মৃত্যুর গন্ধ
রাত তখন এগারোটা বেজে সাত মিনিট।
আগরতলার শহর ছেড়ে বিশ্রামগঞ্জের দিকে যাওয়া পুরনো পিচের রাস্তায় একটি অ্যাম্বাসেডর গাড়ি থামল। হেডলাইট নিভে গেল। চারদিকে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূর থেকে ভেসে আসা নদীর কল্ কল্ শব্দ।
গাড়ি থেকে নামলেন সুধীর দেবনাথ।
বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। মাথায় পাতলা চুল, গায়ে খদ্দরের পাঞ্জাবি, পায়ে চটি। এই মানুষটি কোনো গোয়েন্দা নন। তিনি একজন স্কুলশিক্ষক। ত্রিপুরার মাটিতে জন্ম, এই মাটিতেই বড় হয়েছেন, এই মাটিতেই বাঁচতে চেয়েছেন। কিন্তু আজ সকালে তাঁর পাশের বাড়ির প্রতিবেশী নিশিত রায়ের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গেছে — এই জঙ্গলের ভেতর, পরিত্যক্ত মন্দিরের কাছে।
পুলিশ বলেছে আত্মহত্যা।
সুধীরবাবু বিশ্বাস করেননি।
টর্চলাইট জ্বেলে তিনি হাঁটতে লাগলেন। ঘাসের ওপর শিশির পড়েছে। প্রতিটি পদক্ষেপে ভেজা মাটির গন্ধ উঠছে — সেই চেনা গন্ধ, মাটির গন্ধ, যে গন্ধ ত্রিপুরার প্রতিটি বাড়ির উঠোনে থাকে শরতের রাতে।
কিন্তু আরও একটা গন্ধ ভেসে আসছে।
ধূপের গন্ধ।
এই জঙ্গলে, এই রাতে, ধূপ জ্বলছে কোথাও।
তিন দিন আগের কথা মনে পড়ল সুধীরবাবুর।
নিশিতবাবু এসেছিলেন তাঁর বাড়িতে। সন্ধ্যার আলো জ্বালানো হয়েছে মাত্র । মুখে উদ্বেগের ছায়া। বললেন, "সুধীরদা, আমি একটা জিনিস দেখেছি। এমন জিনিস যা দেখা উচিত ছিল না।"
"কী দেখেছ?"
নিশিতবাবু থামলেন। জানালার দিকে তাকালেন। রাস্তায় তখন একটা মোটরসাইকেল ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছিল। চালক হেলমেট পরা।
মোটরসাইকেলটি চলে যেতেই নিশিতবাবু বললেন, "পরে বলব। এখন না।"
এরপর আর বলার সুযোগ হয়নি।
পরের দিন সকালে তাঁকে পাওয়া গেল এই জঙ্গলে। গলায় দড়ির দাগ। পুলিশের রিপোর্টে লেখা — আত্মহত্যা।
কিন্তু সুধীরবাবু জানেন — নিশিতবাবু বাঁ হাতি ছিলেন।
দড়ির গিঁট বাঁধা ছিল ডান হাতের কায়দায়।
পরিত্যক্ত মন্দিরের দরজায় পৌঁছালেন সুধীরবাবু।
মন্দিরটি একটি পুরনো শিব মন্দির। বছর পনেরো আগেও এখানে পূজা হত। তারপর ধীরে ধীরে জঙ্গল ঘিরে ধরেছে। দরজার পাল্লা ভাঙা। ভেতরে অন্ধকার।
কিন্তু দরজার চৌকাঠে — একটি তাজা মালা।
গাঁদাফুলের মালা। বড়জোর কালকের হবে ।
কেউ এখানে এসেছিল তাহলে।
টর্চ জ্বেলে ভেতরে ঢুকলেন। শিবলিঙ্গের সামনে একটি পোড়া ধূপকাঠির গোড়া। একটি ছোট্ট ঘটি — তাতে সামান্য জল। একটি লাল সিঁদুরের টিপ — শিবলিঙ্গের গায়ে।
কেউ পূজা দিয়ে গেছে।
কিন্তু পাথরের মেঝেতে একটি অদ্ভুত জিনিস — একটি পায়ের ছাপ। একটিমাত্র। বাঁ পায়ের। মাটিতে কাদা লেগে এসেছিল, সেই কাদার ছাপ পাথরে পড়েছে।
সুধীরবাবু নিচু হয়ে দেখলেন।
জুতোর ছাপ। ছোট সাইজ। মহিলার পায়ের মতো। কিন্তু তলার প্যাটার্নটি অদ্ভুত — একটি বৃত্তের মধ্যে তিনটি লাইন। এই ধরনের সোল সাধারণত এক বিশেষ কোম্পানির জুতোয় থাকে। আগরতলায় কি এই জুতো বিক্রি হয়!
সুধীরবাবু উঠে দাঁড়ালেন।
তাঁর মাথায় এখন তিনটি মুখ ভাসছে।
প্রথম — বিপ্লব সাহা। নিশিতবাবুর অফিসের সহকর্মী। গত সপ্তাহে তাঁদের মধ্যে একটি তীব্র তর্ক হয়েছিল — বিষয়টি সুধীরবাবু নিজে শুনেছেন। বিপ্লব বলেছিল, "তুমি যদি মুখ খোলো, তাহলে তুমি একা শেষ হবে না।"
দ্বিতীয় — মীরা চক্রবর্তী। নিশিতবাবুর দূর সম্পর্কের বোন। শহরের নামকরা আইনজীবী। নিশিতবাবুর মৃত্যুর পর তিনি সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। সুধীরবাবু লক্ষ্য করেছেন — মীরা দেবী কাঁদেননি। একটুও না।
তৃতীয় — দিলীপ ত্রিপুরা। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা। নিশিতবাবু সরকারি অডিট বিভাগে মাঝেমধ্যে যেতেন । গত মাসে এক বড় টেন্ডারের অনিয়ম এসেছিল। সেই ফাইলটি পাওয়া যাচ্ছিল না।এতে খুব বড় ধরনের সমস্যা অফিসে চলছে ।
পরের দিন সকালে সুধীরবাবু গেলেন নিশিতবাবুর বাড়িতে।
বাড়িটিতে তখনও শোকের পরিবেশ। প্রতিবেশীরা আসছেন, যাচ্ছেন। উঠোনে কয়েজন মহিলা বসে আছেন।
সুধীরবাবু সরাসরি গেলেন ঘরের ভেতরে।
নিশিতবাবুর পড়ার ঘর। বই, কাগজ, একটি পুরনো কম্পিউটার। সুধীরবাবু লক্ষ্য করলেন — টেবিলের ওপরে একটি মানিপ্লান্ট । জল শুকিয়ে গেছে। তলায় বাদামি দাগ পড়েছে।
এই প্লান্টটিকে কেউ যত্ন করেনি অন্তত কয়েকদিন ধরে।
মানিপ্লান্টের পাশে ধুলোর আস্তরণের মধ্যে একটি পরিষ্কার চতুর্ভুজ অঞ্চল। যেন কোনো বই বা ফাইল ছিল, সরিয়ে নেওয়া হয়েছে সম্প্রতি।
কিন্তু এই ঘরে কে এসেছিল?
নিশিতবাবুর মৃত্যুর পর এই ঘরে আসার অনুমতি পেয়েছিল কেবল দুজন — পুলিশ ইন্সপেক্টর বর্মণ, এবং মীরা চক্রবর্তী।
সুধীরবাবু ইন্সপেক্টর বর্মণকে চেনেন। বর্মণ একজন সৎ মানুষ। কিন্তু মীরা দেবী?
তিনি বুকশেলফের দিকে গেলেন। বইগুলো সাজানো। কিন্তু একটি বই উল্টো রাখা — মানে বইয়ের পেছনটা সামনে। এটা কি নিশিতবাবু ইচ্ছে করে করেছিলেন? কোনো চিহ্ন?
বইটি টেনে বের করলেন।
রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ।
ভেতরে একটি পাতায় পেন্সিলের দাগ — একটি গল্পের নামের নিচে। গল্পের নাম: "ক্ষুধিত পাষাণ"।
এবং পাতার কোণে ছোট্ট করে লেখা একটি সংখ্যা: ১৭।
সতেরো মানে কী? ঘর নম্বর? পাতার নম্বর? তারিখ?
ওইদিন সন্ধ্যায় সুধীরবাবু গেলেন বিপ্লব সাহার কাছে।
বিপ্লব একটু অবাক হলেন। "আপনি? এই সময়ে?"
"দুটো কথা ছিল।"
বিপ্লব চা বানালেন। সুধীরবাবু লক্ষ্য করলেন —বিপ্লব অস্বস্তি বোধ করছেন । তার হাত কাঁপছে সামান্য। একেবারে সামান্য, কিন্তু কাঁপছে।
"নিশিতবাবুর সঙ্গে তোমার ঝামেলাটা কীসের ছিল, বিপ্লব?"
বিপ্লব চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, "ব্যক্তিগত বিষয়।"
"টেন্ডার ফাইলের কথা জানতে তুমি?"
একটা মুহূর্তের জন্য বিপ্লবের চোখ বড় হয়ে গেল। মাত্র এক সেকেন্ড। কিন্তু সুধীরবাবু সেটা দেখলেন।
"কোন ফাইল?"
"যেটা উধাও হয়ে গেছে।"
বিপ্লব উঠে দাঁড়ালেন। "আপনি এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করলেই ভালো হবে, সুধীরদা। নিশিতদার মৃত্যু হয়েছে। এটা দুঃখজনক। কিন্তু মৃতকে কবর দেওয়াই ভালো।"
"নিশিতবাবু যে কবর চান না,বিপ্লব। তিনি সৎ মানুষ ছিলেন।"
বিপ্লব দরজার দিকে হাত বাড়ালেন। অর্থ স্পষ্ট — কথা শেষ।
সুধীরবাবু বেরিয়ে আসার সময় লক্ষ্য করলেন — বিপ্লবের জুতোর রেকে একটি জুতো। একটিমাত্র। অন্যটি নেই।
একটি মহিলার জুতো।
পরের রাতে সুধীরবাবুর বাড়ির দরজায় টোকা পড়ল।
রাত বারোটা।
দরজা খুলে দেখলেন — মীরা চক্রবর্তী।
তাঁর চোখে ভয়। আগে কখনো এই মহিলার মুখে ভয় দেখেননি সুধীরবাবু।
"ভেতরে আসুন।"
মীরাদেবী ঢুকলেন। চেয়ারে বসলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, "আপনি জানতে চাইছেন কী ঘটেছে।"
"হ্যাঁ।"
"আমিও জানি না সব। কিন্তু যা জানি — সেটা বললে আমি বিপদে পড়ব।"
"আপনি এখানে এসেছেন মানে ইতিমধ্যে বিপদে পড়েছেন।"
মীরাদেবী একটু চমকালেন। তারপর বললেন, "নিশিত আমাকে একটা এনক্রিপ্টেড ফাইল পাঠিয়েছিল। মৃত্যুর দুদিন আগে। ই-মেইলে। পাসওয়ার্ড দেয়নি। কিন্তু বলেছিল — পাসওয়ার্ডটা তুমি জানো। তোমাদের পারিবারিক কথা থেকে খুঁজে নিও।"
"কোনো পারিবারিক কথা?"
মীরাদেবী চোখ বন্ধ করলেন। "আমাদের ছোটবেলায় দাদু একটা গল্প বলতেন। রাজার গল্প। সেই গল্পে একটি সংখ্যা ছিল বারবার।"
"সতেরো?"
মীরাদেবী তাকালেন। "আপনি জানলেন কীভাবে?"
সুধীরবাবু বইটির কথা বললেন না। বললেন, "বলুন।"
"হ্যাঁ। সতেরো। পাসওয়ার্ডটা ট্রাই করব বলে ভাবছিলাম, কিন্তু তার আগেই — আজ সন্ধ্যায় আমার বাড়িতে কেউ ঢুকেছিল। ল্যাপটপে কেউ হাত দিয়েছে।"
"ফাইলটা নিয়েছে?"
"না। ক্লাউডে ব্যাকআপ ছিল। কিন্তু তারা জানে আমার কাছে আছে।"
সুধীরবাবু উঠলেন। "ফাইলটা এখন খুলুন। এই মুহূর্তে।"
মীরাদেবীর ফোনে ই-মেইল খোলা হল।
এনক্রিপ্টেড ফাইল। পাসওয়ার্ড বক্সে টাইপ করা হল: saptadasha — সংস্কৃতে সতেরো।
কাজ হল না।
সুধীরবাবু ভাবলেন। নিশিত রবীন্দ্রনাথের বইতে দাগ দিয়েছেন ক্ষুধিত পাষাণ গল্পে। সেই গল্পের মূল চরিত্রের নাম — মেহের আলি।
কিন্তু না।
তিনি ভাবলেন আবার। ক্ষুধিত পাষাণ গল্পে একটি লাইন আছে — "তেরো শতকের বাদশাহি আমলের রাজমহল।"
তেরো শতক। নিশিতবাবু কি তারিখের কথা বলেছিলেন? না — তারিখ নয়।
সুধীরবাবু হঠাৎ বললেন, "বাংলা সংখ্যায় লিখুন। বাংলায়।"
মীরাদেবী টাইপ করলেন: ১৭
ফাইল খুলে গেল।
ফাইলের ভেতরে ছিল তিনটি জিনিস।
প্রথম — একটি স্প্রেডশিট। ত্রিপুরা সরকারের একটি নির্মাণ প্রকল্পের হিসাব। মোট বরাদ্দ ৪৭ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকৃত কাজ হয়েছে মাত্র ১৮ কোটি টাকার। বাকি ২৯ কোটি — উধাও। এবং প্রতিটি পেমেন্টের বিপরীতে একটি স্বাক্ষর। স্বাক্ষরটি দিলীপ ত্রিপুরার।
দ্বিতীয় — একটি ফটোগ্রাফ। রাতের আলোয় তোলা, অস্পষ্ট, কিন্তু চেনা যাচ্ছে — একটি ঘরে দুজন মানুষ। একজন দিলীপ ত্রিপুরা। অন্যজন — বিপ্লব সাহা। তাদের সামনে টেবিলে ক্যাশের বান্ডিল।
তৃতীয় — একটি অডিও ফাইল। মাত্র ৪৩ সেকেন্ডের। কারও কণ্ঠস্বর — সম্ভবত ফোনে রেকর্ড করা।
"নিশিত, তুমি বুঝছ না। এই ফাইল যদি বাইরে যায়, তাহলে শুধু আমি না — অনেক মানুষ শেষ হবে। তোমার পরিবারও বিপদে পড়বে। তুমি চুপ করে থাকো। তোমাকে ভালো একটা ট্রান্সফার দেওয়া হবে।"
কণ্ঠস্বরটি চেনা।
দিলীপ ত্রিপুরার কণ্ঠ।
কিন্তু নিশিতবাবু চুপ করেননি। তিনি এই ফাইল রেখে গেছেন। আর তাই —
সুধীরবাবু একটু থামলেন।
একটা জিনিস মেলানো যাচ্ছে না।
বিপ্লব সাহা এই ষড়যন্ত্রে জড়িত — ছবি থেকে স্পষ্ট। তাহলে বিপ্লবের বাড়িতে মহিলার জুতো কেন? এবং মন্দিরে মহিলার পায়ের ছাপ কার?
পূজার গাঁদাফুলের মালা।
কেউ একজন মহিলা এই মন্দিরে গেছেন — যেখানে নিশিতবাবু মারা গেছেন। পূজা দিয়েছেন।
মীরাদেবীর দিকে তাকালেন সুধীরবাবু।
"আপনি কি মন্দিরে গিয়েছিলেন?"
মীরাদেবী মুখ নামিয়ে নিলেন।
"হ্যাঁ।"
"কেন?"
"নিশিত ওই মন্দিরটা ভালোবাসত। ছোটবেলায় আমরা দুজন পূজা দিতাম। আমি... আমি তাকে বিদায় দিতে গিয়েছিলাম।"
"একা?"
"একা।"
"তাহলে বিপ্লব সাহার বাড়িতে আপনার জুতো কেন?"
মীরাদেবী থামলেন।
দীর্ঘ নীরবতা।
এই নীরবতাটি একটি স্বীকারোক্তি।
"বিপ্লব আমার পুরনো বন্ধু," মীরাদেবী বললেন। "আমরা একসময় ঘনিষ্ঠ ছিলাম। নিশিতের মৃত্যুর পরের দিন বিপ্লব ফোন করেছিল। বলল — মীরা, তুমি কি জানো নিশিত কোথাও কিছু রেখেছে? কোনো ফাইল, কোনো কাগজ? আমি ওর পরিবারের জন্য চিন্তিত।"
"এবং আপনি বিশ্বাস করলেন।"
"করেছিলাম। তার বাড়িতে গিয়েছিলাম। কথা বলেছিলাম। কিন্তু ই-মেইলের কথা বলিনি। কিছু বলিনি।"
"কিন্তু বিপ্লব জেনে গেছে আপনার কাছে কিছু আছে।"
"হয়তো আমার মুখ দেখে বুঝেছে।"
সুধীরবাবু এবার পুরো ছবিটা দেখতে পেলেন।
দিলীপ ত্রিপুরা — মূল অপরাধী। কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি।
বিপ্লব সাহা — সহযোগী। নিশিতবাবুর কাছের মানুষ, তাই ব্যবহার করা হয়েছিল তাঁকে নজরে রাখতে।
নিহিতবাবু ফাইল নিয়ে কাউকে বলতে চেয়েছিলেন — সেই মোটরসাইকেলের চালক সেটা রিপোর্ট করেছিল দিলীপের কাছে।
তারপর — খুন। আত্মহত্যার ভান।
কিন্তু একটা প্রশ্ন এখনও বাকি।
"নিশিতবাবু আমাকে বলতে চেয়েছিলেন," সুধীরবাবু বললেন। "সেই সন্ধ্যায়। তিনি জানালার দিকে তাকিয়ে থামলেন। মোটরসাইকেলটা দেখে।"
"হ্যাঁ।"
"মোটরসাইকেলের চালক কে ছিল?"
মীরাদেবী বললেন, "আমি জানি না।"
সুধীরবাবু উঠলেন। "আমি জানি।"
পরের সকালে সুধীরবাবু গেলেন ইন্সপেক্টর বর্মণের কাছে।
বর্মণ অবাক হলেন। "আপনি?"
"বসুন। এবং মনোযোগ দিয়ে শুনুন।"
সুধীরবাবু একে একে সব বললেন। ফাইলের কথা, অডিওর কথা, মন্দিরের ছাপের কথা, বইয়ের দাগের কথা।
বর্মণ বললেন, "কিন্তু মোটরসাইকেলের চালক কে?"
সুধীরবাবু বললেন, "নিশিতবাবুর অফিসে সহকারী সুপারভাইজার কে?"
বর্মণ ভাবলেন। "রমেশ দেব।"
"রমেশ দেবের গায়ে সবসময় একটা নির্দিষ্ট সুগন্ধি দেয়। Old Spice। আপনি লক্ষ্য করেছেন কি?"
"করেছি। তো?"
"নিশিতবাবুর মৃতদেহের পাশে সেই রাতে পুলিশ একটি সিগারেটের টুকরো পেয়েছিল। রিপোর্টে আছে। Gold Flake। কিন্তু নিশিতবাবু কখনো সিগারেট খেতেন না।"
"এটা দিয়ে কী প্রমাণ হয়?"
"একটাও প্রমাণ হয় না। কিন্তু রমেশ দেব Gold Flake খান। প্রতিদিন দেখেছি। এবং রমেশ দেবের মোটরসাইকেলে একটি বিশেষ স্টিকার আছে — ত্রিপুরা পর্যটনের। আমি সেই রাতে মোটরসাইকেলে সেই স্টিকার দেখেছিলাম।"
বর্মণ সোজা হয়ে বসলেন।
"মানে রমেশ দেব নজর রাখছিল নিশিতবাবুকে।"
"এবং সেই সন্ধ্যায় রিপোর্ট করেছিল দিলীপকে — নিশিত সুধীরের বাড়িতে কথা বলতে গেছে।"
"তারপর রাতেই..."
"রাতেই কাজ হয়ে গেছে।"
সুধীরবাবু এবার বললেন আরও একটা কথা।
"ইন্সপেক্টর, আমি একটু ভুল করেছিলাম। আমি মীরাদেবীকে সন্দেহ করেছি কারণ তিনি এতো বড়ো ঘটনাতে কাঁদেননি কেন? তাকে আমি কাঁদতে দেখিনি।কিন্তু আসলে তিনি কাঁদেননি কারণ তিনি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন হয়তো প্রচন্ড ভয় পেয়েছিলেন। কান্না সবসময় শোকের প্রমাণ নয়। নীরবতাও অপরাধের প্রমাণ নয়।"
বর্মণ বললেন, "দিলীপ ত্রিপুরা নিশিতবাবুর শ্রাদ্ধে এসেছিলেন। সামনের সারিতে বসেছিলেন। বুক ভরা দুঃখের ভান করেছিলেন। কিন্তু কারও মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি শোক দেখানো মানুষটিই সবচেয়ে বেশি সন্দেহজনক — যদি বাকি সব প্রমাণ থাকে।"
সেই বিকেলে দিলীপ ত্রিপুরা, বিপ্লব সাহা, এবং রমেশ দেবকে গ্রেপ্তার করা হল।
দিলীপ ত্রিপুরা প্রথমে অস্বীকার করলেন। কিন্তু অডিও ফাইল চালানো হতেই তিনি চুপ করে গেলেন।
বিপ্লব ভেঙে পড়ল প্রথমেই। সব স্বীকার করল।
রমেশ দেব বলল — সে শুধু নজর রেখেছিল। সে জানত কেন নজর রাখতে হচ্ছে
এবং সে জানত এর পরিণতি কী হতে পারে।
আগরতলার শহর ছেড়ে বিশ্রামগঞ্জের দিকে যাওয়া পুরনো পিচের রাস্তায় একটি অ্যাম্বাসেডর গাড়ি থামল। হেডলাইট নিভে গেল। চারদিকে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূর থেকে ভেসে আসা নদীর কল্ কল্ শব্দ।
গাড়ি থেকে নামলেন সুধীর দেবনাথ।
বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। মাথায় পাতলা চুল, গায়ে খদ্দরের পাঞ্জাবি, পায়ে চটি। এই মানুষটি কোনো গোয়েন্দা নন। তিনি একজন স্কুলশিক্ষক। ত্রিপুরার মাটিতে জন্ম, এই মাটিতেই বড় হয়েছেন, এই মাটিতেই বাঁচতে চেয়েছেন। কিন্তু আজ সকালে তাঁর পাশের বাড়ির প্রতিবেশী নিশিত রায়ের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গেছে — এই জঙ্গলের ভেতর, পরিত্যক্ত মন্দিরের কাছে।
পুলিশ বলেছে আত্মহত্যা।
সুধীরবাবু বিশ্বাস করেননি।
টর্চলাইট জ্বেলে তিনি হাঁটতে লাগলেন। ঘাসের ওপর শিশির পড়েছে। প্রতিটি পদক্ষেপে ভেজা মাটির গন্ধ উঠছে — সেই চেনা গন্ধ, মাটির গন্ধ, যে গন্ধ ত্রিপুরার প্রতিটি বাড়ির উঠোনে থাকে শরতের রাতে।
কিন্তু আরও একটা গন্ধ ভেসে আসছে।
ধূপের গন্ধ।
এই জঙ্গলে, এই রাতে, ধূপ জ্বলছে কোথাও।
তিন দিন আগের কথা মনে পড়ল সুধীরবাবুর।
নিশিতবাবু এসেছিলেন তাঁর বাড়িতে। সন্ধ্যার আলো জ্বালানো হয়েছে মাত্র । মুখে উদ্বেগের ছায়া। বললেন, "সুধীরদা, আমি একটা জিনিস দেখেছি। এমন জিনিস যা দেখা উচিত ছিল না।"
"কী দেখেছ?"
নিশিতবাবু থামলেন। জানালার দিকে তাকালেন। রাস্তায় তখন একটা মোটরসাইকেল ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছিল। চালক হেলমেট পরা।
মোটরসাইকেলটি চলে যেতেই নিশিতবাবু বললেন, "পরে বলব। এখন না।"
এরপর আর বলার সুযোগ হয়নি।
পরের দিন সকালে তাঁকে পাওয়া গেল এই জঙ্গলে। গলায় দড়ির দাগ। পুলিশের রিপোর্টে লেখা — আত্মহত্যা।
কিন্তু সুধীরবাবু জানেন — নিশিতবাবু বাঁ হাতি ছিলেন।
দড়ির গিঁট বাঁধা ছিল ডান হাতের কায়দায়।
পরিত্যক্ত মন্দিরের দরজায় পৌঁছালেন সুধীরবাবু।
মন্দিরটি একটি পুরনো শিব মন্দির। বছর পনেরো আগেও এখানে পূজা হত। তারপর ধীরে ধীরে জঙ্গল ঘিরে ধরেছে। দরজার পাল্লা ভাঙা। ভেতরে অন্ধকার।
কিন্তু দরজার চৌকাঠে — একটি তাজা মালা।
গাঁদাফুলের মালা। বড়জোর কালকের হবে ।
কেউ এখানে এসেছিল তাহলে।
টর্চ জ্বেলে ভেতরে ঢুকলেন। শিবলিঙ্গের সামনে একটি পোড়া ধূপকাঠির গোড়া। একটি ছোট্ট ঘটি — তাতে সামান্য জল। একটি লাল সিঁদুরের টিপ — শিবলিঙ্গের গায়ে।
কেউ পূজা দিয়ে গেছে।
কিন্তু পাথরের মেঝেতে একটি অদ্ভুত জিনিস — একটি পায়ের ছাপ। একটিমাত্র। বাঁ পায়ের। মাটিতে কাদা লেগে এসেছিল, সেই কাদার ছাপ পাথরে পড়েছে।
সুধীরবাবু নিচু হয়ে দেখলেন।
জুতোর ছাপ। ছোট সাইজ। মহিলার পায়ের মতো। কিন্তু তলার প্যাটার্নটি অদ্ভুত — একটি বৃত্তের মধ্যে তিনটি লাইন। এই ধরনের সোল সাধারণত এক বিশেষ কোম্পানির জুতোয় থাকে। আগরতলায় কি এই জুতো বিক্রি হয়!
সুধীরবাবু উঠে দাঁড়ালেন।
তাঁর মাথায় এখন তিনটি মুখ ভাসছে।
প্রথম — বিপ্লব সাহা। নিশিতবাবুর অফিসের সহকর্মী। গত সপ্তাহে তাঁদের মধ্যে একটি তীব্র তর্ক হয়েছিল — বিষয়টি সুধীরবাবু নিজে শুনেছেন। বিপ্লব বলেছিল, "তুমি যদি মুখ খোলো, তাহলে তুমি একা শেষ হবে না।"
দ্বিতীয় — মীরা চক্রবর্তী। নিশিতবাবুর দূর সম্পর্কের বোন। শহরের নামকরা আইনজীবী। নিশিতবাবুর মৃত্যুর পর তিনি সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। সুধীরবাবু লক্ষ্য করেছেন — মীরা দেবী কাঁদেননি। একটুও না।
তৃতীয় — দিলীপ ত্রিপুরা। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা। নিশিতবাবু সরকারি অডিট বিভাগে মাঝেমধ্যে যেতেন । গত মাসে এক বড় টেন্ডারের অনিয়ম এসেছিল। সেই ফাইলটি পাওয়া যাচ্ছিল না।এতে খুব বড় ধরনের সমস্যা অফিসে চলছে ।
পরের দিন সকালে সুধীরবাবু গেলেন নিশিতবাবুর বাড়িতে।
বাড়িটিতে তখনও শোকের পরিবেশ। প্রতিবেশীরা আসছেন, যাচ্ছেন। উঠোনে কয়েজন মহিলা বসে আছেন।
সুধীরবাবু সরাসরি গেলেন ঘরের ভেতরে।
নিশিতবাবুর পড়ার ঘর। বই, কাগজ, একটি পুরনো কম্পিউটার। সুধীরবাবু লক্ষ্য করলেন — টেবিলের ওপরে একটি মানিপ্লান্ট । জল শুকিয়ে গেছে। তলায় বাদামি দাগ পড়েছে।
এই প্লান্টটিকে কেউ যত্ন করেনি অন্তত কয়েকদিন ধরে।
মানিপ্লান্টের পাশে ধুলোর আস্তরণের মধ্যে একটি পরিষ্কার চতুর্ভুজ অঞ্চল। যেন কোনো বই বা ফাইল ছিল, সরিয়ে নেওয়া হয়েছে সম্প্রতি।
কিন্তু এই ঘরে কে এসেছিল?
নিশিতবাবুর মৃত্যুর পর এই ঘরে আসার অনুমতি পেয়েছিল কেবল দুজন — পুলিশ ইন্সপেক্টর বর্মণ, এবং মীরা চক্রবর্তী।
সুধীরবাবু ইন্সপেক্টর বর্মণকে চেনেন। বর্মণ একজন সৎ মানুষ। কিন্তু মীরা দেবী?
তিনি বুকশেলফের দিকে গেলেন। বইগুলো সাজানো। কিন্তু একটি বই উল্টো রাখা — মানে বইয়ের পেছনটা সামনে। এটা কি নিশিতবাবু ইচ্ছে করে করেছিলেন? কোনো চিহ্ন?
বইটি টেনে বের করলেন।
রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ।
ভেতরে একটি পাতায় পেন্সিলের দাগ — একটি গল্পের নামের নিচে। গল্পের নাম: "ক্ষুধিত পাষাণ"।
এবং পাতার কোণে ছোট্ট করে লেখা একটি সংখ্যা: ১৭।
সতেরো মানে কী? ঘর নম্বর? পাতার নম্বর? তারিখ?
ওইদিন সন্ধ্যায় সুধীরবাবু গেলেন বিপ্লব সাহার কাছে।
বিপ্লব একটু অবাক হলেন। "আপনি? এই সময়ে?"
"দুটো কথা ছিল।"
বিপ্লব চা বানালেন। সুধীরবাবু লক্ষ্য করলেন —বিপ্লব অস্বস্তি বোধ করছেন । তার হাত কাঁপছে সামান্য। একেবারে সামান্য, কিন্তু কাঁপছে।
"নিশিতবাবুর সঙ্গে তোমার ঝামেলাটা কীসের ছিল, বিপ্লব?"
বিপ্লব চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, "ব্যক্তিগত বিষয়।"
"টেন্ডার ফাইলের কথা জানতে তুমি?"
একটা মুহূর্তের জন্য বিপ্লবের চোখ বড় হয়ে গেল। মাত্র এক সেকেন্ড। কিন্তু সুধীরবাবু সেটা দেখলেন।
"কোন ফাইল?"
"যেটা উধাও হয়ে গেছে।"
বিপ্লব উঠে দাঁড়ালেন। "আপনি এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করলেই ভালো হবে, সুধীরদা। নিশিতদার মৃত্যু হয়েছে। এটা দুঃখজনক। কিন্তু মৃতকে কবর দেওয়াই ভালো।"
"নিশিতবাবু যে কবর চান না,বিপ্লব। তিনি সৎ মানুষ ছিলেন।"
বিপ্লব দরজার দিকে হাত বাড়ালেন। অর্থ স্পষ্ট — কথা শেষ।
সুধীরবাবু বেরিয়ে আসার সময় লক্ষ্য করলেন — বিপ্লবের জুতোর রেকে একটি জুতো। একটিমাত্র। অন্যটি নেই।
একটি মহিলার জুতো।
পরের রাতে সুধীরবাবুর বাড়ির দরজায় টোকা পড়ল।
রাত বারোটা।
দরজা খুলে দেখলেন — মীরা চক্রবর্তী।
তাঁর চোখে ভয়। আগে কখনো এই মহিলার মুখে ভয় দেখেননি সুধীরবাবু।
"ভেতরে আসুন।"
মীরাদেবী ঢুকলেন। চেয়ারে বসলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, "আপনি জানতে চাইছেন কী ঘটেছে।"
"হ্যাঁ।"
"আমিও জানি না সব। কিন্তু যা জানি — সেটা বললে আমি বিপদে পড়ব।"
"আপনি এখানে এসেছেন মানে ইতিমধ্যে বিপদে পড়েছেন।"
মীরাদেবী একটু চমকালেন। তারপর বললেন, "নিশিত আমাকে একটা এনক্রিপ্টেড ফাইল পাঠিয়েছিল। মৃত্যুর দুদিন আগে। ই-মেইলে। পাসওয়ার্ড দেয়নি। কিন্তু বলেছিল — পাসওয়ার্ডটা তুমি জানো। তোমাদের পারিবারিক কথা থেকে খুঁজে নিও।"
"কোনো পারিবারিক কথা?"
মীরাদেবী চোখ বন্ধ করলেন। "আমাদের ছোটবেলায় দাদু একটা গল্প বলতেন। রাজার গল্প। সেই গল্পে একটি সংখ্যা ছিল বারবার।"
"সতেরো?"
মীরাদেবী তাকালেন। "আপনি জানলেন কীভাবে?"
সুধীরবাবু বইটির কথা বললেন না। বললেন, "বলুন।"
"হ্যাঁ। সতেরো। পাসওয়ার্ডটা ট্রাই করব বলে ভাবছিলাম, কিন্তু তার আগেই — আজ সন্ধ্যায় আমার বাড়িতে কেউ ঢুকেছিল। ল্যাপটপে কেউ হাত দিয়েছে।"
"ফাইলটা নিয়েছে?"
"না। ক্লাউডে ব্যাকআপ ছিল। কিন্তু তারা জানে আমার কাছে আছে।"
সুধীরবাবু উঠলেন। "ফাইলটা এখন খুলুন। এই মুহূর্তে।"
মীরাদেবীর ফোনে ই-মেইল খোলা হল।
এনক্রিপ্টেড ফাইল। পাসওয়ার্ড বক্সে টাইপ করা হল: saptadasha — সংস্কৃতে সতেরো।
কাজ হল না।
সুধীরবাবু ভাবলেন। নিশিত রবীন্দ্রনাথের বইতে দাগ দিয়েছেন ক্ষুধিত পাষাণ গল্পে। সেই গল্পের মূল চরিত্রের নাম — মেহের আলি।
কিন্তু না।
তিনি ভাবলেন আবার। ক্ষুধিত পাষাণ গল্পে একটি লাইন আছে — "তেরো শতকের বাদশাহি আমলের রাজমহল।"
তেরো শতক। নিশিতবাবু কি তারিখের কথা বলেছিলেন? না — তারিখ নয়।
সুধীরবাবু হঠাৎ বললেন, "বাংলা সংখ্যায় লিখুন। বাংলায়।"
মীরাদেবী টাইপ করলেন: ১৭
ফাইল খুলে গেল।
ফাইলের ভেতরে ছিল তিনটি জিনিস।
প্রথম — একটি স্প্রেডশিট। ত্রিপুরা সরকারের একটি নির্মাণ প্রকল্পের হিসাব। মোট বরাদ্দ ৪৭ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকৃত কাজ হয়েছে মাত্র ১৮ কোটি টাকার। বাকি ২৯ কোটি — উধাও। এবং প্রতিটি পেমেন্টের বিপরীতে একটি স্বাক্ষর। স্বাক্ষরটি দিলীপ ত্রিপুরার।
দ্বিতীয় — একটি ফটোগ্রাফ। রাতের আলোয় তোলা, অস্পষ্ট, কিন্তু চেনা যাচ্ছে — একটি ঘরে দুজন মানুষ। একজন দিলীপ ত্রিপুরা। অন্যজন — বিপ্লব সাহা। তাদের সামনে টেবিলে ক্যাশের বান্ডিল।
তৃতীয় — একটি অডিও ফাইল। মাত্র ৪৩ সেকেন্ডের। কারও কণ্ঠস্বর — সম্ভবত ফোনে রেকর্ড করা।
"নিশিত, তুমি বুঝছ না। এই ফাইল যদি বাইরে যায়, তাহলে শুধু আমি না — অনেক মানুষ শেষ হবে। তোমার পরিবারও বিপদে পড়বে। তুমি চুপ করে থাকো। তোমাকে ভালো একটা ট্রান্সফার দেওয়া হবে।"
কণ্ঠস্বরটি চেনা।
দিলীপ ত্রিপুরার কণ্ঠ।
কিন্তু নিশিতবাবু চুপ করেননি। তিনি এই ফাইল রেখে গেছেন। আর তাই —
সুধীরবাবু একটু থামলেন।
একটা জিনিস মেলানো যাচ্ছে না।
বিপ্লব সাহা এই ষড়যন্ত্রে জড়িত — ছবি থেকে স্পষ্ট। তাহলে বিপ্লবের বাড়িতে মহিলার জুতো কেন? এবং মন্দিরে মহিলার পায়ের ছাপ কার?
পূজার গাঁদাফুলের মালা।
কেউ একজন মহিলা এই মন্দিরে গেছেন — যেখানে নিশিতবাবু মারা গেছেন। পূজা দিয়েছেন।
মীরাদেবীর দিকে তাকালেন সুধীরবাবু।
"আপনি কি মন্দিরে গিয়েছিলেন?"
মীরাদেবী মুখ নামিয়ে নিলেন।
"হ্যাঁ।"
"কেন?"
"নিশিত ওই মন্দিরটা ভালোবাসত। ছোটবেলায় আমরা দুজন পূজা দিতাম। আমি... আমি তাকে বিদায় দিতে গিয়েছিলাম।"
"একা?"
"একা।"
"তাহলে বিপ্লব সাহার বাড়িতে আপনার জুতো কেন?"
মীরাদেবী থামলেন।
দীর্ঘ নীরবতা।
এই নীরবতাটি একটি স্বীকারোক্তি।
"বিপ্লব আমার পুরনো বন্ধু," মীরাদেবী বললেন। "আমরা একসময় ঘনিষ্ঠ ছিলাম। নিশিতের মৃত্যুর পরের দিন বিপ্লব ফোন করেছিল। বলল — মীরা, তুমি কি জানো নিশিত কোথাও কিছু রেখেছে? কোনো ফাইল, কোনো কাগজ? আমি ওর পরিবারের জন্য চিন্তিত।"
"এবং আপনি বিশ্বাস করলেন।"
"করেছিলাম। তার বাড়িতে গিয়েছিলাম। কথা বলেছিলাম। কিন্তু ই-মেইলের কথা বলিনি। কিছু বলিনি।"
"কিন্তু বিপ্লব জেনে গেছে আপনার কাছে কিছু আছে।"
"হয়তো আমার মুখ দেখে বুঝেছে।"
সুধীরবাবু এবার পুরো ছবিটা দেখতে পেলেন।
দিলীপ ত্রিপুরা — মূল অপরাধী। কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি।
বিপ্লব সাহা — সহযোগী। নিশিতবাবুর কাছের মানুষ, তাই ব্যবহার করা হয়েছিল তাঁকে নজরে রাখতে।
নিহিতবাবু ফাইল নিয়ে কাউকে বলতে চেয়েছিলেন — সেই মোটরসাইকেলের চালক সেটা রিপোর্ট করেছিল দিলীপের কাছে।
তারপর — খুন। আত্মহত্যার ভান।
কিন্তু একটা প্রশ্ন এখনও বাকি।
"নিশিতবাবু আমাকে বলতে চেয়েছিলেন," সুধীরবাবু বললেন। "সেই সন্ধ্যায়। তিনি জানালার দিকে তাকিয়ে থামলেন। মোটরসাইকেলটা দেখে।"
"হ্যাঁ।"
"মোটরসাইকেলের চালক কে ছিল?"
মীরাদেবী বললেন, "আমি জানি না।"
সুধীরবাবু উঠলেন। "আমি জানি।"
পরের সকালে সুধীরবাবু গেলেন ইন্সপেক্টর বর্মণের কাছে।
বর্মণ অবাক হলেন। "আপনি?"
"বসুন। এবং মনোযোগ দিয়ে শুনুন।"
সুধীরবাবু একে একে সব বললেন। ফাইলের কথা, অডিওর কথা, মন্দিরের ছাপের কথা, বইয়ের দাগের কথা।
বর্মণ বললেন, "কিন্তু মোটরসাইকেলের চালক কে?"
সুধীরবাবু বললেন, "নিশিতবাবুর অফিসে সহকারী সুপারভাইজার কে?"
বর্মণ ভাবলেন। "রমেশ দেব।"
"রমেশ দেবের গায়ে সবসময় একটা নির্দিষ্ট সুগন্ধি দেয়। Old Spice। আপনি লক্ষ্য করেছেন কি?"
"করেছি। তো?"
"নিশিতবাবুর মৃতদেহের পাশে সেই রাতে পুলিশ একটি সিগারেটের টুকরো পেয়েছিল। রিপোর্টে আছে। Gold Flake। কিন্তু নিশিতবাবু কখনো সিগারেট খেতেন না।"
"এটা দিয়ে কী প্রমাণ হয়?"
"একটাও প্রমাণ হয় না। কিন্তু রমেশ দেব Gold Flake খান। প্রতিদিন দেখেছি। এবং রমেশ দেবের মোটরসাইকেলে একটি বিশেষ স্টিকার আছে — ত্রিপুরা পর্যটনের। আমি সেই রাতে মোটরসাইকেলে সেই স্টিকার দেখেছিলাম।"
বর্মণ সোজা হয়ে বসলেন।
"মানে রমেশ দেব নজর রাখছিল নিশিতবাবুকে।"
"এবং সেই সন্ধ্যায় রিপোর্ট করেছিল দিলীপকে — নিশিত সুধীরের বাড়িতে কথা বলতে গেছে।"
"তারপর রাতেই..."
"রাতেই কাজ হয়ে গেছে।"
সুধীরবাবু এবার বললেন আরও একটা কথা।
"ইন্সপেক্টর, আমি একটু ভুল করেছিলাম। আমি মীরাদেবীকে সন্দেহ করেছি কারণ তিনি এতো বড়ো ঘটনাতে কাঁদেননি কেন? তাকে আমি কাঁদতে দেখিনি।কিন্তু আসলে তিনি কাঁদেননি কারণ তিনি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন হয়তো প্রচন্ড ভয় পেয়েছিলেন। কান্না সবসময় শোকের প্রমাণ নয়। নীরবতাও অপরাধের প্রমাণ নয়।"
বর্মণ বললেন, "দিলীপ ত্রিপুরা নিশিতবাবুর শ্রাদ্ধে এসেছিলেন। সামনের সারিতে বসেছিলেন। বুক ভরা দুঃখের ভান করেছিলেন। কিন্তু কারও মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি শোক দেখানো মানুষটিই সবচেয়ে বেশি সন্দেহজনক — যদি বাকি সব প্রমাণ থাকে।"
সেই বিকেলে দিলীপ ত্রিপুরা, বিপ্লব সাহা, এবং রমেশ দেবকে গ্রেপ্তার করা হল।
দিলীপ ত্রিপুরা প্রথমে অস্বীকার করলেন। কিন্তু অডিও ফাইল চালানো হতেই তিনি চুপ করে গেলেন।
বিপ্লব ভেঙে পড়ল প্রথমেই। সব স্বীকার করল।
রমেশ দেব বলল — সে শুধু নজর রেখেছিল। সে জানত কেন নজর রাখতে হচ্ছে
এবং সে জানত এর পরিণতি কী হতে পারে।
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
শঙ্খজিৎ ভট্টাচার্য ০৬/০৪/২০২৬অপূর্ব
-
মোঃ সরব বাবু ২৯/০৩/২০২৬ভালো লেগেছে গল্পটা।
-
ফয়জুল মহী ২৯/০৩/২০২৬অনিন্দ্য সুন্দর নান্দনিক উপস্থাপন
