বিয়ের পরে প্রেম
আগরতলার হরিগঙ্গা বসাক রোডের পুরনো বাড়িটার সামনে দিয়ে যখন সন্ধ্যার শেষ আলো মিলিয়ে যায়, তখন মনে হয় এ শহর যেন কোনো পুরোনো উপন্যাসের পাতায় আঁকা একটা ছবি। চারিদিকে শিউলির গন্ধ, দূরে মন্দিরের ঘণ্টার শব্দ, আর মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া একঝাঁক শালিক — এই পরিবেশেই গোয়েন্দা অর্ক চক্রবর্তী তাঁর বারান্দায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন।
অর্ক ত্রিপুরার পরিচিত মুখ। রাজ্য পুলিশের সাথে বহু মামলায় সহযোগিতা করেছেন, কিন্তু সরকারি চাকরিতে কখনো বাঁধা পড়েননি। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, মাথায় রুপালি চুলের ছিটেফোঁটা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। শান্ত মানুষ, কিন্তু চোখ দুটো সর্বদা কিছু একটা খুঁজে বেড়ায়।
সেদিন সন্ধ্যায় দরজায় টোকা পড়ল। খুলে দেখলেন — সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মধ্যবয়সী মহিলা। পরনে সাদা তাঁতের শাড়ি, কপালে চওড়া সিঁদুর, হাতে সোনার বালা। চোখ দুটো লাল, তবে কান্নার দাগ শুকিয়ে গেছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে — অনেকক্ষণ ধরে কাঁদছিলেন, এখন নিজেকে সামলে নিয়েছেন।
"আপনিই কি অর্ক চক্রবর্তী? আমি মালতী দেবনাথ। আমার স্বামী... আমার স্বামীকে খুন করা হয়েছে — কিন্তু পুলিশ বলছে এটা দুর্ঘটনা।"
অর্ক একটু সরে দাঁড়িয়ে বললেন, "ভেতরে আসুন।"
মালতী দেবনাথের স্বামীর নাম ছিল সুরজিৎ দেবনাথ। আগরতলার বড় ব্যবসায়ী, কাপড়ের দোকান আছে বটতলা মার্কেটে বয়স পঞ্চান্ন। সপ্তাহ দুয়েক আগে, এক বর্ষার রাতে, বাড়ির পেছনের পুকুরে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। পুলিশ রিপোর্টে লেখা — পা পিছলে পড়ে গেছেন। হার্ট অ্যাটাক হয়েছে জলে পড়ার আগেই।
"কিন্তু আমার বিশ্বাস হচ্ছে না," মালতী বললেন। "সুরজিৎ সাঁতার জানত। পুকুরের পাড়ে যাওয়ার কোনো কারণ ছিল না রাত দশটায়। আর মৃত্যুর আগের দিন একটা চিঠি পেয়েছিল।"
অর্ক সামনে ঝুঁকলেন। "চিঠি? কোথায় সেটা?"
মালতী তাঁর আঁচলের ভেতর থেকে একটা ভাঁজ করা হলদেটে খাম বের করলেন। অর্ক সাবধানে খুললেন — ভেতরে একটাই লাইন, হাতে লেখা:
"বিয়ের পরেও প্রেম চলে? সেই হিসেব এবার নেওয়া হবে।"
অর্ক চিঠিটা রাখলেন। একটু চুপ করে থেকে বললেন, "সুরজিৎ বাবুর কি কোনো পুরনো সম্পর্ক ছিল?"
মালতীর মুখ শক্ত হয়ে গেল। "সেটা জানতেই আপনার কাছে এসেছি।"
পরের দিন সকালে অর্ক চক্রবর্তী গেলেন দেবনাথ পরিবারের বাড়িতে। আগরতলা বিশালগড় রোড ছেড়ে ড্রপগেটে একটু ভেতরে ঢুকলেই পুরনো কলোনি এলাকা — ছোট ছোট পুকুর, নারকেল গাছ, টিনের ছাদ আর কংক্রিটের দেওয়ালের সংমিশ্রণ। দেবনাথদের বাড়িটা বেশ বড়। সামনে একটা তুলসীমঞ্চ, পাশে একটা শিবমন্দির — বোঝা যাচ্ছে এ পরিবারে ধর্মাচরণের চল আছে।
বাড়িতে ছিলেন সুরজিৎ দেবনাথের বড় ভাই নিখিল দেবনাথ, তাঁর স্ত্রী চম্পা, এবং সুরজিৎ-মালতীর একমাত্র ছেলে রাহুল। রাহুলের বয়স পঁচিশ, সম্প্রতি কলকাতা থেকে ফিরেছে।
অর্ক কথা বলতে বসলেন নিখিল দেবনাথের সাথে। বয়স্ক মানুষ,চোখে শোক আছে তবে ভেতরে কোথাও একটা অস্বস্তিও আছে — সেটা অর্কের দৃষ্টি এড়াল না।
"ছোট ভাই চলে গেল। পুলিশ বলল দুর্ঘটনা। আমরা মেনে নিলাম। এখন আবার তদন্ত করলে পরিবারের মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি হবে।"
"মান-সম্মান?" অর্ক সরাসরি তাকালেন। "কোন বিষয়ে?"
নিখিল থামলেন। তারপর বললেন, "বছর পনেরো আগের কথা। সুরজিৎ একটা মেয়েকে ভালোবাসত — নাম ছিল রেণু। উদয়পুরের মেয়ে, কায়স্থ পরিবার। কিন্তু আমাদের পরিবার রাজি হয়নি। সুরজিৎকে তখন মালতীর সাথে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হল।"
"রেণুর কী হলো?"
"শুনেছিলাম অন্য কোথাও বিয়ে হয়েছে। তারপর আর খোঁজ রাখিনি।" নিখিলের গলায় একটা ক্লান্তি।
অর্ক উঠলেন। বেরোনোর আগে দেখলেন — উঠোনের কোণে রাহুল। চোখে চোখ পড়তে একটু সরে গেল।
"রাহুল," অর্ক ডাকলেন। "তোমার বাবার শেষ কয়েকটা দিনে কি কোনো অপরিচিত লোক বাড়িতে এসেছিল?"
রাহুল একটু ইতস্তত করে বলল, "একজন মহিলা এসেছিলেন। মা দেখেনি। আমি দেখেছিলাম — বাবা তাঁকে ভেতরে নেননি, দরজাতেই কথা বলেছেন। তারপর মহিলা চলে গেলেন। বাবাকে জিজ্ঞেস করিনি।"
"মহিলার চেহারা মনে আছে?"
"বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। ফর্সা, মাঝারি উচ্চতা। পরনে ছিল নীল শাড়ি। হাতে একটা চামড়ার ব্যাগ।"
উদয়পুর যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন অর্ক। সেখানে তাঁর এক পুরনো পরিচিত আছেন — সুবোধ চৌধুরী, স্থানীয় থানার অবসরপ্রাপ্ত দারোগা। ফোন করতেই রাজি হলেন।
উদয়পুরের সেই পরিচিত মহুয়া গন্ধমাখা রাস্তা ধরে সুবোধ চৌধুরীর বাড়িতে পৌঁছালেন অর্ক। চা খেতে খেতে বললেন সব।
সুবোধ মাথা নাড়লেন। "রেণু সেনগুপ্ত — হ্যাঁ, চিনি। এখন রেণু ভট্টাচার্য। বিয়ে হয়েছিল বছর চোদ্দ আগে শান্তনু ভট্টাচার্যের সাথে। কিন্তু সেই বিয়ে বছর পাঁচেকের মধ্যে ভেঙে গেছে। তারপর থেকে একাই থাকছেন। আগরতলায় চলে গেছেন বছর দুয়েক হল। টাউন বড়দেওয়ালির দিকে একটা ফ্ল্যাট নিয়েছেন।"
অর্ক সোজা হয়ে বসলেন। রেণু আগরতলায়। সুরজিৎ আগরতলায়। মৃত্যুর আগের দিন একজন মহিলা দরজায় এসেছিলেন।
পরের দিন টাউন বড়দেওয়ালির ঠিকানায় গিয়ে পৌঁছালেন অর্ক। তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় ফ্ল্যাট। দরজায় টোকা দিতেই— দরজা খুলল।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাকে দেখে অর্ক সঙ্গে সঙ্গে বুঝলেন — এই সেই নীল শাড়ির মহিলা। রাহুলের বর্ণনার সাথে মিলে যাচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে মহিলার চোখে একটা ভয়ের ছায়া।
"আপনি কি রেণু ভট্টাচার্য? আমি অর্ক চক্রবর্তী — সুরজিৎ দেবনাথের মৃত্যুর ব্যাপারে কথা বলতে চাই।"
রেণুর মুখ পাথরের মতো হয়ে গেল। তারপর ধীরে সরে দাঁড়ালেন। বললেন, "আসুন।"
ভেতরে ছোট কিন্তু গোছানো ঘর। দেওয়ালে একটা দুর্গার ছবি, পাশে একটা বাঁধানো কবিতার লাইন। অর্ক বসলেন।
রেণু নিজে থেকেই বললেন, "হ্যাঁ, আমি গিয়েছিলাম ওর বাড়িতে। তবে আমি কিছু করিনি।"
"কেন গিয়েছিলেন?"
রেণু একটু থামলেন। তারপর বললেন, "একটা চিঠি পেয়েছিলাম আমিও। একই ধরনের। বলছিল — সুরজিৎ এখনো আমার সাথে যোগাযোগ রাখছে, এবং আমাকে সতর্ক করা হচ্ছে। আমি ভয় পেয়ে সুরজিৎকে বলতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ও দরজায়ই থামিয়ে দিল। বলল — ভুলে যাও সবকিছু, চলে যাও। আমি চলে এসেছিলাম।"
"সুরজিৎ কি সত্যিই আপনার সাথে যোগাযোগ রাখত?"
রেণুর চোখ ভেজে গেল। "মাঝে মাঝে ফোন করত। কথা হত। কিন্তু সেটা অনেক বছর আগের কথা। গত দুই বছরে কোনো যোগাযোগ নেই।"
অর্ক জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার চিঠিটা আছে?"
"ছিঁড়ে ফেলেছি।" রেণু বললেন। তারপর একটু চুপ করে থেকে যোগ করলেন, "কিন্তু খামটা রেখেছি।"
খামটা নিলেন অর্ক। পোস্টমার্ক দেখলেন। আগরতলা জিপিও — কিন্তু তারিখটা সুরজিৎ মারা যাওয়ার তিন দিন আগের।
দুটো খাম, দুটো চিঠি — একটা গেছে সুরজিৎের কাছে, আরেকটা রেণুর কাছে। দুটোই লেখা হয়েছে কাছাকাছি সময়ে। হাতের লেখা একই রকম দেখতে। কেউ একজন দুজনকেই চাপে ফেলতে চেয়েছিল।
অর্ক ফিরে গেলেন দেবনাথ বাড়িতে। এবার সরাসরি চম্পার সাথে কথা বলবেন — নিখিলের স্ত্রী। মহিলা স্বভাবতই একটু সতর্ক। "চম্পা দেবী," অর্ক বললেন শান্তভাবে, "আপনি কি মাঝে মাঝে চিঠি লেখেন?"
মহিলা অবাক হলেন। "না মানে... মাঝে মাঝে।"
"কলম ব্যবহার করেন?"
"হ্যাঁ, পুরনো ফাউন্টেন পেন আছে।"
অর্ক হঠাৎ প্রশ্নটা ছুড়লেন সরাসরি: "আপনি কি জানতেন সুরজিৎ বাবুর আর রেণুর কথা?"
চম্পার মুখ লাল হয়ে গেল। তারপর ধীরে ধীরে স্বীকার করলেন, "জানতাম। এবং সহ্য করতে পারছিলাম না।"
"কেন?"
"কারণ এই সংসারে নিখিল আর আমি সবচেয়ে বেশি কষ্ট করেছি। দোকান আমাদের জমানো পয়সা দিয়ে শুরু হয়েছিল। সুরজিৎ পরে এসেছিল। কিন্তু সব নাম-যশ তারই। আর তারপরও সে পুরনো প্রেম ছাড়তে পারছিল না। মালতী ভালো মহিলা, ওর অধিকার নষ্ট হচ্ছিল।" চম্পার গলায় একটা তিক্ততা।
"তাহলে চিঠি লিখলেন — দুজনকেই আলাদা করতে?"
চম্পা থামলেন। তারপর বললেন, "হ্যাঁ। চিঠি লিখেছিলাম। কিন্তু আমি আর কিচ্ছু করিনি। আমি তা কখনো করতে পারি না।"
এই মুহূর্তে অর্ক বুঝলেন — চম্পা হয়তো সত্য বলছেন। কিন্তু তাহলে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে — মারল কে? নাকি সত্যিই দুর্ঘটনা?
অর্ক এবার রাহুলের দিকে মনোযোগ দিলেন। ছেলেটা কলকাতা থেকে হঠাৎ ফিরে এসেছে কেন? তার বাবার মৃত্যুর ঠিক কতদিন আগে ফিরেছে?
মালতী জানালেন — বাবার মৃত্যুর ছয় দিন আগে রাহুল ফিরেছিল। বলেছিল, কলকাতার চাকরি ছেড়ে দিয়েছে।
অর্ক রাহুলকে ডাকলেন একলা। দুজন বসলেন পুকুরের পাড়ে — যেখানে সুরজিৎকে পাওয়া গিয়েছিল।
"তোমার বাবার সাথে কি শেষের দিকে সম্পর্ক ভালো ছিল?"
রাহুল চুপ করে রইল একটু। তারপর বলল, "না।"
"কেন?"
"কলকাতায় একটা মেয়ের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। বাবা জানতে পেরেছিল। রাগ করেছিল।"
"শুধু রাগ? নাকি আরো কিছু?"
রাহুল মুখ নামিয়ে নিল। "বাবা বলেছিল, মেয়েটাকে ছাড়তে হবে। আমি বললাম, না। তখন বাবা বলল — তোমার পুরো ভবিষ্যৎ আমার হাতে। দোকান, সম্পত্তি — কিছুই পাবে না।"
অর্ক সরাসরি তাকালেন। "সেই রাতে তুমি বাবার সাথে কথা বলেছিলে?"
রাহুল ঘাড় নামাল। দীর্ঘ নীরবতা।
"বলেছিলাম।" তারপর ধীরে ধীরে বলল, "কিন্তু ঝগড়া হয়েছিল।বাবা রাগ করে চলে গিয়েছিল পুকুরের দিকে। আমি ঘরে ঢুকে গিয়েছিলাম।"
অর্ক উঠলেন। সত্যটা এখন তাঁর কাছে প্রায় স্পষ্ট।
তিনি গেলেন থানায়। পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা আবার দেখতে চাইলেন। ডাক্তারের সাথে কথা বললেন। একটাই প্রশ্ন — সুরজিৎের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল? বলা হয়েছে পা পিছলানো।
ডাক্তার বললেন, "মাথার পেছনে একটা আঘাত ছিল। কিন্তু পাড়ের পাথরে লেগে হতে পারে।"
"পারে" — এই শব্দটাই অর্ককে ভাবাল।
তিনি আবার গেলেন পুকুরের পাড়ে। আলো ফেলে দেখলেন। পাড়ের পাথরগুলো মসৃণ — পুরনো। কিন্তু একটা জায়গায় একটা পাথরের কোণে কিছু লালচে দাগ, শুকিয়ে গেছে।
আর সেই পাথরের পাশেই মাটিতে একটা পায়ের দাগ — কাদার মধ্যে, ছোট সাইজের জুতো।
অর্ক মালতীকে ডাকলেন। সকাল সকাল।
মালতী এলেন। আঁচল টেনে বসলেন।
"মালতী দেবী," অর্ক বললেন, "সেই রাতে আপনি ঘরে ছিলেন?"
"হ্যাঁ।"
"পুকুরের পাড়ে যাননি?"
মালতী একটু থামলেন।
"আমি একজন স্বামীর কথা বলছি — যে বিয়ের পরেও পুরনো প্রেম ধরে রেখেছিল। যার জন্য আপনি পনেরো বছর ধরে একটা অর্ধেক সংসার করেছেন। চম্পা দেবীর চিঠির কথা আপনি জানতেন — কারণ চিঠিটা আসার আগেই আপনি জানতেন রেণু আগরতলায় আছেন।"
মালতীর চোখ ধীরে ভিজে গেল।
"সেই রাতে ঝগড়া হয়েছিল। রাহুল ঘরে ঢুকে যাওয়ার পর আপনি গিয়েছিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে সব বলেছিলেন — রেণুর কথা, পনেরো বছরের কষ্টের কথা। সুরজিৎ বাবু রেগে গিয়ে আপনাকে ধাক্কা দিয়েছিলেন। আর তখন..."
মালতী মাথা নামিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলেন।
"আমি ধাক্কা দিইনি," তিনি বললেন কাঁদতে কাঁদতে। "ও নিজেই সরে যেতে গিয়ে পিছলে গেল। আমি চিৎকার করিনি। ডাকিনি কাউকে। শুধু দাঁড়িয়ে দেখলাম। তারপর ঘরে চলে এলাম।"
দীর্ঘ নীরবতা নামল ঘরে।
অর্ক বললেন, "আপনি সাহায্য করেননি। সেটাই আপনার অপরাধ। হয়তো সুরজিৎ বাবু বাঁচতেন।"
মালতী নিঃশব্দে কাঁদছিলেন।
"তাহলে আমার কাছে কেন এলেন?" অর্ক জিজ্ঞেস করলেন।
মালতী মুখ তুললেন। "কারণ আমি চাইনি এটা অন্য কারো ঘাড়ে পড়ুক। রাহুলের ঘাড়ে পড়ুক। সে আমার ছেলে। সে নির্দোষ।"
অর্ক চক্রবর্তী সেদিন পুলিশকে জানালেন পুরো ঘটনা। আইনের ভাষায় এটা হত্যা নয় — কারণ সরাসরি কোনো আঘাত নেই। কিন্তু সাহায্য না করার যে অপরাধ, সেটা নিয়ে তদন্ত হবে।
মালতী দেবনাথ সব কিছু স্বীকার করলেন সরলমনে। আদালত তাঁকে কী শাস্তি দেবে সেটা সময় বলবে।
চম্পা দেবী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করলেন চিঠির কথা। তাঁর বিরুদ্ধেও মামলা হলো।
রাহুল কলকাতায় ফিরে গেল। তার প্রেমের আর কোন বাধা রইলো না। আর রেণু ভট্টাচার্য — তিনি শুনলেন সব। সেদিন রাতে একা বসে অনেকক্ষণ কাঁদলেন। পনেরো বছর আগের সেই মানুষটা, যাকে কখনো ভুলতে পারেননি, কিন্তু কোনোদিন পাওয়া হয়নি। বিয়ের পরেও যে প্রেম টিকে ছিল — সেটা শেষ পর্যন্ত শুধু ক্ষত রেখে গেল।এ শহরে অনেক রহস্য আছে। কিছু রহস্য লুকিয়ে থাকে পুরনো চিঠিতে, কিছু থাকে পুকুরের কালো জলে। আর কিছু রহস্য থাকে মানুষের বুকের ভেতরে — যেখানে ভালোবাসা আর যন্ত্রণার মধ্যে পার্থক্য করা সবচেয়ে কঠিন।
অর্ক ত্রিপুরার পরিচিত মুখ। রাজ্য পুলিশের সাথে বহু মামলায় সহযোগিতা করেছেন, কিন্তু সরকারি চাকরিতে কখনো বাঁধা পড়েননি। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, মাথায় রুপালি চুলের ছিটেফোঁটা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। শান্ত মানুষ, কিন্তু চোখ দুটো সর্বদা কিছু একটা খুঁজে বেড়ায়।
সেদিন সন্ধ্যায় দরজায় টোকা পড়ল। খুলে দেখলেন — সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মধ্যবয়সী মহিলা। পরনে সাদা তাঁতের শাড়ি, কপালে চওড়া সিঁদুর, হাতে সোনার বালা। চোখ দুটো লাল, তবে কান্নার দাগ শুকিয়ে গেছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে — অনেকক্ষণ ধরে কাঁদছিলেন, এখন নিজেকে সামলে নিয়েছেন।
"আপনিই কি অর্ক চক্রবর্তী? আমি মালতী দেবনাথ। আমার স্বামী... আমার স্বামীকে খুন করা হয়েছে — কিন্তু পুলিশ বলছে এটা দুর্ঘটনা।"
অর্ক একটু সরে দাঁড়িয়ে বললেন, "ভেতরে আসুন।"
মালতী দেবনাথের স্বামীর নাম ছিল সুরজিৎ দেবনাথ। আগরতলার বড় ব্যবসায়ী, কাপড়ের দোকান আছে বটতলা মার্কেটে বয়স পঞ্চান্ন। সপ্তাহ দুয়েক আগে, এক বর্ষার রাতে, বাড়ির পেছনের পুকুরে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। পুলিশ রিপোর্টে লেখা — পা পিছলে পড়ে গেছেন। হার্ট অ্যাটাক হয়েছে জলে পড়ার আগেই।
"কিন্তু আমার বিশ্বাস হচ্ছে না," মালতী বললেন। "সুরজিৎ সাঁতার জানত। পুকুরের পাড়ে যাওয়ার কোনো কারণ ছিল না রাত দশটায়। আর মৃত্যুর আগের দিন একটা চিঠি পেয়েছিল।"
অর্ক সামনে ঝুঁকলেন। "চিঠি? কোথায় সেটা?"
মালতী তাঁর আঁচলের ভেতর থেকে একটা ভাঁজ করা হলদেটে খাম বের করলেন। অর্ক সাবধানে খুললেন — ভেতরে একটাই লাইন, হাতে লেখা:
"বিয়ের পরেও প্রেম চলে? সেই হিসেব এবার নেওয়া হবে।"
অর্ক চিঠিটা রাখলেন। একটু চুপ করে থেকে বললেন, "সুরজিৎ বাবুর কি কোনো পুরনো সম্পর্ক ছিল?"
মালতীর মুখ শক্ত হয়ে গেল। "সেটা জানতেই আপনার কাছে এসেছি।"
পরের দিন সকালে অর্ক চক্রবর্তী গেলেন দেবনাথ পরিবারের বাড়িতে। আগরতলা বিশালগড় রোড ছেড়ে ড্রপগেটে একটু ভেতরে ঢুকলেই পুরনো কলোনি এলাকা — ছোট ছোট পুকুর, নারকেল গাছ, টিনের ছাদ আর কংক্রিটের দেওয়ালের সংমিশ্রণ। দেবনাথদের বাড়িটা বেশ বড়। সামনে একটা তুলসীমঞ্চ, পাশে একটা শিবমন্দির — বোঝা যাচ্ছে এ পরিবারে ধর্মাচরণের চল আছে।
বাড়িতে ছিলেন সুরজিৎ দেবনাথের বড় ভাই নিখিল দেবনাথ, তাঁর স্ত্রী চম্পা, এবং সুরজিৎ-মালতীর একমাত্র ছেলে রাহুল। রাহুলের বয়স পঁচিশ, সম্প্রতি কলকাতা থেকে ফিরেছে।
অর্ক কথা বলতে বসলেন নিখিল দেবনাথের সাথে। বয়স্ক মানুষ,চোখে শোক আছে তবে ভেতরে কোথাও একটা অস্বস্তিও আছে — সেটা অর্কের দৃষ্টি এড়াল না।
"ছোট ভাই চলে গেল। পুলিশ বলল দুর্ঘটনা। আমরা মেনে নিলাম। এখন আবার তদন্ত করলে পরিবারের মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি হবে।"
"মান-সম্মান?" অর্ক সরাসরি তাকালেন। "কোন বিষয়ে?"
নিখিল থামলেন। তারপর বললেন, "বছর পনেরো আগের কথা। সুরজিৎ একটা মেয়েকে ভালোবাসত — নাম ছিল রেণু। উদয়পুরের মেয়ে, কায়স্থ পরিবার। কিন্তু আমাদের পরিবার রাজি হয়নি। সুরজিৎকে তখন মালতীর সাথে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হল।"
"রেণুর কী হলো?"
"শুনেছিলাম অন্য কোথাও বিয়ে হয়েছে। তারপর আর খোঁজ রাখিনি।" নিখিলের গলায় একটা ক্লান্তি।
অর্ক উঠলেন। বেরোনোর আগে দেখলেন — উঠোনের কোণে রাহুল। চোখে চোখ পড়তে একটু সরে গেল।
"রাহুল," অর্ক ডাকলেন। "তোমার বাবার শেষ কয়েকটা দিনে কি কোনো অপরিচিত লোক বাড়িতে এসেছিল?"
রাহুল একটু ইতস্তত করে বলল, "একজন মহিলা এসেছিলেন। মা দেখেনি। আমি দেখেছিলাম — বাবা তাঁকে ভেতরে নেননি, দরজাতেই কথা বলেছেন। তারপর মহিলা চলে গেলেন। বাবাকে জিজ্ঞেস করিনি।"
"মহিলার চেহারা মনে আছে?"
"বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। ফর্সা, মাঝারি উচ্চতা। পরনে ছিল নীল শাড়ি। হাতে একটা চামড়ার ব্যাগ।"
উদয়পুর যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন অর্ক। সেখানে তাঁর এক পুরনো পরিচিত আছেন — সুবোধ চৌধুরী, স্থানীয় থানার অবসরপ্রাপ্ত দারোগা। ফোন করতেই রাজি হলেন।
উদয়পুরের সেই পরিচিত মহুয়া গন্ধমাখা রাস্তা ধরে সুবোধ চৌধুরীর বাড়িতে পৌঁছালেন অর্ক। চা খেতে খেতে বললেন সব।
সুবোধ মাথা নাড়লেন। "রেণু সেনগুপ্ত — হ্যাঁ, চিনি। এখন রেণু ভট্টাচার্য। বিয়ে হয়েছিল বছর চোদ্দ আগে শান্তনু ভট্টাচার্যের সাথে। কিন্তু সেই বিয়ে বছর পাঁচেকের মধ্যে ভেঙে গেছে। তারপর থেকে একাই থাকছেন। আগরতলায় চলে গেছেন বছর দুয়েক হল। টাউন বড়দেওয়ালির দিকে একটা ফ্ল্যাট নিয়েছেন।"
অর্ক সোজা হয়ে বসলেন। রেণু আগরতলায়। সুরজিৎ আগরতলায়। মৃত্যুর আগের দিন একজন মহিলা দরজায় এসেছিলেন।
পরের দিন টাউন বড়দেওয়ালির ঠিকানায় গিয়ে পৌঁছালেন অর্ক। তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় ফ্ল্যাট। দরজায় টোকা দিতেই— দরজা খুলল।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাকে দেখে অর্ক সঙ্গে সঙ্গে বুঝলেন — এই সেই নীল শাড়ির মহিলা। রাহুলের বর্ণনার সাথে মিলে যাচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে মহিলার চোখে একটা ভয়ের ছায়া।
"আপনি কি রেণু ভট্টাচার্য? আমি অর্ক চক্রবর্তী — সুরজিৎ দেবনাথের মৃত্যুর ব্যাপারে কথা বলতে চাই।"
রেণুর মুখ পাথরের মতো হয়ে গেল। তারপর ধীরে সরে দাঁড়ালেন। বললেন, "আসুন।"
ভেতরে ছোট কিন্তু গোছানো ঘর। দেওয়ালে একটা দুর্গার ছবি, পাশে একটা বাঁধানো কবিতার লাইন। অর্ক বসলেন।
রেণু নিজে থেকেই বললেন, "হ্যাঁ, আমি গিয়েছিলাম ওর বাড়িতে। তবে আমি কিছু করিনি।"
"কেন গিয়েছিলেন?"
রেণু একটু থামলেন। তারপর বললেন, "একটা চিঠি পেয়েছিলাম আমিও। একই ধরনের। বলছিল — সুরজিৎ এখনো আমার সাথে যোগাযোগ রাখছে, এবং আমাকে সতর্ক করা হচ্ছে। আমি ভয় পেয়ে সুরজিৎকে বলতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ও দরজায়ই থামিয়ে দিল। বলল — ভুলে যাও সবকিছু, চলে যাও। আমি চলে এসেছিলাম।"
"সুরজিৎ কি সত্যিই আপনার সাথে যোগাযোগ রাখত?"
রেণুর চোখ ভেজে গেল। "মাঝে মাঝে ফোন করত। কথা হত। কিন্তু সেটা অনেক বছর আগের কথা। গত দুই বছরে কোনো যোগাযোগ নেই।"
অর্ক জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার চিঠিটা আছে?"
"ছিঁড়ে ফেলেছি।" রেণু বললেন। তারপর একটু চুপ করে থেকে যোগ করলেন, "কিন্তু খামটা রেখেছি।"
খামটা নিলেন অর্ক। পোস্টমার্ক দেখলেন। আগরতলা জিপিও — কিন্তু তারিখটা সুরজিৎ মারা যাওয়ার তিন দিন আগের।
দুটো খাম, দুটো চিঠি — একটা গেছে সুরজিৎের কাছে, আরেকটা রেণুর কাছে। দুটোই লেখা হয়েছে কাছাকাছি সময়ে। হাতের লেখা একই রকম দেখতে। কেউ একজন দুজনকেই চাপে ফেলতে চেয়েছিল।
অর্ক ফিরে গেলেন দেবনাথ বাড়িতে। এবার সরাসরি চম্পার সাথে কথা বলবেন — নিখিলের স্ত্রী। মহিলা স্বভাবতই একটু সতর্ক। "চম্পা দেবী," অর্ক বললেন শান্তভাবে, "আপনি কি মাঝে মাঝে চিঠি লেখেন?"
মহিলা অবাক হলেন। "না মানে... মাঝে মাঝে।"
"কলম ব্যবহার করেন?"
"হ্যাঁ, পুরনো ফাউন্টেন পেন আছে।"
অর্ক হঠাৎ প্রশ্নটা ছুড়লেন সরাসরি: "আপনি কি জানতেন সুরজিৎ বাবুর আর রেণুর কথা?"
চম্পার মুখ লাল হয়ে গেল। তারপর ধীরে ধীরে স্বীকার করলেন, "জানতাম। এবং সহ্য করতে পারছিলাম না।"
"কেন?"
"কারণ এই সংসারে নিখিল আর আমি সবচেয়ে বেশি কষ্ট করেছি। দোকান আমাদের জমানো পয়সা দিয়ে শুরু হয়েছিল। সুরজিৎ পরে এসেছিল। কিন্তু সব নাম-যশ তারই। আর তারপরও সে পুরনো প্রেম ছাড়তে পারছিল না। মালতী ভালো মহিলা, ওর অধিকার নষ্ট হচ্ছিল।" চম্পার গলায় একটা তিক্ততা।
"তাহলে চিঠি লিখলেন — দুজনকেই আলাদা করতে?"
চম্পা থামলেন। তারপর বললেন, "হ্যাঁ। চিঠি লিখেছিলাম। কিন্তু আমি আর কিচ্ছু করিনি। আমি তা কখনো করতে পারি না।"
এই মুহূর্তে অর্ক বুঝলেন — চম্পা হয়তো সত্য বলছেন। কিন্তু তাহলে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে — মারল কে? নাকি সত্যিই দুর্ঘটনা?
অর্ক এবার রাহুলের দিকে মনোযোগ দিলেন। ছেলেটা কলকাতা থেকে হঠাৎ ফিরে এসেছে কেন? তার বাবার মৃত্যুর ঠিক কতদিন আগে ফিরেছে?
মালতী জানালেন — বাবার মৃত্যুর ছয় দিন আগে রাহুল ফিরেছিল। বলেছিল, কলকাতার চাকরি ছেড়ে দিয়েছে।
অর্ক রাহুলকে ডাকলেন একলা। দুজন বসলেন পুকুরের পাড়ে — যেখানে সুরজিৎকে পাওয়া গিয়েছিল।
"তোমার বাবার সাথে কি শেষের দিকে সম্পর্ক ভালো ছিল?"
রাহুল চুপ করে রইল একটু। তারপর বলল, "না।"
"কেন?"
"কলকাতায় একটা মেয়ের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। বাবা জানতে পেরেছিল। রাগ করেছিল।"
"শুধু রাগ? নাকি আরো কিছু?"
রাহুল মুখ নামিয়ে নিল। "বাবা বলেছিল, মেয়েটাকে ছাড়তে হবে। আমি বললাম, না। তখন বাবা বলল — তোমার পুরো ভবিষ্যৎ আমার হাতে। দোকান, সম্পত্তি — কিছুই পাবে না।"
অর্ক সরাসরি তাকালেন। "সেই রাতে তুমি বাবার সাথে কথা বলেছিলে?"
রাহুল ঘাড় নামাল। দীর্ঘ নীরবতা।
"বলেছিলাম।" তারপর ধীরে ধীরে বলল, "কিন্তু ঝগড়া হয়েছিল।বাবা রাগ করে চলে গিয়েছিল পুকুরের দিকে। আমি ঘরে ঢুকে গিয়েছিলাম।"
অর্ক উঠলেন। সত্যটা এখন তাঁর কাছে প্রায় স্পষ্ট।
তিনি গেলেন থানায়। পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা আবার দেখতে চাইলেন। ডাক্তারের সাথে কথা বললেন। একটাই প্রশ্ন — সুরজিৎের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল? বলা হয়েছে পা পিছলানো।
ডাক্তার বললেন, "মাথার পেছনে একটা আঘাত ছিল। কিন্তু পাড়ের পাথরে লেগে হতে পারে।"
"পারে" — এই শব্দটাই অর্ককে ভাবাল।
তিনি আবার গেলেন পুকুরের পাড়ে। আলো ফেলে দেখলেন। পাড়ের পাথরগুলো মসৃণ — পুরনো। কিন্তু একটা জায়গায় একটা পাথরের কোণে কিছু লালচে দাগ, শুকিয়ে গেছে।
আর সেই পাথরের পাশেই মাটিতে একটা পায়ের দাগ — কাদার মধ্যে, ছোট সাইজের জুতো।
অর্ক মালতীকে ডাকলেন। সকাল সকাল।
মালতী এলেন। আঁচল টেনে বসলেন।
"মালতী দেবী," অর্ক বললেন, "সেই রাতে আপনি ঘরে ছিলেন?"
"হ্যাঁ।"
"পুকুরের পাড়ে যাননি?"
মালতী একটু থামলেন।
"আমি একজন স্বামীর কথা বলছি — যে বিয়ের পরেও পুরনো প্রেম ধরে রেখেছিল। যার জন্য আপনি পনেরো বছর ধরে একটা অর্ধেক সংসার করেছেন। চম্পা দেবীর চিঠির কথা আপনি জানতেন — কারণ চিঠিটা আসার আগেই আপনি জানতেন রেণু আগরতলায় আছেন।"
মালতীর চোখ ধীরে ভিজে গেল।
"সেই রাতে ঝগড়া হয়েছিল। রাহুল ঘরে ঢুকে যাওয়ার পর আপনি গিয়েছিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে সব বলেছিলেন — রেণুর কথা, পনেরো বছরের কষ্টের কথা। সুরজিৎ বাবু রেগে গিয়ে আপনাকে ধাক্কা দিয়েছিলেন। আর তখন..."
মালতী মাথা নামিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলেন।
"আমি ধাক্কা দিইনি," তিনি বললেন কাঁদতে কাঁদতে। "ও নিজেই সরে যেতে গিয়ে পিছলে গেল। আমি চিৎকার করিনি। ডাকিনি কাউকে। শুধু দাঁড়িয়ে দেখলাম। তারপর ঘরে চলে এলাম।"
দীর্ঘ নীরবতা নামল ঘরে।
অর্ক বললেন, "আপনি সাহায্য করেননি। সেটাই আপনার অপরাধ। হয়তো সুরজিৎ বাবু বাঁচতেন।"
মালতী নিঃশব্দে কাঁদছিলেন।
"তাহলে আমার কাছে কেন এলেন?" অর্ক জিজ্ঞেস করলেন।
মালতী মুখ তুললেন। "কারণ আমি চাইনি এটা অন্য কারো ঘাড়ে পড়ুক। রাহুলের ঘাড়ে পড়ুক। সে আমার ছেলে। সে নির্দোষ।"
অর্ক চক্রবর্তী সেদিন পুলিশকে জানালেন পুরো ঘটনা। আইনের ভাষায় এটা হত্যা নয় — কারণ সরাসরি কোনো আঘাত নেই। কিন্তু সাহায্য না করার যে অপরাধ, সেটা নিয়ে তদন্ত হবে।
মালতী দেবনাথ সব কিছু স্বীকার করলেন সরলমনে। আদালত তাঁকে কী শাস্তি দেবে সেটা সময় বলবে।
চম্পা দেবী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করলেন চিঠির কথা। তাঁর বিরুদ্ধেও মামলা হলো।
রাহুল কলকাতায় ফিরে গেল। তার প্রেমের আর কোন বাধা রইলো না। আর রেণু ভট্টাচার্য — তিনি শুনলেন সব। সেদিন রাতে একা বসে অনেকক্ষণ কাঁদলেন। পনেরো বছর আগের সেই মানুষটা, যাকে কখনো ভুলতে পারেননি, কিন্তু কোনোদিন পাওয়া হয়নি। বিয়ের পরেও যে প্রেম টিকে ছিল — সেটা শেষ পর্যন্ত শুধু ক্ষত রেখে গেল।এ শহরে অনেক রহস্য আছে। কিছু রহস্য লুকিয়ে থাকে পুরনো চিঠিতে, কিছু থাকে পুকুরের কালো জলে। আর কিছু রহস্য থাকে মানুষের বুকের ভেতরে — যেখানে ভালোবাসা আর যন্ত্রণার মধ্যে পার্থক্য করা সবচেয়ে কঠিন।
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
শঙ্খজিৎ ভট্টাচার্য ০৪/০৪/২০২৬চমৎকার
-
ফয়জুল মহী ২৮/০৩/২০২৬অনেক সুন্দর লিখেছেন কবি
