন এক তদন্তকারীর হাতের লেখায় লেখা ছিল —
"সাক্ষীরা বলছেন ঘটনার সময় আশেপাশে কেউ ছিলেন না। কিন্তু একজন স্থানীয় জেলে দাবি করেন, তিনি একজন পুরুষকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন।"
অর্ণব ফাইলটা বন্ধ করলেন।
ইতিহাস মাঝেমাঝে নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে।
পুলিশ রিঙ্কু বসুকে দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসাবাদ করল। এবার অর্ণবও সেখানে।
"নীলেশ সব বলে দিয়েছেন," অর্ণব টেবিলের ওপাশে বসা রিঙ্কুকে বললেন। "আপনি ইউনিটের সবাইকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।"
রিঙ্কুর চোয়াল শক্ত।
"আমি শুধু বলেছিলাম ওকে একা থাকতে দিতে।"
"আপনি সাক্ষীদের সরিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর রাহুল একা সমুদ্রে, এবং কেউ নেই উদ্ধার করতে।" অর্ণব থামলেন। "এটাকে পরিকল্পনা না বলে কী বলব?"
"আমি খুন করিনি!" রিঙ্কু প্রায় চিৎকার করে উঠলেন। "সে নিজেই গেছে! আমি জানতাম না এরকম হবে!"
"কিন্তু আপনি জানতেন সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া একজন মানুষ। পরিবার নিয়ে চিন্তিত। তারপর তাকে একা ছেড়ে দিয়েছিলেন সমুদ্রের কাছে।"
রিঙ্কু চুপ।
"আর ময়নাতদন্ত বলছে সে অনেকক্ষণ জলের নীচে ছিলেন। সেই সময়ে আশেপাশে কেউ ছিল না — কারণ আপনি সবাইকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।" অর্ণবের কণ্ঠ এবার ইস্পাতের মতো শক্ত। "আপনি হাত দিয়ে ধাক্কা দেননি হয়তো। কিন্তু যে পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন — সেটা খুনের থেকে কম কিছু না।"
সেই রাতে অর্ণবের ফোনে একটা বার্তা এলো।
প্রিয়াঙ্কা সরকার — রাহুলের স্ত্রী — লিখেছেন।
"আমরা শান্তিতে শোক পালন করতে চাই। একটি শিশু, একজন মা, একটি পরিবার — আমরা একসঙ্গে এই ক্ষতি সামলে উঠতে চাইছি। আমাদের ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করুন।"
অর্ণব বার্তাটা পড়লেন।
২০১৮ সালে আলাদা হয়েছিলেন তাঁরা। ২০২২ সালে ছেলে সহজের কথা ভেবে আবার একসাথে হয়েছিলেন। কত কষ্টে জোড়া লাগানো একটা পরিবার।
সেই পরিবারের বাবাটা আর নেই।
তেরো বছরের সহজ এখন বাবা ছাড়া।
অর্ণব চোখ বন্ধ করলেন।
এই মামলায় বিচার হবে কিনা, কতটুকু হবে — সেটা আদালতের প্রশ্ন। কিন্তু একটা পরিবার যে ভেঙে গেছে, সেটা আর জোড়া লাগবে না।
পরদিন সকালে অর্ণব তাঁর রিপোর্ট লিখলেন।
রিঙ্কু বসুর বিরুদ্ধে অভিযোগ —অবহেলাজনিত মৃত্যুর সহায়তা। সরাসরি হত্যার প্রমাণ নেই, কিন্তু পরিস্থিতিগত প্রমাণের একটা শৃঙ্খল তৈরি হয়েছে। পুলিশের তদন্ত আরও গভীরে যাবে।
শুটিং ইউনিটের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন উঠবে — পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকা, অনুমতি না নেওয়া, মূল অভিনেতাকে একা ছেড়ে যাওয়া।
প্রদীপ চা নিয়ে এলো। "স্যার, কেস কি শেষ?"
"কেস কখনো পুরোপুরি শেষ হয় না," অর্ণব বললেন। "বিচার হয়তো হবে। কিন্তু রাহুল ফিরবেন না। তেরো বছরের একটা ছেলের বাবা ফিরবেন না।"
জানালার বাইরে কলকাতার আকাশ মেঘলা।
কোথাও একটা বৃষ্টি আসছে।
"তুমি জানো প্রদীপ," অর্ণব চায়ের কাপে চুমুক দিলেন, "পড়াশোনা জানা, ভালো মনের একটা মানুষ চলে গেল। তাঁর প্রতিভা, তাঁর লেখা, তাঁর অভিনয় — সব থেমে গেল মাত্র তেতাল্লিশ বছরে।"
"আর যে বা যারা দায়ী?"
"তারা বেঁচে আছে। কিন্তু বিবেকের সামনে বেঁচে থাকাটা কখনো কখনো মৃত্যুর চেয়েও কঠিন।"
তালসারির সমুদ্র অনেক দূরে — কিন্তু তার ঢেউয়ের শব্দ যেন এখনও কানে বাজছে।
একটা অসমাপ্ত জীবনের গল্প বলছে।
______________
লেখকের নোট: এই গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও সৃজনশীল রচনা। প্রদত্ত সংবাদ তথ্যের ভিত্তিতে একটি কাল্পনিক গোয়েন্দা আখ্যান রচিত হয়েছে মাত্র। গল্পের কোনো চরিত্র, ঘটনা বা অনুমান বাস্তবের সাথে মেলানো সম্পূর্ণ অনুচিত। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাঁর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা।
__________
কেওড়াতলা মহাশ্মশানে সেদিন অন্যরকম একটা ভারী বাতাস ছিল।
গোয়েন্দা অর্ণব মিত্র ভিড়ের একটু দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালেন না —শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। প্রসেনজিৎ, পরমব্রত, রুদ্রনীল, সুদীপ্তা — টলিউডের চেনা মুখগুলো সজল । পাড়া-প্রতিবেশী এসেছেন। সবাই বলছেন একই কথা — এই মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না।
কিন্তু অর্ণবের চোখ অন্য কিছু খুঁজছিল।
পরিবারের ইচ্ছায় কোনো আড়ম্বর ছিল না। বিজয়গড়ের বাড়ি থেকে সরাসরি শ্মশানে নিয়ে আসা হয়েছে রাহুলের দেহ। দেহ শায়িত রাখার অনুমতিও দেয়নি পরিবার।
তারপরেও সংঘাত।
শ্মশানের ভেতরে ঢোকার প্রশ্নে কথা কাটাকাটি হয়ে গেল কয়েকজনের মধ্যে। অর্ণব দেখলেন, একটা থমথমে উত্তেজনা শ্মশান চত্বর ছেয়ে ফেলেছে।
তাঁর সহকারী প্রদীপ পাশে এসে বলল, "স্যার, ঝামেলা হলো। সায়নী ঘোষকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে, এটা নিয়ে কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।"
অর্ণব চুপ করে রইলেন।
শোকের সময়েও মানুষ পক্ষ নেয়। এটাই মানুষের স্বভাব।
কিন্তু অর্ণব শুধু শ্মশানের সংঘাত দেখতে আসেননি। তালসারি থেকে ফিরে তাঁর মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে —
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট।
তমলুক থেকে কলকাতায় দেহ আনার পর ময়নাতদন্ত হয়েছিল। সেই রিপোর্টের একটা কপি অর্ণবের হাতে এসেছে।
রিপোর্টের একটি লাইন তাঁকে বারবার ভাবাচ্ছিল।
"প্রচুর পরিমাণে বালি প্রবেশের ফলে ফুসফুস আকারে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। এই অবস্থা সম্ভব কেবল অনেকক্ষণ জলের নীচে থাকলে।"
অর্ণব চোখ বন্ধ করলেন।
শুটিং ইউনিটের কেউ বলেছিলেন রাহুলকে ডুবতে দেখার পরপরই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ফুসফুসের এই অবস্থা বলছে — রাহুল অনেকক্ষণ জলের নীচে ছিলেন।
তাহলে কি কেউ দেখেনি? নাকি কেউ দেখেও সরে গিয়েছিল?
শুটিংয়ের জন্য ওড়িশা পুলিশের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। এটা ইতিমধ্যে প্রমাণিত। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন — মূল অভিনেতা সৈকতে একা, ঢেউ আসছে, জোয়ার আসছে — অথচ পুরো ইউনিট গাড়ি নিয়ে চলে গেল?
এটা গাফিলতি, নাকি পরিকল্পনা?
শ্মশান থেকে ফেরার পথে প্রদীপ একটা কাগজ এগিয়ে দিল।
"স্যার, এটা পড়ুন। একজন সাংবাদিক পাঠিয়েছেন।"
অর্ণব পড়লেন।
সাতের দশকের অভিনেত্রী কেয়া চক্রবর্তী — মৃত্যু হয়েছিল জলে ডুবে।
গায়ক জুবিন গর্গ — 'চিরদিনই তুমি যে আমার' ছবিতে রাহুলের ঠোঁটে যে 'পিয়া রে' গানটা আজও জীবন্ত, সেই গানের গায়ক — তাঁরও মৃত্যু হয়েছিল সমুদ্রে তলিয়ে গিয়ে।
আর এখন রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জী।
তিনজন শিল্পী। তিনটি মৃত্যু। সবই জলে।
অর্ণব একটু শিউরে উঠলেন। কাকতাল, হয়তো। কিন্তু গোয়েন্দার জীবনে কাকতালের জায়গা কম।
"প্রদীপ," তিনি বললেন, "কেয়া চক্রবর্তীর মৃত্যুর সময়কার কেসফাইল খোঁজো। যদি পাওয়া যায়।"
পরদিন সকালে অর্ণব বসলেন ওড়িশা পুলিশের তদন্তকারী অফিসার পট্টনায়েকের সাথে ভিডিও কলে।
"রিপোর্ট বলছে রাহুল অনেকক্ষণ জলের নীচে ছিলেন," অর্ণব সরাসরি বললেন। "ইউনিটের কেউ সেটা দেখেনি, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।"
পট্টনায়েক একটু অস্বস্তিতে পড়লেন। "আমরাও সেই প্রশ্নটা করছি, মিত্রবাবু। ইউনিটের লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও।"
"সমুদ্রে নামার জন্য কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি — এটা কি ইউনিটের সবাই জানত?"
"জানার কথা। কিন্তু এই শুটিংয়ে নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। লাইফগার্ড নেই, রেসকিউ টিম নেই, কিছুই না।"
অর্ণব টেবিলে আঙুল ঠোকালেন। "একজন লোককে একা সমুদ্রে ছেড়ে যাওয়া — এটা শুধু গাফিলতি হতে পারে না। কেউ না কেউ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে থাকার দরকার নেই।"
"কে সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?"
"সেটাই খুঁজছি।"
অর্ণব ফোন করলেন প্রোডাকশন ম্যানেজার নীলেশ শর্মাকে।
"নীলেশবাবু, একটা প্রশ্ন। সেদিন প্যাক আপের পর সবাই কখন চলে গেল?"
"বিকেল চারটার আগেই।"
"রাহুল জলে নামলেন কখন?"
"সাড়ে তিনটা থেকে চারটার মধ্যে।"
"তাহলে রাহুল জলে থাকা অবস্থাতেই লোকজন চলে যেতে শুরু করেছিল?"
ফোনে নীরবতা।
"নীলেশ?"
"আমি... আমি ঠিক মনে করতে পারছি না।"
"পারছেন না, নাকি বলতে চাইছেন না?" অর্ণব শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে বললেন। "ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে রাহুল অনেকক্ষণ জলের নীচে ছিলেন। সেই সময়টায় আপনারা কোথায় ছিলেন?"
এবার নীলেশের গলা ভাঙল।
"স্যার... রিঙ্কুদা বলেছিল সবাইকে চলে যেতে। বলল রাহুলদা একা থাকতে চান, বিরক্ত করলে রাগ করবেন। আমি... আমি ভেবেছিলাম ঠিকই বলছেন।"
"রিঙ্কু সবাইকে সরিয়ে দিয়েছিল?"
"হ্যাঁ। আর তারপরেই হঠাৎ চিৎকার শুনলাম — রাহুলদা ডুবছেন।"
অর্ণবের হাত শক্ত হয়ে গেল।
রিঙ্কু শুধু হুমকির ফোন দেয়নি। সে ইচ্ছা করে সাক্ষীদের সরিয়ে দিয়েছিল।
প্রদীপ সেদিন রাতে একটা পুরনো ফাইল এনে দিল।
কেয়া চক্রবর্তীর মৃত্যুর কেস। সত্তরের দশকের। ধুলো পড়া কাগজ।
অর্ণব পাতা উল্টালেন।
তখনকার তদন্তে দুর্ঘটনা বলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একটা নোটে তৎকালীন এক তদন্তকারীর হাতের লেখায় লেখা ছিল —
"সাক্ষীরা বলছেন ঘটনার সময় আশেপাশে কেউ ছিলেন না। কিন্তু একজন স্থানীয় জেলে দাবি করেন, তিনি একজন পুরুষকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন।"
অর্ণব ফাইলটা বন্ধ করলেন।
ইতিহাস মাঝেমাঝে নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে।
পুলিশ রিঙ্কু বসুকে দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসাবাদ করল। এবার অর্ণবও সেখানে।
"নীলেশ সব বলে দিয়েছেন," অর্ণব টেবিলের ওপাশে বসা রিঙ্কুকে বললেন। "আপনি ইউনিটের সবাইকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।"
রিঙ্কুর চোয়াল শক্ত।
"আমি শুধু বলেছিলাম ওকে একা থাকতে দিতে।"
"আপনি সাক্ষীদের সরিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর রাহুল একা সমুদ্রে, এবং কেউ নেই উদ্ধার করতে।" অর্ণব থামলেন। "এটাকে পরিকল্পনা না বলে কী বলব?"
"আমি খুন করিনি!" রিঙ্কু প্রায় চিৎকার করে উঠলেন। "সে নিজেই গেছে! আমি জানতাম না এরকম হবে!"
"কিন্তু আপনি জানতেন সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া একজন মানুষ। পরিবার নিয়ে চিন্তিত। তারপর তাকে একা ছেড়ে দিয়েছিলেন সমুদ্রের কাছে।"
রিঙ্কু চুপ।
"আর ময়নাতদন্ত বলছে সে অনেকক্ষণ জলের নীচে ছিলেন। সেই সময়ে আশেপাশে কেউ ছিল না — কারণ আপনি সবাইকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।" অর্ণবের কণ্ঠ এবার ইস্পাতের মতো শক্ত। "আপনি হাত দিয়ে ধাক্কা দেননি হয়তো। কিন্তু যে পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন — সেটা খুনের থেকে কম কিছু না।"
সেই রাতে অর্ণবের ফোনে একটা বার্তা এলো।
প্রিয়াঙ্কা সরকার — রাহুলের স্ত্রী — লিখেছেন।
"আমরা শান্তিতে শোক পালন করতে চাই। একটি শিশু, একজন মা, একটি পরিবার — আমরা একসঙ্গে এই ক্ষতি সামলে উঠতে চাইছি। আমাদের ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করুন।"
অর্ণব বার্তাটা পড়লেন।
২০১৮ সালে আলাদা হয়েছিলেন তাঁরা। ২০২২ সালে ছেলে সহজের কথা ভেবে আবার একসাথে হয়েছিলেন। কত কষ্টে জোড়া লাগানো একটা পরিবার।
সেই পরিবারের বাবাটা আর নেই।
তেরো বছরের সহজ এখন বাবা ছাড়া।
অর্ণব চোখ বন্ধ করলেন।
এই মামলায় বিচার হবে কিনা, কতটুকু হবে — সেটা আদালতের প্রশ্ন। কিন্তু একটা পরিবার যে ভেঙে গেছে, সেটা আর জোড়া লাগবে না।
পরদিন সকালে অর্ণব তাঁর রিপোর্ট লিখলেন।
রিঙ্কু বসুর বিরুদ্ধে অভিযোগ —অবহেলাজনিত মৃত্যুর সহায়তা। সরাসরি হত্যার প্রমাণ নেই, কিন্তু পরিস্থিতিগত প্রমাণের একটা শৃঙ্খল তৈরি হয়েছে। পুলিশের তদন্ত আরও গভীরে যাবে।
শুটিং ইউনিটের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন উঠবে — পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকা, অনুমতি না নেওয়া, মূল অভিনেতাকে একা ছেড়ে যাওয়া।
প্রদীপ চা নিয়ে এলো। "স্যার, কেস কি শেষ?"
"কেস কখনো পুরোপুরি শেষ হয় না," অর্ণব বললেন। "বিচার হয়তো হবে। কিন্তু রাহুল ফিরবেন না। তেরো বছরের একটা ছেলের বাবা ফিরবেন না।"
জানালার বাইরে কলকাতার আকাশ মেঘলা।
কোথাও একটা বৃষ্টি আসছে।
"তুমি জানো প্রদীপ," অর্ণব চায়ের কাপে চুমুক দিলেন, "পড়াশোনা জানা, ভালো মনের একটা মানুষ চলে গেল। তাঁর প্রতিভা, তাঁর লেখা, তাঁর অভিনয় — সব থেমে গেল মাত্র তেতাল্লিশ বছরে।"
"আর যে বা যারা দায়ী?"
"তারা বেঁচে আছে। কিন্তু বিবেকের সামনে বেঁচে থাকাটা কখনো কখনো মৃত্যুর চেয়েও কঠিন।"
তালসারির সমুদ্র অনেক দূরে — কিন্তু তার ঢেউয়ের শব্দ যেন এখনও কানে বাজছে।
একটা অসমাপ্ত জীবনের গল্প বলছে।
______________
লেখকের নোট: এই গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও সৃজনশীল রচনা। প্রদত্ত সংবাদ তথ্যের ভিত্তিতে একটি কাল্পনিক গোয়েন্দা আখ্যান রচিত হয়েছে মাত্র। গল্পের কোনো চরিত্র, ঘটনা বা অনুমান বাস্তবের সাথে মেলানো সম্পূর্ণ অনুচিত। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাঁর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা।
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
জে এস এম অনিক ০৮/০৪/২০২৬Nice
-
ফয়জুল মহী ০৩/০৪/২০২৬চমৎকার লিখেছেন কবি।
খুব ভালো লাগলো পাঠে।
