অন্ধকারের ওপারে আলো
রাত তখন বারোটা ছুঁই ছুঁই।
বিশ্রামগঞ্জ থানার জ্বলন্ত বাল্বগুলো মাঝে মাঝে কাঁপছে। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। দূরে কোথাও একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে থেমে গেল।
ওসি অজিত দেববর্মা নড়লেন না।
তাঁর চোখ আটকে আছে ল্যাপটপের স্ক্রিনে। সেখানে একটা ডিজিটাল মানচিত্রের ওপর নয়টা সবুজ বিন্দু জ্বলছে। বিন্দুগুলো স্থির নয়। একটু নড়ছে। আবার থামছে। কেউ জানে না যে তাদেরকে দেখা যাচ্ছে।
অজিতবাবু ঠান্ডা চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। তেতো লাগল। তবু রাখলেন না। কারণ এই মুহূর্তে তাঁর মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে।
নয়টা ফোন। নয়জন মালিক। চুরি হয়েছে আলাদা আলাদা জায়গায়, আলাদা আলাদা দিনে। তাহলে কি এটা কাকতাল? নাকি একটাই হাত — অনেকগুলো আঙুল নিয়ে?
নয়টি অভিযোগ, সেদিন সকালটা শুরু হয়েছিল মিমি দেববর্মাকে দিয়ে।
বছর পঁচিশের মেয়ে। মাথায় সিঁদুর, হাতে শাঁখা। কিন্তু চোখে ভয়। থানায় ঢুকেই হাতে আঁচল মুচড়াতে লাগল।
"স্যার, আমার ফোনটা হারিয়ে গেছে। বিশ্রামগঞ্জ বাজারে। ভিড়ের মধ্যে।"
অজিতবাবু ডায়েরি খুললেন। "কবে?"
"পরশু। মঙ্গলবার বিকেলে।"
নাম লিখলেন। ফোনের মডেল লিখলেন। IMEI নম্বর চাইলেন। মিমি একটা কাগজ বের করল — আগে থেকে লিখে এনেছে। অজিতবাবু একটু অবাক হলেন। সাধারণত মানুষ IMEI নম্বর রাখে না।
"এটা কীভাবে পেলে?"
"আমার দাদা বলেছিল রাখতে। বলেছিল কোনোদিন কাজে লাগতে পারে।"
দাদা বুদ্ধিমান লোক। অজিতবাবু মনে মনে ভাবলেন।
মিমি বেরিয়ে যেতে না যেতেই এল উজ্জ্বল দেবনাথ। মাঝবয়সী মানুষ, দোকানদার। তারপর শংকর দেবনাথ, সত্যবান দেববর্মা, বাদল বর্মন, যতন দাস। বিকেল পর্যন্ত এল দীপক রুদ্র পাল, জুনায়েদ হোসেন এবং উপানন্দ দেববর্মা।
নয়জন।
কনস্টেবল রমেশ শেষ অভিযোগটা নথিভুক্ত করে বলল, "স্যার, এটা মাথায় ঢুকছে না। একটা থানা এলাকায় এত ফোন চুরি একসাথে?"
অজিতবাবু চেয়ারে হেলান দিলেন। বললেন, "তুই লক্ষ করলি?"
"কী?"
"নয়জনের মধ্যে পাঁচজনের ফোন গেছে বিশ্রামগঞ্জ বাজারে। তিনজনের গেছে পাশের মেলায়। একজনের গেছে বাস স্টেশনে।" একটু থামলেন। "সব জায়গাতেই একটা জিনিস কমন।"
রমেশ ভুরু কুঁচকাল। "ভিড়?"
"ভিড়," অজিতবাবু মাথা নাড়লেন। "পেশাদার কেউ। একা নয়, দল আছে।"
সেই রাতেই নয়টা অভিযোগ CEIR পোর্টালে আপলোড হল।
CEIR মানে — সেন্ট্রাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার।
নামটা শুনতে শুকনো লাগছে। কিন্তু অজিত দেববর্মার কাছে এটা একটা যাদুর আয়না। এই আয়নার সামনে দাঁড়ালে চোর নিজেকে লুকাতে পারে না।
কারণটা সহজ।
প্রতিটা মোবাইল ফোনের একটা জন্মগত পরিচয় থাকে। IMEI নম্বর। পনেরো সংখ্যার এই কোড বদলানো যায় না। সিম বদলাও, রং বদলাও, নাম বদলাও — IMEI থাকবেই। আর ফোন যখনই কোনো টাওয়ারের আওতায় আসে, সেই পরিচয় সংকেত পাঠায়।
CEIR পোর্টালে অভিযোগ দায়ের হতেই সেই সংকেত ধরার কাজ শুরু হয়ে গেল।
রাত তিনটের দিকে প্রথম বিন্দুটা জ্বলে উঠল। তারপর দ্বিতীয়। তৃতীয়। একে একে নয়টা।
অজিতবাবু মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বিন্দুগুলো ছড়িয়ে আছে। কিন্তু একটা প্যাটার্ন আছে। দুটো বিন্দু একই এলাকায়। কাছাকাছি। প্রায় পাশাপাশি।
তিনি সেই দুটো বিন্দুতে জুম করলেন।
মুখে একটা অদ্ভুত হাসি এল।
তুমি সাবধান। কিন্তু যথেষ্ট সাবধান নও।
পরদিন ভোর পাঁচটায় পুলিশ সুপার বিজয় দেববর্মার ফোন এল।
"অজিত, লোকেশন পেয়েছ?"
"জি স্যার। নয়টার মধ্যে সাতটা স্থির। দুটো এখনও নড়ছে।"
"নড়ছে মানে?"
"মানে কেউ ব্যবহার করছে। ঘুমায়নি এখনও। অথবা রাতে বেরিয়েছে।" অজিতবাবু থামলেন। "স্যার, আমার মনে হচ্ছে দলটা আজ রাতেও কাজে ছিল।"
ফোনের ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর বিজয় দেববর্মা বললেন, "আমি আসছি। বিকাশকেও বলছি। ভোর সাতটায় বেরোই।"
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। কুয়াশা ভাসছে রাস্তায়। দলটা তিনটে গাড়িতে ভাগ হয়ে গেল। লোকেশন ভাগ হল মানচিত্র দেখে।
রমেশ চুপচাপ গাড়িতে বসে। তার হাতে ট্যাবলেট — লাইভ আপডেট দেখছে।
হঠাৎ সে বলল, "স্যার, একটা বিন্দু নিভে গেছে।"
অজিতবাবু চমকালেন। "মানে?"
"ফোনটা বন্ধ হয়ে গেছে।"
"কোনটা?"
"তিন নম্বর। যতন দাসের ফোন।"
অজিতবাবু দাঁত চেপে ধরলেন। কেউ টের পেয়েছে? নাকি ব্যাটারি শেষ? দুটোর মধ্যে পার্থক্য বোঝার উপায় নেই এখনই।
"বাকিগুলো?"
"আছে। সব আছে।"
গাড়ি এগিয়ে চলল।
চতুর্থ অধ্যায় — মুখোশের আড়ালে
প্রথম ঠিকানাটা ছিল একটা চায়ের দোকান।
ছোট্ট দোকান। টিনের চাল। সামনে দুটো বেঞ্চ। দোকানদার রোগা লম্বা লোক। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। পুলিশ দেখে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে এল।
"কী হয়েছে দাদা?"
অজিতবাবু সরাসরি বললেন, "আপনার কাছে একটা ফোন আছে। সেটা আমাদের দিন।"
লোকটার মুখ একটু শক্ত হল। তারপর আবার নরম। "কোন ফোন? আমার তো পুরনো কীপ্যাড—"
"সেটা নয়।" অজিতবাবু তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। "আপনি কিনেছেন। কারো কাছ থেকে। সস্তায়।"
লোকটা ঢোক গিলল।
পকেট থেকে বের হল শংকর দেবনাথের ফোন।
লোকটা বলল, "আমি জানতাম না। সত্যি বলছি। একটা ছেলে এসে বেচে দিয়ে গেল। দাম কম দেখে কিনেছিলাম।"
"ছেলেটা কেমন দেখতে?"
লোকটা ভাবল। "কালো। লম্বা। একটা লাল টি-শার্ট ছিল। হাতে একটা ব্যাগ।"
অজিতবাবু রমেশের দিকে তাকালেন। রমেশ নোট নিচ্ছে।
দ্বিতীয় ঠিকানায় পাওয়া গেল বাদল বর্মনের ফোন। রেখেছিল এক কিশোর। বলল দাদা দিয়েছে। দাদার নাম — কার্তিক। থাকে পাশের গ্রামে।
তৃতীয় ঠিকানায় পাওয়া গেল দুটো ফোন। একটা বাড়ির মহিলার হাতে। তিনি কিছুই জানেন না। স্বামী কোথায় গেছেন বলতে পারলেন না।
অজিতবাবু বুঝলেন লোকটা পালিয়েছে। হয়তো টের পেয়েছে।
কিন্তু CEIR বলছে ফোন এখানেই।
রমেশ ঘরের কোণে একটা পুরনো কম্বলের নিচে পেল উপানন্দ দেববর্মার ফোন। বন্ধ করে লুকিয়ে রাখা।
"স্মার্ট," রমেশ বিড়বিড় করল।
"স্মার্ট নয়," অজিতবাবু বললেন। "শেষ মুহূর্তের চেষ্টা। ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।"
পঞ্চম অধ্যায় — মেলার ভেতরে ফাঁদ
সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাটা ঘটল পাশের জেলার একটা মেলায়।
বিকাশ সিনথিয়ার দল সেখানে পৌঁছেছিল বেলা এগারোটায়। মেলা তখন জমজমাট। ঢাক বাজছে। বাচ্চারা ছুটছে। মিষ্টির দোকানে ভিড়।
ট্যাবলেটে দেখা যাচ্ছে দুটো বিন্দু এখানেই।
বিকাশ সিনথিয়া সাদা পোশাকে দাঁড়িয়ে বললেন, "ভিড়ে মিশে যাও। কাউকে সন্দেহ করিয়ো না।"
কনস্টেবলরা ছড়িয়ে পড়ল।
মিনিট পনেরো পরে একজন কনস্টেবল ইশারা করল। মেলার পূর্ব কোণে একটা লোক দাঁড়িয়ে। হাতে একটা ফোন। কারো সাথে কথা বলছে। লাল টি-শার্ট।
চায়ের দোকানদারের বর্ণনার সাথে মিলে গেল।
লোকটার নাম পরে জানা গেল — রঞ্জু। বয়স তিরিশ। পেশা অজানা। এলাকায় কেউ চেনে না তেমন।
পুলিশ কাছে আসতেই রঞ্জু বুঝে গেল। ফোন ছুঁড়ে দিল মাটিতে। দৌড় লাগাল ভিড়ের দিকে।
কিন্তু ভিড়ের মধ্যেও পথ বন্ধ। সাদা পোশাকের কনস্টেবলরা চারদিক থেকে এগিয়ে আসছে।
রঞ্জু থামল। হাঁফাচ্ছে।
মাটিতে পড়া ফোনটা তুলে দেখা গেল — জুনায়েদ হোসেনের ফোন। স্ক্রিন ফাটেনি। অক্ষত।
নবম ফোনটা পাওয়া গেল রঞ্জুর ব্যাগে। সেটা যতন দাসের — যেটা সকালে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়েছিল।
রমেশ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
জিজ্ঞাসাবাদে রঞ্জু প্রথমে চুপ।
তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল গল্প।
পাঁচজনের একটা দল। দুইজন বাজারে কাজ করে — ভিড়ের ভিতর ধাক্কা দেয়, পকেট সাফ করে। একজন মেলায়। একজন বাস স্টেশনে। আর রঞ্জু — সে ফোনগুলো কিনত, বেচত, মাঝখানে রাখত।
মাসখানেক ধরে চলছিল।
"কার্তিক কোথায়?" অজিতবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
রঞ্জু চুপ।
"কার্তিক কোথায়?" আবার। শান্ত গলায়।
রঞ্জু মাথা নামাল। একটা ঠিকানা দিল।
মঙ্গলবার দুপুর।
বিশ্রামগঞ্জ থানার ওসির ছোট্ট কক্ষে তখন রোদ এসে পড়েছে। টেবিলের ওপর নয়টা ফোন সাজানো। পাশে নয়টা নাম লেখা কাগজ।
পুলিশ সুপার বিজয় দেববর্মা দরজায় দাঁড়িয়ে। তাঁর পাশে বিকাশ সিনথিয়া। সামনে নয়জন মানুষ।
মিমি দেববর্মা ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিন জ্বালাল। লক খুলল। সব ছবি আছে। সব মেসেজ আছে। ছেলের প্রথম হাঁটার ভিডিও আছে।
সে কিছু বলতে পারল না। শুধু মাথা নামাল।
যতন দাস বললেন, "ভাবিনি এত তাড়াতাড়ি পাব।"
উপানন্দ দেববর্মা বললেন, "এই পোর্টালের কথা তো জানতামই না।"
বিজয় দেববর্মা সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, "ফোন হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে থানায় আসুন। CEIR পোর্টালে একটা অভিযোগ ক্রুন — বাকি কাজ আমাদের। এই পোর্টালের সাহায্যেই আমরা কিছুদিন আগে বত্রিশটি ফোন উদ্ধার করেছিলাম। আজ আরও নয়টা যোগ হল।"
অজিত দেববর্মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখলেন।
নয়টা মানুষ নয়টা ফোন নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের পায়ের আওয়াজ ক্রমে মিলিয়ে গেল।
ঘরটা ফাঁকা হল।
কিন্তু অজিতবাবু জানেন, এই ফাঁকা বেশিক্ষণ থাকবে না। কাল সকালে আবার কেউ আসবে। নতুন অভিযোগ। নতুন নাম। নতুন IMEI নিয়ে।
বিশ্রামগঞ্জ থানার জ্বলন্ত বাল্বগুলো মাঝে মাঝে কাঁপছে। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। দূরে কোথাও একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে থেমে গেল।
ওসি অজিত দেববর্মা নড়লেন না।
তাঁর চোখ আটকে আছে ল্যাপটপের স্ক্রিনে। সেখানে একটা ডিজিটাল মানচিত্রের ওপর নয়টা সবুজ বিন্দু জ্বলছে। বিন্দুগুলো স্থির নয়। একটু নড়ছে। আবার থামছে। কেউ জানে না যে তাদেরকে দেখা যাচ্ছে।
অজিতবাবু ঠান্ডা চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। তেতো লাগল। তবু রাখলেন না। কারণ এই মুহূর্তে তাঁর মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে।
নয়টা ফোন। নয়জন মালিক। চুরি হয়েছে আলাদা আলাদা জায়গায়, আলাদা আলাদা দিনে। তাহলে কি এটা কাকতাল? নাকি একটাই হাত — অনেকগুলো আঙুল নিয়ে?
নয়টি অভিযোগ, সেদিন সকালটা শুরু হয়েছিল মিমি দেববর্মাকে দিয়ে।
বছর পঁচিশের মেয়ে। মাথায় সিঁদুর, হাতে শাঁখা। কিন্তু চোখে ভয়। থানায় ঢুকেই হাতে আঁচল মুচড়াতে লাগল।
"স্যার, আমার ফোনটা হারিয়ে গেছে। বিশ্রামগঞ্জ বাজারে। ভিড়ের মধ্যে।"
অজিতবাবু ডায়েরি খুললেন। "কবে?"
"পরশু। মঙ্গলবার বিকেলে।"
নাম লিখলেন। ফোনের মডেল লিখলেন। IMEI নম্বর চাইলেন। মিমি একটা কাগজ বের করল — আগে থেকে লিখে এনেছে। অজিতবাবু একটু অবাক হলেন। সাধারণত মানুষ IMEI নম্বর রাখে না।
"এটা কীভাবে পেলে?"
"আমার দাদা বলেছিল রাখতে। বলেছিল কোনোদিন কাজে লাগতে পারে।"
দাদা বুদ্ধিমান লোক। অজিতবাবু মনে মনে ভাবলেন।
মিমি বেরিয়ে যেতে না যেতেই এল উজ্জ্বল দেবনাথ। মাঝবয়সী মানুষ, দোকানদার। তারপর শংকর দেবনাথ, সত্যবান দেববর্মা, বাদল বর্মন, যতন দাস। বিকেল পর্যন্ত এল দীপক রুদ্র পাল, জুনায়েদ হোসেন এবং উপানন্দ দেববর্মা।
নয়জন।
কনস্টেবল রমেশ শেষ অভিযোগটা নথিভুক্ত করে বলল, "স্যার, এটা মাথায় ঢুকছে না। একটা থানা এলাকায় এত ফোন চুরি একসাথে?"
অজিতবাবু চেয়ারে হেলান দিলেন। বললেন, "তুই লক্ষ করলি?"
"কী?"
"নয়জনের মধ্যে পাঁচজনের ফোন গেছে বিশ্রামগঞ্জ বাজারে। তিনজনের গেছে পাশের মেলায়। একজনের গেছে বাস স্টেশনে।" একটু থামলেন। "সব জায়গাতেই একটা জিনিস কমন।"
রমেশ ভুরু কুঁচকাল। "ভিড়?"
"ভিড়," অজিতবাবু মাথা নাড়লেন। "পেশাদার কেউ। একা নয়, দল আছে।"
সেই রাতেই নয়টা অভিযোগ CEIR পোর্টালে আপলোড হল।
CEIR মানে — সেন্ট্রাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার।
নামটা শুনতে শুকনো লাগছে। কিন্তু অজিত দেববর্মার কাছে এটা একটা যাদুর আয়না। এই আয়নার সামনে দাঁড়ালে চোর নিজেকে লুকাতে পারে না।
কারণটা সহজ।
প্রতিটা মোবাইল ফোনের একটা জন্মগত পরিচয় থাকে। IMEI নম্বর। পনেরো সংখ্যার এই কোড বদলানো যায় না। সিম বদলাও, রং বদলাও, নাম বদলাও — IMEI থাকবেই। আর ফোন যখনই কোনো টাওয়ারের আওতায় আসে, সেই পরিচয় সংকেত পাঠায়।
CEIR পোর্টালে অভিযোগ দায়ের হতেই সেই সংকেত ধরার কাজ শুরু হয়ে গেল।
রাত তিনটের দিকে প্রথম বিন্দুটা জ্বলে উঠল। তারপর দ্বিতীয়। তৃতীয়। একে একে নয়টা।
অজিতবাবু মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বিন্দুগুলো ছড়িয়ে আছে। কিন্তু একটা প্যাটার্ন আছে। দুটো বিন্দু একই এলাকায়। কাছাকাছি। প্রায় পাশাপাশি।
তিনি সেই দুটো বিন্দুতে জুম করলেন।
মুখে একটা অদ্ভুত হাসি এল।
তুমি সাবধান। কিন্তু যথেষ্ট সাবধান নও।
পরদিন ভোর পাঁচটায় পুলিশ সুপার বিজয় দেববর্মার ফোন এল।
"অজিত, লোকেশন পেয়েছ?"
"জি স্যার। নয়টার মধ্যে সাতটা স্থির। দুটো এখনও নড়ছে।"
"নড়ছে মানে?"
"মানে কেউ ব্যবহার করছে। ঘুমায়নি এখনও। অথবা রাতে বেরিয়েছে।" অজিতবাবু থামলেন। "স্যার, আমার মনে হচ্ছে দলটা আজ রাতেও কাজে ছিল।"
ফোনের ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর বিজয় দেববর্মা বললেন, "আমি আসছি। বিকাশকেও বলছি। ভোর সাতটায় বেরোই।"
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। কুয়াশা ভাসছে রাস্তায়। দলটা তিনটে গাড়িতে ভাগ হয়ে গেল। লোকেশন ভাগ হল মানচিত্র দেখে।
রমেশ চুপচাপ গাড়িতে বসে। তার হাতে ট্যাবলেট — লাইভ আপডেট দেখছে।
হঠাৎ সে বলল, "স্যার, একটা বিন্দু নিভে গেছে।"
অজিতবাবু চমকালেন। "মানে?"
"ফোনটা বন্ধ হয়ে গেছে।"
"কোনটা?"
"তিন নম্বর। যতন দাসের ফোন।"
অজিতবাবু দাঁত চেপে ধরলেন। কেউ টের পেয়েছে? নাকি ব্যাটারি শেষ? দুটোর মধ্যে পার্থক্য বোঝার উপায় নেই এখনই।
"বাকিগুলো?"
"আছে। সব আছে।"
গাড়ি এগিয়ে চলল।
চতুর্থ অধ্যায় — মুখোশের আড়ালে
প্রথম ঠিকানাটা ছিল একটা চায়ের দোকান।
ছোট্ট দোকান। টিনের চাল। সামনে দুটো বেঞ্চ। দোকানদার রোগা লম্বা লোক। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। পুলিশ দেখে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে এল।
"কী হয়েছে দাদা?"
অজিতবাবু সরাসরি বললেন, "আপনার কাছে একটা ফোন আছে। সেটা আমাদের দিন।"
লোকটার মুখ একটু শক্ত হল। তারপর আবার নরম। "কোন ফোন? আমার তো পুরনো কীপ্যাড—"
"সেটা নয়।" অজিতবাবু তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। "আপনি কিনেছেন। কারো কাছ থেকে। সস্তায়।"
লোকটা ঢোক গিলল।
পকেট থেকে বের হল শংকর দেবনাথের ফোন।
লোকটা বলল, "আমি জানতাম না। সত্যি বলছি। একটা ছেলে এসে বেচে দিয়ে গেল। দাম কম দেখে কিনেছিলাম।"
"ছেলেটা কেমন দেখতে?"
লোকটা ভাবল। "কালো। লম্বা। একটা লাল টি-শার্ট ছিল। হাতে একটা ব্যাগ।"
অজিতবাবু রমেশের দিকে তাকালেন। রমেশ নোট নিচ্ছে।
দ্বিতীয় ঠিকানায় পাওয়া গেল বাদল বর্মনের ফোন। রেখেছিল এক কিশোর। বলল দাদা দিয়েছে। দাদার নাম — কার্তিক। থাকে পাশের গ্রামে।
তৃতীয় ঠিকানায় পাওয়া গেল দুটো ফোন। একটা বাড়ির মহিলার হাতে। তিনি কিছুই জানেন না। স্বামী কোথায় গেছেন বলতে পারলেন না।
অজিতবাবু বুঝলেন লোকটা পালিয়েছে। হয়তো টের পেয়েছে।
কিন্তু CEIR বলছে ফোন এখানেই।
রমেশ ঘরের কোণে একটা পুরনো কম্বলের নিচে পেল উপানন্দ দেববর্মার ফোন। বন্ধ করে লুকিয়ে রাখা।
"স্মার্ট," রমেশ বিড়বিড় করল।
"স্মার্ট নয়," অজিতবাবু বললেন। "শেষ মুহূর্তের চেষ্টা। ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।"
পঞ্চম অধ্যায় — মেলার ভেতরে ফাঁদ
সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাটা ঘটল পাশের জেলার একটা মেলায়।
বিকাশ সিনথিয়ার দল সেখানে পৌঁছেছিল বেলা এগারোটায়। মেলা তখন জমজমাট। ঢাক বাজছে। বাচ্চারা ছুটছে। মিষ্টির দোকানে ভিড়।
ট্যাবলেটে দেখা যাচ্ছে দুটো বিন্দু এখানেই।
বিকাশ সিনথিয়া সাদা পোশাকে দাঁড়িয়ে বললেন, "ভিড়ে মিশে যাও। কাউকে সন্দেহ করিয়ো না।"
কনস্টেবলরা ছড়িয়ে পড়ল।
মিনিট পনেরো পরে একজন কনস্টেবল ইশারা করল। মেলার পূর্ব কোণে একটা লোক দাঁড়িয়ে। হাতে একটা ফোন। কারো সাথে কথা বলছে। লাল টি-শার্ট।
চায়ের দোকানদারের বর্ণনার সাথে মিলে গেল।
লোকটার নাম পরে জানা গেল — রঞ্জু। বয়স তিরিশ। পেশা অজানা। এলাকায় কেউ চেনে না তেমন।
পুলিশ কাছে আসতেই রঞ্জু বুঝে গেল। ফোন ছুঁড়ে দিল মাটিতে। দৌড় লাগাল ভিড়ের দিকে।
কিন্তু ভিড়ের মধ্যেও পথ বন্ধ। সাদা পোশাকের কনস্টেবলরা চারদিক থেকে এগিয়ে আসছে।
রঞ্জু থামল। হাঁফাচ্ছে।
মাটিতে পড়া ফোনটা তুলে দেখা গেল — জুনায়েদ হোসেনের ফোন। স্ক্রিন ফাটেনি। অক্ষত।
নবম ফোনটা পাওয়া গেল রঞ্জুর ব্যাগে। সেটা যতন দাসের — যেটা সকালে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়েছিল।
রমেশ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
জিজ্ঞাসাবাদে রঞ্জু প্রথমে চুপ।
তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল গল্প।
পাঁচজনের একটা দল। দুইজন বাজারে কাজ করে — ভিড়ের ভিতর ধাক্কা দেয়, পকেট সাফ করে। একজন মেলায়। একজন বাস স্টেশনে। আর রঞ্জু — সে ফোনগুলো কিনত, বেচত, মাঝখানে রাখত।
মাসখানেক ধরে চলছিল।
"কার্তিক কোথায়?" অজিতবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
রঞ্জু চুপ।
"কার্তিক কোথায়?" আবার। শান্ত গলায়।
রঞ্জু মাথা নামাল। একটা ঠিকানা দিল।
মঙ্গলবার দুপুর।
বিশ্রামগঞ্জ থানার ওসির ছোট্ট কক্ষে তখন রোদ এসে পড়েছে। টেবিলের ওপর নয়টা ফোন সাজানো। পাশে নয়টা নাম লেখা কাগজ।
পুলিশ সুপার বিজয় দেববর্মা দরজায় দাঁড়িয়ে। তাঁর পাশে বিকাশ সিনথিয়া। সামনে নয়জন মানুষ।
মিমি দেববর্মা ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিন জ্বালাল। লক খুলল। সব ছবি আছে। সব মেসেজ আছে। ছেলের প্রথম হাঁটার ভিডিও আছে।
সে কিছু বলতে পারল না। শুধু মাথা নামাল।
যতন দাস বললেন, "ভাবিনি এত তাড়াতাড়ি পাব।"
উপানন্দ দেববর্মা বললেন, "এই পোর্টালের কথা তো জানতামই না।"
বিজয় দেববর্মা সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, "ফোন হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে থানায় আসুন। CEIR পোর্টালে একটা অভিযোগ ক্রুন — বাকি কাজ আমাদের। এই পোর্টালের সাহায্যেই আমরা কিছুদিন আগে বত্রিশটি ফোন উদ্ধার করেছিলাম। আজ আরও নয়টা যোগ হল।"
অজিত দেববর্মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখলেন।
নয়টা মানুষ নয়টা ফোন নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের পায়ের আওয়াজ ক্রমে মিলিয়ে গেল।
ঘরটা ফাঁকা হল।
কিন্তু অজিতবাবু জানেন, এই ফাঁকা বেশিক্ষণ থাকবে না। কাল সকালে আবার কেউ আসবে। নতুন অভিযোগ। নতুন নাম। নতুন IMEI নিয়ে।
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
জে এস এম অনিক ০৮/০৪/২০২৬Excellent
-
ফয়জুল মহী ০২/০৪/২০২৬অসাধারণ
মুগ্ধ হলাম..
