www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

দ্বিতীয় বিয়ে

আগরতলার মহারাজগঞ্জের পুরনো দেবনাথ বাড়িটা এখনও টিকে আছে — ভাঙা ইটের গায়ে শ্যাওলার স্তর, বারান্দায় তুলসীমঞ্চ, আর দরজায় লাল সিঁদুরে আঁকা স্বস্তিকা চিহ্ন। শীতের বিকেলে কুয়াশা নামে একটু তাড়াতাড়ি। সেই কুয়াশার মধ্যে দিয়ে ইন্সপেক্টর বিশ্বজিৎ দেববর্মা যখন ওই বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন, তখন ভেতর থেকে কান্নার শব্দ আসছিল — মেয়েলি, একটানা, যেন বহুদিনের জমানো বেদনা একসাথে ফেটে পড়ছে।
বিশ্বজিৎ আগরতলা জেলা পুলিশের সিআইডি শাখায় কাজ করেন। বয়স পঁয়তাল্লিশ, মাথায় কাঁচাপাকা চুল, পরনে সাধারণ পাঞ্জাবি-ট্রাউজার। চেহারায় কোনো নাটকীয়তা নেই — কিন্তু চোখ দুটো তীক্ষ্ণ, যেন সবকিছু মেপে নেয়। স্থানীয় লোকে তাঁকে চেনে 'বিশ্বদা' বলে।
ফোনটা এসেছিল বিকেল সাড়ে চারটায়। সুপ্রিয়া দেবনাথ — বয়স আঠাশ — জানিয়েছেন তাঁর স্বামী সুকান্ত দেবনাথ বাড়িতে ফেরেননি। তিন দিন হয়ে গেছে। আর আজ সকালে একটা অচেনা নম্বর থেকে এসএমএস এসেছে: "তোমার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। জিজ্ঞেস করো তার মাকে।"

বাড়ির ভেতরে সুপ্রিয়া বসেছিলেন একপাশে,চোখ ফোলা, শাড়ির আঁচল মুখে চাপা। পাশে বসা তাঁর শাশুড়ি বিমলা দেবনাথ — বছর পঁয়ষট্টি, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা।
বিশ্বজিৎ বসলেন একটি বাঁশের মোড়ায়। চারদিকে একবার চোখ বোলালেন। উঠোনের কোণে একটা পুরনো নারকেল গাছ। রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উঠছে — কেউ একজন রান্না করছে নীরবে। সংসার থামে না, দুঃখের মধ্যেও।
"সুপ্রিয়াদি, এসএমএসটা কি এখনো আছে ফোনে?" বিশ্বজিৎ জিজ্ঞেস করলেন নরম গলায়।
সুপ্রিয়া ফোনটা এগিয়ে দিলেন। বিশ্বজিৎ নম্বরটা নোট করলেন। তারপর বিমলাদেবীর দিকে ফিরলেন।
"মা, আপনি কি জানেন সুকান্তবাবু কোথায় গেছেন?"
বিমলাদেবী একটু চমকালেন। চোখের পাতা কাঁপল। তারপর বললেন, "না। ছেলের কাজকর্ম আমি জানি না। সে বড় হয়েছে।"
মিথ্যে। বিশ্বজিৎ বুঝলেন। বহু বছরের অভিজ্ঞতায় শিখেছেন — মিথ্যে বললে মানুষের চোখ একটু বেশি স্থির থাকে, যেন চোখকে নিয়ন্ত্রণ করতে বেশি শক্তি লাগে।
পরদিন ভোরে বিশ্বজিৎ গেলেন সুকান্তের দোকানে — আগরতলার এলাকায় একটা টেক্সটাইল দোকান। সুকান্ত সেখানে অ্যাকাউন্ট্স ম্যানেজার। সহকর্মী নিপু সরকার জানাল — গত মাস থেকে সুকান্তদা বদলে গিয়েছিলেন। দেরিতে আসতেন, তাড়াতাড়ি চলে যেতেন। একদিন নিপু দেখেছিল সুকান্ত ফোনে কথা বলছেন বাংলায় নয়, হিন্দিতে।
"হিন্দিতে? সুকান্তবাবু হিন্দি জানতেন?"
"হ্যাঁ দাদা, বেশ ভালোই জানতেন। বললেন ছোটবেলায় ধর্মনগরে কিছুদিন ছিলেন।"
বিশ্বজিৎ অফিসের রেজিস্টার ঘেঁটে দেখলেন সুকান্ত গত সপ্তাহে তিনবার উত্তর ত্রিপুরায় গেছেন — কুমারঘাটের একটি সাপ্লায়ারের কাছে। কিন্তু ভাউচারে সাপ্লায়ারের নাম লেখা 'রাধেশ্যাম ট্রেডার্স'। বিশ্বজিৎ সেই নামটা চেনেন — ওটা আগরতলারই একটা দোকান, কুমারঘাটের নয়।
মিথ্যে ট্রিপের আড়ালে কোথায় যেতেন সুকান্ত দেবনাথ?

সেদিন রাতে বিশ্বজিৎ আবার গেলেন দেবনাথ বাড়িতে। এবার একা, সুপ্রিয়াকে পাশের ঘরে রেখে বিমলাদেবীর সামনে বসলেন। রাতের আলোয় বুড়ির মুখ কাঁপছিল।
"মা, আমি জানি আপনি জানেন। আমি পুলিশ হিসেবে নয়, ছেলে হিসেবে জিজ্ঞেস করছি। সুকান্তবাবু কোথায়?"
বিমলাদেবী অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন, "কুমারঘাটে। একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে সে।"
সুপ্রিয়ার বিয়ে হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। সনাতন হিন্দু মতে, শাঁখা-সিঁদুর, সাতপাক, পণ — সব নিয়মে। তারপর থেকে সংসার হয়েছে, কিন্তু সন্তান হয়নি। বিমলাদেবী এটা মেনে নিতে পারেননি। ছেলেকে লুকিয়ে বলেছিলেন — বংশ রক্ষার জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করো। এবং সুকান্ত — নিজের ইচ্ছায় নয়, মায়ের চাপে — তাই করেছে।
"মেয়েটির নাম?"
"মনোরমা। কুমারঘাটের নাম করা পালবাড়ির মেয়ে।"
বিশ্বজিৎ একটু থামলেন। তারপর বললেন, "এই বিয়ে কি আইনসিদ্ধ?"
বিমলাদেবী মাথা নামালেন।
"হিন্দু বিবাহ আইনে, মা — স্ত্রী জীবিত থাকতে দ্বিতীয় বিয়ে অপরাধ। কিন্তু আমি তো শুধু এটা জানতে আসিনি।"

পরদিন সকালে বিশ্বজিৎ কুমারঘাট রওনা হলেন। পাহাড়ি রাস্তা, দু'পাশে রাবার বাগান, মাঝে মাঝে ছোট মন্দির। ত্রিপুরার উত্তরের এই অংশটা শান্ত কিন্তু রহস্যময়।
পালবাড়িতে পৌঁছে বিশ্বজিৎ দেখলেন বাড়িটা তালাবন্ধ। প্রতিবেশী এক বৃদ্ধ জানালেন — মনোরমা নেই, দু'দিন আগে কে যেন এসে তাকে নিয়ে গেছে। সুকান্তও নেই।
বিশ্বজিৎ ফোনে সুকান্তের নম্বরে কল করলেন। বন্ধ। তারপর এসএমএসটা যে নম্বর থেকে এসেছিল, সেটায় করলেন। রিং হল — এবং বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে ফোন বেজে উঠল।
তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকলেন বিশ্বজিৎ। ছোট্ট ঘর, গোছানো। একটা কোণায় একটা মোবাইল ফোন পড়ে আছে — ব্যাটারি প্রায় শেষ। এটাই সেই নম্বর। কিন্তু ফোনটা সুকান্তের নয়, মনোরমার।
মনোরমা নিজেই ওই এসএমএস পাঠিয়েছে সুপ্রিয়াকে?
কিন্তু কেন? যে মেয়ে জেনেশুনে একজন বিবাহিত পুরুষকে বিয়ে করেছে, সে কেন প্রথম স্ত্রীকে সতর্ক করবে?
ফোনে কোন লক নেই, খোলা ছিল। বিশ্বজিৎ সেভ করা নোটস দেখলেন। একটা নোটে বাংলায় লেখা — তারিখ তিনদিন আগের।
"আমি মনোরমা পাল। আমি জানতাম না সুকান্ত বিবাহিত। তার মা ফোনে আমাকে বলেছিল ছেলে বিপত্নীক। আমার বাবা বিশ্বাস করেছিলেন। বিয়ের রাতে সুকান্ত মাতাল হয়ে সত্যিটা বলে ফেলে। আমি ভয়ে পালাতে পারছিলাম না — সুকান্ত বলেছিল পালালে বাবাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসাবে। আমি সুপ্রিয়াদিকে জানিয়েছি। এখন আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে জানি না। কেউ পাড়লে পুলিশকে জানাও।"
বিশ্বজিৎ সঙ্গে সঙ্গে ওয়্যারলেসে বার্তা দিলেন। সুকান্ত দেবনাথকে খোঁজো — আগরতলা-সাব্রুম হাইওয়েতে চেকপোস্ট দাও।
সন্ধ্যার আগেই ধরা পড়ল সুকান্ত — বিলোনিয়ার কাছে একটা ধাবায়। মনোরমা পাশে ছিল, ভয়ে কাঁপছিল। সুকান্তের হাতে মনোরমার অপর একটি ফোন।
থানায় বসে সুকান্ত প্রথমে অস্বীকার করল। তারপর ভেঙে পড়ল। মায়ের চাপ, বংশ রক্ষার ধারণা, নিজের কাপুরুষতা — সব একে একে বেরিয়ে এল। মনোরমাকে সে প্রথমে সত্যি বলেনি, এটা সত্য। কিন্তু ধরা পড়ার ভয়ে মনোরমাকে নিয়ে পালাতে চাইছিল — এটাও সত্য।
সুপ্রিয়া থানায় এলেন। মনোরমার দিকে তাকালেন অনেকক্ষণ — সেই মেয়েটা যে নিজেও ঠকেছে, নিজেও ভিকটিম। দুজনের মধ্যে কোনো কথা হল না। কিন্তু সুপ্রিয়া মনোরমার হাত ধরলেন একটুখানি।
বিশ্বজিৎ দেখলেন সেই দৃশ্য। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পুরুষের মিথ্যা আর সমাজের পুরনো ধারণার চাপে দুটো মেয়ে — দুটো জীবন — বিপন্ন হয়েছে।

সপ্তাহখানেক পরে বিশ্বজিৎ আবার দেবনাথ বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। বারান্দায় সুপ্রিয়া তুলসীতে জল দিচ্ছেন। তাঁকে দেখে একটু হাসলেন — ক্লান্ত হাসি, কিন্তু হাসি।
বিমলাদেবীকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। সুকান্তের বিরুদ্ধে হিন্দু বিবাহ আইনের ৪৯৪ ধারায় মামলা হয়েছে। মনোরমা পাল নিরাপদে বাড়ি ফিরেছে।
আর সুপ্রিয়া? তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নিজের মতো করে বাঁচবেন।
বিশ্বজিৎ মনে মনে বললেন — অপরাধের চেয়েও বড় অপরাধ হল মানুষের বিশ্বাসকে ভাঙা। আর সমাজের পুরনো কুসংস্কার যখন সেই ভাঙার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন গোয়েন্দার কাজ শুধু অপরাধী ধরা নয় — সত্যিটা আলোয় আনা।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১২৩ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ৩০/০৩/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast