ঘণ্টার শব্দ
ত্রিপুরার গোমতী জেলার উদয়পুর শহর থেকে কিছুটা দূরে, পাহাড়ের কোলে একটি ছোট গ্রাম আছে — নাম তার মাতৃপুর। সেখানে সবুজ পাহাড়ের গা বেয়ে কুয়াশা নেমে আসে ভোরবেলা, রাত্রির আঁধারে জোনাকি জ্বলে নদীর ধারে, আর মন্দিরের ঘণ্টার শব্দ দূর পর্যন্ত ভেসে যায় বাতাসে। এই গ্রামেই বাস করতেন বিজয়কান্ত দেবনাথ — বয়স পঞ্চান্ন, পেশায় স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, আর মনে এক গভীর, অনুচ্চারিত একাকীত্বের ভার।
বিজয়কান্তের স্ত্রী সুমিত্রা মারা গেছেন আজ তিন বছর হল। একমাত্র ছেলে দীপঙ্কর পড়াশোনা শেষ করে চলে গেছে আগরতলায়, সেখানে চাকরি-সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে ফোন আসে, দুর্গাপূজায় একবার আসে, তারপর আবার নীরবতা। বিজয়কান্ত প্রতিদিন সকালে উঠে কালীমাতার মন্দিরে যান, ফুল তোলেন বাগান থেকে, পূজা দেন — কিন্তু ঘরে ফিরে আসলে সেই একই নিঃশব্দতা তাঁকে ঘিরে ধরে।
গ্রামের লোকেরা তাঁকে ভালোবাসে, সম্মান করে। কিন্তু বিজয়কান্ত জানেন, সম্মান আর সান্নিধ্য এক জিনিস নয়। রাত্রে যখন বারান্দায় বসে আকাশ দেখেন, চা হাতে, তখন মনে হয় — পৃথিবীর সবচেয়ে জনাকীর্ণ জায়গায় দাঁড়িয়েও মানুষ কতটা একা থাকতে পারে।
সেই বছর শরতের শুরুতে একটা ঘটনা ঘটল। বিজয়কান্ত সকালে মন্দিরে যাচ্ছিলেন, পথে দেখলেন একটি বাচ্চা ছেলে — বছর দশেক বয়স হবে — রাস্তার পাশে বসে কাঁদছে। পরনে ময়লা জামা, পায়ে স্যান্ডেল নেই, চোখদুটো লাল।
"কী হয়েছে বাবা?" বিজয়কান্ত থামলেন।
ছেলেটি মুখ তুলল না। কাঁদতে কাঁদতে বলল, "মা নেই। আমার মা নেই।"
বিজয়কান্তের বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি পাশে বসলেন, মাথায় হাত রাখলেন। ছেলেটির নাম রঘু — পুরো নাম রঘুনাথ সাহা। মা মারা গেছেন এক মাস আগে, বাবা দিনমজুর, মদ খান, ঘরে ফেরেন না। দাদু-দিদিমা আছেন, কিন্তু বুড়ো মানুষ, অসুস্থ। রঘু প্রতিদিন একা একা ঘুরে বেড়ায়, স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।
বিজয়কান্ত সেদিন রঘুকে বাড়ি নিয়ে গেলেন। খাওয়ালেন, গল্প বললেন। রঘু চলে যাওয়ার আগে একবার ফিরে তাকাল — সেই চোখে এমন একটা কৃতজ্ঞতা ছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
একাকীত্ব শুধু নিজের কষ্ট নয় — এটি সেই মানুষকে খোঁজার সুযোগ, যে হয়তো আপনার চেয়েও বেশি একা।
সেদিন থেকে রঘু প্রতিদিন আসতে লাগল বিজয়কান্তের বাড়িতে। বিজয়কান্ত নিজেও বুঝতে পারলেন না কখন এই ছেলেটি তাঁর দিনের একটা অংশ হয়ে গেল। সকালে মন্দিরে যাওয়ার সময় রঘু পাশে থাকে, বিকেলে বারান্দায় বসে পড়া শেখায় বিজয়কান্ত, আর রঘু জিজ্ঞেস করে অদ্ভুত সব প্রশ্ন — "মাস্টারমশাই, আকাশের রং নীল কেন? মাস্টারমশাই, মরে গেলে মানুষ কোথায় যায়?"
বিজয়কান্ত উত্তর দেন, কখনো জানেন না বলেন, কখনো হাসেন। ধীরে ধীরে ঘরের নিঃশব্দতাটা আর অসহ্য লাগে না।
কিন্তু সত্যিকারের পরীক্ষা এল অন্যভাবে। একদিন রঘুর বাবা — হরিপদ সাহা — বিজয়কান্তের দরজায় এসে দাঁড়াল। চোখ লাল, কণ্ঠে রাগ। বলল, "আমার ছেলেকে আপনি কী শেখাচ্ছেন? ওকে কেন প্রতিদিন এখানে আসতে দেন?"
বিজয়কান্ত শান্ত থাকলেন। বললেন, "ছেলেটা পড়া শিখছে। খাওয়াদাওয়া করছে। কোনো ক্ষতি তো হচ্ছে না।"
হরিপদ কিছু না বলে চলে গেল। কিন্তু তার পরদিন থেকে রঘু আর এলো না।
তিনদিন কেটে গেল। বিজয়কান্ত বুঝতে পারলেন সেই পুরনো একাকীত্ব আবার ফিরে এসেছে — কিন্তু এইবার আরও তীব্র, কারণ এখন তিনি জানেন সান্নিধ্য কেমন লাগে।
সেই রাতে বিজয়কান্ত মন্দিরে গেলেন — গভীর রাতে, যখন কেউ থাকে না। কালীমাতার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর চোখ ভিজে গেল। তিনি ভাবলেন — কেন মানুষ এত একা হয়? কেন ভালোবাসার পরেও দূরত্ব থেকে যায়? কেন সম্পর্কগুলো ভেঙে পড়ে, মরে যায়, দূরে সরে যায়?
মন্দিরের প্রদীপের আলোয় মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একটা কথা মনে হল তাঁর — সুমিত্রা একবার বলেছিলেন, "একাকীত্ব হল ঈশ্বরের সেই আহ্বান, যেখানে তিনি বলছেন — এখন নিজেকে খোঁজো।"
বিজয়কান্ত সেই রাতে অনেকক্ষণ বসে রইলেন। ফিরে গেলেন না। আর মনের ভেতর একটা সিদ্ধান্ত পাকতে লাগল — তিনি কিছু করবেন। শুধু নিজের জন্য নয়, রঘুর মতো আরও অনেকের জন্য, যারা একা।
পরের দিন সকালে তিনি গেলেন হরিপদর বাড়িতে। কিন্তু রাগ বা অভিযোগ নিয়ে নয় — হাতে এক থালা নাড়ু আর একটা কথা নিয়ে।
হরিপদ দরজা খুলে অবাক হল। বিজয়কান্ত বললেন, "বোসো ভাই, কথা আছে।"
হরিপদ বসল, আড়ষ্ট হয়ে। বিজয়কান্ত বললেন, "তোমার স্ত্রীকে হারিয়েছ, এই ব্যথা আমি বুঝি। আমিও হারিয়েছি। একাকীত্ব মানুষকে ভেতর থেকে ভাঙে, সেটাও বুঝি। কিন্তু ছেলেকে যদি সেই একাকীত্বের মধ্যে ফেলে রাখো, সে বড় হয়ে কোথায় যাবে?"
হরিপদের চোখ ভিজে গেল। সে কিছু বলতে পারল না।
বিজয়কান্ত বললেন, "রঘুকে পাঠাও। আমি পড়াব। বিনামূল্যে। শুধু কথা দাও — তুমিও চেষ্টা করবে।"
ভেঙে পড়া মানুষের কাছে যাওয়াটাই সাহস — কারণ সেই মানুষই একদিন আমাদের একাকীত্ব ভেঙে দিতে পারে।
রঘু আবার আসতে লাগল। এইবার হরিপদও মাঝে মাঝে আসে, বিকেলে, চা খায়, চুপ করে বসে থাকে। বিজয়কান্ত বোঝেন — কথার দরকার নেই সবসময়, উপস্থিতিই যথেষ্ট।
কিছুদিন পর বিজয়কান্ত একটা উদ্যোগ নিলেন। গ্রামের মন্দির প্রাঙ্গণে প্রতি রবিবার সকালে একটি ছোট পাঠশালা শুরু করলেন — বিনামূল্যে, যেখানে গ্রামের গরিব ছেলেমেয়েরা আসতে পারবে। বিষয়বস্তু শুধু পড়াশোনা নয় — গান, গল্প বলা, মাটির কাজ, আর জীবনের কথা।
প্রথম দিন এলো মাত্র তিনজন। পরের সপ্তাহে সাতজন। একমাসের মধ্যে পনেরোজন।
একদিন গ্রামের বৃদ্ধা শান্তিপ্রিয়া দেবী এলেন — বয়স সত্তর ছাড়িয়ে, একা থাকেন, ছেলে শহরে। বললেন, "মাস্টার, আমিও কি বসতে পারি? না হয় শুনব।" বিজয়কান্ত হেসে বললেন, "আপনি শুধু বসবেন না, আপনি শেখাবেন। আপনার মতো জীবন দেখা মানুষ এই ছেলেমেয়েদের কী শেখাতে পারেন, তা আমি পারব না।"
শান্তিপ্রিয়া দেবী সেদিন প্রথমবার কেঁদেছিলেন — আনন্দে।
মাতৃপুরে একটা অদ্ভুত রূপান্তর ঘটছিল। যে মানুষগুলো একা ছিলেন, প্রত্যেকে একে অপরের দিকে এগিয়ে আসছিলেন। একাকীত্ব মিলিয়ে যাচ্ছিল না — কিন্তু সেটা আর কারাগার ছিল না, হয়ে উঠেছিল একটা দরজা।
দুর্গাপূজার সময় দীপঙ্কর এলো। বাবাকে দেখে চমকে গেল — বিজয়কান্তের মুখে আলো, চোখে প্রাণ, হাঁটায় গতি। মনে হচ্ছে না অবসর নেওয়া মানুষ, মনে হচ্ছে যেন এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজটা তিনি করছেন।
দীপঙ্কর একদিন পাশে বসে বলল, "বাবা, তুমি কি একা থাকতে কষ্ট পাও না?"
বিজয়কান্ত একটু ভাবলেন। বললেন, "একা থাকা আর একাকীত্ব আলাদা জিনিস, দীপু। একা থাকা হল পরিস্থিতি। একাকীত্ব হল মনের অবস্থা। আমি একা থাকি — কিন্তু আর একাকীত্বে ভুগি না।"
দীপঙ্কর চুপ করে রইল। বাবার কথার ওজন অনুভব করছিল।
বিজয়কান্ত বললেন, "জানিস, মা যখন ছিলেন, আমি ভাবতাম — তিনি চলে গেলে আমি বাঁচব না। কিন্তু দেখ, বেঁচে আছি। শুধু বেঁচে না — একটু একটু করে বুঝতে পারছি, বেঁচে থাকার মানে কী।"
"কী মানে, বাবা?"
"নিজের থেকে বাইরে তাকানো। যে মানুষটা তোমার চেয়েও বেশি অন্ধকারে আছে, তার হাত ধরা।"
সেই রাতে দীপঙ্কর অনেকক্ষণ চুপ করে বারান্দায় বসে রইল। তারপর ফোন তুলে স্ত্রীকে বলল, "আমরা শীঘ্রই মাতৃপুরে উঠে আসব। বাবার পাশে থাকব।"
যখন আমরা নিজের একাকীত্বকে অস্ত্র বানাই, তখন সেটা হয় অভিযোগ। আর যখন সেই একাকীত্বকে আয়না বানাই, তখন সেটা হয় আত্মজ্ঞান — সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন জীবন।
শীতের এক সকালে বিজয়কান্ত পাহাড়ে উঠলেন একা — সেই পুরনো অভ্যাস। কিন্তু আজ পেছনে পেছনে আসছে রঘু, আর রঘুর পাশে হরিপদ। দূরে পাহাড়ের চূড়ায় কুয়াশা জমে আছে, নিচে উপত্যকায় ত্রিপুরার সবুজ বিস্তার।
রঘু জিজ্ঞেস করল, "মাস্টারমশাই, ওই পাহাড়ের ওপারে কী আছে?"
বিজয়কান্ত হাসলেন। বললেন, "আরও পাহাড়।"
"তারপর?"
"আরও পাহাড়। আর তারপর আরও আরও পাহাড়।"
রঘু ভ্রু কুঁচকে বলল, "তাহলে শেষ কোথায়?"
বিজয়কান্ত ছেলেটির দিকে তাকালেন। বললেন, "জীবনেরও শেষ নেই এভাবে। একটা পাহাড় পেরোলে আরেকটা আসে। একটা কষ্ট কমলে আরেকটা আসে। কিন্তু প্রতিটা পাহাড়ে উঠলে দেখা যায় — আগের চেয়ে দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।"
হরিপদ চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। সে ধীরে বলল, "মাস্টারদা, আপনি ভালো মানুষ।"
বিজয়কান্ত বললেন, "না ভাই। আমি শুধু শিখেছি — একা থাকা মানে থেমে থাকা নয়।"
পাহাড়ের ওপর থেকে সূর্যোদয় দেখছিলেন তিনজন মানুষ। একজন বৃদ্ধ, একজন দিনমজুর, একটি শিশু — তিনজনেই কোনো না কোনোভাবে একাকীত্বের ভেতর দিয়ে হেঁটে এসেছেন। আর এখন, এই মুহূর্তে, কেউই একা নন।
ত্রিপুরার সেই পাহাড়ের কোলে, কালীমাতার আশীর্বাদে, তিনটি জীবন যেন নতুন করে শুরু হচ্ছিল।
বিজয়কান্তের স্ত্রী সুমিত্রা মারা গেছেন আজ তিন বছর হল। একমাত্র ছেলে দীপঙ্কর পড়াশোনা শেষ করে চলে গেছে আগরতলায়, সেখানে চাকরি-সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে ফোন আসে, দুর্গাপূজায় একবার আসে, তারপর আবার নীরবতা। বিজয়কান্ত প্রতিদিন সকালে উঠে কালীমাতার মন্দিরে যান, ফুল তোলেন বাগান থেকে, পূজা দেন — কিন্তু ঘরে ফিরে আসলে সেই একই নিঃশব্দতা তাঁকে ঘিরে ধরে।
গ্রামের লোকেরা তাঁকে ভালোবাসে, সম্মান করে। কিন্তু বিজয়কান্ত জানেন, সম্মান আর সান্নিধ্য এক জিনিস নয়। রাত্রে যখন বারান্দায় বসে আকাশ দেখেন, চা হাতে, তখন মনে হয় — পৃথিবীর সবচেয়ে জনাকীর্ণ জায়গায় দাঁড়িয়েও মানুষ কতটা একা থাকতে পারে।
সেই বছর শরতের শুরুতে একটা ঘটনা ঘটল। বিজয়কান্ত সকালে মন্দিরে যাচ্ছিলেন, পথে দেখলেন একটি বাচ্চা ছেলে — বছর দশেক বয়স হবে — রাস্তার পাশে বসে কাঁদছে। পরনে ময়লা জামা, পায়ে স্যান্ডেল নেই, চোখদুটো লাল।
"কী হয়েছে বাবা?" বিজয়কান্ত থামলেন।
ছেলেটি মুখ তুলল না। কাঁদতে কাঁদতে বলল, "মা নেই। আমার মা নেই।"
বিজয়কান্তের বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি পাশে বসলেন, মাথায় হাত রাখলেন। ছেলেটির নাম রঘু — পুরো নাম রঘুনাথ সাহা। মা মারা গেছেন এক মাস আগে, বাবা দিনমজুর, মদ খান, ঘরে ফেরেন না। দাদু-দিদিমা আছেন, কিন্তু বুড়ো মানুষ, অসুস্থ। রঘু প্রতিদিন একা একা ঘুরে বেড়ায়, স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।
বিজয়কান্ত সেদিন রঘুকে বাড়ি নিয়ে গেলেন। খাওয়ালেন, গল্প বললেন। রঘু চলে যাওয়ার আগে একবার ফিরে তাকাল — সেই চোখে এমন একটা কৃতজ্ঞতা ছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
একাকীত্ব শুধু নিজের কষ্ট নয় — এটি সেই মানুষকে খোঁজার সুযোগ, যে হয়তো আপনার চেয়েও বেশি একা।
সেদিন থেকে রঘু প্রতিদিন আসতে লাগল বিজয়কান্তের বাড়িতে। বিজয়কান্ত নিজেও বুঝতে পারলেন না কখন এই ছেলেটি তাঁর দিনের একটা অংশ হয়ে গেল। সকালে মন্দিরে যাওয়ার সময় রঘু পাশে থাকে, বিকেলে বারান্দায় বসে পড়া শেখায় বিজয়কান্ত, আর রঘু জিজ্ঞেস করে অদ্ভুত সব প্রশ্ন — "মাস্টারমশাই, আকাশের রং নীল কেন? মাস্টারমশাই, মরে গেলে মানুষ কোথায় যায়?"
বিজয়কান্ত উত্তর দেন, কখনো জানেন না বলেন, কখনো হাসেন। ধীরে ধীরে ঘরের নিঃশব্দতাটা আর অসহ্য লাগে না।
কিন্তু সত্যিকারের পরীক্ষা এল অন্যভাবে। একদিন রঘুর বাবা — হরিপদ সাহা — বিজয়কান্তের দরজায় এসে দাঁড়াল। চোখ লাল, কণ্ঠে রাগ। বলল, "আমার ছেলেকে আপনি কী শেখাচ্ছেন? ওকে কেন প্রতিদিন এখানে আসতে দেন?"
বিজয়কান্ত শান্ত থাকলেন। বললেন, "ছেলেটা পড়া শিখছে। খাওয়াদাওয়া করছে। কোনো ক্ষতি তো হচ্ছে না।"
হরিপদ কিছু না বলে চলে গেল। কিন্তু তার পরদিন থেকে রঘু আর এলো না।
তিনদিন কেটে গেল। বিজয়কান্ত বুঝতে পারলেন সেই পুরনো একাকীত্ব আবার ফিরে এসেছে — কিন্তু এইবার আরও তীব্র, কারণ এখন তিনি জানেন সান্নিধ্য কেমন লাগে।
সেই রাতে বিজয়কান্ত মন্দিরে গেলেন — গভীর রাতে, যখন কেউ থাকে না। কালীমাতার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর চোখ ভিজে গেল। তিনি ভাবলেন — কেন মানুষ এত একা হয়? কেন ভালোবাসার পরেও দূরত্ব থেকে যায়? কেন সম্পর্কগুলো ভেঙে পড়ে, মরে যায়, দূরে সরে যায়?
মন্দিরের প্রদীপের আলোয় মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একটা কথা মনে হল তাঁর — সুমিত্রা একবার বলেছিলেন, "একাকীত্ব হল ঈশ্বরের সেই আহ্বান, যেখানে তিনি বলছেন — এখন নিজেকে খোঁজো।"
বিজয়কান্ত সেই রাতে অনেকক্ষণ বসে রইলেন। ফিরে গেলেন না। আর মনের ভেতর একটা সিদ্ধান্ত পাকতে লাগল — তিনি কিছু করবেন। শুধু নিজের জন্য নয়, রঘুর মতো আরও অনেকের জন্য, যারা একা।
পরের দিন সকালে তিনি গেলেন হরিপদর বাড়িতে। কিন্তু রাগ বা অভিযোগ নিয়ে নয় — হাতে এক থালা নাড়ু আর একটা কথা নিয়ে।
হরিপদ দরজা খুলে অবাক হল। বিজয়কান্ত বললেন, "বোসো ভাই, কথা আছে।"
হরিপদ বসল, আড়ষ্ট হয়ে। বিজয়কান্ত বললেন, "তোমার স্ত্রীকে হারিয়েছ, এই ব্যথা আমি বুঝি। আমিও হারিয়েছি। একাকীত্ব মানুষকে ভেতর থেকে ভাঙে, সেটাও বুঝি। কিন্তু ছেলেকে যদি সেই একাকীত্বের মধ্যে ফেলে রাখো, সে বড় হয়ে কোথায় যাবে?"
হরিপদের চোখ ভিজে গেল। সে কিছু বলতে পারল না।
বিজয়কান্ত বললেন, "রঘুকে পাঠাও। আমি পড়াব। বিনামূল্যে। শুধু কথা দাও — তুমিও চেষ্টা করবে।"
ভেঙে পড়া মানুষের কাছে যাওয়াটাই সাহস — কারণ সেই মানুষই একদিন আমাদের একাকীত্ব ভেঙে দিতে পারে।
রঘু আবার আসতে লাগল। এইবার হরিপদও মাঝে মাঝে আসে, বিকেলে, চা খায়, চুপ করে বসে থাকে। বিজয়কান্ত বোঝেন — কথার দরকার নেই সবসময়, উপস্থিতিই যথেষ্ট।
কিছুদিন পর বিজয়কান্ত একটা উদ্যোগ নিলেন। গ্রামের মন্দির প্রাঙ্গণে প্রতি রবিবার সকালে একটি ছোট পাঠশালা শুরু করলেন — বিনামূল্যে, যেখানে গ্রামের গরিব ছেলেমেয়েরা আসতে পারবে। বিষয়বস্তু শুধু পড়াশোনা নয় — গান, গল্প বলা, মাটির কাজ, আর জীবনের কথা।
প্রথম দিন এলো মাত্র তিনজন। পরের সপ্তাহে সাতজন। একমাসের মধ্যে পনেরোজন।
একদিন গ্রামের বৃদ্ধা শান্তিপ্রিয়া দেবী এলেন — বয়স সত্তর ছাড়িয়ে, একা থাকেন, ছেলে শহরে। বললেন, "মাস্টার, আমিও কি বসতে পারি? না হয় শুনব।" বিজয়কান্ত হেসে বললেন, "আপনি শুধু বসবেন না, আপনি শেখাবেন। আপনার মতো জীবন দেখা মানুষ এই ছেলেমেয়েদের কী শেখাতে পারেন, তা আমি পারব না।"
শান্তিপ্রিয়া দেবী সেদিন প্রথমবার কেঁদেছিলেন — আনন্দে।
মাতৃপুরে একটা অদ্ভুত রূপান্তর ঘটছিল। যে মানুষগুলো একা ছিলেন, প্রত্যেকে একে অপরের দিকে এগিয়ে আসছিলেন। একাকীত্ব মিলিয়ে যাচ্ছিল না — কিন্তু সেটা আর কারাগার ছিল না, হয়ে উঠেছিল একটা দরজা।
দুর্গাপূজার সময় দীপঙ্কর এলো। বাবাকে দেখে চমকে গেল — বিজয়কান্তের মুখে আলো, চোখে প্রাণ, হাঁটায় গতি। মনে হচ্ছে না অবসর নেওয়া মানুষ, মনে হচ্ছে যেন এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজটা তিনি করছেন।
দীপঙ্কর একদিন পাশে বসে বলল, "বাবা, তুমি কি একা থাকতে কষ্ট পাও না?"
বিজয়কান্ত একটু ভাবলেন। বললেন, "একা থাকা আর একাকীত্ব আলাদা জিনিস, দীপু। একা থাকা হল পরিস্থিতি। একাকীত্ব হল মনের অবস্থা। আমি একা থাকি — কিন্তু আর একাকীত্বে ভুগি না।"
দীপঙ্কর চুপ করে রইল। বাবার কথার ওজন অনুভব করছিল।
বিজয়কান্ত বললেন, "জানিস, মা যখন ছিলেন, আমি ভাবতাম — তিনি চলে গেলে আমি বাঁচব না। কিন্তু দেখ, বেঁচে আছি। শুধু বেঁচে না — একটু একটু করে বুঝতে পারছি, বেঁচে থাকার মানে কী।"
"কী মানে, বাবা?"
"নিজের থেকে বাইরে তাকানো। যে মানুষটা তোমার চেয়েও বেশি অন্ধকারে আছে, তার হাত ধরা।"
সেই রাতে দীপঙ্কর অনেকক্ষণ চুপ করে বারান্দায় বসে রইল। তারপর ফোন তুলে স্ত্রীকে বলল, "আমরা শীঘ্রই মাতৃপুরে উঠে আসব। বাবার পাশে থাকব।"
যখন আমরা নিজের একাকীত্বকে অস্ত্র বানাই, তখন সেটা হয় অভিযোগ। আর যখন সেই একাকীত্বকে আয়না বানাই, তখন সেটা হয় আত্মজ্ঞান — সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন জীবন।
শীতের এক সকালে বিজয়কান্ত পাহাড়ে উঠলেন একা — সেই পুরনো অভ্যাস। কিন্তু আজ পেছনে পেছনে আসছে রঘু, আর রঘুর পাশে হরিপদ। দূরে পাহাড়ের চূড়ায় কুয়াশা জমে আছে, নিচে উপত্যকায় ত্রিপুরার সবুজ বিস্তার।
রঘু জিজ্ঞেস করল, "মাস্টারমশাই, ওই পাহাড়ের ওপারে কী আছে?"
বিজয়কান্ত হাসলেন। বললেন, "আরও পাহাড়।"
"তারপর?"
"আরও পাহাড়। আর তারপর আরও আরও পাহাড়।"
রঘু ভ্রু কুঁচকে বলল, "তাহলে শেষ কোথায়?"
বিজয়কান্ত ছেলেটির দিকে তাকালেন। বললেন, "জীবনেরও শেষ নেই এভাবে। একটা পাহাড় পেরোলে আরেকটা আসে। একটা কষ্ট কমলে আরেকটা আসে। কিন্তু প্রতিটা পাহাড়ে উঠলে দেখা যায় — আগের চেয়ে দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।"
হরিপদ চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। সে ধীরে বলল, "মাস্টারদা, আপনি ভালো মানুষ।"
বিজয়কান্ত বললেন, "না ভাই। আমি শুধু শিখেছি — একা থাকা মানে থেমে থাকা নয়।"
পাহাড়ের ওপর থেকে সূর্যোদয় দেখছিলেন তিনজন মানুষ। একজন বৃদ্ধ, একজন দিনমজুর, একটি শিশু — তিনজনেই কোনো না কোনোভাবে একাকীত্বের ভেতর দিয়ে হেঁটে এসেছেন। আর এখন, এই মুহূর্তে, কেউই একা নন।
ত্রিপুরার সেই পাহাড়ের কোলে, কালীমাতার আশীর্বাদে, তিনটি জীবন যেন নতুন করে শুরু হচ্ছিল।
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
শঙ্খজিৎ ভট্টাচার্য ২৪/০৩/২০২৬সুন্দর
-
ফয়জুল মহী ২০/০৩/২০২৬বাহ্ চমৎকার লিখেছেন
