তালসারির ঢেউ
একটি গোয়েন্দা গল্প
_____________
রবিবারের বিকেলটা ছিল অস্বাভাবিক রকম নিস্তব্ধ।
গোয়েন্দা অর্ণব মিত্র তাঁর ভবানীপুরের ছোট্ট অফিসে বসে ঠান্ডা চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন, যখন তাঁর ফোনটা বেজে উঠল।
"স্যার, ওড়িশার তালসারি সৈকতে একজন বাঙালি অভিনেতা ডুবে মারা গেছেন।" ফোনের ওপাশ থেকে তাঁর সহকারী প্রদীপ বলল। "নাম রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জী। সিরিয়াল অভিনেতা। পুলিশ দুর্ঘটনা বলছে, কিন্তু প্রযোজক সংস্থা চাইছে আপনি একবার ঘটনাস্থলে যান।"
অর্ণব চায়ের কাপটা রেখে দিলেন।
রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জী। নামটা তিনি চিনতেন। বাংলা সিরিয়ালের জগতে বেশ পরিচিত মুখ। মাত্র ৪৩ বছর বয়স।
"গাড়ি তৈরি রাখো," তিনি বললেন, "আধঘণ্টার মধ্যে বেরোচ্ছি।"
পরের দিন সকালে অর্ণব তালসারি পৌঁছালেন। ওড়িশার এই ছোট্ট সৈকত শহরটা তখনও শোকের আবহে ভারী হয়ে আছে। হোটেলের সামনে কয়েকটা টেলিভিশন চ্যানেলের গাড়ি দাঁড়িয়ে।
স্থানীয় পুলিশ অফিসার হরেকৃষ্ণ পট্টনায়েক অর্ণবকে স্বাগত জানালেন।
"ঘটনাটা সহজ," পট্টনায়েক বললেন, "শুটিং শেষে অভিনেতা একা সমুদ্রে নেমে পড়েন। ঢেউয়ে তলিয়ে যান। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর মৃত ঘোষণা করা হয়।"
"সহজ," অর্ণব শব্দটা পুনরাবৃত্তি করলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা সূক্ষ্ম হাসি খেলল। "সহজ জিনিস নিয়ে আমাকে ডাকা হয় না, পট্টনায়েকবাবু।"
তিনি সৈকতের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
ঘটনাস্থলটা এখনও দড়ি দিয়ে ঘেরা। অর্ণব বালির দিকে নিচু হয়ে তাকালেন। একজোড়া পায়ের ছাপ জলের দিকে গেছে। কিন্তু কিছু একটা তাঁকে অস্থির করে দিল।
পায়ের ছাপের গভীরতা অসম।
বাঁ পায়ের ছাপ ডান পায়ের তুলনায় অনেক গভীর। যেন কেউ তাঁকে একদিকে ধাক্কা দিয়েছিল, অথবা তিনি নিজেই টলমল করতে করতে হেঁটেছিলেন।
শুটিং ইউনিটের সদস্যরা পাশের একটি হোটেলে উঠেছিলেন। অর্ণব একে একে সবার সাথে কথা বললেন।
প্রথম সাক্ষী — ক্যামেরাম্যান সুজিত দাস:
"রাহুলদা শুটিং শেষ করে খুব চুপচাপ ছিলেন। সাধারণত জোকস করেন, আড্ডা মারেন। সেদিন কেমন যেন থমথমে।"
"শুটিংয়ের সময় কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছিল?" অর্ণব জিজ্ঞেস করলেন।
সুজিত একটু থামলেন। "না... মানে, একটা ফোন এসেছিল। রাহুলদা একটু দূরে গিয়ে কথা বললেন। ফিরে এলেন চুপ হয়ে।"
"কার ফোন?"
"জানি না। তবে রাহুলদার মুখ দেখে মনে হলো কিছু একটা ভালো খবর না।"
দ্বিতীয় সাক্ষী — সহ-অভিনেত্রী মৌমিতা রায়:
"রাহুলদা সমুদ্রে নামার আগে আমাকে বলেছিলেন, 'একটু একা থাকতে চাই।' আমি ভেবেছিলাম ক্লান্ত।" মৌমিতার চোখে জল। "অনেকে বারণ করেছিলেন, জোয়ার আসছে বলে। উনি শুনলেন না।"
"অনেকে মানে কে কে?"
"আমি বারণ করেছিলাম। প্রোডাকশন ম্যানেজার নীলেশও বলেছিলেন। কিন্তু..." মৌমিতা থামলেন।
"কিন্তু?"
"কিন্তু রিঙ্কুদা — মানে রিঙ্কু বসু, আমাদের আর্ট ডিরেক্টর — বলেছিলেন 'ওকে যেতে দাও, একটু একা থাকুক।' তখন রিঙ্কুদার কথা শুনে বাকিরা সরে গেল।"
অর্ণবের কলম থামল।
তৃতীয় সাক্ষী — প্রোডাকশন ম্যানেজার নীলেশ শর্মা:
"আমি বারণ করেছিলাম, স্যার। কিন্তু রাহুলদা মানলেন না। তারপর বাকিরা যে যার গাড়িতে চলে গেল। হঠাৎ দেখি রাহুলদা ডুবে যাচ্ছেন।"
"সবাই গাড়িতে চলে গেল মানে?" অর্ণব তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন। "শুটিং শেষ হতে না হতে সবাই চলে গেল?"
নীলেশ অস্বস্তিতে পড়লেন। "মানে... প্যাক আপ হয়ে গিয়েছিল তো।"
"কিন্তু মূল অভিনেতা সৈকতে একা — এই অবস্থায় পুরো দল চলে যায়?"
নীলেশ চুপ।
সন্ধ্যায় কলকাতা থেকে ফোনে কথা হলো প্রযোজক লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে।
"চিত্রনাট্যে জলের কোনো দৃশ্য ছিল না," তিনি স্পষ্ট বললেন। "আমি এটা জোর দিয়ে বলছি। রাহুল কেন জলে নামল, আমি বুঝতে পারছি না।"
"রাহুলের সাথে শেষ কখন কথা হয়েছিল আপনার?"
একটু নীরবতা। "শুটিংয়ের আগের দিন। সে বলেছিল, কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু কী, বলেনি।"
"আর্ট ডিরেক্টর রিঙ্কু বসুকে চেনেন?"
"রিঙ্কু?" লীনার কণ্ঠে একটু পরিবর্তন। "চিনি। কিন্তু এই প্রোজেক্টে সে কীভাবে এল, আমি নিজেও অবাক হয়েছিলাম। নীলেশ ওকে রেকমেন্ড করেছিল।"
রাতে হোটেলের ঘরে বসে অর্ণব অনলাইনে প্রকাশিত শেষ ভিডিওটা বারবার দেখলেন।
সবুজ শার্ট পরা রাহুল তাঁর সহ-অভিনেত্রীর সাথে পারফর্ম করছেন। রাস্তায় গাড়ি দাঁড়ানো, আশেপাশে ইউনিটের লোকজন।
কিন্তু অর্ণব লক্ষ করলেন — ভিডিওর একদম কোণে, একটি গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে একজন লোক রাহুলের দিকে তাকিয়ে আছে। বাকি সবাই শুটিং দেখছে, কিন্তু এই লোকটি রাহুলকে দেখছে — এক অদ্ভুত স্থির দৃষ্টিতে।
অর্ণব ছবিটা জুম করলেন।
রিঙ্কু বসু।
পরদিন সকালে অর্ণব কলকাতায় তাঁর পুরনো সহকারীকে ফোন করলেন।
"রিঙ্কু বসু সম্পর্কে যা পাস, পাঠা।"
দুপুরের মধ্যেই তথ্য এলো।
রিঙ্কু বসু এবং রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জী — দুজন একসময় ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সালে একটা ঘটনায় সম্পর্ক ভেঙে যায়। একটি প্রোডাকশন হাউসে রাহুলের সাক্ষ্যের কারণে রিঙ্কু চুক্তি হারান এবং ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর নাম খারাপ হয়।
তারপর থেকে রিঙ্কু কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিলেন।
২০২৪ সালের শেষ দিক পর্যন্ত।
ঠিক যখন থেকে এই 'ভোলেবাবা পার করেগা' প্রোজেক্টে তিনি যোগ দেন।
অর্ণব পুলিশকে অনুরোধ করলেন রাহুলের শেষ কয়েক ঘণ্টার কল রেকর্ড দেখতে।
শুটিংয়ের দিন বিকেল সাড়ে তিনটায় একটি অজানা নম্বর থেকে রাহুলকে ফোন করা হয়েছিল। কথা হয়েছিল মাত্র ৪৩ সেকেন্ড।
সেই নম্বরটি ট্রেস করতে গিয়ে দেখা গেল — নম্বরটি একটি সস্তা বার্নার ফোনে করা, যা কিনা তালসারির কাছেই একটি ছোট্ট দোকান থেকে নগদে কেনা হয়েছিল।
দোকানের মালিক জানাল, "হ্যাঁ, একজন মোটামুটি বয়স্ক ভদ্রলোক কিনেছিলেন। চোখে চশমা, খাটো।"
অর্ণব ভিডিওর সেই স্থির চোখের মানুষটির কথা মনে করলেন।
রিঙ্কু বসু।
রিঙ্কু বসু তখনও তালসারির হোটেলে ছিলেন। অর্ণব তাঁর ঘরে গেলেন।
"বসুন," অর্ণব শান্ত গলায় বললেন।
রিঙ্কু নার্ভাস হাসলেন। "কী ব্যাপার?"
"রাহুলের মৃত্যুর দিন বিকেলে ৪৩ সেকেন্ডের একটা ফোন তাঁকে করেছিলেন। কী বলেছিলেন?"
রিঙ্কুর মুখ সাদা হয়ে গেল।
"আমি... আমি জানি না কী বলছেন।"
"তালসারির দোকানের মালিক আপনাকে চিনতে পেরেছেন," অর্ণব বললেন। "বার্নার ফোন কিনেছিলেন। কেন?"
দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর রিঙ্কু ভেঙে পড়লেন।
"আমি... আমি শুধু তাকে ----। "
"তাহলে সমুদ্রে?"
রিঙ্কু মাথা নামালেন। "সে নিজেই গেছে। আমি জানি না কেন। আমি সত্যিই ভাবিনি এরকম হবে।"
অর্ণব হোটেলের বাইরে বেরিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকালেন।
সত্যটা জটিল ছিল না আসলে। রিঙ্কু সরাসরি খুনি নয়। কিন্তু একটা হুমকির ফোন কল, পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় — এই মানসিক চাপে বিপর্যস্ত রাহুল হয়তো সেই বিকেলে কিছু ভাবতেই সমুদ্রের কাছে গিয়েছিলেন। হয়তো একটু শান্তি চেয়েছিলেন।
তারপর ঢেউ এসেছে।
স্ত্রী প্রিয়াঙ্কার কথা মনে পড়ল। ছেলে সহজের কথা। ২০১৮-তে আলাদা হয়ে, ২০২২-এ আবার এক হওয়া — কত কষ্টে গড়া একটা সংসার।
সেই সংসারের কর্তা আর নেই।
সমুদ্র থেকে ঢেউ এসে বালিতে মিলিয়ে গেল।
রিঙ্কু বসুকে পুলিশে দেওয়া হলো। তাঁর বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ দায়ের হলো। সরাসরি হত্যার প্রমাণ নেই, কিন্তু মানসিক নিষ্ঠুরতার একটা দায় থেকেই যায় — সেটা আইনের কাছে নয়, বিবেকের কাছে।
কলকাতায় ফেরার পথে অর্ণব প্রদীপকে বললেন, "প্রতিটা মৃত্যু খুন হয় না। কিন্তু প্রতিটা মৃত্যুর পেছনে একটা গল্প থাকে।"
"এই গল্পটা কী বলে, স্যার?"
অর্ণব জানালার বাইরে তাকালেন। "বলে — কিছু মানুষ প্রতিশোধের নেশায় এতটাই অন্ধ হয়ে যায় যে ভুলে যায়, আরেকজনকে ভাঙলে নিজেও ভেঙে পড়তে হয়।"
গাড়ি এগিয়ে চলল কলকাতার দিকে।
সমুদ্র পেছনে পড়ে রইল।
তালসারির ঢেউ আজও ভাঙে — যেন কোনো অসমাপ্ত কথা বলতে চাইছে। (চলবে)
______________
লেখকের নোট: এই গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে রচিত একটি সৃজনশীল রচনা মাত্র। গল্পের কোনো চরিত্র বা ঘটনা বাস্তবের সাথে মেলানো উচিত নয়। রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জীর মৃত্যু একটি দুঃখজনক দুর্ঘটনা এবং তাঁর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হচ্ছে।
_____________
রবিবারের বিকেলটা ছিল অস্বাভাবিক রকম নিস্তব্ধ।
গোয়েন্দা অর্ণব মিত্র তাঁর ভবানীপুরের ছোট্ট অফিসে বসে ঠান্ডা চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন, যখন তাঁর ফোনটা বেজে উঠল।
"স্যার, ওড়িশার তালসারি সৈকতে একজন বাঙালি অভিনেতা ডুবে মারা গেছেন।" ফোনের ওপাশ থেকে তাঁর সহকারী প্রদীপ বলল। "নাম রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জী। সিরিয়াল অভিনেতা। পুলিশ দুর্ঘটনা বলছে, কিন্তু প্রযোজক সংস্থা চাইছে আপনি একবার ঘটনাস্থলে যান।"
অর্ণব চায়ের কাপটা রেখে দিলেন।
রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জী। নামটা তিনি চিনতেন। বাংলা সিরিয়ালের জগতে বেশ পরিচিত মুখ। মাত্র ৪৩ বছর বয়স।
"গাড়ি তৈরি রাখো," তিনি বললেন, "আধঘণ্টার মধ্যে বেরোচ্ছি।"
পরের দিন সকালে অর্ণব তালসারি পৌঁছালেন। ওড়িশার এই ছোট্ট সৈকত শহরটা তখনও শোকের আবহে ভারী হয়ে আছে। হোটেলের সামনে কয়েকটা টেলিভিশন চ্যানেলের গাড়ি দাঁড়িয়ে।
স্থানীয় পুলিশ অফিসার হরেকৃষ্ণ পট্টনায়েক অর্ণবকে স্বাগত জানালেন।
"ঘটনাটা সহজ," পট্টনায়েক বললেন, "শুটিং শেষে অভিনেতা একা সমুদ্রে নেমে পড়েন। ঢেউয়ে তলিয়ে যান। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর মৃত ঘোষণা করা হয়।"
"সহজ," অর্ণব শব্দটা পুনরাবৃত্তি করলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা সূক্ষ্ম হাসি খেলল। "সহজ জিনিস নিয়ে আমাকে ডাকা হয় না, পট্টনায়েকবাবু।"
তিনি সৈকতের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
ঘটনাস্থলটা এখনও দড়ি দিয়ে ঘেরা। অর্ণব বালির দিকে নিচু হয়ে তাকালেন। একজোড়া পায়ের ছাপ জলের দিকে গেছে। কিন্তু কিছু একটা তাঁকে অস্থির করে দিল।
পায়ের ছাপের গভীরতা অসম।
বাঁ পায়ের ছাপ ডান পায়ের তুলনায় অনেক গভীর। যেন কেউ তাঁকে একদিকে ধাক্কা দিয়েছিল, অথবা তিনি নিজেই টলমল করতে করতে হেঁটেছিলেন।
শুটিং ইউনিটের সদস্যরা পাশের একটি হোটেলে উঠেছিলেন। অর্ণব একে একে সবার সাথে কথা বললেন।
প্রথম সাক্ষী — ক্যামেরাম্যান সুজিত দাস:
"রাহুলদা শুটিং শেষ করে খুব চুপচাপ ছিলেন। সাধারণত জোকস করেন, আড্ডা মারেন। সেদিন কেমন যেন থমথমে।"
"শুটিংয়ের সময় কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছিল?" অর্ণব জিজ্ঞেস করলেন।
সুজিত একটু থামলেন। "না... মানে, একটা ফোন এসেছিল। রাহুলদা একটু দূরে গিয়ে কথা বললেন। ফিরে এলেন চুপ হয়ে।"
"কার ফোন?"
"জানি না। তবে রাহুলদার মুখ দেখে মনে হলো কিছু একটা ভালো খবর না।"
দ্বিতীয় সাক্ষী — সহ-অভিনেত্রী মৌমিতা রায়:
"রাহুলদা সমুদ্রে নামার আগে আমাকে বলেছিলেন, 'একটু একা থাকতে চাই।' আমি ভেবেছিলাম ক্লান্ত।" মৌমিতার চোখে জল। "অনেকে বারণ করেছিলেন, জোয়ার আসছে বলে। উনি শুনলেন না।"
"অনেকে মানে কে কে?"
"আমি বারণ করেছিলাম। প্রোডাকশন ম্যানেজার নীলেশও বলেছিলেন। কিন্তু..." মৌমিতা থামলেন।
"কিন্তু?"
"কিন্তু রিঙ্কুদা — মানে রিঙ্কু বসু, আমাদের আর্ট ডিরেক্টর — বলেছিলেন 'ওকে যেতে দাও, একটু একা থাকুক।' তখন রিঙ্কুদার কথা শুনে বাকিরা সরে গেল।"
অর্ণবের কলম থামল।
তৃতীয় সাক্ষী — প্রোডাকশন ম্যানেজার নীলেশ শর্মা:
"আমি বারণ করেছিলাম, স্যার। কিন্তু রাহুলদা মানলেন না। তারপর বাকিরা যে যার গাড়িতে চলে গেল। হঠাৎ দেখি রাহুলদা ডুবে যাচ্ছেন।"
"সবাই গাড়িতে চলে গেল মানে?" অর্ণব তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন। "শুটিং শেষ হতে না হতে সবাই চলে গেল?"
নীলেশ অস্বস্তিতে পড়লেন। "মানে... প্যাক আপ হয়ে গিয়েছিল তো।"
"কিন্তু মূল অভিনেতা সৈকতে একা — এই অবস্থায় পুরো দল চলে যায়?"
নীলেশ চুপ।
সন্ধ্যায় কলকাতা থেকে ফোনে কথা হলো প্রযোজক লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে।
"চিত্রনাট্যে জলের কোনো দৃশ্য ছিল না," তিনি স্পষ্ট বললেন। "আমি এটা জোর দিয়ে বলছি। রাহুল কেন জলে নামল, আমি বুঝতে পারছি না।"
"রাহুলের সাথে শেষ কখন কথা হয়েছিল আপনার?"
একটু নীরবতা। "শুটিংয়ের আগের দিন। সে বলেছিল, কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু কী, বলেনি।"
"আর্ট ডিরেক্টর রিঙ্কু বসুকে চেনেন?"
"রিঙ্কু?" লীনার কণ্ঠে একটু পরিবর্তন। "চিনি। কিন্তু এই প্রোজেক্টে সে কীভাবে এল, আমি নিজেও অবাক হয়েছিলাম। নীলেশ ওকে রেকমেন্ড করেছিল।"
রাতে হোটেলের ঘরে বসে অর্ণব অনলাইনে প্রকাশিত শেষ ভিডিওটা বারবার দেখলেন।
সবুজ শার্ট পরা রাহুল তাঁর সহ-অভিনেত্রীর সাথে পারফর্ম করছেন। রাস্তায় গাড়ি দাঁড়ানো, আশেপাশে ইউনিটের লোকজন।
কিন্তু অর্ণব লক্ষ করলেন — ভিডিওর একদম কোণে, একটি গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে একজন লোক রাহুলের দিকে তাকিয়ে আছে। বাকি সবাই শুটিং দেখছে, কিন্তু এই লোকটি রাহুলকে দেখছে — এক অদ্ভুত স্থির দৃষ্টিতে।
অর্ণব ছবিটা জুম করলেন।
রিঙ্কু বসু।
পরদিন সকালে অর্ণব কলকাতায় তাঁর পুরনো সহকারীকে ফোন করলেন।
"রিঙ্কু বসু সম্পর্কে যা পাস, পাঠা।"
দুপুরের মধ্যেই তথ্য এলো।
রিঙ্কু বসু এবং রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জী — দুজন একসময় ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সালে একটা ঘটনায় সম্পর্ক ভেঙে যায়। একটি প্রোডাকশন হাউসে রাহুলের সাক্ষ্যের কারণে রিঙ্কু চুক্তি হারান এবং ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর নাম খারাপ হয়।
তারপর থেকে রিঙ্কু কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিলেন।
২০২৪ সালের শেষ দিক পর্যন্ত।
ঠিক যখন থেকে এই 'ভোলেবাবা পার করেগা' প্রোজেক্টে তিনি যোগ দেন।
অর্ণব পুলিশকে অনুরোধ করলেন রাহুলের শেষ কয়েক ঘণ্টার কল রেকর্ড দেখতে।
শুটিংয়ের দিন বিকেল সাড়ে তিনটায় একটি অজানা নম্বর থেকে রাহুলকে ফোন করা হয়েছিল। কথা হয়েছিল মাত্র ৪৩ সেকেন্ড।
সেই নম্বরটি ট্রেস করতে গিয়ে দেখা গেল — নম্বরটি একটি সস্তা বার্নার ফোনে করা, যা কিনা তালসারির কাছেই একটি ছোট্ট দোকান থেকে নগদে কেনা হয়েছিল।
দোকানের মালিক জানাল, "হ্যাঁ, একজন মোটামুটি বয়স্ক ভদ্রলোক কিনেছিলেন। চোখে চশমা, খাটো।"
অর্ণব ভিডিওর সেই স্থির চোখের মানুষটির কথা মনে করলেন।
রিঙ্কু বসু।
রিঙ্কু বসু তখনও তালসারির হোটেলে ছিলেন। অর্ণব তাঁর ঘরে গেলেন।
"বসুন," অর্ণব শান্ত গলায় বললেন।
রিঙ্কু নার্ভাস হাসলেন। "কী ব্যাপার?"
"রাহুলের মৃত্যুর দিন বিকেলে ৪৩ সেকেন্ডের একটা ফোন তাঁকে করেছিলেন। কী বলেছিলেন?"
রিঙ্কুর মুখ সাদা হয়ে গেল।
"আমি... আমি জানি না কী বলছেন।"
"তালসারির দোকানের মালিক আপনাকে চিনতে পেরেছেন," অর্ণব বললেন। "বার্নার ফোন কিনেছিলেন। কেন?"
দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর রিঙ্কু ভেঙে পড়লেন।
"আমি... আমি শুধু তাকে ----। "
"তাহলে সমুদ্রে?"
রিঙ্কু মাথা নামালেন। "সে নিজেই গেছে। আমি জানি না কেন। আমি সত্যিই ভাবিনি এরকম হবে।"
অর্ণব হোটেলের বাইরে বেরিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকালেন।
সত্যটা জটিল ছিল না আসলে। রিঙ্কু সরাসরি খুনি নয়। কিন্তু একটা হুমকির ফোন কল, পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় — এই মানসিক চাপে বিপর্যস্ত রাহুল হয়তো সেই বিকেলে কিছু ভাবতেই সমুদ্রের কাছে গিয়েছিলেন। হয়তো একটু শান্তি চেয়েছিলেন।
তারপর ঢেউ এসেছে।
স্ত্রী প্রিয়াঙ্কার কথা মনে পড়ল। ছেলে সহজের কথা। ২০১৮-তে আলাদা হয়ে, ২০২২-এ আবার এক হওয়া — কত কষ্টে গড়া একটা সংসার।
সেই সংসারের কর্তা আর নেই।
সমুদ্র থেকে ঢেউ এসে বালিতে মিলিয়ে গেল।
রিঙ্কু বসুকে পুলিশে দেওয়া হলো। তাঁর বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ দায়ের হলো। সরাসরি হত্যার প্রমাণ নেই, কিন্তু মানসিক নিষ্ঠুরতার একটা দায় থেকেই যায় — সেটা আইনের কাছে নয়, বিবেকের কাছে।
কলকাতায় ফেরার পথে অর্ণব প্রদীপকে বললেন, "প্রতিটা মৃত্যু খুন হয় না। কিন্তু প্রতিটা মৃত্যুর পেছনে একটা গল্প থাকে।"
"এই গল্পটা কী বলে, স্যার?"
অর্ণব জানালার বাইরে তাকালেন। "বলে — কিছু মানুষ প্রতিশোধের নেশায় এতটাই অন্ধ হয়ে যায় যে ভুলে যায়, আরেকজনকে ভাঙলে নিজেও ভেঙে পড়তে হয়।"
গাড়ি এগিয়ে চলল কলকাতার দিকে।
সমুদ্র পেছনে পড়ে রইল।
তালসারির ঢেউ আজও ভাঙে — যেন কোনো অসমাপ্ত কথা বলতে চাইছে। (চলবে)
______________
লেখকের নোট: এই গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে রচিত একটি সৃজনশীল রচনা মাত্র। গল্পের কোনো চরিত্র বা ঘটনা বাস্তবের সাথে মেলানো উচিত নয়। রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জীর মৃত্যু একটি দুঃখজনক দুর্ঘটনা এবং তাঁর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হচ্ছে।
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
জে এস এম অনিক ০৮/০৪/২০২৬Great
-
ফয়জুল মহী ০২/০৪/২০২৬সুন্দর প্রকাশ ; মুগ্ধ হলাম..
