মোবাইল ছাড়া একটি দিন
গোয়েন্দা কাহিনী
রহস্য • সংশয় • সত্যের সন্ধান
— ✦ —
সকাল সাতটা বাজতে না বাজতেই ইন্সপেক্টর অর্ণব সেনের ফোন বেজে উঠল। তিনি তখন রান্নাঘরে চা বানাচ্ছিলেন, হাতে কেটলি ধরা। নম্বরটা চেনা — থানার ডিউটি অফিসার সুব্রত বাবু।
"স্যার, কাল রাতে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। পাইনগাছ পাড়ায় ডক্টর নীলাঞ্জন বসুর বাড়িতে। ভদ্রলোক সকালে উঠে দেখেন, তাঁর পুরো পরিবারের সবার মোবাইল ফোন — পাঁচটি ফোন — হাওয়া হয়ে গেছে।"
অর্ণব থেমে গেলেন। "শুধু ফোন? অন্য কিছু নেই?"
"না স্যার। শুধু ফোন। কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই শেষ না।"
অর্ণব চায়ের কাপ রেখে দিলেন। তাঁর দীর্ঘ গোয়েন্দা জীবনে চুরির মামলা অনেক দেখেছেন, কিন্তু এই অদ্ভুত বিশেষত্ব — শুধু মোবাইল — তাঁর কৌতূহল জাগিয়ে দিল।
ডক্টর নীলাঞ্জন বসুর বাড়িটি শহরের উত্তর প্রান্তে, একটু নির্জন এলাকায়। তিনতলা পুরনো বাড়ি, চারদিকে বড় বড় পাইনগাছ। অর্ণব যখন পৌঁছলেন, তখন সকাল আটটা। বাড়ির সামনে ইতিমধ্যে একটি পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে।
ডক্টর নীলাঞ্জন বসু বয়স্ক মানুষ, প্রায় পঁয়ষট্টি। মাথায় পাকা চুল, মুখে উদ্বেগের ছাপ। বসার ঘরে সোফায় বসে আছেন। পাশে তাঁর স্ত্রী সুচিত্রা, ছেলে রাহুল, ছেলের বউ মেঘনা এবং কলেজপড়ুয়া নাতনি তানিয়া।
"ইন্সপেক্টর, এটা আমার বোঝার বাইরে," নীলাঞ্জন বললেন, তাঁর গলায় স্পষ্ট বিরক্তি মিশ্রিত ভয়। "রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আমরা প্রত্যেকে আমাদের ফোন নিজের কাছে রেখেছিলাম। সকালে উঠে কারো কাছেই নেই।"
অর্ণব পুরো পরিবারের দিকে তাকালেন। সবার মুখে একটা অদ্ভুত অভিব্যক্তি। শুধু উদ্বেগ নয়, কিছু একটা লুকানোর চেষ্টা যেন।
"রাতে বাড়িতে আর কেউ ছিল?"
"হ্যাঁ। বাড়িতে কাজ করে লক্ষ্মী। সে রান্নাঘরের পাশের ছোট ঘরে থাকে," মেঘনা বলল।
অর্ণব উঠে দাঁড়ালেন। "আমাকে পুরো বাড়িটা একবার দেখতে হবে।"
অর্ণব প্রতিটি ঘর পদ্ধতিগতভাবে পরীক্ষা করলেন। বাড়ির সমস্ত দরজা-জানালা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। কোনো তালা ভাঙার চিহ্ন নেই, জানালার শিক বাঁকানো নেই। বাইর থেকে কেউ ঢোকেনি — এটা প্রায় নিশ্চিত।
চোর বাইরে থেকে আসেনি। তার মানে যে চুরি করেছে, সে বাড়ির ভেতরেই ছিল।
প্রতিটি ঘরের চার্জিং পয়েন্ট খালি। রাহুলের ঘরে একটা টেবিলের ওপর ফোনের কভার পড়ে আছে — ফোন নেই, শুধু কভার। তানিয়ার ঘরে বালিশের নিচে ফোন রাখার অভ্যাস, সেখানেও খালি।
অর্ণব রান্নাঘরের পাশে লক্ষ্মীর ঘরে গেলেন। লক্ষ্মী মধ্যবয়সী মহিলা, সামান্য ভয় পাওয়া চোখে তাকিয়ে আছে।
"তোমার ফোন আছে?"
"আছে স্যার। দেখুন।" লক্ষ্মী পুরনো একটা বাটন ফোন বের করল।
অর্ণব লক্ষ্য করলেন, এই ঘরে সবকিছু স্বাভাবিক। লক্ষ্মীর ঘর থেকে সরাসরি একটা সরু দরজা আছে বাগানে বের হওয়ার — সেটা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। কিন্তু ছিটকিনি দেওয়া নেই, শুধু ধাক্কা মেরে বন্ধ করা ছিল।
১. পাঁচটি স্মার্টফোন চুরি, লক্ষ্মীর পুরনো বাটন ফোন অক্ষত।
২. বাড়ির মূল দরজা ও সব জানালা রাতভর বন্ধ।
৩. লক্ষ্মীর ঘরের পেছনের দরজা — ছিটকিনি ছাড়া বন্ধ।
৪. রাহুলের টেবিলে শুধু ফোনের কভার পড়ে আছে।
অর্ণব একে একে পরিবারের সদস্যদের আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। প্রথমে রাহুল — তিরিশের কাছাকাছি বয়স, চোখে একটা চঞ্চলতা।
"আপনি কটায় ঘুমিয়েছিলেন গতকাল রাতে?"
"এগারোটার দিকে।"
"ফোনটা কোথায় রেখেছিলেন?"
"টেবিলে চার্জে দিয়েছিলাম।"
"রাতে একবারও উঠেছিলেন?"
রাহুল একটু থামল। "না।"
সেই 'না' বলতে এক সেকেন্ড বেশি সময় নিল। অর্ণব নোট করলেন।পরের জন মেঘনা। সে আরও বেশি স্বাভাবিক দেখাল, কিন্তু তার বাঁ হাতের আঙুলগুলো অবিরাম মুচড়াচ্ছিল।
"গতকাল সন্ধ্যায় কি কোনো বিশেষ ঘটনা ঘটেছিল এই বাড়িতে?"
মেঘনা চুপ করে রইল।
"মেঘনাদেবী?"
"ছোটখাটো একটা মতবিরোধ হয়েছিল। পারিবারিক বিষয়।"
তানিয়া সবার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অস্থির। বয়স বড়জোর বিশ-একুশ। সে বলল রাত বারোটার পর ঘুমিয়েছে কারণ পরীক্ষার পড়া পড়ছিল। কিন্তু অর্ণব লক্ষ্য করলেন — তানিয়ার ঘরে কোনো নোটবুক খোলা নেই। ল্যাপটপও বন্ধ।
অর্ণব আবার পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখলেন, এবার আরও সূক্ষ্মভাবে। বাথরুমের পাশে একটা ছোট স্টোররুম — সেখানে পুরনো আসবাব, পরিত্যক্ত জিনিসপত্র।
স্টোররুমের কোণে একটা পুরনো শাড়ির মধ্যে মোড়ানো ছোট একটা বাক্স। অর্ণব সেটা খুললেন। ভেতরে একটা নতুন সিম কার্ড, একটা ছোট চিরকুট এবং একটি পুরনো চাবি।
চিরকুটে লেখা: "সোমবার রাত দশটা। আর দেরি করা যাবে না।"
তারিখ লেখা নেই, কিন্তু কাগজটা নতুন। অর্ণব চিরকুটটা সাবধানে ব্যাগে রাখলেন।
এখন প্রশ্ন হলো, কে রেখেছে এটা? বাইরের কেউ, নাকি পরিবারের কেউই? চাবিটা পরীক্ষা করলেন — সাধারণ একটা লকারের চাবি। বাড়িতে কোনো লকার আছে কিনা জিজ্ঞেস করতে হবে।
অর্ণব ডক্টর নীলাঞ্জনকে একা ডাকলেন তাঁর পড়ার ঘরে। সেখানে মেডিকেল বইয়ের পাশাপাশি আইনের বেশ কিছু বই। দেওয়ালে সার্টিফিকেট। এবং একটা ছোট কাঠের আলমারি — তালাবন্ধ।
"ডক্টর বসু, আপনার বাড়িতে কোনো লকার বা সেফ আছে?"
বৃদ্ধ একটু থামলেন। "আছে। ওই আলমারিতে।"
"চাবিটা কোথায়?"
নীলাঞ্জনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। "চাবিটা আমার কাছেই থাকে। কোটের পকেটে।" তিনি পকেট হাতড়ালেন। "নেই। চাবিটাও নেই।"
অর্ণব স্টোররুম থেকে পাওয়া চাবিটা বের করলেন। "এটা কি সেটাই?"
নীলাঞ্জন চাবিটা দেখে একটু নিঃশ্বাস ফেললেন। "হ্যাঁ।"
আলমারি খোলা হলো। ভেতরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, একটা পাসপোর্ট, এবং একটা ব্যাংকের পাসবুক। সব অক্ষত।
"এই আলমারিতে আর কী ছিল?"
নীলাঞ্জন অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "একটা পেনড্রাইভ ছিল। এখন নেই।"
"কী ছিল ওই পেনড্রাইভে?"
ডক্টর বসু জানালার দিকে তাকালেন। বাইরে পাইনগাছের ডালে একটা পাখি বসে আছে।
"আমার একটা পুরনো মেডিকেল রিপোর্ট। যেটা আমি কাউকে দেখাইনি। একটা... ভুল চিকিৎসার রেকর্ড। বহু বছর আগের। একজন রোগী মারা গিয়েছিল।"
এখন রহস্যটা শুধু চুরির মামলা নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে একটা পুরনো অপরাধের ছায়া।
অর্ণব আবার তানিয়ার ঘরে গেলেন। এবার কথোপকথনের ধরন বদলালেন। সরাসরি অভিযোগ না করে বন্ধুর মতো কথা শুরু করলেন।
"তানিয়া, তুমি রাতে ঘুমাওনি। আমি জানি। তোমার চোখ দেখলেই বোঝা যায়।"
মেয়েটি একটু কেঁপে উঠল।
"তুমি কি দেখেছ কে ফোনগুলো নিয়েছে?"
তানিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।
"রাত দুটোর দিকে আমি বাথরুমে যাচ্ছিলাম। দেখলাম মামার ঘরের দরজা খোলা। মামা ভেতরে নেই। একটু পরে দেখি মামা হলের দিক থেকে আসছে — হাতে কী যেন। ঠিক বুঝতে পারিনি।"
রাহুল — ডক্টর বসুর ছেলে। সে বলেছিল রাতে ওঠেনি, কিন্তু তানিয়া দেখেছে সে বাইরে গিয়েছিল।
অর্ণব এবার রাহুলকে ডাকলেন একা। তাঁর কণ্ঠস্বর এবার স্পষ্ট এবং সরাসরি।
"রাহুলবাবু, রাত দুটোয় আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?"
রাহুলের মুখ শক্ত হয়ে গেল। "কোথাও না।"
"তানিয়া আপনাকে দেখেছে।"
দীর্ঘ নীরবতা। তারপর রাহুল উঠে জানালার কাছে গেল।
"আমি জানতাম এটা একদিন বেরিয়ে আসবে। বাবার পেনড্রাইভটা আমিই নিয়েছিলাম।"
"কেন?"
"কারণ কেউ আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছিল। বলেছিল ওই রেকর্ড পুলিশকে দেবে যদি আমরা টাকা না দিই। তার সাথে যোগাযোগ হতো মোবাইলে। তাই—"
অর্ণব এগিয়ে এলেন।
"তাই আপনি সবার ফোন লুকিয়ে ফেলেছিলেন? যাতে ব্ল্যাকমেইলারের সাথে কেউ যোগাযোগ না করতে পারে?"
রাহুল মাথা নোয়াল। "হ্যাঁ। আমি ভয় পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম পরিবারকে রক্ষা করছি।"
— রাহুল নিজেই পাঁচটি ফোন লুকিয়েছে বাড়িরই একটি গোপন জায়গায়।
— চিরকুটটি ব্ল্যাকমেইলারের নির্দেশ, যা রাহুলের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
— পেনড্রাইভটি রাহুল নিজে সরিয়ে রেখেছে ব্ল্যাকমেইলারের হাত থেকে বাঁচাতে।
রাহুল নিজেই অর্ণবকে নিয়ে গেল বাগানের একটা কোণে। সেখানে একটা পুরনো পাথরের বেঞ্চের নিচে একটা ছোট ব্যাগ। ভেতরে পাঁচটি মোবাইল ফোন — সব বন্ধ অবস্থায়।
"আমি ভেবেছিলাম একদিনের জন্য সবার ফোন বন্ধ থাকলে ব্ল্যাকমেইলার বুঝবে আমরা তার বার্তা পড়িনি। একটু সময় পাব ভাবার।"
অর্ণব ফোনগুলো হাতে নিলেন। "এই এক দিনে আপনি কী ভাবলেন?"
রাহুল মাথা নিচু করল।
"ভাবলাম, পালিয়ে কোনো লাভ নেই। বাবার পুরনো ভুল তাঁর নিজেকেই স্বীকার করতে হবে। পুলিশে যাব বলে ঠিক করেছিলাম।"
অর্ণব স্টোররুম থেকে পাওয়া নতুন সিম কার্ডটি পরীক্ষার জন্য পাঠালেন। একই সঙ্গে চিরকুটের হাতের লেখার নমুনা সংগ্রহ করলেন পরিবারের সবার কাছ থেকে। এই মামলায় ব্ল্যাকমেইলার বাইরের কেউ — কিন্তু সে বাড়ির ভেতরের খবর কোথা থেকে পেল?
তিন ঘণ্টা পরে রিপোর্ট এলো। সিম কার্ডটি নিবন্ধিত হয়েছে একটি ভুয়া নামে, কিন্তু কেনা হয়েছে শহরের একটি মোবাইল শপ থেকে। দোকানের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেল একজন মাঝবয়সী পুরুষ — সিম কার্ডটি সংগ্রহ করে ছিল।
ডক্টর বসুর পুরনো সহকর্মী, ডক্টর পার্থ রায়। যিনি সেই রাতে ডক্টর বসুর সাথে ছিলেন, যেদিন রোগী মারা গিয়েছিল। এত বছর পরে কেউ সেই প্রমাণ ব্যবহার করে টাকা আদায় করতে চেয়েছিল।
রহস্য • সংশয় • সত্যের সন্ধান
— ✦ —
সকাল সাতটা বাজতে না বাজতেই ইন্সপেক্টর অর্ণব সেনের ফোন বেজে উঠল। তিনি তখন রান্নাঘরে চা বানাচ্ছিলেন, হাতে কেটলি ধরা। নম্বরটা চেনা — থানার ডিউটি অফিসার সুব্রত বাবু।
"স্যার, কাল রাতে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। পাইনগাছ পাড়ায় ডক্টর নীলাঞ্জন বসুর বাড়িতে। ভদ্রলোক সকালে উঠে দেখেন, তাঁর পুরো পরিবারের সবার মোবাইল ফোন — পাঁচটি ফোন — হাওয়া হয়ে গেছে।"
অর্ণব থেমে গেলেন। "শুধু ফোন? অন্য কিছু নেই?"
"না স্যার। শুধু ফোন। কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই শেষ না।"
অর্ণব চায়ের কাপ রেখে দিলেন। তাঁর দীর্ঘ গোয়েন্দা জীবনে চুরির মামলা অনেক দেখেছেন, কিন্তু এই অদ্ভুত বিশেষত্ব — শুধু মোবাইল — তাঁর কৌতূহল জাগিয়ে দিল।
ডক্টর নীলাঞ্জন বসুর বাড়িটি শহরের উত্তর প্রান্তে, একটু নির্জন এলাকায়। তিনতলা পুরনো বাড়ি, চারদিকে বড় বড় পাইনগাছ। অর্ণব যখন পৌঁছলেন, তখন সকাল আটটা। বাড়ির সামনে ইতিমধ্যে একটি পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে।
ডক্টর নীলাঞ্জন বসু বয়স্ক মানুষ, প্রায় পঁয়ষট্টি। মাথায় পাকা চুল, মুখে উদ্বেগের ছাপ। বসার ঘরে সোফায় বসে আছেন। পাশে তাঁর স্ত্রী সুচিত্রা, ছেলে রাহুল, ছেলের বউ মেঘনা এবং কলেজপড়ুয়া নাতনি তানিয়া।
"ইন্সপেক্টর, এটা আমার বোঝার বাইরে," নীলাঞ্জন বললেন, তাঁর গলায় স্পষ্ট বিরক্তি মিশ্রিত ভয়। "রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আমরা প্রত্যেকে আমাদের ফোন নিজের কাছে রেখেছিলাম। সকালে উঠে কারো কাছেই নেই।"
অর্ণব পুরো পরিবারের দিকে তাকালেন। সবার মুখে একটা অদ্ভুত অভিব্যক্তি। শুধু উদ্বেগ নয়, কিছু একটা লুকানোর চেষ্টা যেন।
"রাতে বাড়িতে আর কেউ ছিল?"
"হ্যাঁ। বাড়িতে কাজ করে লক্ষ্মী। সে রান্নাঘরের পাশের ছোট ঘরে থাকে," মেঘনা বলল।
অর্ণব উঠে দাঁড়ালেন। "আমাকে পুরো বাড়িটা একবার দেখতে হবে।"
অর্ণব প্রতিটি ঘর পদ্ধতিগতভাবে পরীক্ষা করলেন। বাড়ির সমস্ত দরজা-জানালা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। কোনো তালা ভাঙার চিহ্ন নেই, জানালার শিক বাঁকানো নেই। বাইর থেকে কেউ ঢোকেনি — এটা প্রায় নিশ্চিত।
চোর বাইরে থেকে আসেনি। তার মানে যে চুরি করেছে, সে বাড়ির ভেতরেই ছিল।
প্রতিটি ঘরের চার্জিং পয়েন্ট খালি। রাহুলের ঘরে একটা টেবিলের ওপর ফোনের কভার পড়ে আছে — ফোন নেই, শুধু কভার। তানিয়ার ঘরে বালিশের নিচে ফোন রাখার অভ্যাস, সেখানেও খালি।
অর্ণব রান্নাঘরের পাশে লক্ষ্মীর ঘরে গেলেন। লক্ষ্মী মধ্যবয়সী মহিলা, সামান্য ভয় পাওয়া চোখে তাকিয়ে আছে।
"তোমার ফোন আছে?"
"আছে স্যার। দেখুন।" লক্ষ্মী পুরনো একটা বাটন ফোন বের করল।
অর্ণব লক্ষ্য করলেন, এই ঘরে সবকিছু স্বাভাবিক। লক্ষ্মীর ঘর থেকে সরাসরি একটা সরু দরজা আছে বাগানে বের হওয়ার — সেটা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। কিন্তু ছিটকিনি দেওয়া নেই, শুধু ধাক্কা মেরে বন্ধ করা ছিল।
১. পাঁচটি স্মার্টফোন চুরি, লক্ষ্মীর পুরনো বাটন ফোন অক্ষত।
২. বাড়ির মূল দরজা ও সব জানালা রাতভর বন্ধ।
৩. লক্ষ্মীর ঘরের পেছনের দরজা — ছিটকিনি ছাড়া বন্ধ।
৪. রাহুলের টেবিলে শুধু ফোনের কভার পড়ে আছে।
অর্ণব একে একে পরিবারের সদস্যদের আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। প্রথমে রাহুল — তিরিশের কাছাকাছি বয়স, চোখে একটা চঞ্চলতা।
"আপনি কটায় ঘুমিয়েছিলেন গতকাল রাতে?"
"এগারোটার দিকে।"
"ফোনটা কোথায় রেখেছিলেন?"
"টেবিলে চার্জে দিয়েছিলাম।"
"রাতে একবারও উঠেছিলেন?"
রাহুল একটু থামল। "না।"
সেই 'না' বলতে এক সেকেন্ড বেশি সময় নিল। অর্ণব নোট করলেন।পরের জন মেঘনা। সে আরও বেশি স্বাভাবিক দেখাল, কিন্তু তার বাঁ হাতের আঙুলগুলো অবিরাম মুচড়াচ্ছিল।
"গতকাল সন্ধ্যায় কি কোনো বিশেষ ঘটনা ঘটেছিল এই বাড়িতে?"
মেঘনা চুপ করে রইল।
"মেঘনাদেবী?"
"ছোটখাটো একটা মতবিরোধ হয়েছিল। পারিবারিক বিষয়।"
তানিয়া সবার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অস্থির। বয়স বড়জোর বিশ-একুশ। সে বলল রাত বারোটার পর ঘুমিয়েছে কারণ পরীক্ষার পড়া পড়ছিল। কিন্তু অর্ণব লক্ষ্য করলেন — তানিয়ার ঘরে কোনো নোটবুক খোলা নেই। ল্যাপটপও বন্ধ।
অর্ণব আবার পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখলেন, এবার আরও সূক্ষ্মভাবে। বাথরুমের পাশে একটা ছোট স্টোররুম — সেখানে পুরনো আসবাব, পরিত্যক্ত জিনিসপত্র।
স্টোররুমের কোণে একটা পুরনো শাড়ির মধ্যে মোড়ানো ছোট একটা বাক্স। অর্ণব সেটা খুললেন। ভেতরে একটা নতুন সিম কার্ড, একটা ছোট চিরকুট এবং একটি পুরনো চাবি।
চিরকুটে লেখা: "সোমবার রাত দশটা। আর দেরি করা যাবে না।"
তারিখ লেখা নেই, কিন্তু কাগজটা নতুন। অর্ণব চিরকুটটা সাবধানে ব্যাগে রাখলেন।
এখন প্রশ্ন হলো, কে রেখেছে এটা? বাইরের কেউ, নাকি পরিবারের কেউই? চাবিটা পরীক্ষা করলেন — সাধারণ একটা লকারের চাবি। বাড়িতে কোনো লকার আছে কিনা জিজ্ঞেস করতে হবে।
অর্ণব ডক্টর নীলাঞ্জনকে একা ডাকলেন তাঁর পড়ার ঘরে। সেখানে মেডিকেল বইয়ের পাশাপাশি আইনের বেশ কিছু বই। দেওয়ালে সার্টিফিকেট। এবং একটা ছোট কাঠের আলমারি — তালাবন্ধ।
"ডক্টর বসু, আপনার বাড়িতে কোনো লকার বা সেফ আছে?"
বৃদ্ধ একটু থামলেন। "আছে। ওই আলমারিতে।"
"চাবিটা কোথায়?"
নীলাঞ্জনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। "চাবিটা আমার কাছেই থাকে। কোটের পকেটে।" তিনি পকেট হাতড়ালেন। "নেই। চাবিটাও নেই।"
অর্ণব স্টোররুম থেকে পাওয়া চাবিটা বের করলেন। "এটা কি সেটাই?"
নীলাঞ্জন চাবিটা দেখে একটু নিঃশ্বাস ফেললেন। "হ্যাঁ।"
আলমারি খোলা হলো। ভেতরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, একটা পাসপোর্ট, এবং একটা ব্যাংকের পাসবুক। সব অক্ষত।
"এই আলমারিতে আর কী ছিল?"
নীলাঞ্জন অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "একটা পেনড্রাইভ ছিল। এখন নেই।"
"কী ছিল ওই পেনড্রাইভে?"
ডক্টর বসু জানালার দিকে তাকালেন। বাইরে পাইনগাছের ডালে একটা পাখি বসে আছে।
"আমার একটা পুরনো মেডিকেল রিপোর্ট। যেটা আমি কাউকে দেখাইনি। একটা... ভুল চিকিৎসার রেকর্ড। বহু বছর আগের। একজন রোগী মারা গিয়েছিল।"
এখন রহস্যটা শুধু চুরির মামলা নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে একটা পুরনো অপরাধের ছায়া।
অর্ণব আবার তানিয়ার ঘরে গেলেন। এবার কথোপকথনের ধরন বদলালেন। সরাসরি অভিযোগ না করে বন্ধুর মতো কথা শুরু করলেন।
"তানিয়া, তুমি রাতে ঘুমাওনি। আমি জানি। তোমার চোখ দেখলেই বোঝা যায়।"
মেয়েটি একটু কেঁপে উঠল।
"তুমি কি দেখেছ কে ফোনগুলো নিয়েছে?"
তানিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।
"রাত দুটোর দিকে আমি বাথরুমে যাচ্ছিলাম। দেখলাম মামার ঘরের দরজা খোলা। মামা ভেতরে নেই। একটু পরে দেখি মামা হলের দিক থেকে আসছে — হাতে কী যেন। ঠিক বুঝতে পারিনি।"
রাহুল — ডক্টর বসুর ছেলে। সে বলেছিল রাতে ওঠেনি, কিন্তু তানিয়া দেখেছে সে বাইরে গিয়েছিল।
অর্ণব এবার রাহুলকে ডাকলেন একা। তাঁর কণ্ঠস্বর এবার স্পষ্ট এবং সরাসরি।
"রাহুলবাবু, রাত দুটোয় আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?"
রাহুলের মুখ শক্ত হয়ে গেল। "কোথাও না।"
"তানিয়া আপনাকে দেখেছে।"
দীর্ঘ নীরবতা। তারপর রাহুল উঠে জানালার কাছে গেল।
"আমি জানতাম এটা একদিন বেরিয়ে আসবে। বাবার পেনড্রাইভটা আমিই নিয়েছিলাম।"
"কেন?"
"কারণ কেউ আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছিল। বলেছিল ওই রেকর্ড পুলিশকে দেবে যদি আমরা টাকা না দিই। তার সাথে যোগাযোগ হতো মোবাইলে। তাই—"
অর্ণব এগিয়ে এলেন।
"তাই আপনি সবার ফোন লুকিয়ে ফেলেছিলেন? যাতে ব্ল্যাকমেইলারের সাথে কেউ যোগাযোগ না করতে পারে?"
রাহুল মাথা নোয়াল। "হ্যাঁ। আমি ভয় পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম পরিবারকে রক্ষা করছি।"
— রাহুল নিজেই পাঁচটি ফোন লুকিয়েছে বাড়িরই একটি গোপন জায়গায়।
— চিরকুটটি ব্ল্যাকমেইলারের নির্দেশ, যা রাহুলের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
— পেনড্রাইভটি রাহুল নিজে সরিয়ে রেখেছে ব্ল্যাকমেইলারের হাত থেকে বাঁচাতে।
রাহুল নিজেই অর্ণবকে নিয়ে গেল বাগানের একটা কোণে। সেখানে একটা পুরনো পাথরের বেঞ্চের নিচে একটা ছোট ব্যাগ। ভেতরে পাঁচটি মোবাইল ফোন — সব বন্ধ অবস্থায়।
"আমি ভেবেছিলাম একদিনের জন্য সবার ফোন বন্ধ থাকলে ব্ল্যাকমেইলার বুঝবে আমরা তার বার্তা পড়িনি। একটু সময় পাব ভাবার।"
অর্ণব ফোনগুলো হাতে নিলেন। "এই এক দিনে আপনি কী ভাবলেন?"
রাহুল মাথা নিচু করল।
"ভাবলাম, পালিয়ে কোনো লাভ নেই। বাবার পুরনো ভুল তাঁর নিজেকেই স্বীকার করতে হবে। পুলিশে যাব বলে ঠিক করেছিলাম।"
অর্ণব স্টোররুম থেকে পাওয়া নতুন সিম কার্ডটি পরীক্ষার জন্য পাঠালেন। একই সঙ্গে চিরকুটের হাতের লেখার নমুনা সংগ্রহ করলেন পরিবারের সবার কাছ থেকে। এই মামলায় ব্ল্যাকমেইলার বাইরের কেউ — কিন্তু সে বাড়ির ভেতরের খবর কোথা থেকে পেল?
তিন ঘণ্টা পরে রিপোর্ট এলো। সিম কার্ডটি নিবন্ধিত হয়েছে একটি ভুয়া নামে, কিন্তু কেনা হয়েছে শহরের একটি মোবাইল শপ থেকে। দোকানের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেল একজন মাঝবয়সী পুরুষ — সিম কার্ডটি সংগ্রহ করে ছিল।
ডক্টর বসুর পুরনো সহকর্মী, ডক্টর পার্থ রায়। যিনি সেই রাতে ডক্টর বসুর সাথে ছিলেন, যেদিন রোগী মারা গিয়েছিল। এত বছর পরে কেউ সেই প্রমাণ ব্যবহার করে টাকা আদায় করতে চেয়েছিল।
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
শঙ্খজিৎ ভট্টাচার্য ২৬/০৩/২০২৬বেশ
-
ফয়জুল মহী ২৬/০৩/২০২৬Excellent
