www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

শিকল বিহীন তালা

ধর্মনগরের হরি মন্দিরের ঘণ্টা যখন ভোরের প্রথম আলোয় বাজে, তখন বিবেকানন্দ রোডের সেই গলিটা ঘুমিয়েই থাকে। রাস্তার ধুলো তখনো উড়ে ওঠেনি, কুকুরগুলো গুটিসুটি পড়ে আছে বাড়ির দাওয়ায়, আর মন্দিরের ধূপের গন্ধ বাতাসে ভেসে আসে দূর থেকে — শান্ত, পবিত্র। কিন্তু সেই শান্তির বুকে সেদিন একটা ক্ষত জন্মেছিল, যা কেউ তখনো জানত না।
গলিটার একেবারে মাথায় হরিপ্রসাদ দেবনাথের দোতলা বাড়ি। পুরনো লালচে ইটের দেওয়াল — সেখানে বৃষ্টির দাগ, শ্যাওলার রেখা, আর বছরের পর বছরের নীরব সাক্ষ্য। টিনের চালে বাতাস লাগলে একটা চাপা শব্দ হয়, যেন বাড়িটা নিজেই কিছু বলতে চায়। উঠোনের কোণে দাঁড়িয়ে সেই চিরপরিচিত নিম গাছ — পাতা ঝরে পড়েছে উঠোনে, শুকনো ডালে একটা কাক বসে আছে নিঃশব্দে, যেন সেও অপেক্ষা করছে কোনো অজানা ঘটনার।
"সেই সকালটা অন্য সব সকালের মতোই শুরু হয়েছিল। অথচ প্রথম পা ফেলতেই হরিপ্রসাদ বুঝলেন — আজকের সূর্য অন্য আলো এনেছে।"
হরিপ্রসাদ ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিনের মতোই পূজার ঘরের দিকে গেলেন। কিন্তু সেদিন পায়ের তলায় মাটি যেন একটু সরে গেল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল — তালাটা ঝুলছে, কিন্তু তার ভেতরের শিকলিটা বাহিরের দিকে ঝুলে আছে। ফাঁক দিয়ে দরজাটা একটু খোলা। একটা শীতল স্রোত পিঠ বেয়ে নেমে গেল।
ভেতরে ঢুকলেন কাঁপতে কাঁপতে। কাঠের সিন্দুকটা — যেটায় তার বাবা নিজে মহাজনের কাছ থেকে কিনেছিলেন শখের বসে — সেটার ডালা হাঁ করে খোলা। ভেতরে শুধু শূন্যতা। বাষট্টি হাজার টাকা নেই। প্রয়াত বাবার রুপোর বাটি নেই — সেই বাটি, যা পূজায় তুলসীপাতা ভাসিয়ে রাখা হত, যার গায়ে বাবার নামের আদ্যাক্ষর খোদাই করা। কিছুই নেই।
খবর পেয়ে গোয়েন্দা অরুণ চক্রবর্তী পৌঁছালেন বেলা দশটা নাগাদ। পাড়াটায় তখন রোদ উঠেছে, প্রতিবেশী্রা নিজেদের দরজায় দরজায় দাঁড়িয়ে ফিসফিস কথা বলছেন, শিশুরা উঠোনে খেলছে — স্বাভাবিক জীবন চলছে, কিন্তু হরিপ্রসাদের বাড়ির ভেতরে সময়্টা যেন থমকে আছে।
চক্রবর্তীকে দেখে কেউ বুঝতে পারবে না ইনি গোয়েন্দা। সাদা পাঞ্জাবি, কালো প্যান্ট — গলায় কোনো পরিচয়পত্র নেই, হাতে কোনো ব্যাগ নেই। ধর্মনগরের যেকোনো মধ্যবিত্ত মানুষের মতোই দেখতে। কিন্তু গেটে পা দিয়েই তিনি একটু থামলেন। মাটির দিকে একবার তাকালেন। তারপর উঠোনের বাঁ দিকে একবার, নিম গাছের গোড়ায় একবার। কেউ খেয়াল করলে বুঝত — ওই চোখ দুটো আসলে একটা ক্যামেরা, যা প্রতিটি ফ্রেম সংরক্ষণ করে নিচ্ছে।
গোয়েন্দার দৃষ্টি যেখানে পড়ল
গেটের কাছে মাটিতে সাইকেলের চাকার হালকা দাগ — সম্প্রতি কেউ এসেছিল। উঠোনের নিম গাছের নিচে একটা বিড়ি পড়ে আছে — অর্ধেক পোড়া, নতুন। হরিপ্রসাদের পরিবার বিড়ি খায় না।
পূজার ঘরে ঢুকলেন। একবার চারদিকে চোখ বোলালেন — দ্রুত, কিন্তু কিছুই বাদ যায় না। ভাঙা তালাটা হাতে তুললেন, আলোয় ধরলেন। তারপর নামিয়ে রাখলেন ঠিক যেখানে পড়েছিল। সিন্দুকের কাঠ স্পর্শ করলেন, ডালার কব্জায় আঙুল দিলেন। খালি চোখে যা দেখা যায় না, তা যেন তাঁর আঙুলের ডগা পড়ে নেয়।
তারপর পকেট থেকে ছোট্ট কালো নোটবইটা বের করলেন। পাতা উল্টালেন না — শুধু কলম ঠেকালেন। বসলেন না। দাঁড়িয়েই থাকলেন, যেন নিজেও এই ঘরের একটা অংশ হয়ে যেতে চাইছেন — যাতে ঘরটা তাঁর কাছে তার গোপন কথা বলে।
"তদন্ত শুরু হয় দেখার আগে — অনুভব করা দিয়ে। চক্রবর্তী সেটা জানতেন।"

অরুণ চক্রবর্তী প্রথমে হরিপ্রসাদকে বসালেন উঠোনের বারান্দায়। সরস্বতী দেবী চা নিয়ে এলেন। চক্রবর্তী চায়ে চুমুক না দিয়েই শুরু করলেন।
চক্রবর্তী: "হরিদা, গতকাল রাতে শেষবার পূজার ঘরে কখন গিয়েছিলেন? ঠিক সময়টা
মনে আছে?"
হরিপ্রসাদ: "রাত সাড়ে দশটা। সন্ধ্যাপ্রদীপ নিভিয়ে তালা দিই। প্রতিদিনকার অভ্যাস।"
চক্রবর্তী: "তালাটা কোন ধরনের? চাবি কয়টা আছে? আর চাবিগুলো কোথায় রাখতেন?"
হরিপ্রসাদ: "লুথার কোম্পানির তালা। দুটো চাবি — একটা আমার কাছে, একটা সরস্বতীর কাছে।"
চক্রবর্তী: "সিন্দুকে এত টাকা কেন রেখেছিলেন? ব্যাংকে জমা দেননি কেন?"
হরিপ্রসাদ: "মেয়ের বিয়ের জন্য বিবাহ ভবন বায়না দিতে যাওয়ার কথা ছিল। সেজন্য।"
চক্রবর্তী: "এই টাকা রাখার কথা বাড়ির বাইরে কাউকে বলেছিলেন?"
হরিপ্রসাদ: "না... মানে, শুধু মনোজকে বলেছিলাম। ও তো ঘরের ছেলেই।"
সূত্র ১
টাকার কথা একমাত্র মনোজ দেবনাথ জানতেন — বাড়ির বাইরে কেউ নয়। অথচ চুরি হয়েছে সিন্দুক থেকে, জানালা দিয়ে নয়।
চক্রবর্তী উঠলেন। পূজার ঘরে গিয়ে তালাটা হাতে নিলেন। ভাঙা নয় — চাবি দিয়ে খোলা হয়েছে। ভেতরের ছিটকিনি ভেতর থেকেই তোলা।
জিজ্ঞাসাবাদ — সরস্বতী দেবনাথ (গৃহিণী)
চক্রবর্তী: "গতরাতে ঘুম ভেঙেছিল? কোনো শব্দ পেয়েছিলেন?"
সরস্বতী: "না, আমি গভীর ঘুমাই। কিছু শুনিনি।"
চক্রবর্তী: "আপনার চাবিটা এখন কোথায়?"
সরস্বতী: "(থতমত খেয়ে) আমার... আমার শাড়ির আঁচলে বাঁধা থাকে। এখন আছে।" (চাবি দেখালেন)
চক্রবর্তী: "রাতে মনোজ কোথায় ঘুমিয়েছিল?"
সরস্বতী: "নিচতলার ঘরে। ওর নিজের ঘর।"
চক্রবর্তী: "কবিতা কি রাতে বাড়িতে ছিল?"
সরস্বতী: "না, কবিতা সন্ধ্যার আগেই চলে যায়। ওর বাড়ি ছড়ার পাড়।"
চক্রবর্তী: "মনোজের সঙ্গে হরিদার সম্পর্ক কেমন? কোনো পারিবারিক বিবাদ আছে?"
সরস্বতী: "(একটু চুপ করে) মনোজ... সে একটু খরচার ছেলে। কিছুদিন আগে টাকার জন্য ঝগড়া হয়েছিল।"
সূত্র ২
সরস্বতী দেবীর চাবি তাঁর কাছেই আছে। হরিপ্রসাদের চাবি এখনো পাওয়া যাচ্ছে। তাহলে তালা খোলা হল কীভাবে? নকল চাবি? নাকি তৃতীয় কোনো চাবি?
মনোজ বছর পঁচিশের যুবক। চোখে অস্থিরতা। চক্রবর্তী তাকে একা পেয়ে উঠোনের কোণে নিয়ে গেলেন।
জিজ্ঞাসাবাদ — মনোজ দেবনাথ (ভাতিজা)
চক্রবর্তী: "গতকাল রাতে কোথায় ছিলে? রাত বারোটার পর?"
মনোজ: "ঘরেই ছিলাম। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আগেই।"
চক্রবর্তী: "কেউ দেখেছে তোমাকে? কোনো সাক্ষী?"
মনোজ: "একা থাকি, সাক্ষী কোথায় পাব?"
চক্রবর্তী: "কাকার কাছে সম্প্রতি টাকা চেয়েছিলে?"
মনোজ: "একটু ধার চেয়েছিলাম। ব্যবসায় লোকসান হয়েছিল।"
চক্রবর্তী: "দিয়েছিলেন?"
মনোজ: "না। বললেন পরে দেখবেন।"
চক্রবর্তী: "সিন্দুকে টাকা আছে — এটা তুমি ছাড়া আর কাউকে বলেছিলে?"
মনোজ: "(ঢোক গিলে) না।"
চক্রবর্তী: "তোমার মোবাইলে গতকাল রাত সাড়ে এগারোটায় শেষ কল কার কাছে?"
মনোজ: "..."
সূত্র ৩
মনোজের মোবাইলের শেষ কল সম্পর্কে প্রশ্নে সে চুপ করে গেল। রাত সাড়ে এগারোটার পর সে ফোন করেছে কাউকে — কিন্তু কাকে?


এই বাড়ির ঠিক বিপরীত দিকে রমেশ পালের মুদির দোকান। সকাল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত খোলা থাকে। চক্রবর্তী গেলেন সেখানে।
জিজ্ঞাসাবাদ — রমেশ পাল (প্রতিবেশী)
চক্রবর্তী: "গতকাল রাতে দোকান বন্ধ করার সময় হরিদার বাড়ির দিকে কিছু অস্বাভাবিক
দেখেছিলেন?"
রমেশ: "রাত দশটার দিকে মনোজকে দেখলাম বাড়ি থেকে বেরোতে। কিছু মনে হয়নি।"
চক্রবর্তী: "একা ছিল?"
রমেশ: "একাই ছিল। কিন্তু খানিকক্ষণ পরে ফিরে এল।"
চক্রবর্তী: "ফেরার সময়ও একা?"
রমেশ: "হ্যাঁ। তবে... একটু তাড়াহুড়ো করছিল মনে হল।"
চক্রবর্তী: "হরিদার বাড়িতে কোনো অপরিচিত মানুষ এদিকে আসা-যাওয়া করে?"
রমেশ: "না তেমন না। তবে কবিতার দাদা একদিন এসেছিল কদিন আগে।"
সূত্র ৪
মনোজ রাত দশটায় বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল এবং ফিরেছিল। সে বলেছে সারারাত ঘরে ছিল — এটা সরাসরি মিথ্যা।
ছড়ার পাড়ে কবিতা সূত্রধরের বাড়ি খুঁজে পেতে দেরি হল না। দরজা খুলতেই মুখ ফ্যাকাশে।
জিজ্ঞাসাবাদ — কবিতা সূত্রধর (গৃহসহায়িকা)
চক্রবর্তী: "পূজার ঘরের তালা তুমি কখনো খুলেছ?"
কবিতা: "মাঝেমধ্যে বৌদিমা বলতেন সন্ধ্যার প্রদীপ দিতে।"
চক্রবর্তী: "চাবি কোথায় পেতে?"
কবিতা: "বৌদিমার কাছ থেকে।"
চক্রবর্তী: "কখনো চাবিটা নকল করিয়েছে? বা কাউকে দিয়েছ?"
কবিতা: "(কেঁদে ফেলে) মনোজদা জোর করল... বলল শুধু দেখব, কোনো ক্ষতি হবে না। আমি জানতাম না ও এত বড় কাজ করবে।"
চক্রবর্তী: "মনোজ তোমাকে কী দিয়েছে বলেছিল?"
কবিতা: "পাঁচ হাজার টাকা দেবে বলেছিল।"
সূত্র ৫ — মূল রহস্য উন্মোচন
কবিতা সূত্রধর চাবি নকল করিয়ে মনোজকে দিয়েছিল। মনোজ রাত দশটায় বের হয়ে চাবি দিয়ে পূজার ঘর খুলে টাকা ও রুপোর বাটি নিয়ে ফিরে যায়।
বিকেলে চক্রবর্তী আবার হরিপ্রসাদের বাড়িতে এলেন। মনোজ তখনও ছিল। চক্রবর্তী তাকে ডাকলেন।
চূড়ান্ত মুখোমুখি — মনোজ দেবনাথ
চক্রবর্তী: "মনোজ, তুমি বললে সারারাত ঘরে ছিলে। রমেশ পাল দেখেছেন রাত দশটায়
তুমি বেরিয়েছ। এটা কী?"
মনোজ: "রমেশদা ভুল দেখেছেন।"
চক্রবর্তী: "কবিতা বলেছে তুমি ওকে দিয়ে চাবি নকল করিয়েছ। পাঁচ হাজার টাকার লোভ
দিয়েছ।"
মনোজ: "(দীর্ঘ নীরবতা। তারপর ধীরে মাথা নামায়)"

চক্রবর্তী: "একটাই মিথ্যা কথা সব শেষ করে দিল মনোজ — 'সারারাত ঘরে ছিলাম।' ওই
একটি মিথ্যাই তোমার ফাঁদ।"

মনোজ দেবনাথ কাকার কাছে ধার চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে পরিকল্পনা করে। কবিতাকে দিয়ে সরস্বতী দেবীর চাবির নকল বানায়। রাত দশটায় সকলে ঘুমালে পূজার ঘর খুলে বাষট্টি হাজার টাকা ও রুপোর বাটি নিয়ে নিজের ঘরে লুকিয়ে রাখে। তদন্তে তার একমাত্র ভুল ছিল সেই একটি মিথ্যা — "সারারাত ঘরে ছিলাম।" রমেশ পালের সাক্ষী আর কবিতার স্বীকারোক্তি সেই মিথ্যার দেওয়াল ভেঙে দিল।
হরিপ্রসাদ চুপ করে বসেছিলেন। কিন্তু মুখ পাথর। সরস্বতী দেবী আঁচল মুখে দিলেন।
চক্রবর্তী নোটবই বন্ধ করলেন। উঠতে উঠতে বললেন — "ধর্মনগরে আমি অনেক চুরির মামলা দেখেছি। চোর সবসময় বাইরের লোক হবে এমন কোন কথা নেই।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১০৫ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ৩১/০৩/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast