www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

তখন রাত ঠিক বারোটা

— রাত তখন ঠিক বারোটা —
রাত তখন ঠিক বারোটা বেজে গেছে। শহরের সবচেয়ে পুরনো পাড়ার একটি তিনতলা বাড়ির দোতলায় একা বসে আছে সুমন। বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে। ঘরের একমাত্র জানালাটা খোলা — সেখান দিয়ে ভেজা মাটির গন্ধ ভেতরে ঢুকছে, সাথে অন্ধকার রাতের এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
সুমন বেসরকারি একটি কোম্পানিতে চাকরি করে। এই শহরে সে নতুন এসেছে মাস তিনেক আগে। বাড়িটা নতুন হলেও ভাড়া কম, তাই নিয়ে নিয়েছে। বাড়ির মালিক কোলকাতা থাকেন, আর নিচতলায় থাকে বৃদ্ধা কেয়ারটেকার অপর্ণা সেন। তিনি বলতেন, "রাত হলে একা থাইকেন না বাবা। এই বাড়ি... এই বাড়ির একটা ইতিহাস আছে।" সুমন হাসত। শহুরে মানুষ, ভূতে তার বিশ্বাস নেই।
সেই রাতে সুমন ল্যাপটপে একটা রিপোর্ট তৈরি করছিল। ঘরে একটা টেবিলফ্যান চলছে, পাশে এক মগ চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ — ঝুপ করে সব আলো নিভে গেল।
লোডশেডিং।
শহরের এই পাড়ায় লোডশেডিং নতুন কিছু না। সুমন একটু বিরক্ত হয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করল। ব্যাটারি ব্যাকআপ নেই। মোমবাতিও খুঁজে পাচ্ছে না অন্ধকারে। ফোনের টর্চ জ্বালাল সে। ঘরটা হঠাৎ একটা অদ্ভুত রূপ নিল — আলো-ছায়ার খেলায় কোণগুলো আরও গভীর হয়ে গেল, দেওয়ালের পুরনো রঙ উঠে যাওয়া জায়গাগুলো যেন মুখের মতো দেখাচ্ছে।
"ঘুমিয়ে পড়াই ভালো," নিজেকে বলল সুমন।
কিন্তু ঠিক তখনই সে শুনল — নিচতলা থেকে একটা শব্দ। মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট। যেন কেউ খুব ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। এক ধাপ... দুই ধাপ... তিন ধাপ...
সুমন কান খাড়া করল। অপর্ণা দিদিভাই কি জেগে আছেন? এই রাত বারোটায়? বৃদ্ধা মানুষ, রাত দশটার আগেই ঘুমিয়ে পড়েন সাধারণত।
সুমন উঠে দরজার কাছে গেল। ফোনের আলো দিয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল। সিঁড়ির অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু শব্দ হচ্ছে — ধীর, নিয়মিত, একেবারে নিশ্চিত পদক্ষেপে কেউ উঠে আসছে।
সুমন দরজা খুলল।
কেউ নেই।
সিঁড়িতে শুধু অন্ধকার। বৃষ্টির শব্দ। আর সেই ভেজা মাটির গন্ধ, এখন আরও তীব্র।
"মনের ভুল," বিড়বিড় করল সে। দরজা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
কিন্তু ঘুম আসছে না। চোখ বন্ধ করলেই মনে হচ্ছে ঘরের কোথাও কেউ আছে। কোনো উপস্থিতি। এমন একটা অনুভূতি যেটা সে আগে কখনো পায়নি — যেন ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেছে, তাপমাত্রা কমে গেছে কয়েক ডিগ্রি।
সুমন চোখ খুলল।
এবং বুকের ভেতরটা একটা ঠান্ডা হাতে চেপে ধরল কেউ।
খোলা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে।
তাকে মানুষ বলা যায় না,কারণ সে স্বাভাবিক মানুষের মতো দাঁড়িয়ে নেই — পা দুটো মাটি থেকে সামান্য উপরে ভাসছে। সাদা কাপড়ে মোড়া। চুল খোলা, কোমর পর্যন্ত নামা, ভেজা। মুখটা অন্ধকারের দিকে ফেরানো, বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে।
সুমন নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। গলা শুকিয়ে গেছে। ফোনটা বিছানায় রাখা — আলো জ্বলছে, কিন্তু সেই আলো এই অদ্ভুত মুহূর্তে যেন কাজ করছে না।
মেয়েটা ঘুরল।
সুমন দেখল — মুখ নেই। মুখের জায়গায় শুধু মসৃণ, ফ্যাকাশে চামড়া। কোনো চোখ নেই, নাক নেই, ঠোঁট নেই। শুধু একটা সমতল, ফাঁকা মুখমণ্ডল।
কিন্তু সেই মুখহীন মুখটা যেন সুমনের দিকেই "তাকিয়ে" আছে।
"কে তুমি?" — কণ্ঠস্বর বের হল না সুমনের।
মেয়েটা এগিয়ে এল। এক পা। দুই পা। মাটি স্পর্শ না করে।
সুমন চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা বন্ধ। পালাতে চাইল, কিন্তু শরীর নড়ছে না। মাথার ভেতরে একটা ভোঁতা শব্দ — যেন কোনো পুরনো রেডিওতে স্ট্যাটিক আসছে।
তারপর — ঝলকে বিদ্যুৎ এল।
ঘরে আলো জ্বলে উঠল। ফ্যান চালু হল। এবং মেয়েটা — অদৃশ্য
সুমন বিছানায় বসে হাঁফাচ্ছে। ঘামে ভিজে গেছে গায়ের জামা। ঘরে কেউ নেই। জানালার সামনে শুধু বৃষ্টিভেজা রাতের বাতাস।
সে জল খেতে উঠল। হাত কাঁপছে। রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুলল। ঠান্ডা জলের বোতল বের করে ঢকঢক করে খেল।
"স্বপ্ন দেখছিলাম। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।" নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু তখন সে দেখল — রান্নাঘরের মেঝেতে জলের দাগ। ভেজা পায়ের ছাপ। একটার পর একটা। ছোট, সরু পা। আর সেই ছাপগুলো এসেছে জানালার দিক থেকে — মানে বাইরে থেকে — এবং গেছে ঘরের ভেতরে।
সুমনের হাত থেকে জলের বোতল পড়ে গেল।
পরদিন সকাল।
অপর্ণা দিদিভাই চা নিয়ে এলেন। সুমন রাতের কথা বলল। বৃদ্ধার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
"বাবা, আমি তো বলছিলাম। এই বাড়িতে বহু বছর আগে একটা ঘটনা হইছিল। দোতলায় একটা মেয়ে থাকত — আপনার ঘরেই। নাম ছিল মায়া। ছেলের বাপ ছাইড়া চইলা গেছিল। একদিন মাঝরাতে লোডশেডিং-এর সময় সে জানালা দিয়ে..."
অপর্ণা দিদিভাই থামলেন।
"কী হয়েছিল?" সুমন ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
"পড়ে গিয়েছিল। নাকি লাফ দিয়েছিল — কেউ জানে না। কিন্তু মানুষ বলে, লোডশেডিং হইলেই সে ফিরা আসে। কাউকে খোঁজে। হয়তো যে তাকে ঠেলা দেয়েছিল..."
ঘরে একটা শীতল বাতাস বয়ে গেল।
সুমন সেদিনই বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিল। সন্ধ্যার আগেই গোছগাছ শুরু করল। ব্যাগ গোছাচ্ছে, তাড়াহুড়ো করছে। হোটেলে উঠবে আপাতত।
ঠিক তখন — আবার লোডশেডিং।
সুমন স্থির হয়ে গেল। অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। ফোন কোথায়? ব্যাগের মধ্যে। ব্যাগটা কোথায়? বিছানায়।
সে হাতড়িয়ে এগোল।
এবং তার কাঁধে একটা হাত পড়ল।
ঠান্ডা। অস্বাভাবিক রকম ঠান্ডা। যেন বরফের তৈরি আঙুল।
সুমন পাথর হয়ে গেল।
"তুমি... তুমি কি মায়া?" কোনোমতে বলল সে।
কোনো জবাব নেই। শুধু সেই হাত। সেই স্পর্শ।
তারপর কানের কাছে একটা নিঃশ্বাস অনুভব করল সুমন — ঠান্ডা, স্থির। এবং তারপর একটা কণ্ঠস্বর, এত মৃদু যে সে প্রায় শুনতে পেল না:
"সে এখনো এখানে আছে।"
সুমন বুঝল না — কে এখানে আছে? সেই লোক যে মায়াকে ঠেলে দিয়েছিল? নাকি অন্য কেউ?
আলো এল।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১২৩ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১৩/০৩/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast