পোস্টমর্টেম
রাত তখন প্রায় বারোটা। ডাক্তার সুবীর মিত্র ময়নাতদন্ত কক্ষের ঠান্ডা আলোর নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার সামনে শুয়ে আছে একটি মৃতদেহ। পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছর বয়সী এক যুবক। শরীরে কোনো বাহ্যিক আঘাতের চিহ্ন নেই। মুখে অদ্ভুত এক শান্তির ছায়া। যেন ঘুমিয়ে আছে।
সুবীর বাবু বিশ বছর ধরে এই কাজ করছেন। হাজারো মৃতদেহ দেখেছেন। প্রতিটি মৃতদেহই একটা গল্প বলে তাকে — কেউ সহিংসতার, কেউ অবহেলার, কেউ বার্ধক্যের। কিন্তু আজকের এই ছেলেটা কী বলতে চাইছে, সেটা এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশ রিপোর্টে লেখা আছে: সন্দেহজনক মৃত্যু। কোনো পরিচয়পত্র নেই। কেউ দাবি করতে আসেনি।
সুবীর বাবু গ্লাভস পরলেন। স্কালপেল তুললেন। তারপর থামলেন।
ছেলেটার বাঁ হাতের তালুতে কিছু একটা লেখা। কালো কালিতে। হয়তো নিজেই লিখেছে। ছোট ছোট অক্ষরে: 'আমাকে খুঁজো না।'
সুবীর বাবু একটু চমকালেন। এরকম আগে দেখেননি। তিনি লগবুকে নোট নিলেন। তারপর কাজ শুরু করলেন।
পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট তৈরি হতে সময় লাগবে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে — বিষক্রিয়া। কোনো সাধারণ বিষ নয়। সুনির্দিষ্ট পরিমাণে নেওয়া হয়েছে। যে মাত্রায় নিলে যন্ত্রণা ছাড়াই চলে যাওয়া যায়।
এটা আত্মহত্যা। সুবীর বাবু নিশ্চিত হলেন।
কিন্তু কেন?
পরদিন সকালে থানার ইন্সপেক্টর রহিম সাহেব এলেন। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। চোখে ক্লান্তির ছাপ। বহু বছর মানুষের দুঃখ দেখতে দেখতে চোখ দুটো পাথর হয়ে গেছে।
'কোনো আইডেন্টিফিকেশন নেই?' রহিম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
'নেই। ফোনও নেই। মানিব্যাগ নেই। শুধু একটা ছেঁড়া কাগজের টুকরো পকেটে পাওয়া গেছে।' সুবীর বাবু একটা প্লাস্টিক ব্যাগ এগিয়ে দিলেন।
কাগজের টুকরোয় একটা ঠিকানা, ইন্দ্রনগরের কোনো এক গলির নাম।
রহিম সাহেব ঠিকানাটা নোট করলেন। 'বয়স?'
'সাতাশ থেকে ঊনত্রিশের মধ্যে।'
'কতদিন মৃত?'
'বত্রিশ থেকে ছত্রিশ ঘণ্টা।'
রহিম সাহেব মৃতদেহের মুখের দিকে তাকালেন। দীর্ঘ একটা নিশ্বাস নিলেন। 'কারো জন্য অপেক্ষা করছে কেউ।' তিনি বললেন, 'না জেনে।'
সুবীর বাবু চুপ করে রইলেন। কারণ এই কথার কোনো জবাব নেই।
—
ঠিকানা ধরে গেলে পাওয়া যায় একটা ছোট মেস বাড়ি। সরু সিঁড়ি, আঁধার করিডোর। চারতলায় একটা ঘর। তালা দেওয়া।
বাড়িওয়ালা বললেন, 'অর্ণব তো তিনদিন ধরে নেই। ভাড়া বাকি এক মাসের।'
'অর্ণব?' রহিম সাহেব বললেন।
'অর্ণব চক্রবর্তী। গ্রাফিক ডিজাইনার ছিল। একাই থাকত। কোনো আত্মীয়স্বজন দেখিনি কোনোদিন।'
তালা ভাঙা হলো। ঘরে ঢুকে রহিম সাহেব থমকে গেলেন।
ঘরটা অদ্ভুতরকম গোছানো। প্রতিটি জিনিস নিজের জায়গায়। বিছানার চাদর টানটান। বইগুলো সারিবদ্ধ। রান্নাঘরে বাসনগুলো ধুয়ে রাখা। যেন কেউ চলে যাওয়ার আগে সব কিছু ঠিকঠাক করে রেখে গেছে।
টেবিলের উপর একটা চিঠি। খামে ভরা। উপরে লেখা: 'যে পাবে তার জন্য।'
রহিম সাহেব হাতে তুললেন।
চিঠিটা পড়লেন সুবীর বাবু। রহিম সাহেব দিয়ে গেছেন, বলেছেন 'আপনাকে দিতে চাইলে দিতে পারি, আপনি তো ওর শেষ পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এই পৃথিবীর সাথে।'
চিঠিতে লেখা ছিল:
"আমি ক্লান্ত। এটা কাউকে বোঝাতে পারিনি কখনো। ক্লান্তিটা শরীরের না — মনের, আত্মার। প্রতিদিন সকালে উঠি, ভাবি আজ কিছু একটা বদলাবে। বদলায় না। অফিস যাই, কাজ করি, ফিরি, ঘুমাই। মাঝে মাঝে মানুষের সাথে কথা বলি — কিন্তু কেউ শোনে না আসলে। সবাই শুনছে, কিন্তু শোনে না।"
"আমি একটা গল্প লিখতে চেয়েছিলাম। হয়নি। একটা ছবি আঁকতে চেয়েছিলাম — অর্থবহ কিছু। সেটাও হয়নি। প্রতিদিন কাজ করি অন্যের স্বপ্নের জন্য, নিজের স্বপ্নের জন্য সময় নেই।"
"কাউকে দোষ দিচ্ছি না। সবাই ব্যস্ত। পৃথিবীটাই এরকম। হয়তো আমিই দুর্বল।"
"একটাই অনুরোধ — আমার ঘরের বইগুলো কাউকে দিও। আর ছাদের কোণে একটা টব আছে, তাতে তুলসী গাছ। জল দিও।"
চিঠির শেষে শুধু একটা নাম — অর্ণব।
সুবীর বাবু চিঠিটা ভাঁজ করলেন। জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন। বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তায় মানুষ ছুটছে, কেউ ছাতা নিয়েছে, কেউ নেয়নি। সবাই কোথাও না কোথাও যাচ্ছে।
সবাই কি জানে কোথায় যাচ্ছে?
সেই রাতে সুবীর বাবু বাড়ি ফিরলেন দেরি করে। তার স্ত্রী মিনু অপেক্ষা করছিলেন। রাতের খাবার ঢেকে রাখা।
'কী হলো আজ? মুখ কেন এমন?' মিনু জিজ্ঞেস করলেন।
'কিছু না।' সুবীর বাবু বললেন। তারপর থামলেন। 'একটা ছেলে আজ... অর্ণব নাম। কেউ ছিল না তার।'
মিনু কাছে এলেন। হাত ধরলেন। 'তুমি খেয়েছ?'
'না।'
'বসো।' মিনু বললেন।
সুবীর বাবু বসলেন। মিনু খাবার বাড়তে বাড়তে বললেন, 'তোমার মেয়ে ফোন করেছিল। বলছে আগরতলা আসবে মাসের শেষে।'
সুবীর বাবু মাথা তুললেন। 'সত্যি?'
'হ্যাঁ। বলছে নানু দেখতে চাইছে।'
সুবীর বাবুর মুখে হাসি এলো। আস্তে। অনেক ধীরে। যেভাবে রাতের শেষে আলো আসে।
তিনি ভাবলেন অর্ণবের কথা। ভাবলেন যে মানুষ চলে গেছে কাউকে না বলে, কোনো হাত না ধরে, কোনো উষ্ণতা ছাড়া।
এই পার্থক্যটুকুই কি সব? একটা হাত? একটা কণ্ঠস্বর?
পরের সপ্তাহে সুবীর বাবু একটা কাজ করলেন, যেটা আগে কখনো করেননি।
অর্ণবের মেসে গেলেন একা। বাড়িওয়ালাকে বললেন তুলসী গাছটা নিতে চান। বাড়িওয়ালা অবাক হলেন, তারপর দিলেন।
সুবীর বাবু গাছটা নিয়ে এলেন নিজের বাড়ির ছাদে। রাখলেন। জল দিলেন।
মিনু উপর থেকে দেখছিলেন। 'এটা কী?'
'তুলসী।'
'কোথা থেকে?'
সুবীর বাবু একটু থামলেন। 'একজন দিয়ে গেছে। সে বলেছিল জল দিতে।'
মিনু আর প্রশ্ন করলেন না। তিনি বুঝলেন যে এই গাছের পেছনে একটা গল্প আছে, যেটা হয়তো তার জানার নয়।
সেদিন থেকে প্রতিদিন সকালে সুবীর বাবু ছাদে যান। গাছে জল দেন। একটু দাঁড়িয়ে থাকেন। আকাশ দেখেন।
প্রার্থনা করেন। নিজের মতো করে।
তিন মাস পরে একটা ঘটনা ঘটল।
সুবীর বাবুর মোবাইলে একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলো। একটা মেয়ের গলা।
'আপনি কি ডাক্তার সুবীর মিত্র?'
'হ্যাঁ।'
'আমি... আমার নাম মেঘনা। অর্ণব চক্রবর্তী আমার বন্ধু ছিল। শুনলাম আপনি তার... মানে ময়নাতদন্ত করেছেন।'
সুবীর বাবু চুপ করে রইলেন।
'আমি জানতে চাইছিলাম... সে কি কষ্ট পেয়েছিল?' মেয়েটার গলা কাঁপছে।
সুবীর বাবু ভাবলেন। সত্যটা কী বলবেন? কিন্তু এই মুহূর্তে সত্যের চেয়ে বড় কিছু আছে।
'না। সে কষ্ট পায়নি।' তিনি বললেন।
ওপাশ থেকে একটা ধরা কান্নার শব্দ এলো।
'আপনি কীভাবে পেলেন আমার নম্বর?' সুবীর বাবু জিজ্ঞেস করলেন।
'থানা থেকে। ইন্সপেক্টর রহিম সাহেব দিয়েছেন। বলেছেন আপনি ভালো মানুষ।'
সুবীর বাবু একটু হাসলেন।
'তুমি কি কাছে কোথাও থাকো?' তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
'হ্যাঁ। ঘিলাতলী।'
'একটু আসতে পারবে? অর্ণব একটা জিনিস রেখে গেছে। তুলসী গাছ। হয়তো তুমিই নিতে পারবে।'
মেঘনা এলো পরদিন বিকেলে। চোখের নিচে কালো দাগ। কিন্তু মুখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।
সুবীর বাবু ছাদে নিয়ে গেলেন তাকে।
মেঘনা তুলসী গাছটা দেখল। হাত দিয়ে পাতা ছুঁল। চোখ ভিজে উঠল।
'ও ছাদ ভালোবাসত,' মেঘনা বলল। 'বলত আকাশ দেখলে মনে হয় পৃথিবীটা আসলে ছোট না।'
সুবীর বাবু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
'আমি বুঝতে পারিনি,' মেঘনা বলল। 'শেষবার ফোন করেছিল। বললাম ব্যস্ত। পরে কথা বলব। পরে আর হলো না।'
'তুমি দোষী নও,' তিনি বললেন।
'জানি। কিন্তু মনে হয়...'
'মনে হয়, কিন্তু তুমি দোষী নও। সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তুমি সেটা আটকাতে পারতে কিনা, সেটা কেউ জানে না। হয়তো পারতে। হয়তো না। কিন্তু এই সন্দেহের সাথে বাঁচতে হবে না তোমাকে।'
মেঘনা গাছটা বুকে জড়িয়ে ধরল। শিশুর মতো।
সুবীর বাবু তাকিয়ে রইলেন। মনে হলো এই মুহূর্তে কোথাও একটা হিসেব মিলছে। কী হিসেব, বলা কঠিন।
রাতে শুতে যাওয়ার আগে সুবীর বাবু তার ডায়েরিতে লিখলেন:
"পোস্টমর্টেম মানে শুধু মৃতদেহ পরীক্ষা নয়। পোস্টমর্টেম মানে মৃত্যুর পর যা বাকি থাকে তা খোঁজা। প্রতিটি মৃত মানুষের পেছনে একটা জীবন আছে। সে জীবনে থাকে কেউ না কেউ — যে হয়তো জানতেও পারেনি, বুঝতেও পারেনি।"
"অর্ণব চলে গেছে। কিন্তু তার তুলসী গাছ আছে। মেঘনা আছে। এবং প্রশ্নগুলো আছে, যেগুলোর উত্তর দেওয়া যাবে না, কিন্তু জিজ্ঞেস করতে হবে।"
"কতজন অর্ণব আছে এই শহরে? যারা ঘর গুছিয়ে রেখেছে, গাছে জল দেওয়ার কথা বলে গেছে, কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করেনি — 'কেমন আছ?' সত্যিকারের ভাবে।"
"আজ থেকে আমি চেষ্টা করব। প্রতিদিন একজনকে জিজ্ঞেস করব। হয়তো কোনো তফাৎ হবে না। হয়তো হবে।"
পরদিন সকালে সুবীর বাবু ময়নাতদন্ত কক্ষে ঢুকলেন। তার সহকারী রাজু, বছর বাইশের ছেলে, চুপচাপ বসে ছিল।
'রাজু,' সুবীর বাবু বললেন, 'কেমন আছ?'
রাজু একটু অবাক হলো। এতদিনে স্যার এই প্রশ্ন করেননি। 'ভালো স্যার।'
'সত্যি?'
রাজু থামল। তারপর আস্তে বলল, 'মা অসুস্থ। কিছুটা চিন্তায় আছি।'
'কী হয়েছে?'
রাজু বলল। সুবীর বাবু শুনলেন। পরামর্শ দিলেন। একটা ভালো ডাক্তারের নাম বললেন।
ছোট একটা কথোপকথন। পাঁচ মিনিটের। কিন্তু রাজুর মুখে যে হাসি ফুটল, সেটা অন্যরকম।
সুবীর বাবু মনে মনে ভাবলেন — অর্ণব, তুমি কি এটুকুই চেয়েছিলে? কেউ শুনুক। সত্যিকার ভাবে।
হয়তো হ্যাঁ। হয়তো না।
কিন্তু আজ থেকে সুবীর বাবু জিজ্ঞেস করবেন। প্রতিদিন। প্রতিজনকে।
কারণ পোস্টমর্টেম করতে করতে তিনি একটা কথা শিখেছেন — মৃত্যু সব শেষ করে না। কিছু কিছু প্রশ্ন শুরু হয় মৃত্যুর পরেই।
এবং কিছু কিছু উত্তর, হয়তো, এখনও পাওয়া যায়।
যদি আমরা একটু থেমে জিজ্ঞেস করি — সত্যিই কেমন আছ?
সমাপ্ত
সুবীর বাবু বিশ বছর ধরে এই কাজ করছেন। হাজারো মৃতদেহ দেখেছেন। প্রতিটি মৃতদেহই একটা গল্প বলে তাকে — কেউ সহিংসতার, কেউ অবহেলার, কেউ বার্ধক্যের। কিন্তু আজকের এই ছেলেটা কী বলতে চাইছে, সেটা এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশ রিপোর্টে লেখা আছে: সন্দেহজনক মৃত্যু। কোনো পরিচয়পত্র নেই। কেউ দাবি করতে আসেনি।
সুবীর বাবু গ্লাভস পরলেন। স্কালপেল তুললেন। তারপর থামলেন।
ছেলেটার বাঁ হাতের তালুতে কিছু একটা লেখা। কালো কালিতে। হয়তো নিজেই লিখেছে। ছোট ছোট অক্ষরে: 'আমাকে খুঁজো না।'
সুবীর বাবু একটু চমকালেন। এরকম আগে দেখেননি। তিনি লগবুকে নোট নিলেন। তারপর কাজ শুরু করলেন।
পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট তৈরি হতে সময় লাগবে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে — বিষক্রিয়া। কোনো সাধারণ বিষ নয়। সুনির্দিষ্ট পরিমাণে নেওয়া হয়েছে। যে মাত্রায় নিলে যন্ত্রণা ছাড়াই চলে যাওয়া যায়।
এটা আত্মহত্যা। সুবীর বাবু নিশ্চিত হলেন।
কিন্তু কেন?
পরদিন সকালে থানার ইন্সপেক্টর রহিম সাহেব এলেন। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। চোখে ক্লান্তির ছাপ। বহু বছর মানুষের দুঃখ দেখতে দেখতে চোখ দুটো পাথর হয়ে গেছে।
'কোনো আইডেন্টিফিকেশন নেই?' রহিম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
'নেই। ফোনও নেই। মানিব্যাগ নেই। শুধু একটা ছেঁড়া কাগজের টুকরো পকেটে পাওয়া গেছে।' সুবীর বাবু একটা প্লাস্টিক ব্যাগ এগিয়ে দিলেন।
কাগজের টুকরোয় একটা ঠিকানা, ইন্দ্রনগরের কোনো এক গলির নাম।
রহিম সাহেব ঠিকানাটা নোট করলেন। 'বয়স?'
'সাতাশ থেকে ঊনত্রিশের মধ্যে।'
'কতদিন মৃত?'
'বত্রিশ থেকে ছত্রিশ ঘণ্টা।'
রহিম সাহেব মৃতদেহের মুখের দিকে তাকালেন। দীর্ঘ একটা নিশ্বাস নিলেন। 'কারো জন্য অপেক্ষা করছে কেউ।' তিনি বললেন, 'না জেনে।'
সুবীর বাবু চুপ করে রইলেন। কারণ এই কথার কোনো জবাব নেই।
—
ঠিকানা ধরে গেলে পাওয়া যায় একটা ছোট মেস বাড়ি। সরু সিঁড়ি, আঁধার করিডোর। চারতলায় একটা ঘর। তালা দেওয়া।
বাড়িওয়ালা বললেন, 'অর্ণব তো তিনদিন ধরে নেই। ভাড়া বাকি এক মাসের।'
'অর্ণব?' রহিম সাহেব বললেন।
'অর্ণব চক্রবর্তী। গ্রাফিক ডিজাইনার ছিল। একাই থাকত। কোনো আত্মীয়স্বজন দেখিনি কোনোদিন।'
তালা ভাঙা হলো। ঘরে ঢুকে রহিম সাহেব থমকে গেলেন।
ঘরটা অদ্ভুতরকম গোছানো। প্রতিটি জিনিস নিজের জায়গায়। বিছানার চাদর টানটান। বইগুলো সারিবদ্ধ। রান্নাঘরে বাসনগুলো ধুয়ে রাখা। যেন কেউ চলে যাওয়ার আগে সব কিছু ঠিকঠাক করে রেখে গেছে।
টেবিলের উপর একটা চিঠি। খামে ভরা। উপরে লেখা: 'যে পাবে তার জন্য।'
রহিম সাহেব হাতে তুললেন।
চিঠিটা পড়লেন সুবীর বাবু। রহিম সাহেব দিয়ে গেছেন, বলেছেন 'আপনাকে দিতে চাইলে দিতে পারি, আপনি তো ওর শেষ পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এই পৃথিবীর সাথে।'
চিঠিতে লেখা ছিল:
"আমি ক্লান্ত। এটা কাউকে বোঝাতে পারিনি কখনো। ক্লান্তিটা শরীরের না — মনের, আত্মার। প্রতিদিন সকালে উঠি, ভাবি আজ কিছু একটা বদলাবে। বদলায় না। অফিস যাই, কাজ করি, ফিরি, ঘুমাই। মাঝে মাঝে মানুষের সাথে কথা বলি — কিন্তু কেউ শোনে না আসলে। সবাই শুনছে, কিন্তু শোনে না।"
"আমি একটা গল্প লিখতে চেয়েছিলাম। হয়নি। একটা ছবি আঁকতে চেয়েছিলাম — অর্থবহ কিছু। সেটাও হয়নি। প্রতিদিন কাজ করি অন্যের স্বপ্নের জন্য, নিজের স্বপ্নের জন্য সময় নেই।"
"কাউকে দোষ দিচ্ছি না। সবাই ব্যস্ত। পৃথিবীটাই এরকম। হয়তো আমিই দুর্বল।"
"একটাই অনুরোধ — আমার ঘরের বইগুলো কাউকে দিও। আর ছাদের কোণে একটা টব আছে, তাতে তুলসী গাছ। জল দিও।"
চিঠির শেষে শুধু একটা নাম — অর্ণব।
সুবীর বাবু চিঠিটা ভাঁজ করলেন। জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন। বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তায় মানুষ ছুটছে, কেউ ছাতা নিয়েছে, কেউ নেয়নি। সবাই কোথাও না কোথাও যাচ্ছে।
সবাই কি জানে কোথায় যাচ্ছে?
সেই রাতে সুবীর বাবু বাড়ি ফিরলেন দেরি করে। তার স্ত্রী মিনু অপেক্ষা করছিলেন। রাতের খাবার ঢেকে রাখা।
'কী হলো আজ? মুখ কেন এমন?' মিনু জিজ্ঞেস করলেন।
'কিছু না।' সুবীর বাবু বললেন। তারপর থামলেন। 'একটা ছেলে আজ... অর্ণব নাম। কেউ ছিল না তার।'
মিনু কাছে এলেন। হাত ধরলেন। 'তুমি খেয়েছ?'
'না।'
'বসো।' মিনু বললেন।
সুবীর বাবু বসলেন। মিনু খাবার বাড়তে বাড়তে বললেন, 'তোমার মেয়ে ফোন করেছিল। বলছে আগরতলা আসবে মাসের শেষে।'
সুবীর বাবু মাথা তুললেন। 'সত্যি?'
'হ্যাঁ। বলছে নানু দেখতে চাইছে।'
সুবীর বাবুর মুখে হাসি এলো। আস্তে। অনেক ধীরে। যেভাবে রাতের শেষে আলো আসে।
তিনি ভাবলেন অর্ণবের কথা। ভাবলেন যে মানুষ চলে গেছে কাউকে না বলে, কোনো হাত না ধরে, কোনো উষ্ণতা ছাড়া।
এই পার্থক্যটুকুই কি সব? একটা হাত? একটা কণ্ঠস্বর?
পরের সপ্তাহে সুবীর বাবু একটা কাজ করলেন, যেটা আগে কখনো করেননি।
অর্ণবের মেসে গেলেন একা। বাড়িওয়ালাকে বললেন তুলসী গাছটা নিতে চান। বাড়িওয়ালা অবাক হলেন, তারপর দিলেন।
সুবীর বাবু গাছটা নিয়ে এলেন নিজের বাড়ির ছাদে। রাখলেন। জল দিলেন।
মিনু উপর থেকে দেখছিলেন। 'এটা কী?'
'তুলসী।'
'কোথা থেকে?'
সুবীর বাবু একটু থামলেন। 'একজন দিয়ে গেছে। সে বলেছিল জল দিতে।'
মিনু আর প্রশ্ন করলেন না। তিনি বুঝলেন যে এই গাছের পেছনে একটা গল্প আছে, যেটা হয়তো তার জানার নয়।
সেদিন থেকে প্রতিদিন সকালে সুবীর বাবু ছাদে যান। গাছে জল দেন। একটু দাঁড়িয়ে থাকেন। আকাশ দেখেন।
প্রার্থনা করেন। নিজের মতো করে।
তিন মাস পরে একটা ঘটনা ঘটল।
সুবীর বাবুর মোবাইলে একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলো। একটা মেয়ের গলা।
'আপনি কি ডাক্তার সুবীর মিত্র?'
'হ্যাঁ।'
'আমি... আমার নাম মেঘনা। অর্ণব চক্রবর্তী আমার বন্ধু ছিল। শুনলাম আপনি তার... মানে ময়নাতদন্ত করেছেন।'
সুবীর বাবু চুপ করে রইলেন।
'আমি জানতে চাইছিলাম... সে কি কষ্ট পেয়েছিল?' মেয়েটার গলা কাঁপছে।
সুবীর বাবু ভাবলেন। সত্যটা কী বলবেন? কিন্তু এই মুহূর্তে সত্যের চেয়ে বড় কিছু আছে।
'না। সে কষ্ট পায়নি।' তিনি বললেন।
ওপাশ থেকে একটা ধরা কান্নার শব্দ এলো।
'আপনি কীভাবে পেলেন আমার নম্বর?' সুবীর বাবু জিজ্ঞেস করলেন।
'থানা থেকে। ইন্সপেক্টর রহিম সাহেব দিয়েছেন। বলেছেন আপনি ভালো মানুষ।'
সুবীর বাবু একটু হাসলেন।
'তুমি কি কাছে কোথাও থাকো?' তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
'হ্যাঁ। ঘিলাতলী।'
'একটু আসতে পারবে? অর্ণব একটা জিনিস রেখে গেছে। তুলসী গাছ। হয়তো তুমিই নিতে পারবে।'
মেঘনা এলো পরদিন বিকেলে। চোখের নিচে কালো দাগ। কিন্তু মুখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।
সুবীর বাবু ছাদে নিয়ে গেলেন তাকে।
মেঘনা তুলসী গাছটা দেখল। হাত দিয়ে পাতা ছুঁল। চোখ ভিজে উঠল।
'ও ছাদ ভালোবাসত,' মেঘনা বলল। 'বলত আকাশ দেখলে মনে হয় পৃথিবীটা আসলে ছোট না।'
সুবীর বাবু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
'আমি বুঝতে পারিনি,' মেঘনা বলল। 'শেষবার ফোন করেছিল। বললাম ব্যস্ত। পরে কথা বলব। পরে আর হলো না।'
'তুমি দোষী নও,' তিনি বললেন।
'জানি। কিন্তু মনে হয়...'
'মনে হয়, কিন্তু তুমি দোষী নও। সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তুমি সেটা আটকাতে পারতে কিনা, সেটা কেউ জানে না। হয়তো পারতে। হয়তো না। কিন্তু এই সন্দেহের সাথে বাঁচতে হবে না তোমাকে।'
মেঘনা গাছটা বুকে জড়িয়ে ধরল। শিশুর মতো।
সুবীর বাবু তাকিয়ে রইলেন। মনে হলো এই মুহূর্তে কোথাও একটা হিসেব মিলছে। কী হিসেব, বলা কঠিন।
রাতে শুতে যাওয়ার আগে সুবীর বাবু তার ডায়েরিতে লিখলেন:
"পোস্টমর্টেম মানে শুধু মৃতদেহ পরীক্ষা নয়। পোস্টমর্টেম মানে মৃত্যুর পর যা বাকি থাকে তা খোঁজা। প্রতিটি মৃত মানুষের পেছনে একটা জীবন আছে। সে জীবনে থাকে কেউ না কেউ — যে হয়তো জানতেও পারেনি, বুঝতেও পারেনি।"
"অর্ণব চলে গেছে। কিন্তু তার তুলসী গাছ আছে। মেঘনা আছে। এবং প্রশ্নগুলো আছে, যেগুলোর উত্তর দেওয়া যাবে না, কিন্তু জিজ্ঞেস করতে হবে।"
"কতজন অর্ণব আছে এই শহরে? যারা ঘর গুছিয়ে রেখেছে, গাছে জল দেওয়ার কথা বলে গেছে, কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করেনি — 'কেমন আছ?' সত্যিকারের ভাবে।"
"আজ থেকে আমি চেষ্টা করব। প্রতিদিন একজনকে জিজ্ঞেস করব। হয়তো কোনো তফাৎ হবে না। হয়তো হবে।"
পরদিন সকালে সুবীর বাবু ময়নাতদন্ত কক্ষে ঢুকলেন। তার সহকারী রাজু, বছর বাইশের ছেলে, চুপচাপ বসে ছিল।
'রাজু,' সুবীর বাবু বললেন, 'কেমন আছ?'
রাজু একটু অবাক হলো। এতদিনে স্যার এই প্রশ্ন করেননি। 'ভালো স্যার।'
'সত্যি?'
রাজু থামল। তারপর আস্তে বলল, 'মা অসুস্থ। কিছুটা চিন্তায় আছি।'
'কী হয়েছে?'
রাজু বলল। সুবীর বাবু শুনলেন। পরামর্শ দিলেন। একটা ভালো ডাক্তারের নাম বললেন।
ছোট একটা কথোপকথন। পাঁচ মিনিটের। কিন্তু রাজুর মুখে যে হাসি ফুটল, সেটা অন্যরকম।
সুবীর বাবু মনে মনে ভাবলেন — অর্ণব, তুমি কি এটুকুই চেয়েছিলে? কেউ শুনুক। সত্যিকার ভাবে।
হয়তো হ্যাঁ। হয়তো না।
কিন্তু আজ থেকে সুবীর বাবু জিজ্ঞেস করবেন। প্রতিদিন। প্রতিজনকে।
কারণ পোস্টমর্টেম করতে করতে তিনি একটা কথা শিখেছেন — মৃত্যু সব শেষ করে না। কিছু কিছু প্রশ্ন শুরু হয় মৃত্যুর পরেই।
এবং কিছু কিছু উত্তর, হয়তো, এখনও পাওয়া যায়।
যদি আমরা একটু থেমে জিজ্ঞেস করি — সত্যিই কেমন আছ?
সমাপ্ত
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
শঙ্খজিৎ ভট্টাচার্য ০৬/০৩/২০২৬চমৎকার লেখা
-
ফয়জুল মহী ০৫/০৩/২০২৬খুবই চমৎকার লিখেছেন
