www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

স্বাধীনতা

হারাধন বাবু চাকরি থেকে অবসর নিলেন ঠিক পঁয়ত্রিশ বছর, সাত মাস, এগারো দিন, চার ঘণ্টা এবং বত্রিশ মিনিট পর। তিনি গুনেছিলেন। প্রতিটি দিন। এটি ছিল তার বেঁচে থাকার কৌশল।
অবসরের প্রথম সকালে হারাধন বাবু ঘুম থেকে উঠলেন ঠিক পাঁচটায়। পঁয়ত্রিশ বছরের অভ্যাস এত সহজে যায় না। তিনি উঠে দাঁত মাজলেন, মুখ ধুলেন তারপর হঠাৎ থমকে গেলেন, আজ কোথাও যেতে হবে না। কোনো বস নেই। কোনো মিটিং নেই। কোনো ফাইল নেই।
স্ত্রী মালতী দেবী চা নিয়ে এসে দেখলেন স্বামী সোফায় বসে দার্শনিকের মতো শূন্যে তাকিয়ে আছেন।
"কী হয়েছে গো? শরীর খারাপ?" মালতী দেবী উদ্বিগ্ন হলেন।
"না না, শরীর ঠিক আছে। আমি ভাবছি।"
"কী ভাবছ?"
"ভাবছি, আজ থেকে কী করব।"
মালতী দেবী চায়ের কাপ রেখে বললেন, "এতদিন তো বলতে, অবসর পেলে এটা করব, ওটা করব। মাছ ধরব, বাগান করব, বই লিখব।"
হারাধন বাবু চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, "হ্যাঁ, কিন্তু সেগুলো বলেছিলাম চাকরি থাকতে। এখন স্বাধীনতা পেয়ে দেখছি…।"
মালতী দেবী বুঝলেন না।

পরের দিন হারাধন বাবু সিদ্ধান্ত নিলেন মাছ ধরতে যাবেন। পাড়ার পুকুরে। সকাল সাতটায় বাঁশের ছিপ, কেঁচো, এবং অসীম উৎসাহ নিয়ে রওনা হলেন।
পুকুরপাড়ে পৌঁছে দেখলেন সেখানে আগে থেকেই বসে আছেন পাঁচজন বয়োজ্যেষ্ঠ। সবাই অবসরপ্রাপ্ত। সবার হাতে ছিপ। সবাই মাছ ধরছেন — বসে গল্প করছেন।
"আরে হারাধনদা, আসুন আসুন!" ডাকলেন প্রমোদ বাবু, যিনি ডাকবিভাগ থেকে অবসর নিয়েছেন বছর দশেক আগে। "আজ থেকে আমাদের দলে যোগ দিলেন?"
হারাধন বাবু বসলেন। ছিপ ফেললেন জলে। অপেক্ষা করলেন।
পনেরো মিনিট পর মাছের কোনো সাড়া নেই। আধঘণ্টা পর কিছু নেই। একঘণ্টা পর প্রমোদ বাবু বললেন, "এই পুকুরে মাছ নেই হারাধনদা। তিন বছর ধরে আসছি, একটাও পাইনি।"
"তাহলে আসেন কেন?"
"গল্প করতে। বাড়িতে বউ থাকে তো"
সেদিন থেকে তিনিও পুকুরপাড়ে যেতে লাগলেন। মাছ ধরার নামে গল্প করতে। গল্পের বিষয়বস্তু মূলত তিনটি: দেশের রাজনীতি, পাড়ার রাজনীতি, এবং নিজ নিজ ছেলেমেয়ের ব্যর্থতা।
সপ্তাহখানেক পর হারাধন বাবু ভাবলেন বাগান করবেন। বারান্দায় কয়েকটা টব ছিল, মালতী দেবীর গাছপালা। সেগুলো সরিয়ে নিজে বাগান শুরু করবেন।
"আমার গাছ সরাবে কেন?" মালতী দেবী আপত্তি জানালেন।
"ওগুলো তো শুধু ফুলগাছ। আমি সবজি ফলাব।"
"তোমার হাতে কবে গাছ বেঁচেছে? মনে নেই, একবার অফিস থেকে একটা মানিপ্ল্যান্ট এনেছিলে? সেটাও মেরে ফেলেছিলে।"
"সে ছিল অন্য ব্যাপার। তখন সময় ছিল না। এখন সময় আছে।"
মালতী দেবী পথ ছেড়ে দিলেন। কারণ তিনি জীবনে শিখেছেন, স্বামীর কিছু শখ আছে যেগুলো বাধা না দিলে দুই সপ্তাহেই মিটে যায়।
হারাধন বাবু বীজ কিনে আনলেন। টমেটো, বেগুন, লঙ্কা, ধনেপাতা। মাটি কিনে আনলেন। সার কিনে আনলেন। একটা বই কিনে আনলেন: "গৃহস্থের বাগান"।
প্রথম দিন সব বীজ পুঁতে ফেললেন। দ্বিতীয় দিন জল দিলেন। তৃতীয় দিন জল দিলেন। চতুর্থ দিন একটু বেশি জল দিলেন। পঞ্চম দিন ভাবলেন সার দেওয়া দরকার। ষষ্ঠ দিন আরেকটু সার। সপ্তম দিন বীজগুলো পচে গেল।
"মাটি খারাপ ছিল," হারাধন বাবু ঘোষণা করলেন।
"অতিরিক্ত জল আর সার দিলে যা হয়," মালতী দেবী চুপচাপ বললেন।
"তুমি কী জানো? আমি দ্বিতীয় দফায় আরও ভালো করব।"
দ্বিতীয় দফায় হারাধন বাবু ঠিক বিপরীত পদ্ধতি অনুসরণ করলেন। একদমই জল দেবেন না, একদমই সার দেবেন না। প্রকৃতির উপর ছেড়ে দেবেন। তৃতীয় সপ্তাহে গাছগুলো শুকিয়ে গেল।
"তৃতীয় দফা?" মালতী দেবী জিজ্ঞেস করলেন।
"না। বাগান আমার জন্য নয়।" হারাধন বাবু গম্ভীরভাবে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন।

এরপর এলো বই লেখার পালা। হারাধন বাবু সারাজীবন ভেবেছিলেন তাঁর মধ্যে একজন লেখক লুকিয়ে আছেন, যাকে শুধু সময় আর সুযোগ দরকার।
একটি খাতা কিনে আনলেন। কালো মলাটের, পাঁচশো পৃষ্ঠার। কলম কিনলেন চারটি। বসলেন লিখতে।
কী লিখবেন? আত্মজীবনী। "আমার জীবন — একটি সরকারি কর্মচারীর সংগ্রামগাথা।"
প্রথম লাইন: "আমি হারাধন চক্রবর্তী, ত্রিপুরা সরকারের অর্থ বিভাগে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে যোগদান করেছিলাম ১৯৮৮ সালের পনেরোই জুন, সোমবার, সকাল দশটায়।"
দ্বিতীয় লাইন: "সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল।"
তৃতীয় লাইন নেই। ঘণ্টাখানেক বসে থেকে হারাধন বাবু বুঝলেন লেখক হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ তৃতীয় লাইনে কী লিখবেন সেটা মাথায় আসছে না।
পরের দিন ছেলে মনোজ এসে দেখল বাবা খাতার দিকে তাকিয়ে বসে আছেন।
"কী করছ বাবা?"
"আত্মজীবনী লিখছি।"
মনোজ খাতাটা তুলে পড়ল। দুটো লাইন পড়ে খাতা নামিয়ে রাখল। "খুব ভালো শুরু। তারপর?"
"তারপর আটকে আছি।"
"কোথায় আটকেছ?"
"সেই সোমবারের পরে কী হয়েছিল সেটা মনে পড়ছে না।"
"মাকে জিজ্ঞেস করো। মা সব মনে রাখে।"
হারাধন বাবু মালতী দেবীকে ডাকলেন। মালতী দেবী এসে দুটো লাইন পড়ে বললেন, "সেদিন তুমি অফিসে গিয়ে সইন করতে ভুলে গিয়েছিলে হাজিরা খাতায়। সুপারভাইজার বকেছিল।"
হারাধন বাবু তৃতীয় লাইন লিখলেন।
চতুর্থ লাইন লিখতে গিয়ে আবার আটকালেন।
শেষ পর্যন্ত মালতী দেবীই পুরো আত্মজীবনী বললেন, হারাধন বাবু লিখলেন। একশো বিশ পৃষ্ঠা হল।
"তুমিই লেখো না," হারাধন বাবু বললেন।
"আমার জীবন নিয়ে লিখলে অনেক বেশি মজা হত," মালতী দেবী বললেন হাসতে হাসতে।

একদিন হারাধন বাবু হঠাৎ রান্না শিখবেন বলে ঘোষণা করলেন।
মালতী দেবী রান্নাঘর থেকে বের হয়ে বললেন, "কেন?"
"তোমাকে একটু বিশ্রাম দেব। তা ছাড়া রান্না নাকি ক্রিয়েটিভ কাজ। মেডিটেশনের মতো।"
মালতী দেবী সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেন কিন্তু রান্নাঘর ছেড়ে দিলেন।
হারাধন বাবু প্রথমে চা বানালেন। চা ভালোই হল। উৎসাহিত হয়ে ডিম সেদ্ধ করলেন। ডিম সেদ্ধও ঠিকঠাক হল। তারপর সাহস বেড়ে গেল।
"আজ আলু ভাজা করব," ঘোষণা করলেন।
আলু কাটতে গিয়ে আঙুল কাটলেন। ব্যান্ডেজ করে আবার শুরু করলেন। তেলে আলু দিতে গিয়ে তেল ছিটকাল গায়ে। তারপরেও এগিয়ে গেলেন।
পনেরো মিনিট পর মালতী দেবী রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে দেখলেন — চুলার উপর কালো ধোঁয়া উঠছে, কড়াইতে কিছু একটা পুড়ছে, হারাধন বাবু বিভ্রান্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
"কী রান্না করলে?"
"আলু ভাজা।"
"এটা কি আলু ভাজা?"
"না। এটা আলু পোড়া। কিন্তু ভুলটা কোথায় হল বুঝতে পারছি না।"
"আঁচ কমাতে হয়।"
"আঁচ কম রাখলে সময় বেশি লাগবে না?"
"সময় বেশি লাগলেও অন্তত খাওয়ার যোগ্য থাকবে।"
হারাধন বাবু দ্বিতীয়বার চেষ্টা করলেন। এবার আলু পুড়ল না কিন্তু কাঁচা রয়ে গেল। তৃতীয়বার চেষ্টায় মোটামুটি খাওয়ার যোগ্য কিছু তৈরি হল।
"এই হল মেডিটেশন?" মালতী দেবী জিজ্ঞেস করলেন।
"না। এটা যুদ্ধ," হারাধন বাবু স্বীকার করলেন।

এবার হারাধন বাবু ফেসবুক ধরলেন। প্রথম পোস্ট করলেন: "আজ আবহাওয়া ভালো।"
পোস্টে পঞ্চাশটি লাইক পড়ল। হারাধন বাবু অবাক হলেন। পঞ্চাশজন মানুষ আবহাওয়া ভালো থাকায় খুশি?
মনোজ বোঝাল, "বাবা, লাইক মানে তারা পোস্টটা দেখেছে। মানে রাজি আছে কিংবা ভালো লেগেছে।"
"তাহলে যদি আমি লিখি আজ আবহাওয়া খারাপ, তাহলেও লাইক দেবে?"
"সম্ভবত।"
হারাধন বাবু এই ব্যবস্থাটি গভীরভাবে চিন্তা করলেন। তারপর লিখলেন: "আমি মনে করি আলুর দাম কমানো উচিত।"
একশো বিশটি লাইক। পনেরোটি কমেন্ট।
"এই হল গণতন্ত্র," হারাধন বাবু সন্তুষ্টির সাথে বললেন।
ফেসবুকে জনপ্রিয়তা পেয়ে হারাধন বাবু পাড়ার বিষয়ে নজর দিতে লাগলেন। রাস্তার গর্ত, বিদ্যুতের খুঁটি, পার্কের বেঞ্চ — সব বিষয়ে পোস্ট দিলেন।
পৌরসভায় চিঠি লিখলেন। কাউন্সিলরের সাথে দেখা করলেন। ধীরে ধীরে পাড়ায় তাঁর একটা পরিচিতি তৈরি হল — "হারাধনদা কিছু একটা করে দেবেন।"
একদিন পুকুরপাড়ের দলের প্রমোদ বাবু বললেন, "হারাধনদা, পাড়ার ক্লাব নির্বাচনে দাঁড়ান।"
"ক্লাব নির্বাচন?"
"হ্যাঁ, তারুণ সংঘের সভাপতি। পঁচিশ বছর ধরে শৈলেন বাবু আছেন। এখন তিনি পঁচাত্তর বছর বয়সে কান শোনেন না, চোখে দেখেন না, কিন্তু সভাপতি পদ ছাড়বেন না।"
হারাধন বাবু নির্বাচনে দাঁড়ালেন। প্রচার শুরু করলেন। প্রতিদিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিচয় দিলেন। প্রতিশ্রুতি দিলেন রাস্তা ঠিক করবেন, পার্ক সুন্দর করবেন, পুকুর পরিষ্কার করবেন।
নির্বাচনের দিন ভোট পড়ল। হারাধন বাবু জিতলেন। শৈলেন বাবু পরাজিত হলেন। তবে শৈলেন বাবু এত কানে শোনেন না যে তিনি বুঝলেনই না কী হয়েছে। তিনি গদগদ মুখে হারাধন বাবুকে অভিনন্দন জানালেন এবং বললেন, "ভালোই হল, এবার থেকে তুমি কাজ করো, আমি পরামর্শ দেব।"
সভাপতি হওয়ার পর হারাধন বাবুর জীবন পাল্টে গেল।
সকালে পুকুরপাড়, বিকেলে ক্লাবঘর, রাতে ফেসবুক। মাঝে মাঝে পৌরসভা। মাঝে মাঝে বাজার। মাঝে মাঝে রান্নাঘরে গিয়ে মালতী দেবীকে বিরক্ত করা।
তিন মাস পর এক সন্ধ্যায় মালতী দেবী চা দিতে এসে দেখলেন স্বামী হাসিমুখে বসে ফোনে কিছু দেখছেন।
"কী দেখছ?"
"পার্কের নতুন বেঞ্চের ছবি। পৌরসভা লাগিয়ে দিয়েছে।"
"তোমার জন্য?"
"আমার দরখাস্তের জন্য।"
হারাধন বাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন, "হ্যাঁ। তখন মনে হয়েছিল অবসর মানে জীবনের শেষ অধ্যায়। সবকিছু শেষ হয়ে গেছে, আর কিছু নেই।"
"এখন?"
"এখন মনে হয় শেষ অধ্যায় সবচেয়ে মজার অধ্যায়। কারণ এখন কেউ বলছে না কী করতে হবে।"
মালতী দেবী হাসলেন। "তাহলে মাছ ধরা, বাগান, আত্মজীবনী, রান্না — এসব শিখলে কী?"
"শিখলাম যে এগুলো আমার জন্য নয়," হারাধন বাবু অকপটে বললেন। "কিন্তু চেষ্টা করে দেখাটাই আসল। পঁয়ত্রিশ বছর অফিসে কেউ আমাকে চেষ্টা করতেই দেয়নি।"

সেদিন রাতে হারাধন বাবু ফেসবুকে একটা পোস্ট দিলেন। লিখলেন:
"অবসর নিয়ে কেউ ভয় পাবেন না। জীবনে প্রথমবার সত্যিকারের স্বাধীনতা পাবেন। মাছ ধরতে যাবেন — মাছ না পেলেও গল্প পাবেন। বাগান করবেন — গাছ না বাঁচলেও অভিজ্ঞতা পাবেন। রান্না শিখবেন — খাওয়ার অযোগ্য হলেও হাসির রসদ পাবেন। পাড়ার নেতা হবেন — আর বউ এর পরামর্শ নেবেন।"
পোস্টে তিনশো লাইক পড়ল।
একেবারে সোনালি।
একটু হাঁটাহাঁটি করলেই রং ফিরে আসে।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১৩৭ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ০৬/০৩/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast