www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

একটা হাসিখুশির দিন

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। আগরতলার উপকণ্ঠে, বিশালগড়ের কাছাকাছি একটি ছোট্ট গ্রাম — মাণিকপুর। গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু খালটার দুই পাড়ে সারি সারি সুপারি গাছ। গাছের পাতায় ভোরের শিশির এখনও জমে আছে। দূরে কোথাও একটা ডাহুক ডাকছে। মাটির ঘরগুলোর চালে কুয়াশার আস্তরণ।
এই ভোরেই সুবল দেবনাথের ঘরে আলো জ্বলে উঠল।
সুবল দেবনাথের বয়স বাষট্টি। সারাজীবন ধান চাষ করে কাটিয়েছেন। শরীরে বয়সের ছাপ পড়েছে, কিন্তু চোখদুটো এখনও তরতাজা। তাঁর স্ত্রী সরস্বতী — সবাই ডাকে সরু দেবী — ভোর না হতেই উঠে পড়েছেন। আজকে বিশেষ দিন। ছোট ছেলে নীলাঞ্জন অনেক দিন পর ঢাকা থেকে আসছে — না, ঢাকা নয়, কলকাতা থেকে। কলেজের পড়া শেষ করে সে এখন একটা আইটি কোম্পানিতে চাকরি করে। তিন বছর পর আজ বাড়ি ফিরছে।
"সুবল, উঠবে কখন? ছেলে আসছে আজ," সরু দেবী ডাকলেন।
"উঠেছি গো, উঠেছি।" সুবল বিছানায় উঠে বসলেন। বাইরে পাখি ডাকছে। আজ মনটা অন্যরকম হালকা লাগছে।
রান্নাঘরে সরু দেবী ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। নীলাঞ্জনের পছন্দের খাবার — মুইয়া মাছের ঝোল, আলু দিয়ে মুরগির মাংস, আর বাঁশ কোড়লের তরকারি। ত্রিপুরার ঘরে ঘরে এই বাঁশ কোড়লের তরকারি অতুলনীয়। প্রতিদিন সকালে সরু দেবী উঠোনে তুলসীতলায় প্রণাম করেন, তারপর রান্নায় বসেন। আজ তুলসীতলায় একটু বেশি সময় নিলেন। মনে মনে বললেন, "ঠাকুর, ছেলেটাকে ভালোয় ভালোয় পাঠাও।"

পাশের বাড়ির গায়ত্রী রানী ত্রিপুরা ভোরবেলাই উঁকি দিলেন।
"সরু দি, নীলু আসছে আজ?"
"হ্যাঁ গো, বিকেলের বাসে।"
গায়ত্রী রানী হাসলেন। তিনি ত্রিপুরি সম্প্রদায়ের মানুষ, কিন্তু দুই পরিবারের মধ্যে বন্ধন বহু বছরের। দুর্গাপূজায় সুবলদের বাড়িতে যান, বিজু উৎসবে সুবলরা যান গায়ত্রীদের বাড়ি। ধর্ম আলাদা, কিন্তু মন এক।
"আমি ওর জন্য একটু চাখাই বানিয়ে দেব নাকি?" গায়ত্রী জিজ্ঞেস করলেন।
সরু দেবী হাসলেন। "দাও দাও। নীলু চাখাই খুব ভালোবাসে।"

ততক্ষণে বাড়িতে আরও শোরগোল শুরু হয়ে গেছে।
সুবলের বড় ছেলে পল্টু — আসল নাম পলাশ — সকালে গরু নিয়ে মাঠে যাওয়ার আগে বললেন, "বাবা, আজ সন্ধ্যায় আমি একটু তাড়াতাড়ি ফিরব। নীলু আসবে বলে।"
"আসবে তো। যাও, মাঠের কাজ সেরে এসো।"
পল্টুর মেয়ে পাপিয়া — বয়স আট — সকাল থেকেই চাচ্চু চাচ্চু করে ঘুরছে। নীলাঞ্জন মানে তার চাচ্চু। কলকাতা থেকে কী আনবে সে? পাপিয়া বারবার মাকে জিজ্ঞেস করছে।
"মা, চাচ্চু কি পুতুল আনবে?"
"আনবে, আনবে। তুই আগে মুখ ধু গিয়ে।"
পাপিয়ার মা শান্তি — পল্টুর বউ — রান্নায় সাহায্য করতে রান্নাঘরে এলেন। দুই মা-বউ মিলে রান্না করতে লাগলেন। ঘরে ধনেপাতা আর রসুনের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।

মাণিকপুরের মন্দিরটি গ্রামের একদম মাথায়। ছোট মন্দির, কিন্তু পুরনো। সেখানে মা কালীর মূর্তি। গ্রামের মানুষ বলেন এই মন্দির একশো বছরেরও বেশি পুরনো। প্রতিদিন সকালে পুরোহিত রামেশ্বর চক্রবর্তী পূজা দেন। রামেশ্বর ঠাকুরের বয়স সত্তরের কাছাকাছি। সরু দেবীর অনেক দিনের পরিচয়।
সেদিন সকালে পূজা দিতে গিয়ে সরু দেবী রামেশ্বর ঠাকুরকে বললেন, "ঠাকুর মশাই, আমার নীলু আজ আসছে। একটু বিশেষ পূজা দেবেন?"
রামেশ্বর চক্রবর্তী হাসলেন। "দেব দেব। মা কালী সব জানেন। ছেলে ভালো থাকুক।"
পূজার ঘণ্টা বাজল। ধূপের ধোঁয়া ভোরের বাতাসে মিশে গেল। মন্দিরের সামনে ছোট্ট পুকুর, পুকুরে পদ্মফুল ফুটে আছে। সরু দেবী প্রণাম করে উঠে দাঁড়িয়ে দেখলেন — আকাশে সূর্য উঠে এসেছে। সোনালি আলো পুকুরের জলে পড়ে ঝলমল করছে।
মন ভরে গেল তাঁর।

বেলা বাড়তে লাগল।
সুবল দেবনাথ উঠোনে চেয়ার নিয়ে বসলেন। পাশে হুঁকো। তবে হুঁকো এখন আর তেমন টানেন না — ডাক্তার মানা করেছেন। শুধু হাতে নিয়ে বসে থাকেন, অভ্যেস ছাড়তে পারেননি।
পাড়ার বন্ধু হরিপদ দাস এলেন। হরিপদ রিটায়ার্ড স্কুলমাস্টার।
"সুবল দা, শুনলাম নীলু আসছে।"
"হ্যাঁ, আজ আসছে।"
"কতদিন পর!"
"তিন বছর।"
দুজনে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। গ্রামের রাস্তায় একটা রিকশা যাচ্ছে। দূরে কোথাও কেউ গান গাইছে।
"ছেলেটা ভালো করেছে পড়াশোনায়," হরিপদ বললেন।
"হ্যাঁ। কিন্তু মন পড়ে থাকে গ্রামে। বলে, বাবা, একদিন ফিরে আসব। দেখি।"
হরিপদ হাসলেন। "এই গ্রাম ছেড়ে যায় কে? মনটা থেকেই যায়।"
সত্যি কথা। মাণিকপুর ছোট গ্রাম, কিন্তু এই মাটির একটা টান আছে। এখানে শৈশব কেটেছে, এখানে মা-বাবা আছেন, এখানে পাড়ার পুকুরে সাঁতার শেখা। কলকাতার ফ্ল্যাটে বসে নীলাঞ্জন নিশ্চয়ই মাঝে মাঝে এই গ্রামের কথা মনে করে।

দুপুরবেলায় একটু বিশ্রাম নিলেন সুবল দেবনাথ। স্বপ্নে দেখলেন তাঁর বাবাকে। বাবা বলছেন, "সুবল, ছেলেকে যত্ন করিস।" ঘুম ভেঙে গেল। চোখে হালকা জল। বাবা মারা গেছেন পনেরো বছর আগে। কিন্তু স্বপ্নে আসেন।
ঘরের কোণে বাবার একটা ছবি টাঙানো। সাদাকালো ছবি। পিতলের ফ্রেমে। প্রতিদিন একটা ধূপকাঠি জ্বালান। আজও জ্বাললেন।
"বাবা, নীলু আসছে আজ। তুমি আশীর্বাদ করো।"

বিকেল চারটায় ফোন এল।
"বাবা, আমি বাসে উঠেছি। সন্ধ্যায় পৌঁছে যাব।"
নীলাঞ্জনের গলা শুনে সুবলের বুকটা ভরে গেল।
"আয় রে, মা রান্না করেছে অনেক কিছু।"
"মুইয়া মাছের ঝোল হয়েছে?"
সুবল হাসলেন। "তোর মা কি ভোলে? হয়েছে।"
ফোন রাখলেন। সরু দেবী জিজ্ঞেস করলেন, "কখন পৌঁছাবে?"
"সন্ধ্যায়।"
পাপিয়া লাফ দিয়ে উঠল। "চাচ্চু আসছে, চাচ্চু আসছে!"

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল ধীরে ধীরে।
সুপারি গাছের মাথায় আকাশ লাল হয়ে গেছে। পাখিরা ঘরে ফিরছে। গ্রামের ঘরে ঘরে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে উঠছে। তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বাললেন সরু দেবী। শাঁখ বাজালেন। মনে মনে প্রার্থনা করলেন।
সুবল উঠোনে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছেন। পল্টু মাঠ থেকে ফিরে এসেছেন। শান্তি ঘর সাজিয়েছেন। পাপিয়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
দূরে একটা মোটরসাইকেলের আলো দেখা গেল। তারপর কাছে এল। থামল।
একটা যুবক নামল। কাঁধে ব্যাগ। হাসি মুখে।
"বাবা!"
সুবল এগিয়ে গেলেন। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কিছু বললেন না। বলতে পারলেন না। গলা বুজে গেল।
নীলাঞ্জন বলল, "বাবা, ভালো আছ?"
"এখন ভালো।"
সরু দেবী ছুটে এলেন। ছেলের মাথায় হাত রাখলেন। চোখে জল।
"মা, কাঁদছ কেন?"
"আনন্দে কাঁদছি রে।"
পাপিয়া ছুটে এল। "চাচ্চু! কী এনেছ আমার জন্য?"
নীলাঞ্জন হাসল। ব্যাগ থেকে একটা বাক্স বের করল। "এই দেখ।" ভেতরে একটা সুন্দর পুতুল। পাপিয়ার চোখ চকচক করে উঠল।

রাতের খাবার হল একসাথে।
থালায় ধোঁয়া ওঠা ভাত, মুইয়া মাছের ঝোল, মুরগির মাংস, বাঁশ কোড়লের তরকারি। গায়ত্রী রানীর পাঠানো চাখাইও আছে।
নীলাঞ্জন প্রথম লোকমা মুখে দিয়ে বলল, "মা, তোমার রান্নার সাথে কোথাও কিছু হয় না।"
সরু দেবী হাসলেন। "তুই কলকাতায় কী খাস?"
"রেস্তোরাঁয়। অফিসের ক্যান্টিনে। কিন্তু এই স্বাদ নেই কোথাও।"
পল্টু বলল, "আর কতদিন থাকবি?"
"দশ দিন ছুটি নিয়েছি।"
সুবল বললেন, "দশ দিন অনেক কম।"
"পরেরবার আরও বেশি দিন থাকব বাবা।"
খাবার টেবিলে কথার ফুলঝুরি। নীলাঞ্জন বলল কলকাতার গল্প, অফিসের কথা, নতুন প্রজেক্টের কথা। সুবল বললেন এই বছর ধানের ফলন ভালো হয়েছে। পল্টু বলল গ্রামে নতুন রাস্তা হচ্ছে। শান্তি বলল পাপিয়া এবার পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে। পাপিয়া লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।
হাসি, গল্প, আলো। ঘরটা ভরে গেল।

রাত একটু গভীর হলে সুবল আর নীলাঞ্জন উঠোনে বসলেন।
আকাশে তারা ভরা। ত্রিপুরার আকাশে মেঘ নেই আজ। চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় সুপারি গাছের ছায়া মাটিতে পড়েছে।
বাবা-ছেলে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।
তারপর নীলাঞ্জন বলল, "বাবা, তুমি একটু বুড়ো হয়ে গেছ।"
সুবল হাসলেন। "বুড়ো তো হবই।"
"আমার ইচ্ছে করে তোমাদের কাছে থাকতে।"
সুবল ছেলের দিকে তাকালেন। "তোর ক্যারিয়ার আছে। তুই এগিয়ে যা। আমরা আছি এখানে।"
"কিন্তু বাবা—"
"না রে। এই গ্রামে থাকলে তুই কী করবি? ধান চাষ? সেটা তোর কাজ না। তুই পড়াশোনা করেছিস, বড় হচ্ছিস। যা। শুধু মনে রাখিস — এই মাটির কথা।"
নীলাঞ্জনের চোখে জল এল। বাবার হাত ধরল।
সুবল বললেন, "কাঁদছিস কেন?"
"কিছু না।"
"বড়রা কাঁদে না।" সুবল নিজেই একটু হাসলেন। "তবে কাঁদলে দোষ নেই। আমিও কাঁদি মাঝে মাঝে। তোর দাদুর কথা মনে হলে।"
দুজনে চুপ করে রইলেন। খালের কাছে ব্যাঙ ডাকছে। রাতপাখি ডাকছে।
সুবল বললেন, "জানিস, আমার বাবা বলতেন — জীবনে সব কিছু পাবি না। কিন্তু যা পেয়েছিস তাই নিয়ে হাসতে শেখ। হাসতে পারলেই জীবন সুন্দর।"
নীলাঞ্জন মাথা নাড়ল।

পরদিন সকাল।
নীলাঞ্জন ঘুম থেকে উঠল ভোরে — যা সে কলকাতায় কখনও পারে না। ঘুমের ঘোরে শুনছিল পাখির ডাক, দূরের মন্দিরের ঘণ্টা। উঠে দেখল মা তুলসীতলায় প্রণাম করছেন। বাবা উঠোনে বসে আছেন।
সে বাইরে এল।
ভোরের বাতাস। ঠান্ডা নয়, তবে শীতল। গায়ে একটা আরামের পরশ। সুপারি গাছের পাতায় শিশির। আকাশে হালকা গোলাপি আভা।
নীলাঞ্জন দাঁড়িয়ে রইল। মন ভরে শ্বাস নিল।
এই হাওয়া কলকাতায় নেই। এই নিস্তব্ধতা নেই। এই ভোর নেই।
সুবল বললেন, "কী দেখছিস?"
"এই সব।"
"এই সব কোথাও যাবে না। তুই যখন আসবি, এই ভোর থাকবে।"
নীলাঞ্জন হাসল। "বাবা, তুমি কবিতা লিখতে শুরু করলে নাকি?"
সুবল হাহা করে হাসলেন। "যা বেয়াদব ছেলে।"

সেদিন দুপুরে হরিপদ দাস এলেন। সাথে তাঁর স্ত্রী কমলা। রামেশ্বর চক্রবর্তী এলেন। গায়ত্রী রানী এলেন তাঁর স্বামীকে নিয়ে। আরও দুয়েকজন পাড়াপ্রতিবেশী।
ঘর ভরে গেল মানুষে।
সরু দেবী চা করলেন, মুড়ি ভাজলেন। বাইরে উঠোনে মাদুর পাতা হল। সবাই বসলেন।
নীলাঞ্জন সবার সাথে কথা বলল। রামেশ্বর ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন, "কলকাতায় ঠাকুরের পূজা করিস?"
নীলাঞ্জন একটু থমকাল। তারপর সৎভাবে বলল, "ঠাকুর মশাই, নিয়ম করে না। তবে মনে মনে করি।"
রামেশ্বর হাসলেন। "মনে মনে যে প্রার্থনা, সেটাই সত্যিকারের।"
হরিপদ বললেন, "নীলু, কলকাতায় কি ত্রিপুরার মানুষ বেশি আছে?"
"আছেন। অনেক ত্রিপুরির আলাদা পাড়া আছে। আমার কিছু বন্ধুও আছে ত্রিপুরার।"
গায়ত্রী রানী বললেন, "মনে পড়ে আমাদের?"
"মনে পড়ে কাকিমা। বিজু হলে মনে পড়ে তোমাদের।"
গায়ত্রী হাসলেন। "পরের বিজুতে আসিস। বাঁশের মাংস রেঁধে দেব।"
উঠোনে হাসির রোল পড়ে গেল।

বিকেলে নীলাঞ্জন একা একটু হাঁটতে বের হল।
গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সে ছোটবেলার স্মৃতির মধ্যে ডুবে গেল। এই গাছটার নিচে বন্ধুদের সাথে মার্বেল খেলত। ওই পুকুরে সাঁতার দিত। ওই মাঠে ক্রিকেট। এই মন্দিরে পূজার সময় মায়ের হাত ধরে দাঁড়াত।
জীবন এগিয়ে গেছে। কিন্তু এই স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে।
খালের পারে এসে বসল সে। জল বহে যাচ্ছে। স্থির, শান্ত।
ফোন বের করল। একটা ছবি তুলল — খালের জল, সুপারি গাছ, আকাশ। তারপর রাখল ফোন।
মনে পড়ল বাবার কথা। "যা পেয়েছিস তাই নিয়ে হাসতে শেখ।"
নীলাঞ্জন হাসল। একা একা।
হ্যাঁ, সে অনেক কিছু পেয়েছে। এই বাবা-মা, এই গ্রাম, এই মানুষগুলো। কলকাতায় চাকরি, সুযোগ। দুই জগতের মাঝে সে — কিন্তু দুই জগতেই তার জায়গা আছে।

রাতে খাওয়ার পর সবাই একসাথে বসল।
পাপিয়া তার নতুন পুতুলকে কোলে নিয়ে বসে আছে। তার মুখে তৃপ্তির হাসি। শান্তি বলল, "নীলু ভাই, কলকাতায় বিয়ের কথা ভাবছ?"
নীলাঞ্জন লজ্জা পেল। "এখনই না।"
পল্টু বলল, "মা কিন্তু পাত্রী দেখছেন।"
সরু দেবী বললেন, "আমি কিছু বলিনি।"
"মা, তুমি পাড়ার মাসিকে বলেছিলে।"
"সেটা অন্য কথা।"
সবাই হাসতে লাগল। নীলাঞ্জনও হাসল।
সুবল বললেন, "ছেড়ে দাও। নিজে বুঝবে সময় হলে।"
রাতটা এগিয়ে গেল গল্পে, হাসিতে, স্মৃতিতে।
মাঝরাতে যখন ঘুমোতে যাওয়ার পালা, নীলাঞ্জন তার পুরনো ঘরে শুয়ে পড়ল। সেই একই বিছানা। একই বালিশ। জানালার পাশে সেই একই বেলফুল গাছ — গন্ধ আসছে।
সে ভাবল — তিন বছরে কত কিছু বদলেছে। কিন্তু এই ঘর বদলায়নি। এই গন্ধ বদলায়নি। এই নিস্তব্ধ রাত বদলায়নি।
একটু পরে ঘুম এল। শান্তির ঘুম। এই ঘুম কলকাতায় আসে না।

পরদিন ভোরে উঠে দেখল — বাবা উঠোনে বসে আছেন। একা। চারদিক ভোরের আলোয় মাখা।
নীলাঞ্জন বাইরে এল। পাশে বসল।
দুজনে কিছু বলল না। শুধু পাশাপাশি বসে রইল।
দূরে পাখি ডাকছে। খালে জল বইছে। সুপারি গাছে বাতাস লাগছে।
সুবল দেবনাথ ছেলের দিকে তাকালেন। দেখলেন — ছেলে বড় হয়ে গেছে। তবু এই ভোরে, এই উঠোনে, পাশে বসে আছে। ঠিক যেন ছোটবেলার মতো।
মনে মনে বললেন, "ভগবান, এই একটা দিনের জন্য সারাজীবন কৃতজ্ঞ।"
বাইরে আলো বাড়ছে।
মাণিকপুর গ্রাম জেগে উঠছে।
আর সুবল দেবনাথের ঘরে — একটা হাসিখুশির দিন শুরু হল।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৮৬ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২২/০৩/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast