www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

শিকারির জাল

আগরতলার শীতের সন্ধ্যা। বাতাসে হালকা কুয়াশা, রাস্তার আলো ঝাপসা হয়ে আসছে। গোয়েন্দা অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য তাঁর বাড়িতেই ছোট অফিসের কাঠের চেয়ারে বসে একটা পুরনো ডায়েরি উলটাচ্ছেন। চায়ের কাপ পাশে ঠান্ডা হয়ে গেছে — সেদিকে তাঁর কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।
অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্যকে আগরতলায় সবাই চেনে। পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই মানুষটার চুলে পাক ধরেছে, মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে দুটো তীক্ষ্ণ চোখ। অনিরুদ্ধ বাবু সবসময় একটা পুরনো খদ্দরের পাঞ্জাবি পরেন এবং কথা বলার সময় নিজের বাঁ কানের লতি টানতে থাকেন। কথার মাঝখানে হঠাৎ থেমে যান, শূন্যে তাকিয়ে থাকেন মিনিটখানেক, তারপর বলেন — "হুঁ। বুঝেছি।" কী বুঝেছেন, তা সহজে বলেন না।
কেউ ঐ সন্ধ্যায় দরজায় কড়া নাড়ল।
"আসুন।"
দরজা খুলে ঢুকলেন এক মধ্যবয়সী মহিলা। শাড়ি পরা, চোখ ফোলা, হাতে একটা ছোট ব্যাগ। পিছনে একজন পঞ্চাশ বছরের ভদ্রলোক — মাথায় টাক, মুখে উদ্বেগের ছাপ।
"বসুন।" অনিরুদ্ধ বললেন, চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে।
মহিলাটি বসলেন। নাম সুষমা দেববর্মা। পাশের ভদ্রলোক তাঁর স্বামী, রমেশ দেববর্মা। থাকেন রবীন্দ্র সরণী। রমেশবাবু সরকারি দপ্তরে কাজ করেন, সুষমাদেবী গৃহিণী।
"আমাদের মেয়ে পালিয়ে গেছে।" সুষমাদেবী বললেন, কণ্ঠ কাঁপছে।
অনিরুদ্ধ চশমা খুললেন। কান্না দেখলে তিনি অস্বস্তি বোধ করেন — এটা তাঁর বিশেষ দুর্বলতা। সেই অস্বস্তি ঢাকতে তিনি ডায়েরিটা খুলে কলম তুলে নিলেন।
"মেয়ের নাম?"
"প্রিয়াংকা। বয়স বাইশ। এম.এ পড়ছিল।"
"কখন থেকে নিখোঁজ?"
"তিনদিন হলো।"
"পুলিশে জানিয়েছেন?"
"জানিয়েছি।" রমেশবাবু বললেন। "কিন্তু পুলিশ বলছে, প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে স্বেচ্ছায় গেছে কিনা আগে বুঝতে হবে। তাই আপনার কাছে এলাম।"
অনিরুদ্ধ বাঁ কানের লতি টানলেন।
"মেয়ের ঘরে কিছু পেয়েছেন? চিঠি, ডায়েরি?"
সুষমাদেবী ব্যাগ থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করলেন। "এটা পেয়েছি। মেয়ের বালিশের নিচে।"
অনিরুদ্ধ কাগজটা নিলেন। বাংলায় লেখা, হাতের লেখা তরুণীর। "মা, আমি ভালো থাকবো। চিন্তা কোরো না। আমি যাকে ভালোবাসি, তার সাথে চলে গেছি। সে আমাকে অনেক ভালোবাসে। একদিন বুঝবে।"
"ছেলেটার কথা জানতেন?"
রমেশবাবু মাথা নাড়লেন। "কিছুই জানতাম না। প্রিয়াংকা কখনো বলেনি।"
"ফোন?"
"ফোন বন্ধ।"
"বন্ধুবান্ধব?"
"জিজ্ঞেস করেছি। কেউ জানে না।"
অনিরুদ্ধ আবার কানের লতি টানলেন। তারপর বললেন — "মেয়ের ঘরটা একবার দেখতে হবে। আর একটা কথা — মেয়ে কোন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করত?"
সুষমাদেবীর কপালে ভাঁজ পড়ল। "ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম। সব ছেলেমেয়েই করে এখন।"
"ল্যাপটপ আছে ঘরে?"
"আছে।"
"চলুন।"

দেববর্মা পরিবারের বাড়ি রবীন্দ্র সরণী। দোতলা পাকা বাড়ি, উঠোনে তুলসীতলা, দেওয়ালে মা লক্ষ্মীর ছবি। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে অনিরুদ্ধ লক্ষ্য করলেন — বাড়িটা সুসজ্জিত কিন্তু মানুষগুলো এই মুহূর্তে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছে।
প্রিয়াংকার ঘর ছোট কিন্তু গোছানো। দেওয়ালে সরস্বতীর ছবি, বইয়ের তাক ভরা, টেবিলে ল্যাপটপ।
অনিরুদ্ধ ঘরে ঢুকে প্রথমে কিছু বললেন না। শুধু দাঁড়িয়ে রইলেন মাঝখানে। চোখ ঘুরল বইয়ের তাকে, জানালার পর্দায়, টেবিলের কোণে রাখা একটা ছোট পারফিউমের শিশিতে। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে খাটের নিচে টর্চ জ্বাললেন।
"এটা কী?" বিড়বিড় করে বললেন নিজেই।
খাটের নিচ থেকে বের করলেন একটা ছেঁড়া খাম। ভিতরে কিছু নেই, কিন্তু ঠিকানার জায়গায় লেখা — "রাহুল সেন, ধর্মনগর"।
রমেশবাবু পিছনে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। "ধর্মনগর?"
"হুঁ।" অনিরুদ্ধ উঠলেন। "ল্যাপটপটা চালু করুন।"
ল্যাপটপ চালু হতে দেখা গেল পাসওয়ার্ড লক। অনিরুদ্ধ সুষমাদেবীর দিকে তাকালেন।
"প্রিয়াংকার জন্মতারিখ কী?"
"পনেরোই মার্চ, দুই হাজার দুই।"
অনিরুদ্ধ টাইপ করলেন — priyanka1503। ঢুকল না। তারপর — 15032002। ঢুকল।
"সহজ পাসওয়ার্ড।" মন্তব্য করলেন তিনি। "সহজ মানুষেরা এরকমই করে।"
ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা ছিল ব্রাউজারে। অনিরুদ্ধ মেসেজ বক্স খুললেন। স্ক্রোল করে উপরে উঠলেন।
রাহুল সেন। তিন মাস ধরে কথা হচ্ছে। প্রথমে সাধারণ কথাবার্তা — পড়াশোনা, গান, সিনেমা। তারপর ধীরে ধীরে অন্তরঙ্গ। রাহুল নিজেকে পরিচয় দিয়েছে ধর্মনগরের একটি বেসরকারি বিশ্ব বিদ্যালয়ের লেকচারার হিসেবে। বয়স বলেছে ছাব্বিশ। ছবি আছে প্রোফাইলে — হাসিখুশিতে ভরপুর এক সুন্দর তরুণ।
অনিরুদ্ধ রাহুলের প্রোফাইল খুললেন। চোখ সরু হলো।
"কী দেখছেন?" রমেশবাবু উৎসুক।
"চুপ করুন একটু।"
তিনি রাহুলের প্রোফাইল ছবিগুলো একটা একটা করে দেখলেন। তারপর তাঁর নিজের ফোনে ছবিটা স্ক্রিনশট নিলেন। মেসেজ বক্সে ফিরে গেলেন। শেষ কয়েকটা মেসেজ পড়লেন।
শেষ মেসেজটা ছিল চারদিন আগে, রাত দশটায়। রাহুল লিখেছে — "কাল সন্ধ্যায় আসো। বাস স্ট্যান্ডে থাকব। সব ঠিক হয়ে যাবে।" প্রিয়াংকার উত্তর — "ঠিক আছে। ভয় করছে একটু।" রাহুল — "ভয় কী? আমি তো আছি। তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো?" প্রিয়াংকা — "হ্যাঁ।"
অনিরুদ্ধ ল্যাপটপ বন্ধ করলেন। বাঁ কানের লতি টানলেন। তারপর হঠাৎ শূন্যে তাকিয়ে রইলেন মিনিট দুয়েক।
সুষমাদেবী অপেক্ষা করছেন।
অবশেষে অনিরুদ্ধ বললেন — "হুঁ। বুঝেছি।"
"কী বুঝেছেন?" রমেশবাবু প্রায় চিৎকার করলেন।
"মেয়ে বিপদে আছে।"

রাতে বাড়ি ফিরে অনিরুদ্ধ বসলেন তাঁর কম্পিউটারের সামনে। রাহুল সেনের প্রোফাইল ছবিটা গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলেন। ফলাফল দেখে তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা তিক্ত হাসি ফুটল।
ছবিটা একজন মুম্বাইয়ের অভিনেতার — একটি ওয়েব সিরিজে অভিনয় করেছেন, ইনস্টাগ্রামে তাঁর পঞ্চাশ হাজার ফলোয়ার। সেই ছবি চুরি করে তৈরি হয়েছে রাহুল সেনের ভুয়া প্রোফাইল।
অনিরুদ্ধ রাহুলের প্রোফাইলের বন্ধুতালিকা দেখলেন। মাত্র সাতজন বন্ধু, সবাই মেয়ে। অ্যাকাউন্ট তৈরি হয়েছে ছয় মাস আগে।
তিনি ফোন করলেন তাঁর পুরনো পরিচিত, ধর্মনগরের সাব-ইন্সপেক্টর বিশ্বজিৎ দাসকে।
"বিশ্বজিৎ, আমি অনিরুদ্ধ।"
"দাদা! কতদিন পরে ফোন করলেন। কী ব্যাপার?"
"একটা মেয়েকে খুঁজছি। আগরতলার। তোমার এলাকায় এসেছে সম্ভবত।" বিস্তারিত বললেন।
বিশ্বজিৎ একটু চুপ করে থাকল। "দাদা, ধর্মনগরে এরকম একটা গ্যাং আছে বলে আমরা সন্দেহ করছিলাম। ভুয়া পরিচয়ে মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে নিয়ে আসে। তারপর ব্ল্যাকমেইল।"
অনিরুদ্ধের চোয়াল শক্ত হলো। "কাল সকালে আসচ্ছি।"
ধর্মনগর আগরতলা থেকে প্রায় ১৭৪ কিলোমিটার। অনিরুদ্ধ সকালের ট্রেনে উঠে জানালার পাশে বসলেন । না, কারো সাথে কথা বললেন না। জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন — পাহাড়ি রাস্তা, চা বাগান, ছোট ছোট গ্রাম।
এই রাস্তায় অনিরুদ্ধ আগেও এসেছেন। ত্রিপুরার উত্তর জেলা তাঁর অপরিচিত নয়। কিন্তু প্রতিবারই এই সবুজ পাহাড় দেখে তিনি একটু আপ্লুত হন — সেটা তিনি কাউকে বলেন না।
সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ ধর্মনগর পৌঁছলেন। বিশ্বজিৎ থানায় অপেক্ষা করছিল।
"দাদা, আমরা একটু আগে একটা সূত্র পেলাম। কলেজ রোডের কাছে একটা ভাড়া বাড়িতে তিনচারজন ছেলে থাকে, সন্দেহজনক। একজনের নাম রাইয়ান মিয়া। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। আগে একটা প্রতারণার মামলায় নাম ছিল।"
"রাহুল সেন নামে কেউ?"
"না। তবে রাইয়ান মিয়াএকাধিক নামে পরিচিত।"
"চলো।"
কলেজ রোডের ভাড়াবাড়ি একটা সরু গলির ভেতরে। পুরনো দোতলা বাড়ি, দেওয়ালে শ্যাওলা। বিশ্বজিৎ দুজন কনস্টেবল নিয়ে এল।
অনিরুদ্ধ বললেন — "আমি একা যাব আগে।"
বিশ্বজিৎ আপত্তি করতে গেল, অনিরুদ্ধ হাত তুললেন। "বিশ্বাস করো।"
তিনি একা গলিতে ঢুকলেন। দরজায় টোকা দিলেন।
একটু পরে দরজা খুলল। বছর ত্রিশের একটি ছেলে — লম্বা, গায়ে টি-শার্ট, চোখে সন্দেহ।
"কে?"
"আমি প্রিয়াংকার বাবার বন্ধু। মেয়েটা এখানে এসেছে বলে শুনলাম।"
ছেলেটা একটু ইতস্তত করল। "কোন প্রিয়াংকা?"
অনিরুদ্ধ কানের লতি টানলেন। তারপর শান্তভাবে বললেন — "রাইয়ানবাবু, আপনি ফেসবুকে রাহুল সেন নামে একটি অ্যাকাউন্ট চালান। প্রোফাইল ছবি একজন মুম্বাইয়ের অভিনেতার চুরি করা। এই অ্যাকাউন্ট দিয়ে আপনি গত ছয় মাসে অন্তত সাতজন মেয়ের সাথে প্রতারণা করেছেন। প্রিয়াংকা দেববর্মা আপনার সর্বশেষ শিকার। সে কোথায়?"
ছেলেটার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
"আমি জানি না কোনো প্রি—"
"আমার পিছনে পুলিশ আছে। বেরিয়ে দেখো।"
একটা মুহূর্ত। তারপর ছেলেটা পিছন ফিরে চিৎকার করল — "ভাগ, ভাগ!"
অনিরুদ্ধ পিছন ফিরে হাত নাড়লেন। বিশ্বজিৎ এবং কনস্টেবলরা ছুটে এলেন।

বাড়ির ভেতরে তিনটি কোঠা। একটিতে প্রিয়াংকাকে পাওয়া গেল — চোখ লাল, কাঁদছে, কিন্তু শারীরিকভাবে অক্ষত। দরজায় বাইরে থেকে লাগানো ছিল।
রাইয়ান মিয়া পালাতে গিয়ে পিছনের দরজায় বিশ্বজিৎ বাবুর কনস্টেবলের মুখোমুখি হলো। গ্রেফতার।
প্রিয়াংকা সুষমাদেবীর মতোই দেখতে — একই গড়ন, একই চোখ। ঘর থেকে বেরিয়ে এসে অচেনা মানুষটাকে দেখে সে থমকাল।
"আমি অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য। তোমার বাবা-মা পাঠিয়েছেন।"
প্রিয়াংকার চোখ ভরে জল এল।
"আমি বোকা হয়ে গিয়েছিলাম আঙ্কেল"
"না।" অনিরুদ্ধ সংক্ষেপে বললেন। "তুমি ভালোবাসতে চেয়েছিলে। এটা বোকামি নয়। যে তোমাকে প্রতারণা করেছে — সে অপরাধী।"
থানায় জিজ্ঞাসাবাদে রাইয়ান মিয়া স্বীকার করল — সে এবং তার দুই সঙ্গী মিলে গত দুই বছর ধরে ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করে মেয়েদের ফাঁদে ফেলছিল। একাকী মেয়ে, সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়, মানসিকভাবে একটু একাকীত্বে ভোগা — এরাই ছিল তার লক্ষ্য। প্রেমের অভিনয় করে ঘরের বাইরে আনত, তারপর আপত্তিজনক ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল করত। প্রিয়াংকা সময়মতো উদ্ধার পেয়েছে — তার আগের পর্যায়গুলো আসেনি তখনো।
অনিরুদ্ধ বিশ্বজিৎকে বললেন — "রাইয়ান মিয়ার ফোনের কল লগ এবং ফেসবুক মেসেজ সব সংরক্ষণ করো। অন্য মেয়েদেরও খোঁজো।"
"দাদা, আপনি কীভাবে বুঝলেন এত তাড়াতাড়ি?"
অনিরুদ্ধ একটু থামলেন। বাঁ কানের লতি টানলেন।
"তিনটে জিনিস দেখেছিলাম। এক — প্রোফাইল ছবি। যে মানুষ বলছে সে ধর্মনগরে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়, তার ছবিতে পটভূমি একটা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের — ত্রিপুরার মফস্বল শহরে এরকম পরিবেশ বিরল। দুই — মেসেজের ধরন। রাইয়ান মিয়া একবারও বলেনি সে প্রিয়াংকার বাড়িতে আসতে চায়। সে সবসময় বলেছে প্রিয়াংকাকে আসতে। যে মানুষ সত্যিই ভালোবাসে, সে সাধারণত মেয়ের বাড়িতে পরিচয় করিয়ে দিতে চায়। তিন — অ্যাকাউন্টে বন্ধু মাত্র সাতজন, সবাই মেয়ে। এটা প্রেমিকের প্রোফাইল নয়, শিকারির জাল।"
বিশ্বজিৎ মাথা নাড়ল।
"আর একটা কথা।" অনিরুদ্ধ বললেন। "রাইয়ান মিয়ার ফোনে ফেসবুক লগইন ছিল। রাহুল সেনের অ্যাকাউন্ট থেকে শেষ মেসেজ গেছে রাত দশটায়। কিন্তু প্রিয়াংকার মেসেজ বক্সে দেখলাম রাহুলের আইপি লোকেশন ধর্মনগরের — আগরতলার নয়। মানে বদমাশটা ধর্মনগরে বসেই অ্যাকাউন্ট চালাত।"

সন্ধ্যায় ফেরার ট্রেনে অনিরুদ্ধ পাশের সিটে প্রিয়াংকাকে বসিয়েছেন। মেয়েটা চুপ করে বসে আছে। জানালার বাইরে অন্ধকার পাহাড়।
অনিরুদ্ধ কিছু বললেন না। তাঁর পকেট থেকে একটা ছোট চকোলেটের প্যাকেট বের করলেন — ট্রেনে চড়ার আগে বিশ্বজিৎ দিয়েছিল। তিনি সেটা প্রিয়াংকার হাতে দিলেন।
মেয়েটা একটু অবাক হলো।
"খাও।" সংক্ষেপে বললেন অনিরুদ্ধ।
একটু পরে প্রিয়াংকা বলল — "আমি কি সত্যিই এত বোকা?"
"না।" অনিরুদ্ধ জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন। "তুমি একাকী ছিলে। আর একাকী মানুষ ভালোবাসা খোঁজে — এটাই স্বাভাবিক। তোমার দোষ এখানে নেই।"
"কিন্তু মা-বাবা কী বলবে?"
"কিছুই বলবে না। শুধু কাঁদবে।" একটু থেমে — "সেটা তোমার জন্যই।"
প্রিয়াংকা চুপ করে গেল।

প্রিয়াংকা ফিরে আসার পর সুষমাদেবীর বাড়িতে এক অন্য ধরনের পরিবেশ তৈরি হলো। অনিরুদ্ধ বাবু আর তাদের বাড়ী ডুকলেন না। তিনি দরজার বাইরে থেকে মা-মেয়ের কান্না শুনলেন। রমেশবাবু দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন — চোখ লাল, কিন্তু মুখে কোনো কথা নেই।
অনিরুদ্ধ বললেন — "রমেশবাবু, মেয়েকে সময় দিন। আর এই ঘটনাটা গোপন রাখার চেষ্টা করবেন না।"
রমেশবাবু চমকালেন। "মানে?"
"মানে হলো — লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। একটা সংগঠিত প্রতারক চক্র আপনার মেয়েকে ফাঁদে ফেলেছিল। এটা আপনার মেয়ের দোষ নয়। যদি গোপন রাখার চেষ্টা করেন, তাহলে অন্য মেয়েরা সতর্ক হতে পারবে না।" একটু থামলেন। "প্রতিটা পরিবারে আজ এক একটা প্রিয়াংকা আছে — সোশ্যাল মিডিয়ায় একা বসে ভালোবাসা খুঁজছে। রাইয়ান মিয়াদের মতো মানুষ সেটা জানে।"
রমেশবাবু কিছু বললেন না।
অনিরুদ্ধ ঘুরে হাঁটতে শুরু করলেন।
"আপনার ?" রমেশবাবু পিছন থেকে ডাকলেন।
"পরে হবে, কাল অফিসে আসুন।" হাঁটতে হাঁটতে বললেন অনিরুদ্ধ।

নিজের বাড়ি ফিরে অনিরুদ্ধ বাবু ডায়েরিতে লিখলেন —
"সোশ্যাল মিডিয়া একটি আয়না। এই আয়নায় মানুষ যা দেখাতে চায়, তাই দেখায়। প্রেমিক সাজা সহজ — একটি সুন্দর ছবি, কিছু মিষ্টি কথা, আর ধৈর্য। প্রতারকের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সময় — সে সময় দেয়, বিশ্বাস তৈরি করে, তারপর আঘাত করে।
কিন্তু প্রতারকেরও ভুল হয়। ছবি যাচাই করে না, কথায় ফাঁক থাকে, জাল সব সময় নিখুঁত বুনতে হয় না।
আমাদের মেয়েরা বোকা নয়। তারা শুধু ভালোবাসতে চায়। সেটা তাদের দুর্বলতা নয় — সেটা তাদের মনুষ্যত্ব।
দোষ প্রতারকের। সতর্কতা আমাদের।"
ডায়েরি বন্ধ করলেন। চায়ের কাপ তুললেন। এবারও ঠান্ডা।
বাঁ কানের লতি টানলেন। জানালার বাইরে আগরতলা শহরে রাত গভীর হচ্ছে ।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৭৮ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৪/০৩/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast