নিঃশব্দ ভাঙন
রাতের শেষে ভোর আসে—এ কথা সবাই জানে। কিন্তু কিছু রাত আছে, যেগুলো ভোরের দিকে এগোয় না; বরং নিজের গভীরতার দিকেই ঢুকে পড়ে। সেই রাতে ঋদ্ধিমা ঘুমোতে পারেনি। বিছানার এক কোণে শুয়ে সে ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। ফ্যানের ঘূর্ণন ধীরে ধীরে তার চিন্তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছিল। প্রতিটি ঘূর্ণনে যেন একটি করে প্রশ্ন জমে উঠছিল—কতটা নীরবতা স্বাভাবিক? আর কতটা নীরবতা অবহেলা?
ঘড়ির কাঁটা তিনটে ছুঁই ছুঁই। শহরের ভেতর তখন আর কোনো শব্দ নেই। কেবল দূরের কোনো ট্রেনের হালকা গুঞ্জন, আর জানলার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া ঠান্ডা বাতাস। ঋদ্ধিমার মনে হলো—এই বাতাসের মতোই কি সম্পর্ক? স্পর্শ করে, অথচ ধরা যায় না। উপস্থিত থাকে, অথচ নিজের মতো করে। সে বারান্দার দিকে তাকাল। পর্দাটা সামান্য দুলছে। যেন কেউ বাইরে থেকে ডাকছে, কিন্তু সাহস করে ভেতরে আসছে না। ঠিক অগ্নিভের মতো।
অগ্নিভের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বৃষ্টির দুপুরে। সে ছাতা ভুলে এসেছিল, আর অগ্নিভ তার ছাতার অর্ধেকটা এগিয়ে দিয়েছিল বিনা কথায়। সেই নিঃশব্দ দেওয়াটাই ছিল তাদের প্রথম কথোপকথন। পরে হাসতে হাসতে বলেছিল—"ভিজলে ঠান্ডা লাগবে।" ঋদ্ধিমা তখন ভেবেছিল, এই মানুষটা কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাস করে। সেটাকেই সে ভালোবেসেছিল। আজ সেই একই বৈশিষ্ট্য তার কাছে সবচেয়ে বড় দূরত্ব হয়ে উঠেছে।
সে ধীরে ধীরে উঠে বসল। পাশের টেবিলে রাখা ডায়েরিটা আবার খুলল। কিছু পাতা আগেই ভাঁজ করা—চেনা হাতের লেখা, চেনা দীর্ঘশ্বাস। আজ সে নতুন করে কিছু লিখতে চায় না। শুধু পুরনো লেখাগুলো পড়ে যেতে ইচ্ছে করে। যেন সেই পড়া থেকেই কোনো উত্তর বেরিয়ে আসবে।
"আজ অগ্নিভ কথা বলেনি। ব্যস্ত বলেছিল। আমি বুঝেছি, তবু বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা রয়ে গেছে।"
নিজের লেখাই আজ তার কাছে অপরিচিত ঠেকল। সে কি সত্যিই বুঝেছিল, না কি বোঝার ভান করেছিল? সম্পর্কের ভিত কি কখনো ভানের ওপর দাঁড়াতে পারে? ডায়েরির পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে আরো পুরনো একটা অংশে গিয়ে থামল। তখন লেখা ছিল—"অগ্নিভ আজ অফিস থেকে ফিরে বলল, তোমার মুখ দেখলেই সব ক্লান্তি চলে যায়।" ঋদ্ধিমার বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড় দিল। সেই মানুষটাই কি এখন কথা বলতে ভুলে গেছে? নাকি ক্লান্তি এতটাই বেড়ে গেছে যে তার মুখ দেখাও আর যথেষ্ট নয়?
এই একই সময়ে, শহরের অন্য প্রান্তে অগ্নিভ অফিসের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। ল্যাপটপ বন্ধ, কিন্তু মাথার ভেতরের স্ক্রিন বন্ধ হচ্ছে না। দিনের পর দিন কাজের চাপ, সময়ের অভাব—সব মিলিয়ে সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে। ঋদ্ধিমার মেসেজটা সে দেখেছিল। উত্তর দিতে চেয়েও দেয়নি। ঠিক না ভেবে, শব্দ বেছে না নিয়ে কিছু লিখতে তার ভয় হচ্ছিল।
তার মনে হলো—কখন থেকে সম্পর্কটা এত হিসেবি হয়ে গেল? আগে তো কথা হতো না বলেও বোঝা যেত। এখন বোঝার জন্যও শব্দ দরকার। অফিসের ফাঁকা করিডরে সে একা বসে ভাবছিল, কীভাবে একটা মানুষ কাছে থাকতে থাকতেই এতটা দূরে সরে যায়? না সে সরেছে, না ঋদ্ধিমা সরেছে—তবু মাঝখানে একটা অদৃশ্য কাচের দেওয়াল কখন যেন তৈরি হয়ে গেছে। দুজনে একে অপরকে দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু স্পর্শ পৌঁছাচ্ছে না।
সে ফোনটা উল্টে রাখল। জানত, এই উল্টে রাখার সিদ্ধান্তটাই হয়তো পরের কোনো ভাঙনের সূচনা। তবু সে ক্লান্ত। প্রতিদিন শক্ত থাকার অভিনয় করতে করতে ক্লান্ত। অফিসে সবার সামনে হাসিমুখে থাকা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, নেতৃত্ব দেওয়া—এত সব করতে করতে একটা মুহূর্তও নিজের জন্য থাকে না। ঋদ্ধিমাকে বলা হয় না, কারণ সে নিজেই জানে না ঠিক কী বলবে। ক্লান্তির কথা বলতে গেলে কেমন দুর্বল লাগে নিজেকে।
ভোরের আলো ধীরে ধীরে জানলার পর্দায় ছায়া ফেলল। ঋদ্ধিমা উঠে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। শহর জেগে উঠছে। দুধওয়ালার সাইকেল, পাড়ার কাকের ডাক, দূরের মন্দিরের ঘণ্টা—সব মিলিয়ে জীবনের স্বাভাবিকতা ফিরে আসছে। অথচ তার ভেতরে কিছুই স্বাভাবিক নয়।
সে ভাবল—সম্পর্ক কি এমনই হয়? যেখানে বাইরে সব ঠিকঠাক চলে, কিন্তু ভেতরে জমে থাকে অগোছালো অনুভূতি? বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে সে নিচের রাস্তা দেখল। একটা বৃদ্ধ মানুষ ধীরে ধীরে হাঁটছেন। তাঁর পাশে তাঁর স্ত্রী। কোনো কথা নেই দুজনের মধ্যে, অথচ পাশাপাশি হাঁটাটাই যেন তাদের কথোপকথন। ঋদ্ধিমার বুকের ভেতর একটা শীতল বাতাস বয়ে গেল। এই নিঃশব্দ সাহচর্যটাও তো একটা ভাষা। সে কি সেটা ভুলে গেছে? অগ্নিভ কি ভুলে গেছে?
মোবাইলটা হাতে নিল। অগ্নিভের নামটা স্ক্রিনে নেই। কোনো নতুন নোটিফিকেশন নেই। আশ্চর্যভাবে, আজ তার কষ্ট কম লাগছে। হয়তো অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে সে। এই অভ্যস্ততাই কি সবচেয়ে বড় বিপদ?
সকালের কাজে মন দিল ঋদ্ধিমা। কফির কাপ, জানলার ধুলো মোছা, গাছগুলোতে জল দেওয়া—সবকিছু খুব মন দিয়ে করল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মনে হচ্ছিল, এই ছোট ছোট নিয়মিত কাজই তো জীবনের ভিত। তুলসী গাছটায় জল দিতে গিয়ে দেখল, একটা নতুন কুঁড়ি এসেছে। কাল ছিল না, আজ হঠাৎ এসে গেছে। কেউ জানান দেয়নি, কোনো ঘোষণা নেই—শুধু আছে। সম্পর্কও কি তেমনই নয়? প্রতিদিনের সামান্য যত্ন, সামান্য উপস্থিতি—এই নিয়েই কি টিকে থাকে? এই নিয়েই কি একদিন হঠাৎ কুঁড়ি আসে?
অগ্নিভ অফিসে পৌঁছল একটু দেরিতে। লিফটে উঠতে উঠতে তার মনে পড়ল কলেজের সেই দিনগুলোর কথা। তখন দেরি মানেই ছিল অপেক্ষা। কেউ রাগ করত, কেউ হাসত। এখন দেরি মানে কেবল মিসড কল আর পড়ে থাকা মেসেজ। লিফটের আয়নায় সে নিজের মুখ দেখল। চোখের নিচে কালো দাগ, চোয়াল শক্ত। এই মুখটা চেনা? নাকি এটাও অপরিচিত হয়ে গেছে?
সে ডেস্কে বসে প্রথম মেইলটা খুলল, তারপর দ্বিতীয়টা। কাজের ভিড়ের মধ্যেও বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছিল ফোনের দিকে। একটা অদ্ভুত টান। সে বুঝতে পারছিল না এই টানটা কীসের—অপরাধবোধের, নাকি ভালোবাসার, নাকি দুটো একসঙ্গে মিশে যায় অনেক সময়। শেষমেশ সে ঋদ্ধিমাকে একটা ছোট মেসেজ পাঠাল—"আজ একটু কথা হবে?"
মেসেজ পাঠানোর পরেই তার বুকের ভেতর চাপটা একটু হালকা হলো। বড় কোনো ব্যাখ্যা নয়, কোনো প্রতিশ্রুতি নয়—শুধু কথা বলার ইচ্ছে। এইটুকুই কি যথেষ্ট? সে জানে না। কিন্তু এই না-জানাটুকু নিয়েও এগিয়ে যাওয়াটাই হয়তো সাহস।
ঋদ্ধিমা মেসেজটা পেল দুপুরের দিকে। সে তখন রান্নাঘরে। ফোনটা কাঁপতেই তার হাত থমকে গেল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখেই সে বুঝে গেল—সব ভাঙন চূড়ান্ত হয়নি। কতটুকু বাকি আছে, কতটুকু মেরামত হবে—সেটা জানা নেই। কিন্তু মেসেজটা এসেছে। এইটুকুই এখন অনেক।
সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। চেয়ারে বসে একটু সময় নিল। ভাবল—সব প্রশ্নের উত্তর কি এখনই দিতে হবে? নাকি কিছু উত্তর অপেক্ষার মধ্যেই স্পষ্ট হয়? জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। রোদ পড়েছে। গাছের পাতায় ঝলমল করছে। এই আলোটুকুই কি যথেষ্ট নয় একটা দিন শুরু করার জন্য?
শেষমেশ সে লিখল—"হ্যাঁ, হবে।"
দুটো শব্দ। অথচ এই দুটো শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে রইল অনেক কথা—অভিযোগ, বোঝাপড়া, ক্লান্তি আর এখনো বেঁচে থাকা ভালোবাসা। মেসেজটা পাঠিয়ে সে ফোনটা রেখে দিল। বুকের ভেতরটা এখন আর পাথর নয়। একটু নরম লাগছে। যেন অনেকদিনের জমে থাকা বরফ সামান্য গলতে শুরু করেছে।
সন্ধ্যেবেলা আকাশে মেঘ জমল। হালকা বাতাসে বারান্দার পর্দা দুলছে। ঋদ্ধিমা আবার সেই পরিচিত জায়গায় এসে দাঁড়াল। এইখানে দাঁড়িয়ে সে কতবার ভেবেছে, কতবার কেঁদেছে, কতবার নিজেকে বুঝিয়েছে। আজ তার মনে হচ্ছে না যে নীরবতা তাকে গ্রাস করছে। বরং এই নীরবতার ভেতরেই সে নিজের অবস্থানটা বুঝতে পারছে।
সম্পর্ক মানে হয়তো সবসময় একসঙ্গে হাঁটা নয়। কখনো কখনো পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আলাদা আলাদা দিকেও তাকানো। তবু জানার চেষ্টা করা—অন্যজন ঠিক কোথায় আছে। সে ভাবল, দুজন মানুষ যখন দুটো আলাদা সংগ্রামের মধ্যে থাকে, তখন একে অপরকে না বোঝাটা হয়তো অবহেলা নয়—বরং নিজের ভেতরের ঝড়ের কাছে পরাজিত হওয়া। অগ্নিভও হয়তো তেমনই একটা ঝড়ের মধ্যে আছে। সে একা লড়ছে। যেমন সেও একা ছিল।
রাত নামছে। শহরের আলো একে একে জ্বলছে। ঋদ্ধিমা গভীর শ্বাস নিল। সে জানে, সামনে কথা হবে। সহজ হবে না। অনেক কিছু বলতে হবে, অনেক কিছু শুনতে হবে। হয়তো কান্না আসবে। হয়তো রাগও। তবু এই অপেক্ষাটুকু এখন আর ভারী লাগছে না।
কারণ সে বুঝতে শিখছে—ভাঙনের শব্দ যতই নীরব হোক, মেরামতির প্রক্রিয়াও ততটাই নিঃশব্দ। এবং সেই নিঃশব্দতাতেই কখনো কখনো সম্পর্কের আসল ভিত তৈরি হয়। দুটো মানুষ যখন ভাঙতে ভাঙতেও একে অপরের কাছে ফিরে আসে, তখন সেই ফেরাটাই সবচেয়ে বড় কথা। বাকি সব পরে।
ঘড়ির কাঁটা তিনটে ছুঁই ছুঁই। শহরের ভেতর তখন আর কোনো শব্দ নেই। কেবল দূরের কোনো ট্রেনের হালকা গুঞ্জন, আর জানলার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া ঠান্ডা বাতাস। ঋদ্ধিমার মনে হলো—এই বাতাসের মতোই কি সম্পর্ক? স্পর্শ করে, অথচ ধরা যায় না। উপস্থিত থাকে, অথচ নিজের মতো করে। সে বারান্দার দিকে তাকাল। পর্দাটা সামান্য দুলছে। যেন কেউ বাইরে থেকে ডাকছে, কিন্তু সাহস করে ভেতরে আসছে না। ঠিক অগ্নিভের মতো।
অগ্নিভের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বৃষ্টির দুপুরে। সে ছাতা ভুলে এসেছিল, আর অগ্নিভ তার ছাতার অর্ধেকটা এগিয়ে দিয়েছিল বিনা কথায়। সেই নিঃশব্দ দেওয়াটাই ছিল তাদের প্রথম কথোপকথন। পরে হাসতে হাসতে বলেছিল—"ভিজলে ঠান্ডা লাগবে।" ঋদ্ধিমা তখন ভেবেছিল, এই মানুষটা কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাস করে। সেটাকেই সে ভালোবেসেছিল। আজ সেই একই বৈশিষ্ট্য তার কাছে সবচেয়ে বড় দূরত্ব হয়ে উঠেছে।
সে ধীরে ধীরে উঠে বসল। পাশের টেবিলে রাখা ডায়েরিটা আবার খুলল। কিছু পাতা আগেই ভাঁজ করা—চেনা হাতের লেখা, চেনা দীর্ঘশ্বাস। আজ সে নতুন করে কিছু লিখতে চায় না। শুধু পুরনো লেখাগুলো পড়ে যেতে ইচ্ছে করে। যেন সেই পড়া থেকেই কোনো উত্তর বেরিয়ে আসবে।
"আজ অগ্নিভ কথা বলেনি। ব্যস্ত বলেছিল। আমি বুঝেছি, তবু বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা রয়ে গেছে।"
নিজের লেখাই আজ তার কাছে অপরিচিত ঠেকল। সে কি সত্যিই বুঝেছিল, না কি বোঝার ভান করেছিল? সম্পর্কের ভিত কি কখনো ভানের ওপর দাঁড়াতে পারে? ডায়েরির পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে আরো পুরনো একটা অংশে গিয়ে থামল। তখন লেখা ছিল—"অগ্নিভ আজ অফিস থেকে ফিরে বলল, তোমার মুখ দেখলেই সব ক্লান্তি চলে যায়।" ঋদ্ধিমার বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড় দিল। সেই মানুষটাই কি এখন কথা বলতে ভুলে গেছে? নাকি ক্লান্তি এতটাই বেড়ে গেছে যে তার মুখ দেখাও আর যথেষ্ট নয়?
এই একই সময়ে, শহরের অন্য প্রান্তে অগ্নিভ অফিসের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। ল্যাপটপ বন্ধ, কিন্তু মাথার ভেতরের স্ক্রিন বন্ধ হচ্ছে না। দিনের পর দিন কাজের চাপ, সময়ের অভাব—সব মিলিয়ে সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে। ঋদ্ধিমার মেসেজটা সে দেখেছিল। উত্তর দিতে চেয়েও দেয়নি। ঠিক না ভেবে, শব্দ বেছে না নিয়ে কিছু লিখতে তার ভয় হচ্ছিল।
তার মনে হলো—কখন থেকে সম্পর্কটা এত হিসেবি হয়ে গেল? আগে তো কথা হতো না বলেও বোঝা যেত। এখন বোঝার জন্যও শব্দ দরকার। অফিসের ফাঁকা করিডরে সে একা বসে ভাবছিল, কীভাবে একটা মানুষ কাছে থাকতে থাকতেই এতটা দূরে সরে যায়? না সে সরেছে, না ঋদ্ধিমা সরেছে—তবু মাঝখানে একটা অদৃশ্য কাচের দেওয়াল কখন যেন তৈরি হয়ে গেছে। দুজনে একে অপরকে দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু স্পর্শ পৌঁছাচ্ছে না।
সে ফোনটা উল্টে রাখল। জানত, এই উল্টে রাখার সিদ্ধান্তটাই হয়তো পরের কোনো ভাঙনের সূচনা। তবু সে ক্লান্ত। প্রতিদিন শক্ত থাকার অভিনয় করতে করতে ক্লান্ত। অফিসে সবার সামনে হাসিমুখে থাকা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, নেতৃত্ব দেওয়া—এত সব করতে করতে একটা মুহূর্তও নিজের জন্য থাকে না। ঋদ্ধিমাকে বলা হয় না, কারণ সে নিজেই জানে না ঠিক কী বলবে। ক্লান্তির কথা বলতে গেলে কেমন দুর্বল লাগে নিজেকে।
ভোরের আলো ধীরে ধীরে জানলার পর্দায় ছায়া ফেলল। ঋদ্ধিমা উঠে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। শহর জেগে উঠছে। দুধওয়ালার সাইকেল, পাড়ার কাকের ডাক, দূরের মন্দিরের ঘণ্টা—সব মিলিয়ে জীবনের স্বাভাবিকতা ফিরে আসছে। অথচ তার ভেতরে কিছুই স্বাভাবিক নয়।
সে ভাবল—সম্পর্ক কি এমনই হয়? যেখানে বাইরে সব ঠিকঠাক চলে, কিন্তু ভেতরে জমে থাকে অগোছালো অনুভূতি? বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে সে নিচের রাস্তা দেখল। একটা বৃদ্ধ মানুষ ধীরে ধীরে হাঁটছেন। তাঁর পাশে তাঁর স্ত্রী। কোনো কথা নেই দুজনের মধ্যে, অথচ পাশাপাশি হাঁটাটাই যেন তাদের কথোপকথন। ঋদ্ধিমার বুকের ভেতর একটা শীতল বাতাস বয়ে গেল। এই নিঃশব্দ সাহচর্যটাও তো একটা ভাষা। সে কি সেটা ভুলে গেছে? অগ্নিভ কি ভুলে গেছে?
মোবাইলটা হাতে নিল। অগ্নিভের নামটা স্ক্রিনে নেই। কোনো নতুন নোটিফিকেশন নেই। আশ্চর্যভাবে, আজ তার কষ্ট কম লাগছে। হয়তো অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে সে। এই অভ্যস্ততাই কি সবচেয়ে বড় বিপদ?
সকালের কাজে মন দিল ঋদ্ধিমা। কফির কাপ, জানলার ধুলো মোছা, গাছগুলোতে জল দেওয়া—সবকিছু খুব মন দিয়ে করল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মনে হচ্ছিল, এই ছোট ছোট নিয়মিত কাজই তো জীবনের ভিত। তুলসী গাছটায় জল দিতে গিয়ে দেখল, একটা নতুন কুঁড়ি এসেছে। কাল ছিল না, আজ হঠাৎ এসে গেছে। কেউ জানান দেয়নি, কোনো ঘোষণা নেই—শুধু আছে। সম্পর্কও কি তেমনই নয়? প্রতিদিনের সামান্য যত্ন, সামান্য উপস্থিতি—এই নিয়েই কি টিকে থাকে? এই নিয়েই কি একদিন হঠাৎ কুঁড়ি আসে?
অগ্নিভ অফিসে পৌঁছল একটু দেরিতে। লিফটে উঠতে উঠতে তার মনে পড়ল কলেজের সেই দিনগুলোর কথা। তখন দেরি মানেই ছিল অপেক্ষা। কেউ রাগ করত, কেউ হাসত। এখন দেরি মানে কেবল মিসড কল আর পড়ে থাকা মেসেজ। লিফটের আয়নায় সে নিজের মুখ দেখল। চোখের নিচে কালো দাগ, চোয়াল শক্ত। এই মুখটা চেনা? নাকি এটাও অপরিচিত হয়ে গেছে?
সে ডেস্কে বসে প্রথম মেইলটা খুলল, তারপর দ্বিতীয়টা। কাজের ভিড়ের মধ্যেও বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছিল ফোনের দিকে। একটা অদ্ভুত টান। সে বুঝতে পারছিল না এই টানটা কীসের—অপরাধবোধের, নাকি ভালোবাসার, নাকি দুটো একসঙ্গে মিশে যায় অনেক সময়। শেষমেশ সে ঋদ্ধিমাকে একটা ছোট মেসেজ পাঠাল—"আজ একটু কথা হবে?"
মেসেজ পাঠানোর পরেই তার বুকের ভেতর চাপটা একটু হালকা হলো। বড় কোনো ব্যাখ্যা নয়, কোনো প্রতিশ্রুতি নয়—শুধু কথা বলার ইচ্ছে। এইটুকুই কি যথেষ্ট? সে জানে না। কিন্তু এই না-জানাটুকু নিয়েও এগিয়ে যাওয়াটাই হয়তো সাহস।
ঋদ্ধিমা মেসেজটা পেল দুপুরের দিকে। সে তখন রান্নাঘরে। ফোনটা কাঁপতেই তার হাত থমকে গেল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখেই সে বুঝে গেল—সব ভাঙন চূড়ান্ত হয়নি। কতটুকু বাকি আছে, কতটুকু মেরামত হবে—সেটা জানা নেই। কিন্তু মেসেজটা এসেছে। এইটুকুই এখন অনেক।
সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। চেয়ারে বসে একটু সময় নিল। ভাবল—সব প্রশ্নের উত্তর কি এখনই দিতে হবে? নাকি কিছু উত্তর অপেক্ষার মধ্যেই স্পষ্ট হয়? জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। রোদ পড়েছে। গাছের পাতায় ঝলমল করছে। এই আলোটুকুই কি যথেষ্ট নয় একটা দিন শুরু করার জন্য?
শেষমেশ সে লিখল—"হ্যাঁ, হবে।"
দুটো শব্দ। অথচ এই দুটো শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে রইল অনেক কথা—অভিযোগ, বোঝাপড়া, ক্লান্তি আর এখনো বেঁচে থাকা ভালোবাসা। মেসেজটা পাঠিয়ে সে ফোনটা রেখে দিল। বুকের ভেতরটা এখন আর পাথর নয়। একটু নরম লাগছে। যেন অনেকদিনের জমে থাকা বরফ সামান্য গলতে শুরু করেছে।
সন্ধ্যেবেলা আকাশে মেঘ জমল। হালকা বাতাসে বারান্দার পর্দা দুলছে। ঋদ্ধিমা আবার সেই পরিচিত জায়গায় এসে দাঁড়াল। এইখানে দাঁড়িয়ে সে কতবার ভেবেছে, কতবার কেঁদেছে, কতবার নিজেকে বুঝিয়েছে। আজ তার মনে হচ্ছে না যে নীরবতা তাকে গ্রাস করছে। বরং এই নীরবতার ভেতরেই সে নিজের অবস্থানটা বুঝতে পারছে।
সম্পর্ক মানে হয়তো সবসময় একসঙ্গে হাঁটা নয়। কখনো কখনো পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আলাদা আলাদা দিকেও তাকানো। তবু জানার চেষ্টা করা—অন্যজন ঠিক কোথায় আছে। সে ভাবল, দুজন মানুষ যখন দুটো আলাদা সংগ্রামের মধ্যে থাকে, তখন একে অপরকে না বোঝাটা হয়তো অবহেলা নয়—বরং নিজের ভেতরের ঝড়ের কাছে পরাজিত হওয়া। অগ্নিভও হয়তো তেমনই একটা ঝড়ের মধ্যে আছে। সে একা লড়ছে। যেমন সেও একা ছিল।
রাত নামছে। শহরের আলো একে একে জ্বলছে। ঋদ্ধিমা গভীর শ্বাস নিল। সে জানে, সামনে কথা হবে। সহজ হবে না। অনেক কিছু বলতে হবে, অনেক কিছু শুনতে হবে। হয়তো কান্না আসবে। হয়তো রাগও। তবু এই অপেক্ষাটুকু এখন আর ভারী লাগছে না।
কারণ সে বুঝতে শিখছে—ভাঙনের শব্দ যতই নীরব হোক, মেরামতির প্রক্রিয়াও ততটাই নিঃশব্দ। এবং সেই নিঃশব্দতাতেই কখনো কখনো সম্পর্কের আসল ভিত তৈরি হয়। দুটো মানুষ যখন ভাঙতে ভাঙতেও একে অপরের কাছে ফিরে আসে, তখন সেই ফেরাটাই সবচেয়ে বড় কথা। বাকি সব পরে।
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
শঙ্খজিৎ ভট্টাচার্য ১৬/০৩/২০২৬সুন্দর নিবেদন কবি
-
ফয়জুল মহী ১২/০৩/২০২৬অপূর্ব সৃজন
খুব চমৎকার লিখেছেন।
