একটু জায়গা
আগরতলার ধলেশ্বরের একটি দোতলা অফিস ভবনে 'স্টারলাইন টেকনোলজিস'-এর কার্যালয়। সকাল নয়টার একটু আগেই শাশ্বতী দত্ত অফিসে ঢুকলেন। হাতে কফির মগ, কাঁধে ল্যাপটপ ব্যাগ, চোখে হালকা ক্লান্তির ছায়া। তবু মুখে এক ধরনের প্রশান্তি আছে।
শাশ্বতী এই কোম্পানির সিনিয়র প্রোজেক্ট ম্যানেজার। বয়স সাতাশ। চুলগুলো সবসময় এলোমেলো থাকে, যেন সময় নেই গুছিয়ে রাখার। শাড়ি পরলে সহকর্মীরা বলে 'আজকে কী বিশেষ দিন?' কারণ বেশিরভাগ দিনই তিনি কুর্তা আর জিন্সে থাকেন। সরলতাই তাঁর সৌন্দর্য।
সেদিন অফিসে ঢুকতেই দেখলেন, নিজের ডেস্কের পাশে একটা চেয়ার। আর সেই চেয়ারে বসে আছেন এক অপরিচিত পুরুষ। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, হাতে একটা কলম, আর সামনে খোলা একটা ডায়েরি। মনোযোগ দিয়ে কিছু লিখছেন।
শাশ্বতী গলা খাঁকারি দিলেন। লোকটি মাথা তুলল। চোখে চশমার আড়াল থেকে একজোড়া গভীর চোখ তাঁকে দেখল। তারপর হাসল — সেই হাসিতে একটু লাজুকতা আছে, দেখে মনে হল সততা আছে।
'আমি অনির্বাণ। আজ থেকে জয়েন করলাম। সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট।' সে হাত বাড়িয়ে দিল।
শাশ্বতী হাত মেলাল। 'শাশ্বতী দত্ত। প্রোজেক্ট ম্যানেজার।' সংক্ষিপ্ত পরিচয়, কিন্তু সেই মুহূর্তে যেন একটা অদৃশ্য সুতো জড়িয়ে গেল দুজনের মধ্যে — এতই সূক্ষ্ম যে কেউ টের পায়নি।
প্রথম কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল স্বাভাবিকভাবেই। অনির্বাণ আর শাশ্বতী একই প্রোজেক্টে কাজ করতেন। মিটিং রুমে পাশাপাশি বসতেন, হোয়াইটবোর্ডে আইডিয়া লিখতেন, কখনো তর্ক করতেন, কখনো এক মত হতেন। কাজের মধ্যে একটা ছন্দ তৈরি হয়ে গিয়েছিল তাদের।
শাশ্বতী লক্ষ্য করলেন, অনির্বাণ যখন কোনো সমস্যার সমাধান বের করতে পারে, তখন তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সেই উজ্জ্বলতা তাঁকে অদ্ভুতভাবে টানত। অনির্বাণও খেয়াল করত, শাশ্বতী যখন কোনো প্রেজেন্টেশন দেন, তখন তাঁর কণ্ঠস্বর পাল্টে যায় — আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ, শান্ত, অথচ মোহময়।
একদিন অফিসের ছাদে দুজনই চলে গেলেন লাঞ্চ নিয়ে। আলাদা আলাদাভাবে। কিন্তু ছাদে উঠে দেখলেন একজন আরেকজনকে। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন দুজনেই। তারপর অনির্বাণ বলল, 'একা খাবে, নাকি ক্লায়েন্ট আছে?' শাশ্বতী হেসে বলল, 'আমার ক্লায়েন্টরা ছাদে আসে না।'
সেদিন থেকে লাঞ্চটা ছাদেই হতে লাগল। প্রথমে বিষয় থাকত কাজ। তারপর ধীরে ধীরে অন্য কথা আসত। পরিবার, স্বপ্ন, ভ্রমণ, পছন্দের বই। অনির্বাণ জানাল, সে রবীন্দ্রনাথ পড়ে না, কারণ 'বুঝি না।' শাশ্বতী হাসতে হাসতে বললেন, 'সৎ মানুষ।'
একদিন বৃষ্টি নামল। দুজনই ছাদে ছিল। দৌড়ে নামার পথে অনির্বাণ থামল। বলল, 'একটু দাঁড়াও।' শাশ্বতী ঘুরে তাকালেন। অনির্বাণ বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল, 'আগরতলায় বৃষ্টি মানেই কাদামাখা রাস্তা, ভোগান্তি। কিন্তু ছাদে দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হয় অন্য শহর।' শাশ্বতী চুপ করে পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। বৃষ্টি পড়ছিল, দুজনেই ভিজছিলেন একটু একটু করে। কেউ সরে যাননি।
সমস্যাটা শুরু হলো একটা বড় প্রোজেক্ট ডেডলাইনের আগে। ক্লায়েন্ট পুরো সিস্টেমটা বদলে দিতে চাইল শেষ মুহূর্তে। শাশ্বতী টিমকে বললেন করা যাবে। অনির্বাণ বলল, 'এটা অবাস্তব।'
মিটিং রুমে দুজনের মধ্যে তীক্ষ্ণ বিতর্ক হলো। শাশ্বতী বললেন, 'ক্লায়েন্টকে হ্যাঁ বলতে হবে।' অনির্বাণ বলল, 'মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিলে পরে টিম ডুবে যাবে।' দুজনের কেউ ছাড় দিলেন না। মিটিং শেষে শাশ্বতী চুপ করে বের হয়ে গেলেন। অনির্বাণও।
সেদিন ছাদে কেউ গেল না।
পরদিনও না।
তৃতীয় দিন শাশ্বতী ছাদে উঠলেন। দেখলেন অনির্বাণ বসে আছে। হাতে দুটো চায়ের কাপ। একটা তাঁর দিকে এগিয়ে দিল।
'আমি হয়তো ভুল ছিলাম,' অনির্বাণ বলল।
শাশ্বতী চায়ে চুমুক দিলেন। 'আমিও।' তারপর দুজনেই চুপ করে রইলেন। কিন্তু সেই চুপ থাকাটায় একটা উষ্ণতা ছিল।
সেদিন রাতে বাসায় ফিরে শাশ্বতী বুঝলেন, অনির্বাণের সঙ্গে তর্কটা তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল ।যদিও এটা স্বীকার করতে তাঁর সময় লাগল তিন দিন।
আর অনির্বাণ? সে জানত আগে থেকেই। তবু কিছু বলেনি। পরের সপ্তাহে কোম্পানির বার্ষিক অনুষ্ঠান হলো। সবাই একটু সাজগোজ করে এলো। শাশ্বতী সেদিন শাড়ি পরেছিলেন — গাঢ় নীল, সোনালি পাড়। অনির্বাণ দেখল এবং কিছু বলল না। কিন্তু সন্ধ্যার খাবারের টেবিলে পাশে বসে ফিসফিস করে বলল, 'তোমাকে আজ অন্যরকম দেখাচ্ছে।' শাশ্বতী মুখ নিচু করলেন। 'ভালো না খারাপ?' 'অন্যরকম মানে সবসময় ভালোই হয়।'
তার কিছু দিন পর এলো সেই সন্ধ্যা।
যে সন্ধ্যায় প্রোজেক্ট শেষ হয়েছে। ক্লায়েন্ট খুশি। টিম খুশি। সবাই বাড়ি চলে গেছে। শাশ্বতী একা বসে শেষ কিছু রিপোর্ট গুছাচ্ছিলেন। দেখলেন অনির্বাণ এখনো আছে।
'বাড়ি যাওনি?' তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
'যাব,' অনির্বাণ বলল। 'একটু দাঁড়াও।'
শাশ্বতী ল্যাপটপ বন্ধ করলেন। অনির্বাণ তাঁর সামনে এসে বসল। একটু থামল।
'আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। অনেকদিন ধরে । কিন্তু বলিনি কারণ জানি না তুমি কী ভাববে। আর অফিসের ব্যাপারটাও আছে। তবু যদি না বলি, নিজেকে মাফ করতে পারব না।'
শাশ্বতী চুপ করে তাকিয়ে রইলেন।
অনির্বাণ বলল, 'তোমার সাথে কাজ করতে করতে আমি বুঝেছি, একটা মানুষকে তখনই ভালো লাগে যখন সে তোমাকে রাগাতেও পারে, তর্ক করতেও পারে, আবার চা হাতে পাশে দাঁড়াতেও পারে। তুমি সেটা পারো। আমার কাছে তুমি শুধু সহকর্মী নও।'
অফিসের জানালা দিয়ে ধলেশ্বরের সন্ধ্যার আলো দেখা যাচ্ছে।
শাশ্বতী অনেকক্ষণ কিছু বললেন না। তারপর ধীরে বললেন, 'আমি জানতাম তুমি একদিন বলবে। আমিও অপেক্ষা করছিলাম।'
'কেন বলোনি আগে?'
'কারণ তুমি বললে ভালো লাগে।' এই বলে তিনি হাসলেন — সেই হাসি যা অনির্বাণ এতদিন ধরে দেখে আসছিল, কিন্তু আজ মনে হলো প্রথম দেখছে।
পরের দিন অফিসে সবকিছু আগের মতোই ছিল। কাজ ছিল, মিটিং ছিল, ডেডলাইন ছিল। তবু কিছু একটা পাল্টে গিয়েছিল। অনির্বাণ কফি আনত, শাশ্বতী টেবিলে রাখতেন বিস্কিট। লাঞ্চে ছাদে যেতেন দুজনে। তর্ক হতো, মিল হতো।
সহকর্মীরা বুঝত। কিন্তু কেউ বলত না কিছু। কারণ কিছু সম্পর্ক আছে যেগুলো না বললেও বোঝা যায়।
একদিন অনির্বাণ বলল, 'এই অফিসটা না থাকলে তোমাকে চিনতাম না।' শাশ্বতী বললেন, 'এই অফিসটাই হয়তো আমাদের বন্ধুত্ব শুরুর ঠিকানা ।'
ধলেশ্বরের সেই দোতলায়, হোয়াইটবোর্ডের পাশে, বৃষ্টিভেজা ছাদে, কফির ধোঁয়ায় — একটা গল্প শুরু হয়েছিল। কোনো নাটকীয়তা ছাড়া, শুধু দুটো মানুষ, একটু একটু করে, একে অপরের হয়ে উঠেছিল।
আর সেটাই সবচেয়ে সুন্দর রোমান্স — যেটা ফুলের তোড়ায় নয়, রোজকার ছোট ছোট মুহূর্তে বেড়ে ওঠে।এক্ট
শাশ্বতী এই কোম্পানির সিনিয়র প্রোজেক্ট ম্যানেজার। বয়স সাতাশ। চুলগুলো সবসময় এলোমেলো থাকে, যেন সময় নেই গুছিয়ে রাখার। শাড়ি পরলে সহকর্মীরা বলে 'আজকে কী বিশেষ দিন?' কারণ বেশিরভাগ দিনই তিনি কুর্তা আর জিন্সে থাকেন। সরলতাই তাঁর সৌন্দর্য।
সেদিন অফিসে ঢুকতেই দেখলেন, নিজের ডেস্কের পাশে একটা চেয়ার। আর সেই চেয়ারে বসে আছেন এক অপরিচিত পুরুষ। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, হাতে একটা কলম, আর সামনে খোলা একটা ডায়েরি। মনোযোগ দিয়ে কিছু লিখছেন।
শাশ্বতী গলা খাঁকারি দিলেন। লোকটি মাথা তুলল। চোখে চশমার আড়াল থেকে একজোড়া গভীর চোখ তাঁকে দেখল। তারপর হাসল — সেই হাসিতে একটু লাজুকতা আছে, দেখে মনে হল সততা আছে।
'আমি অনির্বাণ। আজ থেকে জয়েন করলাম। সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট।' সে হাত বাড়িয়ে দিল।
শাশ্বতী হাত মেলাল। 'শাশ্বতী দত্ত। প্রোজেক্ট ম্যানেজার।' সংক্ষিপ্ত পরিচয়, কিন্তু সেই মুহূর্তে যেন একটা অদৃশ্য সুতো জড়িয়ে গেল দুজনের মধ্যে — এতই সূক্ষ্ম যে কেউ টের পায়নি।
প্রথম কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল স্বাভাবিকভাবেই। অনির্বাণ আর শাশ্বতী একই প্রোজেক্টে কাজ করতেন। মিটিং রুমে পাশাপাশি বসতেন, হোয়াইটবোর্ডে আইডিয়া লিখতেন, কখনো তর্ক করতেন, কখনো এক মত হতেন। কাজের মধ্যে একটা ছন্দ তৈরি হয়ে গিয়েছিল তাদের।
শাশ্বতী লক্ষ্য করলেন, অনির্বাণ যখন কোনো সমস্যার সমাধান বের করতে পারে, তখন তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সেই উজ্জ্বলতা তাঁকে অদ্ভুতভাবে টানত। অনির্বাণও খেয়াল করত, শাশ্বতী যখন কোনো প্রেজেন্টেশন দেন, তখন তাঁর কণ্ঠস্বর পাল্টে যায় — আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ, শান্ত, অথচ মোহময়।
একদিন অফিসের ছাদে দুজনই চলে গেলেন লাঞ্চ নিয়ে। আলাদা আলাদাভাবে। কিন্তু ছাদে উঠে দেখলেন একজন আরেকজনকে। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন দুজনেই। তারপর অনির্বাণ বলল, 'একা খাবে, নাকি ক্লায়েন্ট আছে?' শাশ্বতী হেসে বলল, 'আমার ক্লায়েন্টরা ছাদে আসে না।'
সেদিন থেকে লাঞ্চটা ছাদেই হতে লাগল। প্রথমে বিষয় থাকত কাজ। তারপর ধীরে ধীরে অন্য কথা আসত। পরিবার, স্বপ্ন, ভ্রমণ, পছন্দের বই। অনির্বাণ জানাল, সে রবীন্দ্রনাথ পড়ে না, কারণ 'বুঝি না।' শাশ্বতী হাসতে হাসতে বললেন, 'সৎ মানুষ।'
একদিন বৃষ্টি নামল। দুজনই ছাদে ছিল। দৌড়ে নামার পথে অনির্বাণ থামল। বলল, 'একটু দাঁড়াও।' শাশ্বতী ঘুরে তাকালেন। অনির্বাণ বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল, 'আগরতলায় বৃষ্টি মানেই কাদামাখা রাস্তা, ভোগান্তি। কিন্তু ছাদে দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হয় অন্য শহর।' শাশ্বতী চুপ করে পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। বৃষ্টি পড়ছিল, দুজনেই ভিজছিলেন একটু একটু করে। কেউ সরে যাননি।
সমস্যাটা শুরু হলো একটা বড় প্রোজেক্ট ডেডলাইনের আগে। ক্লায়েন্ট পুরো সিস্টেমটা বদলে দিতে চাইল শেষ মুহূর্তে। শাশ্বতী টিমকে বললেন করা যাবে। অনির্বাণ বলল, 'এটা অবাস্তব।'
মিটিং রুমে দুজনের মধ্যে তীক্ষ্ণ বিতর্ক হলো। শাশ্বতী বললেন, 'ক্লায়েন্টকে হ্যাঁ বলতে হবে।' অনির্বাণ বলল, 'মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিলে পরে টিম ডুবে যাবে।' দুজনের কেউ ছাড় দিলেন না। মিটিং শেষে শাশ্বতী চুপ করে বের হয়ে গেলেন। অনির্বাণও।
সেদিন ছাদে কেউ গেল না।
পরদিনও না।
তৃতীয় দিন শাশ্বতী ছাদে উঠলেন। দেখলেন অনির্বাণ বসে আছে। হাতে দুটো চায়ের কাপ। একটা তাঁর দিকে এগিয়ে দিল।
'আমি হয়তো ভুল ছিলাম,' অনির্বাণ বলল।
শাশ্বতী চায়ে চুমুক দিলেন। 'আমিও।' তারপর দুজনেই চুপ করে রইলেন। কিন্তু সেই চুপ থাকাটায় একটা উষ্ণতা ছিল।
সেদিন রাতে বাসায় ফিরে শাশ্বতী বুঝলেন, অনির্বাণের সঙ্গে তর্কটা তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল ।যদিও এটা স্বীকার করতে তাঁর সময় লাগল তিন দিন।
আর অনির্বাণ? সে জানত আগে থেকেই। তবু কিছু বলেনি। পরের সপ্তাহে কোম্পানির বার্ষিক অনুষ্ঠান হলো। সবাই একটু সাজগোজ করে এলো। শাশ্বতী সেদিন শাড়ি পরেছিলেন — গাঢ় নীল, সোনালি পাড়। অনির্বাণ দেখল এবং কিছু বলল না। কিন্তু সন্ধ্যার খাবারের টেবিলে পাশে বসে ফিসফিস করে বলল, 'তোমাকে আজ অন্যরকম দেখাচ্ছে।' শাশ্বতী মুখ নিচু করলেন। 'ভালো না খারাপ?' 'অন্যরকম মানে সবসময় ভালোই হয়।'
তার কিছু দিন পর এলো সেই সন্ধ্যা।
যে সন্ধ্যায় প্রোজেক্ট শেষ হয়েছে। ক্লায়েন্ট খুশি। টিম খুশি। সবাই বাড়ি চলে গেছে। শাশ্বতী একা বসে শেষ কিছু রিপোর্ট গুছাচ্ছিলেন। দেখলেন অনির্বাণ এখনো আছে।
'বাড়ি যাওনি?' তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
'যাব,' অনির্বাণ বলল। 'একটু দাঁড়াও।'
শাশ্বতী ল্যাপটপ বন্ধ করলেন। অনির্বাণ তাঁর সামনে এসে বসল। একটু থামল।
'আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। অনেকদিন ধরে । কিন্তু বলিনি কারণ জানি না তুমি কী ভাববে। আর অফিসের ব্যাপারটাও আছে। তবু যদি না বলি, নিজেকে মাফ করতে পারব না।'
শাশ্বতী চুপ করে তাকিয়ে রইলেন।
অনির্বাণ বলল, 'তোমার সাথে কাজ করতে করতে আমি বুঝেছি, একটা মানুষকে তখনই ভালো লাগে যখন সে তোমাকে রাগাতেও পারে, তর্ক করতেও পারে, আবার চা হাতে পাশে দাঁড়াতেও পারে। তুমি সেটা পারো। আমার কাছে তুমি শুধু সহকর্মী নও।'
অফিসের জানালা দিয়ে ধলেশ্বরের সন্ধ্যার আলো দেখা যাচ্ছে।
শাশ্বতী অনেকক্ষণ কিছু বললেন না। তারপর ধীরে বললেন, 'আমি জানতাম তুমি একদিন বলবে। আমিও অপেক্ষা করছিলাম।'
'কেন বলোনি আগে?'
'কারণ তুমি বললে ভালো লাগে।' এই বলে তিনি হাসলেন — সেই হাসি যা অনির্বাণ এতদিন ধরে দেখে আসছিল, কিন্তু আজ মনে হলো প্রথম দেখছে।
পরের দিন অফিসে সবকিছু আগের মতোই ছিল। কাজ ছিল, মিটিং ছিল, ডেডলাইন ছিল। তবু কিছু একটা পাল্টে গিয়েছিল। অনির্বাণ কফি আনত, শাশ্বতী টেবিলে রাখতেন বিস্কিট। লাঞ্চে ছাদে যেতেন দুজনে। তর্ক হতো, মিল হতো।
সহকর্মীরা বুঝত। কিন্তু কেউ বলত না কিছু। কারণ কিছু সম্পর্ক আছে যেগুলো না বললেও বোঝা যায়।
একদিন অনির্বাণ বলল, 'এই অফিসটা না থাকলে তোমাকে চিনতাম না।' শাশ্বতী বললেন, 'এই অফিসটাই হয়তো আমাদের বন্ধুত্ব শুরুর ঠিকানা ।'
ধলেশ্বরের সেই দোতলায়, হোয়াইটবোর্ডের পাশে, বৃষ্টিভেজা ছাদে, কফির ধোঁয়ায় — একটা গল্প শুরু হয়েছিল। কোনো নাটকীয়তা ছাড়া, শুধু দুটো মানুষ, একটু একটু করে, একে অপরের হয়ে উঠেছিল।
আর সেটাই সবচেয়ে সুন্দর রোমান্স — যেটা ফুলের তোড়ায় নয়, রোজকার ছোট ছোট মুহূর্তে বেড়ে ওঠে।এক্ট
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
ফয়জুল মহী ১১/০৩/২০২৬

খুব চমৎকার লিখেছেন।