www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

নীরবতার অন্দরমহল

রাত তখন প্রায় দুইটা।
শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত হাসপাতালের করিডোরে একা বসে আছেন ডাক্তার দেবাশীষ চক্রবর্তী। হাতে একটা ঠান্ডা চায়ের কাপ, চোখের নিচে গাঢ় কালো দাগ। আজ টানা ষোল ঘণ্টা অপারেশন থিয়েটারে কাটিয়েছেন। তবু ঘরে যেতে পারছেন না।
কারণ আজ একটি সাত বছরের মেয়ে তাঁর হাতের মধ্যেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছে।
দেবাশীষ চোখ বন্ধ করলেন। মেয়েটার মুখটা ভাসছে বারবার। কী সুন্দর হাসি ছিল তার। ভর্তি হওয়ার দিন বলেছিল, "ডাক্তারদাদু, আমি ভালো হয়ে গেলে তোমাকে একটা ছবি এঁকে দেব।"
সেই ছবি আর আঁকা হলো না।
তিনি উঠে হাঁটতে লাগলেন করিডোরে। রাতের হাসপাতাল একটা অন্যরকম জায়গা। দিনের কোলাহল নেই। শুধু মাঝে মাঝে কারো কান্নার শব্দ, কারো পায়ের আওয়াজ, আর ভেন্টিলেটরের একঘেয়ে গুনগুন।
এই নীরবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে দেবাশীষ প্রথমবার অনুভব করলেন — তিনি ক্লান্ত। শুধু শরীরে নয়। আত্মায়।
পঁচিশ বছর ধরে ডাক্তারি করছেন। কতজনকে বাঁচিয়েছেন — হিসেব নেই। কিন্তু যাদের বাঁচাতে পারেননি, তারা প্রতি রাতে ফিরে আসে। নীরবে। কোনো অভিযোগ ছাড়া। শুধু তাকিয়ে থাকে।
তিনি জানালার কাছে গেলেন। বাইরে শহর ঘুমাচ্ছে। রাস্তার আলো জ্বলছে একাকী। একটা কুকুর হেঁটে যাচ্ছে নিঃশব্দে।
দেবাশীষ ভাবলেন — এই নীরবতাই কি সত্যিকারের সত্য? সারাদিনের হইচই, যন্ত্রপাতির শব্দ, মানুষের চিৎকার — এসব কি শুধু ঢাকার জন্য? এই গভীর শান্তিকে ঢেকে রাখার জন্য?

দেবাশীষের ছেলেবেলাটা ছিল একদম আলাদা।
উত্তরবঙ্গের একটা ছোট শহরে জন্ম। বাবা হরিপদ চক্রবর্তী ছিলেন স্কুলশিক্ষক। মা শকুন্তলাদেবী গৃহিণী। অভাব ছিল, কিন্তু আনন্দ কম ছিল না। বাড়িতে বই ছিল, গান ছিল, সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালানোর রীতি ছিল।
দেবাশীষ ছোটবেলায় খুব কম কথা বলতেন। স্কুলে শিক্ষকরা ভাবতেন ছেলেটা বোধহয় লাজুক। কিন্তু আসলে তা নয়। তিনি পর্যবেক্ষণ করতেন। চুপ করে বসে থাকতেন আর দেখতেন — মানুষ কীভাবে কথা বলে, কীভাবে কষ্ট পায়, কীভাবে হাসে।
বাবা একদিন বললেন, "দেবু, তুই এত চুপ থাকিস কেন?"
দেবাশীষ বলেছিলেন, "বাবা, চুপ থাকলে অনেক কিছু শোনা যায়।"
হরিপদ সেদিন অবাক হয়েছিলেন। মাত্র বারো বছরের ছেলের মুখে এই কথা।
ক্লাস টেনে পড়ার সময় পাড়ার এক বৃদ্ধ অসুস্থ হলেন। ডাক্তার আসতে দেরি হচ্ছিল। দেবাশীষ শুধু পাশে বসে রইলেন। হাত ধরে রইলেন। কিছু বললেন না। বৃদ্ধ পরে বলেছিলেন, "ওই ছেলেটার হাতের উত্তাপে আমি বেঁচে গেছি।"
সেই থেকে সিদ্ধান্ত — ডাক্তার হবেন।

মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর দেবাশীষের জীবন বদলে গেল।
শহরের বড় কলেজ। হাজারো ছাত্রছাত্রী। চারদিকে শোরগোল। প্রতিযোগিতা। নম্বরের লড়াই।
কিন্তু দেবাশীষ নিজেকে হারিয়ে ফেললেন না।
তাঁর বন্ধু হলো তিনজন — সুব্রত, মীরা আর কমলেশ। চারজন একসাথে পড়তেন রাতের পর রাত। হোস্টেলের ছাদে বসে তারা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেন।
সুব্রত বলত, "আমি বড় হাসপাতাল খুলব।"
মীরা বলত, "আমি গ্রামের মানুষের কাছে যাব।"
কমলেশ বলত, "আমি বিদেশে গিয়ে গবেষণা করব।"
দেবাশীষ চুপ করে শুনতেন।
একদিন মীরা জিজ্ঞেস করল, "দেবদা, তুমি কী করবে?"
দেবাশীষ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, "আমি মানুষের পাশে থাকব। শুধু পাশে।"
মীরা হেসেছিল। "এটা কোনো স্বপ্ন হলো?"
"এটাই সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।"

বছর পেরোল। দেবাশীষ ডাক্তার হলেন। বিয়ে হলো গৌরীর সাথে। গৌরী ছিলেন শান্ত, ধীর স্থির একজন মানুষ। দেবাশীষের নীরবতাকে তিনি ভালোবাসতেন। বুঝতেন।
ছেলে হলো — নাম রাখলেন আদিত্য।
জীবন সুন্দর ছিল। সকালে হাসপাতাল, বিকেলে বাড়ি, রাতে পরিবার। মাঝে মাঝে ছাদে বসে গৌরীর সাথে চা খাওয়া।
কিন্তু সুখ বেশিদিন স্থির থাকে না।
আদিত্যের বয়স যখন দশ, গৌরী হঠাৎ অসুস্থ হলেন। প্রথমে সামান্য মাথাব্যথা। তারপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তারপর রিপোর্ট।
ব্রেন টিউমার।
দেবাশীষ রিপোর্টটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলেন নিজের চেম্বারে। একটি কথাও বললেন না। শুধু কাগজটা টেবিলে রেখে জানালার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বাইরে সেদিন বৃষ্টি পড়ছিল।

গৌরীর চিকিৎসা চলল দীর্ঘ দুই বছর। দেবাশীষ প্রতিটি মুহূর্তে পাশে ছিলেন। অপারেশনের সময় তিনি নিজে অন্য ডাক্তারদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেন। রাতে হাসপাতালের বিছানার পাশে চেয়ার টেনে ঘুমালেন।
গৌরী একদিন বললেন, "তুমি বাড়ি যাও। আদিত্য একা আছে।"
"আদিত্যের কাছে তার ঠাকুমা আছে। তোমার কাছে আমি ছাড়া কেউ নেই।"
গৌরী হাসলেন। সেই হাসিতে কষ্ট ছিল, কিন্তু ভালোবাসাও ছিল।
"তুমি সারাজীবন মানুষের পাশে থাকার কথা বলেছিলে। কিন্তু নিজের কথাটা ভুলে গেলে কেন?"
দেবাশীষ কিছু বললেন না। শুধু গৌরীর হাত শক্ত করে ধরলেন।
দুই বছর পর গৌরী চলে গেলেন। শেষরাতে। নিঃশব্দে। যেভাবে মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে।
দেবাশীষ পাশেই ছিলেন। গৌরীর শেষ নিঃশ্বাসের সেই মুহূর্তে তিনি টের পেলেন — নীরবতা কতটা ভারী হতে পারে।

গৌরীর চলে যাওয়ার পর দেবাশীষ যেন পাথর হয়ে গেলেন।
কাজ করতেন। কিন্তু হাসতেন না। কথা বলতেন কম। বাড়িতে ফিরতেন দেরিতে। আদিত্য বুঝতে পারত বাবার ভেতরে কিছু একটা ভেঙে গেছে। কিন্তু কী বলবে সে?
একদিন আদিত্য বাবার ঘরে এল। দেবাশীষ বসে আছেন গৌরীর ছবির সামনে।
"বাবা।"
"হুম।"
"মা কি স্বর্গে আছে?"
দেবাশীষ একটু থামলেন। তারপর বললেন, "হ্যাঁ।"
"তাহলে সে কি সুখে আছে?"
"হ্যাঁ। মা সুখেই আছে।"
"তাহলে তুমি কাঁদছ কেন?"
দেবাশীষ ঘুরে তাকালেন। ছেলের চোখে প্রশ্ন নেই, আছে ভালোবাসা।
"আমি কাঁদছি না।"
"ভেতরে কাঁদছ। আমি বুঝতে পারি।"
সেই রাতে দেবাশীষ অনেকক্ষণ বসে রইলেন ছাদে। একা। আকাশে তারা ছিল অনেক। ঠান্ডা বাতাস বইছিল।
গৌরীর একটা কথা মনে পড়ল — "নীরবতা মানে শূন্যতা নয়। নীরবতার মধ্যেও জীবন আছে। শুনতে পেলেই হয়।"
দেবাশীষ চোখ বন্ধ করলেন। বাতাসের শব্দ শুনলেন। রাতের পাখির ডাক শুনলেন। নিজের বুকের ধুকপুক শুনলেন।
আস্তে আস্তে বুকের পাথরটা একটু সরে গেল।

পরদিন সকালে দেবাশীষ হাসপাতালে এলেন। কিন্তু আজ একটু আলাদাভাবে।
ওয়ার্ডে গিয়ে একজন বৃদ্ধ রোগীর পাশে বসলেন। লোকটার নাম রাধেশ্যাম। একা মানুষ। পরিবার নেই। ছেলে বিদেশে থাকে।
দেবাশীষ জিজ্ঞেস করলেন, "কেমন আছেন?"
"ভালো না, ডাক্তারবাবু।"
"কোথায় কষ্ট?"
"শরীরে না। মনে।"
দেবাশীষ চুপ করে বসে রইলেন। রাধেশ্যাম বলতে লাগলেন — জীবনের কথা, একাকীত্বের কথা, ছেলের কথা। দেবাশীষ শুনলেন। মাঝে মাঝে মাথা নাড়লেন। কোনো পরামর্শ দিলেন না। শুধু শুনলেন।
আধঘণ্টা পর রাধেশ্যাম বললেন, "জানেন ডাক্তারবাবু, আপনার সাথে কথা বলে মনটা অনেক হালকা হয়ে গেল।"
দেবাশীষ হাসলেন। প্রথমবার। অনেকদিন পর।
বুঝলেন — নিরাময় শুধু ওষুধে হয় না। কখনো কখনো নীরবে পাশে থাকাটাই সবচেয়ে বড় চিকিৎসা।

দেবাশীষের জীবনে এরপর একটা নতুন অধ্যায় শুরু হলো।
তিনি হাসপাতালের কাজের পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে একটি বস্তি এলাকায় যেতে শুরু করলেন। সেখানে গরিব মানুষ আছে — যাদের ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সামর্থ্য নেই।
প্রথমদিন গিয়ে দেখলেন — একটা ছোট্ট ঘরে একজন মহিলা শুয়ে আছেন। জ্বর। কিন্তু পাশে কেউ নেই। স্বামী রিকশা চালায়, সকাল থেকে বেরিয়ে গেছে। ছেলেমেয়েরা স্কুলে।
মহিলার নাম সাবিত্রী।
দেবাশীষ ওষুধ দিলেন। তারপর একটু বসলেন।
সাবিত্রী বললেন, "ডাক্তারবাবু, আপনি এখানে কেন এলেন? আমরা তো গরিব মানুষ।"
"মানুষ মানুষের কাছে আসে। গরিব-বড়লোক কোনো ব্যাপার না।"
সাবিত্রীর চোখে জল এলো।
দেবাশীষ সেই জলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছু বললেন না। নীরবতাই বলে দিল সব।

কমলেশ একদিন ফোন করল বিদেশ থেকে।
"দেবদা, শুনলাম তুমি নাকি বস্তিতে বিনামূল্যে চিকিৎসা করছ?"
"হ্যাঁ।"
"কেন? তোমার কি টাকাপয়সার সমস্যা নেই?"
"আছে। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়।"
"তাহলে বড় কথা কী?"
দেবাশীষ একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, "কমলেশ, তুই জানিস আমি কত রাত ঘুমাতে পারিনি? রোগী মারা গেছে বলে? গৌরী চলে গেছে বলে? কিন্তু এখন যখন একজন মানুষের মুখে হাসি দেখি — সেই হাসিতে আমার ঘুম আসে।"
কমলেশ চুপ করে রইল।
"জীবনের অর্থ খুঁজতে অনেক দূরে যেতে হয় না। পাশের মানুষটার চোখে তাকালেই পাওয়া যায়।"

আদিত্য ধীরে ধীরে বড় হলো।
সে বাবাকে দেখত। বাবার নীরব জীবন দেখত। বাবা কীভাবে কথা না বলেও মানুষকে শান্ত করেন, সেটা দেখত।
একদিন আদিত্য বলল, "বাবা, আমিও ডাক্তার হব।"
দেবাশীষ ছেলের দিকে তাকালেন। "কেন?"
"কারণ তুমি ডাক্তার। আর তুমি যা করো, সেটা দেখে আমি বুঝেছি — এই পেশায় শুধু ওষুধ দেওয়া হয় না। মানুষকে বাঁচানো হয়।"
দেবাশীষের বুকে একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল।
"কিন্তু জানিস তো, এই পেশা অনেক কঠিন?"
"জানি।"
"হারাতে হয় অনেককে?"
"তুমি হেরেও থামনি। আমিও থামব না।"
সেই রাতে দেবাশীষ আবার ছাদে গেলেন। আকাশে তারা ছিল। ঠিক যেমন ছিল গৌরীর চলে যাওয়ার রাতে।
কিন্তু এবার নীরবতাটা ভারী লাগল না। বরং মনে হলো — এই নীরবতার মধ্যে গৌরী আছেন। মা আছেন। বাবা আছেন। চলে যাওয়া সব মানুষ আছেন।
নীরবতা আসলে শূন্যতা নয়। নীরবতা হলো সেই জায়গা, যেখানে ভালোবাসা জমা থাকে।

বছর দশেক পর।
দেবাশীষ এখন শুধু একজন ডাক্তার নন। শহরের মানুষ তাঁকে চেনে। বস্তির মানুষ ভালোবাসে। হাসপাতালের নার্সরা বলেন — "স্যার থাকলে ওয়ার্ডের বাতাস বদলে যায়।"
একটি মেডিকেল কনফারেন্সে তাঁকে বক্তৃতা দিতে ডাকা হলো।
বিষয় — "আধুনিক চিকিৎসায় মানবিক স্পর্শ।"
দেবাশীষ মঞ্চে উঠলেন। সামনে শত শত তরুণ ডাক্তার।
তিনি প্রথমে কিছু বললেন না। শুধু দাঁড়িয়ে রইলেন। ত্রিশ সেকেন্ড নীরব।
হলে অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল।
তারপর দেবাশীষ বললেন, "এই ত্রিশ সেকেন্ড কেমন লাগল?"
কেউ কেউ বলল, "অস্বস্তি লাগল।"
কেউ বলল, "অদ্ভুত।"
"কিন্তু জানো, এই নীরবতার মধ্যেই কিন্তু তোমরা আমাকে মনোযোগ দিলে। ভাবলে। অনুভব করলে।"
সবাই চুপ।
"একজন রোগী যখন তোমার সামনে বসে — সে শুধু ওষুধ চায় না। সে চায় তুমি তার কথা শুনবে। তার ভয়টা বুঝবে। তার একাকীত্বটা ছুঁয়ে দেবে। আর এটার জন্য কোনো যন্ত্র লাগে না। লাগে শুধু একটু নীরবতা। নিজেকে থামানোর ক্ষমতা।"
হল নিস্তব্ধ।
"আমি পঁচিশ বছর ধরে ডাক্তারি করছি। অনেক হারিয়েছি। স্ত্রীকে হারিয়েছি, রোগীদের হারিয়েছি। কিন্তু প্রতিবার যখন ভেঙে পড়েছি, তখন নীরবতাই আমাকে কুড়িয়ে নিয়েছে। নীরবতার মধ্যে আমি শুনেছি নিজেকে। আর নিজেকে শুনতে পারলেই অন্যকে শোনা যায়।"
বক্তৃতা শেষ হলো।
হাততালি উঠল। কিন্তু দেবাশীষ লক্ষ করলেন — সামনের সারিতে একজন তরুণ ডাক্তার চোখ মুছছে।
সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

সেই রাতে করিডোরে আবার একা বসলেন দেবাশীষ।
হাতে গরম চা। বাইরে নরম বৃষ্টি।
আজকের সেই সাত বছরের মেয়ের কথা মনে পড়ল। যে ছবি আঁকতে চেয়েছিল।
দেবাশীষ পকেট থেকে একটা কাগজ বের করলেন। একটা কলম। আস্তে আস্তে আঁকতে শুরু করলেন। এঁকে উঠল একটা ছোট্ট মেয়ে। হাতে বেলুন। মুখে হাসি।
ছবিটা শেষ করে তিনি সেটার দিকে তাকালেন।
নীরবে।
বুঝলেন — জীবনে অনেক কিছু থামে। মানুষ থামে, সম্পর্ক থামে, স্বপ্ন থামে। কিন্তু ভালোবাসা থামে না। সেটা রূপ বদলায়। কখনো স্মৃতি হয়, কখনো অনুপ্রেরণা, কখনো একটা ছোট্ট ছবি।

পরদিন সকালে আদিত্য ফোন করল।
"বাবা, কেমন আছ?"
"ভালো।"
"সত্যিই?"
"হ্যাঁ, আজ সত্যিই ভালো।"
"কী হলো হঠাৎ?"
দেবাশীষ হাসলেন। "কিছু হয়নি। শুধু বুঝলাম — ভালো থাকাটা বড় কোনো ঘটনার জন্য অপেক্ষা করে না। একটা গরম চা, একটা নরম বৃষ্টি, আর মনের মধ্যে একটু নীরবতা — এটুকুই যথেষ্ট।"
আদিত্য হাসল। "তুমি দার্শনিক হয়ে যাচ্ছ বাবা।"
"না রে। আমি শুধু শিখছি।"
"কী শিখছ?"
দেবাশীষ জানালার বাইরে তাকালেন। সকালের রোদ পড়েছে রাস্তার ওপর। একটা শিশু স্কুলে যাচ্ছে মায়ের হাত ধরে।
"শিখছি যে — জীবনের সবচেয়ে গভীর উত্তরগুলো কোলাহলে পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় নীরবতার অন্দরমহলে। সেখানে যেতে পারলে দেখবি — সব প্রশ্নের জবাব আছে। সব ব্যথার শেষে একটা আলো আছে।"
ফোনের ওপারে আদিত্য চুপ করে রইল।
তারপর আস্তে বলল, "ভালোবাসি, বাবা।"
"আমিও।"
ফোন রেখে দেবাশীষ উঠে দাঁড়ালেন। আজ আবার হাসপাতালে যেতে হবে। আবার মানুষের পাশে থাকতে হবে। আবার কারো হাত ধরতে হবে।
কিন্তু আজ বুকটা হালকা। পা দুটো শক্ত। মনটা শান্ত।
কারণ তিনি জানেন —
ঝড় আসে। ব্যথা আসে। অন্ধকার আসে।
কিন্তু যে মানুষ নীরবতার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পায়,
সে কখনো সত্যিকারের হারিয়ে যায় না।

আমাদের সবার জীবনেই এমন মুহূর্ত আসে যখন সব কিছু নিস্তব্ধ হয়ে যায়। মনে হয় এগিয়ে যাওয়ার পথ নেই।
কিন্তু সেই নীরবতাই আসলে সুযোগ। নিজেকে শোনার সুযোগ। ভেতরের কণ্ঠস্বর শোনার সুযোগ।
কারণ জীবন কখনো থামে না। সে শুধু আমাদের অপেক্ষা করে — সেই মুহূর্তের জন্য, যখন আমরা নীরবতার অন্দরমহলে ঢুকে নিজেকে আবার খুঁজে পাই।

"যে নিজেকে শুনতে পারে, সে পৃথিবীর সব শব্দকে জয় করতে পারে।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১০৮ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১৮/০৩/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast