সোনার কলঙ্ক
রাত তখন প্রায় দুটো। কলকাতার পুরনো পাড়া শ্যামবাজারের গলিতে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ দেবনাথ জুয়েলার্সের সামনে একটা গাড়ি এসে থামল। গাড়ির হেডলাইট নেভানো। তিনটি ছায়ামূর্তি নেমে মুহূর্তের মধ্যে দোকানের পিছনের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
পরদিন সকাল সাড়ে আটটায় দোকান খুলতে এসে মালিক রমেশচন্দ্র দেবনাথ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ভেতরে ঢুকে দেখেন — লকার ভাঙা, শোকেস তছনছ, আর মেঝেতে পড়ে আছে তাঁর বিশ্বস্ত কর্মচারী সুকান্ত মণ্ডল — অজ্ঞান অবস্থায়। চুরি হয়ে গেছে পঞ্চাশ ভরি সোনার গয়না, নগদ তিন লক্ষ টাকা, আর সবচেয়ে মূল্যবান — একটি বিশেষ হার, যেটি ছিল নাকি একটি রাজপরিবারের পারিবারিক সম্পদ।
রমেশবাবু কাঁপতে কাঁপতে ফোন করলেন থানায়। কিন্তু তার আগেই একটা ছোট্ট কার্ড দেখলেন টেবিলের ওপর — "প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন: অর্ণব রায়, গোয়েন্দা।" কে রেখে গেল এই কার্ড? রমেশবাবু ভ্রু কুঁচকালেন। তারপর ফোন তুললেন।
অর্ণব রায়ের বয়স পঁয়ত্রিশ। মাঝারি উচ্চতা, চোখে সরু ফ্রেমের চশমা, পরনে সাদা পাঞ্জাবি। দেখতে একজন সাধারণ মানুষের মতো, কিন্তু চোখ দুটো অসাধারণ তীক্ষ্ণ — যেন প্রতিটা জিনিস স্ক্যান করে নিচ্ছে মস্তিষ্কে। কলকাতার আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে শুরু করে কর্পোরেট দুনিয়া — সব জায়গায় তার সুনাম আছে।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে অর্ণব প্রথমেই পুলিশের তদন্ত টিমের সাথে পরিচয় করলেন। ইন্সপেক্টর সুজয় বিশ্বাস — বছর পঞ্চাশের রোগা মানুষ, মুখে পান সবসময়। তিনি অর্ণবকে দেখে নাক সিটকালেন।
"আবার আপনি! পুলিশের কাজে নাক গলাবেন না।"
অর্ণব হাসলেন। "নাক গলাচ্ছি না ইন্সপেক্টরবাবু, শুধু একটু দেখছি।"
তিনি সরাসরি গেলেন পিছনের দরজার কাছে। তালা ভাঙা নয় — কেউ চাবি দিয়ে খুলেছে। কিন্তু কীভাবে? সুকান্তর কাছে তো একটাই চাবি থাকত।
"সুকান্তবাবু এখন কেমন আছেন?" অর্ণব জিজ্ঞেস করলেন।
"হাসপাতালে। ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করা হয়েছিল। সন্ধ্যে থেকেই আছেন।"
অর্ণব ঘুরে তাকালেন রমেশবাবুর দিকে। "মানে সুকান্তবাবু কাল রাতে দোকানেই ছিলেন। কেন?"
রমেশবাবু ঢোক গিললেন। "ও বলেছিল একটা হিসাব মেলাতে হবে। তাই থাকছে।"
অর্ণব কিছু বললেন না। কিন্তু মনে মনে একটা প্রশ্নচিহ্ন এঁকে নিলেন।
হাসপাতালে গিয়ে সুকান্তর সাথে দেখা করলেন অর্ণব। বছর পঁচিশের ছেলে, শীর্ণ চেহারা, চোখে ভয়ের ছায়া। অর্ণব বসলেন পাশে।
"কাল রাতে কী হয়েছিল বলুন।"
সুকান্ত জড়িয়ে জড়িয়ে বলল — রাত এগারোটার দিকে হঠাৎ কারেন্ট চলে গেল। অন্ধকারে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেউ তার মুখে কাপড় চেপে ধরল। তারপর আর কিছু মনে নেই।
"একটাই প্রশ্ন," অর্ণব বললেন শান্তভাবে। "পিছনের দরজার চাবি কি সবসময় আপনার কাছেই থাকত?"
সুকান্ত একটু থামল। "হ্যাঁ।"
"কিন্তু কালকে রাতে চাবিটা কোথায় ছিল?"
চুপ।
"সুকান্তবাবু," অর্ণব নরম গলায় বললেন, "আপনি কোনো বিপদে পড়েছেন। সেটা বুঝতে পারছি। কিন্তু সত্যি না বললে আমি সাহায্য করতে পারব না।"
সুকান্তর চোখ ভিজে উঠল। ধীরে ধীরে বলল — তিন সপ্তাহ আগে একদিন রাস্তায় কেউ তাকে আটকায়। বলে যে সুকান্তর বাবার পুরনো ঋণের কথা। যদি একটা রাতের জন্য পিছনের দরজা খোলা রাখে — ঋণ মাফ হবে। সুকান্ত রাজি হয়নি। কিন্তু তিন সপ্তাহ ধরে চাপ বাড়তে থাকে। শেষমেশ...
অর্ণব উঠে দাঁড়ালেন। "এই লোকটাকে চিনতেন?"
"না। কিন্তু গলায় একটা উল্কি ছিল — নীল রঙের সাপ।"
কলকাতার অন্ধকার জগতে নীল সাপের উল্কি মানে একটাই নাম — বিমল হালদার, যাকে সবাই চেনে "নাগ" বলে। পুরনো বস্তির ছেলে, এখন একটা নকল গয়নার ব্যবসার আড়ালে চলে জুয়া আর চোরাকারবার।
অর্ণব সন্ধ্যেবেলা গেলেন শ্যামপুকুরের সেই গলিতে। কিন্তু নাগের আড্ডায় পৌঁছে দেখলেন — দরজা বন্ধ, ভেতর থেকে শব্দ নেই। প্রতিবেশীরা বলল নাগ সেদিন সকাল থেকেই নেই।
হঠাৎ একটা কথা মাথায় এল অর্ণবের। যে হারটি চুরি হয়েছে — রাজপরিবারের সেই হার — সেটা কেনা হয়েছিল মাত্র দুই মাস আগে এক নিলামে। কে কিনেছিল? রমেশবাবু।
"রমেশবাবু," অর্ণব ফোন করলেন, "হারটা আপনি কোথায় কিনেছিলেন?"
"নিউমার্কেটের কাছে এক বিদেশি সংস্থার নিলামে।"
"নিলামে আর কারা ছিল?"
একটু চুপ থেকে রমেশবাবু বললেন, "আরও দুজন বিড করেছিল। একজন ছিল কোনো কর্পোরেট সংস্থার প্রতিনিধি, আর একজন — একজন মহিলা। বেশ অভিজাত চেহারা।"
অর্ণবের চোখ সরু হল। "মহিলার নাম জানেন?"
"না। কিন্তু গাড়িতে উঠেছিল — কালো মার্সিডিজ।"
পরদিন সকালে অর্ণব গেলেন তাঁর পুরনো বন্ধু ও সাংবাদিক পার্থ সেনের কাছে। পার্থ শহরের খবর রাখে সবথেকে বেশি।
"ওই হারটার ইতিহাস জানো?" অর্ণব জিজ্ঞেস করলেন।
পার্থ একটু চিন্তা করে বলল, "শুনেছিলাম — এটা নাকি বর্ধমানের এক রাজপরিবারের। বছর পঞ্চাশ আগে পরিবারটা ভেঙে পড়ে। হারটা নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে মামলা হয়। শেষে বিক্রি করে দেওয়া হয় নিলামে। কিন্তু এক ভাই — ছোটজন — নাকি মরার আগে বলে গিয়েছিল যে হারটা তার মেয়েকে দিতে হবে।"
"সেই মেয়ে কোথায়?"
"কলকাতায়ই থাকে। নাম মৃণালিনী রায়চৌধুরী। বিধবা। রাজারহাটে বড় বাড়ি আছে।"
অর্ণব উঠে দাঁড়াল। "একটা কালো মার্সিডিজ গাড়ি কি আছে তার?"
পার্থ হাসল। "তুমি ইতিমধ্যে জেনে গেছ দেখছি।"
সেই বিকেলেই অর্ণব গেলেন মৃণালিনী রায়চৌধুরীর বাড়িতে। বিশাল বাড়ি, বাগানে ফুলের গাছ, দরজায় পুরনো কালো মার্সিডিজ।
মৃণালিনী দেবী বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। শান্ত মুখ, চোখে এক গভীর বিষাদ। অর্ণবকে দেখে অবাক হলেন না। যেন অপেক্ষায় ছিলেন।
"আসুন," শুধু বললেন।
চা খেতে খেতে অর্ণব সরাসরি বললেন, "হারটা আপনার বাবার ছিল।"
মৃণালিনী দেবী একটু থেমে বললেন, "হ্যাঁ। আমার বাবা মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন — ওটা আমার অধিকার। কিন্তু জেঠুর ছেলে বিক্রি করে দিল।"
"তাহলে কি আপনি...?"
"আমি চুরি করিনি," মৃণালিনী দেবী শান্তভাবে বললেন। "চুরি করার দরকার হয়নি।"
অর্ণব চমকে উঠলেন।
"মানে?" অর্ণব প্রায় ফিসফিস করলেন।
মৃণালিনী দেবী উঠে গেলেন পাশের ঘরে। ফিরে এলেন একটি কাঠের বাক্স নিয়ে। বাক্স খুলতেই ঝলমল করে উঠল — সেই হার।
"এটা...!" অর্ণব অবাক।
"রমেশচন্দ্রবাবু নিজেই আমাকে দিয়ে গেছেন। কাল রাতে।"
অর্ণব কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললেন, "তার মানে পুরো চুরির ঘটনাটা..."
"সাজানো।" মৃণালিনী দেবী বললেন। "রমেশবাবু জানতেন এটা আমার অধিকার। তিনি নিজে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কীভাবে দেবেন? এত টাকা দিয়ে কিনেছেন — এমনি দেওয়া কি সম্ভব? আর বেচতে গেলে অনেক আইনি জটিলতা। তাই চুরির নাটক।"
"কিন্তু বাকি সোনা? তিন লক্ষ টাকা?"
"সেটা আলাদা।" মৃণালিনী দেবী একটু হাসলেন। "সেটা সত্যিই চুরি হয়েছে। রমেশবাবু জানতেন না যে তাঁর নাটকের রাতেই আসল চোরেরাও এসেছিল।"
অর্ণব মাথায় হাত দিলেন। "একই রাতে দুটো আলাদা ঘটনা।"
"হ্যাঁ। রমেশবাবু সুকান্তকে দিয়ে দরজা খোলা রাখিয়েছিলেন হার নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সেই ফাঁকেই বিমল হালদারের দল ঢুকে পড়ে এবং সুকান্তকে অজ্ঞান করে বাকি সব নিয়ে চলে যায়।"
অর্ণব উঠে দাঁড়ালেন। "রমেশবাবু এখন কোথায়?"
রমেশচন্দ্র দেবনাথ তখন বসে আছেন তাঁর দোকানে, মাথা নিচু করে। অর্ণব ঢুকে দরজা বন্ধ করলেন।
"সব জেনেছি।"
রমেশবাবু মুখ তুললেন। চোখে জল।
"আমি ভুল করেছি," ধীরে বললেন। "মিথ্যে মামলা করে পুলিশের সময় নষ্ট করেছি। কিন্তু হারটা ওঁর পাওয়াই উচিত ছিল। আমি শুধু... সহজ পথ নিয়েছিলাম।"
"কিন্তু আপনার সেই সহজ পথের সুযোগ নিয়ে নাগের দল আপনার আসল ক্ষতি করে দিল।"
রমেশবাবু মাথা নাড়লেন।
"বিমল হালদারের খোঁজ পাচ্ছি না," অর্ণব বললেন। "কিন্তু শহর ছেড়ে যাওয়া সহজ নয়। ইন্সপেক্টর বিশ্বাস ইতিমধ্যে সব রেলস্টেশন ও বাস টার্মিনালে নজর রাখছেন।"
সেদিন রাতেই হাওড়া স্টেশনে ধরা পড়ল বিমল হালদার ওরফে নাগ — সঙ্গে তার দুই সহযোগী। মালপত্রের মধ্যে পাওয়া গেল চুরির সোনা ও টাকার বেশিরভাগ।
অর্ণব পরদিন সকালে চা খেতে খেতে পার্থকে ফোন করলেন।
"কেস শেষ?"
"প্রায়। একটাই জিনিস বাকি।"
"কী?"
"রমেশবাবুকে বোঝানো যে সত্যিকারের ভালো কাজ করতে গেলে মিথ্যের সাহায্য নিতে হয় না।"
পার্থ হাসল। "সেটা কি সম্ভব?"
অর্ণব একটু থেমে বললেন, "সম্ভব। কারণ রমেশবাবুর মন মন্দ নয়। শুধু পথটা ভুল ছিল।"
পরদিন সকাল সাড়ে আটটায় দোকান খুলতে এসে মালিক রমেশচন্দ্র দেবনাথ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ভেতরে ঢুকে দেখেন — লকার ভাঙা, শোকেস তছনছ, আর মেঝেতে পড়ে আছে তাঁর বিশ্বস্ত কর্মচারী সুকান্ত মণ্ডল — অজ্ঞান অবস্থায়। চুরি হয়ে গেছে পঞ্চাশ ভরি সোনার গয়না, নগদ তিন লক্ষ টাকা, আর সবচেয়ে মূল্যবান — একটি বিশেষ হার, যেটি ছিল নাকি একটি রাজপরিবারের পারিবারিক সম্পদ।
রমেশবাবু কাঁপতে কাঁপতে ফোন করলেন থানায়। কিন্তু তার আগেই একটা ছোট্ট কার্ড দেখলেন টেবিলের ওপর — "প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন: অর্ণব রায়, গোয়েন্দা।" কে রেখে গেল এই কার্ড? রমেশবাবু ভ্রু কুঁচকালেন। তারপর ফোন তুললেন।
অর্ণব রায়ের বয়স পঁয়ত্রিশ। মাঝারি উচ্চতা, চোখে সরু ফ্রেমের চশমা, পরনে সাদা পাঞ্জাবি। দেখতে একজন সাধারণ মানুষের মতো, কিন্তু চোখ দুটো অসাধারণ তীক্ষ্ণ — যেন প্রতিটা জিনিস স্ক্যান করে নিচ্ছে মস্তিষ্কে। কলকাতার আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে শুরু করে কর্পোরেট দুনিয়া — সব জায়গায় তার সুনাম আছে।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে অর্ণব প্রথমেই পুলিশের তদন্ত টিমের সাথে পরিচয় করলেন। ইন্সপেক্টর সুজয় বিশ্বাস — বছর পঞ্চাশের রোগা মানুষ, মুখে পান সবসময়। তিনি অর্ণবকে দেখে নাক সিটকালেন।
"আবার আপনি! পুলিশের কাজে নাক গলাবেন না।"
অর্ণব হাসলেন। "নাক গলাচ্ছি না ইন্সপেক্টরবাবু, শুধু একটু দেখছি।"
তিনি সরাসরি গেলেন পিছনের দরজার কাছে। তালা ভাঙা নয় — কেউ চাবি দিয়ে খুলেছে। কিন্তু কীভাবে? সুকান্তর কাছে তো একটাই চাবি থাকত।
"সুকান্তবাবু এখন কেমন আছেন?" অর্ণব জিজ্ঞেস করলেন।
"হাসপাতালে। ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করা হয়েছিল। সন্ধ্যে থেকেই আছেন।"
অর্ণব ঘুরে তাকালেন রমেশবাবুর দিকে। "মানে সুকান্তবাবু কাল রাতে দোকানেই ছিলেন। কেন?"
রমেশবাবু ঢোক গিললেন। "ও বলেছিল একটা হিসাব মেলাতে হবে। তাই থাকছে।"
অর্ণব কিছু বললেন না। কিন্তু মনে মনে একটা প্রশ্নচিহ্ন এঁকে নিলেন।
হাসপাতালে গিয়ে সুকান্তর সাথে দেখা করলেন অর্ণব। বছর পঁচিশের ছেলে, শীর্ণ চেহারা, চোখে ভয়ের ছায়া। অর্ণব বসলেন পাশে।
"কাল রাতে কী হয়েছিল বলুন।"
সুকান্ত জড়িয়ে জড়িয়ে বলল — রাত এগারোটার দিকে হঠাৎ কারেন্ট চলে গেল। অন্ধকারে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেউ তার মুখে কাপড় চেপে ধরল। তারপর আর কিছু মনে নেই।
"একটাই প্রশ্ন," অর্ণব বললেন শান্তভাবে। "পিছনের দরজার চাবি কি সবসময় আপনার কাছেই থাকত?"
সুকান্ত একটু থামল। "হ্যাঁ।"
"কিন্তু কালকে রাতে চাবিটা কোথায় ছিল?"
চুপ।
"সুকান্তবাবু," অর্ণব নরম গলায় বললেন, "আপনি কোনো বিপদে পড়েছেন। সেটা বুঝতে পারছি। কিন্তু সত্যি না বললে আমি সাহায্য করতে পারব না।"
সুকান্তর চোখ ভিজে উঠল। ধীরে ধীরে বলল — তিন সপ্তাহ আগে একদিন রাস্তায় কেউ তাকে আটকায়। বলে যে সুকান্তর বাবার পুরনো ঋণের কথা। যদি একটা রাতের জন্য পিছনের দরজা খোলা রাখে — ঋণ মাফ হবে। সুকান্ত রাজি হয়নি। কিন্তু তিন সপ্তাহ ধরে চাপ বাড়তে থাকে। শেষমেশ...
অর্ণব উঠে দাঁড়ালেন। "এই লোকটাকে চিনতেন?"
"না। কিন্তু গলায় একটা উল্কি ছিল — নীল রঙের সাপ।"
কলকাতার অন্ধকার জগতে নীল সাপের উল্কি মানে একটাই নাম — বিমল হালদার, যাকে সবাই চেনে "নাগ" বলে। পুরনো বস্তির ছেলে, এখন একটা নকল গয়নার ব্যবসার আড়ালে চলে জুয়া আর চোরাকারবার।
অর্ণব সন্ধ্যেবেলা গেলেন শ্যামপুকুরের সেই গলিতে। কিন্তু নাগের আড্ডায় পৌঁছে দেখলেন — দরজা বন্ধ, ভেতর থেকে শব্দ নেই। প্রতিবেশীরা বলল নাগ সেদিন সকাল থেকেই নেই।
হঠাৎ একটা কথা মাথায় এল অর্ণবের। যে হারটি চুরি হয়েছে — রাজপরিবারের সেই হার — সেটা কেনা হয়েছিল মাত্র দুই মাস আগে এক নিলামে। কে কিনেছিল? রমেশবাবু।
"রমেশবাবু," অর্ণব ফোন করলেন, "হারটা আপনি কোথায় কিনেছিলেন?"
"নিউমার্কেটের কাছে এক বিদেশি সংস্থার নিলামে।"
"নিলামে আর কারা ছিল?"
একটু চুপ থেকে রমেশবাবু বললেন, "আরও দুজন বিড করেছিল। একজন ছিল কোনো কর্পোরেট সংস্থার প্রতিনিধি, আর একজন — একজন মহিলা। বেশ অভিজাত চেহারা।"
অর্ণবের চোখ সরু হল। "মহিলার নাম জানেন?"
"না। কিন্তু গাড়িতে উঠেছিল — কালো মার্সিডিজ।"
পরদিন সকালে অর্ণব গেলেন তাঁর পুরনো বন্ধু ও সাংবাদিক পার্থ সেনের কাছে। পার্থ শহরের খবর রাখে সবথেকে বেশি।
"ওই হারটার ইতিহাস জানো?" অর্ণব জিজ্ঞেস করলেন।
পার্থ একটু চিন্তা করে বলল, "শুনেছিলাম — এটা নাকি বর্ধমানের এক রাজপরিবারের। বছর পঞ্চাশ আগে পরিবারটা ভেঙে পড়ে। হারটা নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে মামলা হয়। শেষে বিক্রি করে দেওয়া হয় নিলামে। কিন্তু এক ভাই — ছোটজন — নাকি মরার আগে বলে গিয়েছিল যে হারটা তার মেয়েকে দিতে হবে।"
"সেই মেয়ে কোথায়?"
"কলকাতায়ই থাকে। নাম মৃণালিনী রায়চৌধুরী। বিধবা। রাজারহাটে বড় বাড়ি আছে।"
অর্ণব উঠে দাঁড়াল। "একটা কালো মার্সিডিজ গাড়ি কি আছে তার?"
পার্থ হাসল। "তুমি ইতিমধ্যে জেনে গেছ দেখছি।"
সেই বিকেলেই অর্ণব গেলেন মৃণালিনী রায়চৌধুরীর বাড়িতে। বিশাল বাড়ি, বাগানে ফুলের গাছ, দরজায় পুরনো কালো মার্সিডিজ।
মৃণালিনী দেবী বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। শান্ত মুখ, চোখে এক গভীর বিষাদ। অর্ণবকে দেখে অবাক হলেন না। যেন অপেক্ষায় ছিলেন।
"আসুন," শুধু বললেন।
চা খেতে খেতে অর্ণব সরাসরি বললেন, "হারটা আপনার বাবার ছিল।"
মৃণালিনী দেবী একটু থেমে বললেন, "হ্যাঁ। আমার বাবা মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন — ওটা আমার অধিকার। কিন্তু জেঠুর ছেলে বিক্রি করে দিল।"
"তাহলে কি আপনি...?"
"আমি চুরি করিনি," মৃণালিনী দেবী শান্তভাবে বললেন। "চুরি করার দরকার হয়নি।"
অর্ণব চমকে উঠলেন।
"মানে?" অর্ণব প্রায় ফিসফিস করলেন।
মৃণালিনী দেবী উঠে গেলেন পাশের ঘরে। ফিরে এলেন একটি কাঠের বাক্স নিয়ে। বাক্স খুলতেই ঝলমল করে উঠল — সেই হার।
"এটা...!" অর্ণব অবাক।
"রমেশচন্দ্রবাবু নিজেই আমাকে দিয়ে গেছেন। কাল রাতে।"
অর্ণব কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললেন, "তার মানে পুরো চুরির ঘটনাটা..."
"সাজানো।" মৃণালিনী দেবী বললেন। "রমেশবাবু জানতেন এটা আমার অধিকার। তিনি নিজে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কীভাবে দেবেন? এত টাকা দিয়ে কিনেছেন — এমনি দেওয়া কি সম্ভব? আর বেচতে গেলে অনেক আইনি জটিলতা। তাই চুরির নাটক।"
"কিন্তু বাকি সোনা? তিন লক্ষ টাকা?"
"সেটা আলাদা।" মৃণালিনী দেবী একটু হাসলেন। "সেটা সত্যিই চুরি হয়েছে। রমেশবাবু জানতেন না যে তাঁর নাটকের রাতেই আসল চোরেরাও এসেছিল।"
অর্ণব মাথায় হাত দিলেন। "একই রাতে দুটো আলাদা ঘটনা।"
"হ্যাঁ। রমেশবাবু সুকান্তকে দিয়ে দরজা খোলা রাখিয়েছিলেন হার নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সেই ফাঁকেই বিমল হালদারের দল ঢুকে পড়ে এবং সুকান্তকে অজ্ঞান করে বাকি সব নিয়ে চলে যায়।"
অর্ণব উঠে দাঁড়ালেন। "রমেশবাবু এখন কোথায়?"
রমেশচন্দ্র দেবনাথ তখন বসে আছেন তাঁর দোকানে, মাথা নিচু করে। অর্ণব ঢুকে দরজা বন্ধ করলেন।
"সব জেনেছি।"
রমেশবাবু মুখ তুললেন। চোখে জল।
"আমি ভুল করেছি," ধীরে বললেন। "মিথ্যে মামলা করে পুলিশের সময় নষ্ট করেছি। কিন্তু হারটা ওঁর পাওয়াই উচিত ছিল। আমি শুধু... সহজ পথ নিয়েছিলাম।"
"কিন্তু আপনার সেই সহজ পথের সুযোগ নিয়ে নাগের দল আপনার আসল ক্ষতি করে দিল।"
রমেশবাবু মাথা নাড়লেন।
"বিমল হালদারের খোঁজ পাচ্ছি না," অর্ণব বললেন। "কিন্তু শহর ছেড়ে যাওয়া সহজ নয়। ইন্সপেক্টর বিশ্বাস ইতিমধ্যে সব রেলস্টেশন ও বাস টার্মিনালে নজর রাখছেন।"
সেদিন রাতেই হাওড়া স্টেশনে ধরা পড়ল বিমল হালদার ওরফে নাগ — সঙ্গে তার দুই সহযোগী। মালপত্রের মধ্যে পাওয়া গেল চুরির সোনা ও টাকার বেশিরভাগ।
অর্ণব পরদিন সকালে চা খেতে খেতে পার্থকে ফোন করলেন।
"কেস শেষ?"
"প্রায়। একটাই জিনিস বাকি।"
"কী?"
"রমেশবাবুকে বোঝানো যে সত্যিকারের ভালো কাজ করতে গেলে মিথ্যের সাহায্য নিতে হয় না।"
পার্থ হাসল। "সেটা কি সম্ভব?"
অর্ণব একটু থেমে বললেন, "সম্ভব। কারণ রমেশবাবুর মন মন্দ নয়। শুধু পথটা ভুল ছিল।"
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
শ.ম. শহীদ ২৬/০৩/২০২৬খুব ভালো লাগলো। শুভেচ্ছা রইলো।
-
শঙ্খজিৎ ভট্টাচার্য ২০/০৩/২০২৬অসামান্য
-
ফয়জুল মহী ১৭/০৩/২০২৬দারুণ লিখেছেন
