www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

পুরানো ক্যালেন্ডার

— অতীতের পাতায় লুকানো হত্যারহস্য —
আগরতলার হাওয়ায় সেই ভোরটা ছিল অন্যরকম। কার্তিক মাসের কুয়াশা তখনো মাটি ছেড়ে উঠতে পারেনি। উমাকান্ত রোডের সরু গলিতে, পাঁচিলঘেরা পুরনো এক বাড়ির উঠোনে কাশীনাথ চক্রবর্তীর দেহ পাওয়া গেল — উপুড় হয়ে পড়া, মাথার কাছে অল্প রক্তক্ষরণের চিহ্ন । পাশে ছিটকে পড়ে ছিল একটি পুরানো দেয়াল-ক্যালেন্ডার। ১৯৮৭ সালের।
বাড়ির মালিক কাশীনাথ চক্রবর্তী, বয়স সত্তর পেরিয়েছে। আগরতলার পুরনো ব্রাহ্মণ পরিবারের শেষ বংশধর। পূজার ঠাকুরঘর থেকে তাঁকে শেষবার দেখেছিলেন বাড়ির পরিচারিকা বিমলা। রাত দশটায়। ভোরে উঠে দরজা খুলতে গিয়ে বিমলাই আঁতকে উঠেছিলেন।
পুলিশ এল। দেখল। তারা মাথা চুলকিয়ে চুলকিয়ে বিধি সম্মত সব কিছু করে চলে গেল। তারপর সন্ধ্যায় ফোন করল শুভ্রাংশুকে।
শুভ্রাংশু বসু — আগরতলার সরকারি চাকরি ছেড়ে নিজের বুদ্ধির উপর ভরসা করে বসা মানুষ। বয়স পঞ্চাশের কাছে, পাতলা গড়ন, গভীর চোখে সবসময় একটা হিসাব চলে। মাথায় সাদা চুলের রেখা এসেছে, কিন্তু চেহারায় শৈথিল্য নেই। তাঁর কাঁধে সবসময় থাকে একটি ঝোলা — ভেতরে নোটবই, একটি ম্যাগনিফাইং গ্লাস, আর পাওয়ার মিন্টের কৌটো।
তাঁর সহচর প্রণব দাস — পাশের মহকুমার স্কুলশিক্ষক, ছুটিতে এলেই শুভ্রাংশুর সঙ্গী হন। মোটাসোটা, হাসিখুশি, তবে প্রয়োজনে অত্যন্ত সাহসী। শুভ্রাংশু তাঁকে বলেন "আমার পায়ের পাতা" — কারণ প্রণব যেখানে যান, মাটির হদিশ বের করে আনেন।
পুলিশের ফোন পেয়েই শুভ্রাংশু প্রণবকে ডাকলেন।
"প্রণব, চলো। আগরতলায় পুরনো গন্ধ আছে।"
"গন্ধ মানে?" প্রণব ধূপবাতি নামাতে নামাতে জিজ্ঞেস করলেন।
"মানে এই মামলা শুধু খুনের নয়। এটা ইতিহাসের।"
পরদিন সকালে শুভ্রাংশু আর প্রণব পৌঁছলেন উমাকান্ত রোডের বাড়িতে। টিনের গেট, শ্যাওলা ধরা দেয়াল, আর উঠোনে একটি প্রাপ্ত বয়স্ক আমগাছ। বাড়িটা যেন নিজেই একটা গল্পের বই।
ভেতরে ঢুকে তিনটি মানুষকে পেলেন শুভ্রাংশু। কাশীনাথের ছেলে কল্যাণ চক্রবর্তী — কলকাতায় ব্যবসা করেন, দু'দিন আগে এসেছেন। কাশীনাথের ভাইপো সুমন্ত — আগরতলাতেই থাকেন, তবে মামার বাড়িতে কালেভদ্রে আসেন। আর বাড়ির পরিচারিকা বিমলা দেবী — একচল্লিশ বছর ধরে এই বাড়িতে।
শুভ্রাংশু প্রথমে কিছু না বলে শুধু ঘুরলেন। ঠাকুরঘরে গেলেন, উঠোনে দাঁড়ালেন, মৃত্যুর জায়গাটা দেখলেন। প্রণব তাঁর পেছনে নোটবই খুলে হাঁটলেন।
তারপর শুভ্রাংশু সেই ক্যালেন্ডারটা দেখতে চাইলেন।
সূত্র — ১
ক্যালেন্ডারটি ১৯৮৭ সালের। কিন্তু কার্তিক মাসের পাতায় একটি তারিখ — ১৫ই কার্তিক — পেন দিয়ে গোল করা। গোলের ভেতরে লেখা মাত্র দুটো অক্ষর: "ক.দ."
"এই ক্যালেন্ডার আগে কোথায় ছিল?" শুভ্রাংশু বিমলাকে জিজ্ঞেস করলেন।
"ঠাকুরঘরের তাকে। বলতেন এটা তাঁর সবচেয়ে দামি জিনিস।" বিমলার চোখে জল।
"সবচেয়ে দামি জিনিস?" প্রণব অবাক হলেন। "একটা পুরনো ক্যালেন্ডার?"
"দাম টাকায় মাপতে নেই, দাদাবাবু।" শুভ্রাংশু শান্তভাবে বললেন।
শুভ্রাংশু ক্যালেন্ডারের প্রতিটি পাতা উল্টালেন। আর পেলেন প্রতিটি পাতার ভাঁজে একটি করে রহস্য।
সূত্র — ২
ক্যালেন্ডারের পেছনের মলাটে পেন্সিলে লেখা একটি ঠিকানা — "মেলারমাঠ।" এবং তার পাশে একটি সংখ্যা — ৩৭,০০০।
সূত্র — ৩
মৃতদেহের পাশে মাটিতে একটি ছোট্ট ধাতব বোতাম পাওয়া গেছে — ত্রিপুরা স্টেট কো-অপারেটিভ ব্যাংকের ইউনিফর্মের। বর্তমান কর্মীদের ইউনিফর্মে এই ধরনের বোতাম নেই। পুরনো মডেল — আশির দশকের।
সন্ধ্যায় শুভ্রাংশু প্রণবকে নিয়ে বসলেন পুরনো রেকর্ড ঘাঁটতে। ১৯৮৭ সালের একটি মামলার ফাইল পাওয়া গেল। এক জমি-বিবাদ। কাশীনাথ চক্রবর্তী বনাম কনকলাল দাস। ৩৭,০০০ টাকার জমি। লোকেশন মেলারমাঠ।
মামলায় হেরেছিলেন কনকলাল দাস। সেই বছরই তাঁর মৃত্যু হয় — পুলিশি নথিতে "হৃদরোগে"। কিন্তু পরিবার বলেছিল — অপমানে।
"ক.দ. মানে কনকলাল দাস," শুভ্রাংশু বললেন।
"তাহলে কাশীনাথবাবু নিজেই কি দিনটা মনে রাখতেন?" প্রণব জিজ্ঞেস করলেন।
"মনে রাখতেন — অপরাধবোধে। বা ভয়ে।"
কনকলাল দাসের পরিবারে — একটি ছেলে। নাম বিকাশ দাস। বর্তমান ঠিকানা অজানা। কিন্তু আগরতলার পুরনো বাসিন্দারা জানেন — বিকাশ একসময় ত্রিপুরা স্টেট কো-অপারেটিভ ব্যাংকে কাজ করতেন।
পরদিন সকালে শুভ্রাংশু অন্য মানুষ হলেন। ট্রাউজার প্যান্ট ছেড়ে পরলেন লুঙ্গি আর ময়লা ফতুয়া। মাথায় একটা গামছা। নামলেন বটতলা বাজারে — যেখানে আগরতলার বয়স্ক মানুষেরা সকালবেলা চা খেতে আসেন।
প্রণব দাঁড়িয়ে রইলেন দূরে।
শুভ্রাংশু চায়ের দোকানে বসে পরিচয় দিলেন — উদয়পুর থেকে আসা ফুটপাত ব্যবসায়ী। ধীরে ধীরে কথা তুললেন কনকলাল দাসের। পুরনো মানুষেরা অনেক কিছু মনে রাখেন। একজন বললেন:
"হ্যাঁ, কনকলালের ছেলে বিকাশ তো এখানেই আছে। 'বিকাশ ভট্ বললে সবাই চিনবে — বাড়িভাড়া দেয় গান্ধীঘাটে ।"
নামটা শুনে শুভ্রাংশুর চোখ সরু হল। ভট্টাচার্য — ব্রাহ্মণ পদবি। দাস থেকে ভট্টাচার্য — পরিচয় পালটানো।
দ্রুত পায়ে ফিরে এলেন প্রণবের কাছে।
"বিকাশ দাস এখন বিকাশ ভট্টাচার্য। গান্ধীঘাটে থাকে/”
গান্ধীঘাটের আশে পাশে খোঁজ নিয়ে জানা গেল-
কাশীনাথবাবুর বাড়িতে কল্যাণ আসার দুদিন আগে — মানে চারদিন আগে — কেউ একজন বাড়িভাড়া নিয়েছে ঐ বাড়িতে।
"মানে সে নজর রাখছিল!" প্রণব বললেন।
"নজর রাখছিল না — সুযোগ খুঁজছিল। আর সুযোগ এল যখন কল্যাণ এল — কারণ রাতে বাড়িতে বিক্ষিপ্ততা বাড়ে।"
সূত্র — ৪
পাশের বাড়ির ভাড়াটেকে তিনি "বিক্রমপুর থেকে আসা ব্যবসায়ী" বলেছেন।
রাত নটা। আকাশে মেঘ জমেছে। উমাকান্ত রোড নিঝুম। শুভ্রাংশু আর প্রণব কাশীনাথের বাড়িতেই ছিলেন। শুভ্রাংশু কল্যাণকে বলেছিলেন — আজ রাতে বাড়ি ছাড়বেন না।
হঠাৎ উঠোনের দিক থেকে একটা শব্দ। পাঁচিলে কিছু ঘষা লাগার।
প্রণব উঠে দাঁড়াতে গেলেন। শুভ্রাংশু হাত দিয়ে থামালেন।
"আলো নেভাও,"
অন্ধকারে দুজন দাঁড়ালেন। কয়েক মিনিট পর ঠাকুরঘরের দিক থেকে একটা মোমবাতির আলো নড়ল। কেউ একজন ঢুকেছে।
শুভ্রাংশু নিঃশব্দে এগোলেন। প্রণব পেছনে। ঠাকুরঘরের দরজা ঠেলে খুললেন।
ভেতরে একজন মানুষ — ষাটের কাছে বয়স, রোগাটে, চোখে ভয় আর ক্রোধের মিশ্রণ। হাতে কাশীনাথের পুরনো একটি টিনের বাক্স।
"বিকাশ দাস?" শুভ্রাংশু বললেন।
লোকটা থমকে গেল। তারপর বাক্সটা ছুঁড়ে দিয়ে পালাতে চাইল। কিন্তু প্রণব দরজা আগেই আটকে দাঁড়িয়েছিলেন। দুজনে মিলে তাকে ধরলেন।
টিনের বাক্সটা মাটিতে পড়ে খুলে গেল। ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ল একগুচ্ছ পুরনো কাগজ — ১৯৮৭ সালের জমির দলিল। এবং একটি চিঠি।
কনকলাল দাসের জমি কাশীনাথ নেননি — নিয়েছিলেন জাল সাক্ষী ও দুর্নীতিগ্রস্ত মাপজোকের মাধ্যমে তাঁর তৎকালীন বন্ধু, কো-অপারেটিভ ব্যাংকের কর্মকর্তা রমেশ ঘোষ। কিন্তু মুনাফা গিয়েছিল কাশীনাথের ঘরে। রমেশ ঘোষ পরে মারা যান। আর কাশীনাথ সেই অপরাধবোধ বুকে নিয়ে বেঁচেছিলেন ৩৭ বছর।
চিঠিটি লিখেছিলেন কাশীনাথ নিজে — মৃত্যুর আগের সন্ধ্যায়। বিকাশকে উদ্দেশ্য করে। লিখেছিলেন — "তোমার বাবার জমির দলিল আমার কাছে আছে। সব কাগজ তোমার পাওনা।"
কিন্তু বিকাশ সেই চিঠি পায়নি। সে আসার আগেই কাশীনাথকে মেরে ফেলা হয়েছিল।
"তুমি মারোনি," শুভ্রাংশু বিকাশকে বললেন। "তুমি শুধু চিঠিটা পেতে এসেছিলে।"
বিকাশের চোখ ভিজে গেল।
"বাবার জমির কাগজ — এটুকুই চেয়েছিলাম। তাঁর সম্মান ফিরিয়ে নিতে।"
আসল খুনি ছিলেন কল্যাণ — কাশীনাথের ছেলে। সে জানত বাবা শেষবয়সে সব সত্য বলে দিতে চাইছেন। জমির কাগজ বেরিয়ে পড়লে সম্পত্তিতে বিকাশের দাবি আসবে। তাই কল্যাণ রাতে বাবাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে উঠোনে নিয়ে গিয়ে মাথায় আঘাত করেছিল। তারপর ক্যালেন্ডারটা ছুঁড়ে দিয়েছিল — পাগলামির ছাপ তৈরি করতে।
কিন্তু ক্যালেন্ডারটাই হল কাল। ভয়ে বা তাড়াহুড়োয় কল্যাণ বুঝতে পারেনি যে বাবার সবচেয়ে গোপন সাক্ষী সে নিজেই ছুঁড়ে দিয়েছে তদন্তকারীর সামনে।
কল্যাণকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হল। বিকাশ পেলেন তাঁর বাবার জমির দলিল। আর সেই টিনের বাক্সে পাওয়া গেল একটি ছোট্ট কাগজ — কাশীনাথের হাতে লেখা শেষ ইচ্ছা। মেলারমাঠের জমি বিকাশ দাসকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৭২ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৭/০৩/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast