www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

ওরে গৃহবাসী

ফাল্গুনের শেষ বিকেলে আকাশটা যেন নিজেই রঙ মেখেছিল। পশ্চিম দিগন্তে কমলা আর সোনালির মিলে মিশে একাকার, আর তার নিচে শিমুল-পলাশের লাল আগুন। সেই আলোয় নদীর জলও যেন লজ্জা পেয়ে গোলাপি হয়ে উঠেছিল। রাঙামাটি গ্রামের মানুষেরা সেদিন কেউ ঘরে বসে থাকেনি — মাঠে, পথে, বাগানে সবখানে ছিল উৎসবের গন্ধ।

মালতী সেদিন ভোরবেলা উঠেই দেখেছিল, তার মা উঠোনে দাঁড়িয়ে পাশের বাড়ির কাকিমার সাথে কথা বলছেন। দুজনের হাতে আবিরের থালা। মালতীর বয়স তখন বারো, কিন্তু দোল উৎসবের আনন্দ সে যেন প্রতি বছর নতুন করে অনুভব করত। বিছানা ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে সে দৌড়ে গেল উঠোনে।

"মা! আজকে আমি সবার আগে রঙ দেব!" সে চেঁচিয়ে বলল।

মা হেসে বললেন, "আগে মুখ ধো, তারপর রঙ দে।"

কিন্তু মালতী সে কথায় কান না দিয়ে সোজা দৌড়াল পাড়ার পুকুরের দিকে, যেখানে তার বন্ধুরা ইতিমধ্যে জমা হয়েছে। পুকুরঘাটে নীলু, রাহুল, সোমা আর ছোট্ট বিটু অপেক্ষা করছিল। সবার হাতে রঙের বালতি, পিচকারি আর আবিরের প্যাকেট।

"মালতীদি এল!" বিটু চিৎকার করে উঠল।

নীলু তৈরিই ছিল। মালতী কাছে আসতেই পিচকারি তাক করে মারল। একটা লাল রঙের ধারা সোজা এসে পড়ল মালতীর সাদা জামায়। মালতী চোখ বড় বড় করে তাকাল, তারপর হেসে ফেলল। "এখন দেখ!"

মুহূর্তেই শুরু হয়ে গেল রঙের যুদ্ধ। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ — রঙের বিস্ফোরণে ভরে গেল পুকুরঘাট। পাঁচটি শিশু যেন পাঁচটি রঙিন ফুলে পরিণত হল। হাসি আর আনন্দের শব্দে ভরে উঠল সকালের বাতাস।



পাড়ার শেষ মাথায় একটা পুরনো বাড়ি ছিল। দেওয়ালের রঙ উঠে গেছে, উঠোনে ঘাস জন্মেছে। সেই বাড়িতে থাকতেন বৃদ্ধ হরিপদ কাকা — একা। তাঁর ছেলে শহরে চলে গেছে বছর দুয়েক আগে, আর ফেরেনি। গ্রামের মানুষ বলত, হরিপদ কাকা এখন শুধু গাছপালার সাথে কথা বলেন।

সেদিন রঙ খেলতে খেলতে মালতীর চোখ পড়ল সেই বাড়ির দিকে। দেখল, হরিপদ কাকা তাঁর ভাঙা বারান্দায় একটা পুরনো চেয়ারে বসে আছেন। সামনে একটা চায়ের কাপ। তাঁর চোখ বন্ধ, কিন্তু মুখে হাসি নেই। চারপাশে উৎসবের শোরগোল, কিন্তু সেই বারান্দায় যেন নীরবতা থমকে আছে।

মালতীর মনে কেমন একটা দুঃখ হল। সে নীলুর হাত ধরে বলল, "চল, হরিপদ কাকার কাছে যাই।"

নীলু একটু ইতস্তত করল। "কেন? উনি তো কারও সাথে কথা বলেন না।"

"তাও চল।" মালতী হাত টানল।

দুজনে গেল সেই বাড়িতে। হরিপদ কাকা চোখ খুললেন। মালতীর রঙমাখা মুখ দেখে তিনি একটু অবাক হলেন।

"কাকা, আপনাকে রঙ দিতে এসেছি," মালতী বলল।

হরিপদ কাকা চুপ করে রইলেন একটু। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, "আমার বয়সে আর রঙ মানায় না রে মা।"

"মানায়," মালতী জোর দিয়ে বলল। "রঙ সবার জন্য।" সে হাত বাড়িয়ে আলতো করে হরিপদ কাকার কপালে একটু আবির ছুঁইয়ে দিল।

হরিপদ কাকার চোখ দুটো একটু চকচক করে উঠল। বহু বছরের জমে থাকা কোনো একটা ভার যেন সরে গেল। তিনি কাঁপা গলায় বললেন, "তোর বাবার মতো মন তোর।"

বেলা বাড়তে বাড়তে গ্রামের মাঠে জমল আসল উৎসব। বছরের পর বছর ধরে রাঙামাটি গ্রামে দোলের দিন সন্ধ্যায় একটা রীতি ছিল — সবাই মিলে মাঠে আগুন জ্বালানো, গান গাওয়া, আর পুরনো বছরের সব দুঃখ সেই আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া।

মালতীর বাবা সুধীর বাবু সেই রীতির প্রধান আয়োজক ছিলেন। লম্বা চেহারা, গোঁফওয়ালা মুখ, কিন্তু চোখে সবসময় একটা মিষ্টি আলো। তিনি গান ভালোবাসতেন। দোলের দিন তিনি গাইতেন, আর সারা গ্রাম শুনত।

সেবার কিন্তু একটা বিষয় মালতীকে ভেতরে ভেতরে কুরে খাচ্ছিল। স্কুলে তার সাথে পড়ত অনিমা। অনিমার সাথে কদিন আগে ঝগড়া হয়েছিল — ছোট্ট একটা কারণে, কিন্তু দুজনেই কথা বলছিল না। উৎসবের আনন্দের ভেতরেও একটা বেদনা ছিল।

দুপুরে মা যখন ডাকলেন, মালতী বসে ভাত খাচ্ছিল চুপ করে। মা লক্ষ্য করলেন।

"কী হয়েছে? মন খারাপ?"

মালতী বলল, "অনিমার সাথে ঝগড়া হয়েছে।"

মা একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "জানিস, দোল মানে শুধু রঙ না। দোল মানে পুরনো সব কষ্ট ধুয়ে দেওয়া। রঙের মতোই — একটু মাখলে মিলিয়ে যায় সব।"

মালতী মায়ের কথা ভাবল। বিকেলে উঠে সে সোজা গেল অনিমার বাড়ি।

অনিমা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। দুজন দুজনকে দেখল। একটু অস্বস্তি, একটু নীরবতা। তারপর মালতী হাসল। হাতের আবিরের থালা এগিয়ে দিল।

অনিমা কিছু বলল না। কিন্তু সেও হাসল। আর আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে মালতীর গালে একটু আবির মাখিয়ে দিল।

সেই স্পর্শে মালতীর মনে হল, ঝগড়াটা সত্যিই ধুয়ে গেছে।

সন্ধ্যার আগে গ্রামের মাঠে কাঠের স্তূপ সাজানো হল। ছেলে-বুড়ো সকলে জড়ো হলেন। সুধীর বাবু একটা বড় কাঠের স্তূপে আগুন জ্বাললেন। লকলক করে উঠল শিখা।

আগুনের আলোয় সবার মুখ রঙিন হয়ে উঠল। হরিপদ কাকাও এসেছিলেন — হাতে একটা লাঠি, মুখে সেই আবির এখনও লেগে আছে। তিনি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আগুন দেখছিলেন।

সুধীর বাবু গান ধরলেন —

"ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল, লাগল যে দোল..."

গলায় গলা মেলাল গ্রামের মানুষ। মালতীও গাইল, ছোট্ট বিটুও গাইল। এমনকি হরিপদ কাকার ঠোঁটও নড়ল — বহু বছর পর।

আগুনের আলো আর মানুষের গান মিলে সেই সন্ধ্যাটা হয়ে উঠল অপার্থিব। মালতী বাবার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। আগুনের ফুলকিগুলো উড়ে যাচ্ছে উপরে — যেন অনেক ছোট্ট ছোট্ট আলোর পাখি।

সে ফিসফিস করে বলল, "বাবা, এই আগুনে কি সত্যিই সব দুঃখ পুড়ে যায়?"

সুধীর বাবু মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। বললেন, "সব না। কিন্তু মন যদি চায়, তাহলে অনেকটাই যায়।"

রাত নামল আস্তে আস্তে। উৎসব শেষ হল না, কিন্তু ক্লান্তি এল। একে একে মানুষ ঘরে ফিরতে লাগল। মালতী বাড়ি ফেরার পথে দেখল, হরিপদ কাকা একা হাঁটছেন। তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেল।

হরিপদ কাকা বললেন, "আজকে অনেকদিন পর মনে হল, বেঁচে আছি।"

মালতী তাঁর হাত ধরল। কিছু বলল না। কিছু বলার দরকার ছিল না।

বাড়ি ফিরে মালতী আয়নার সামনে দাঁড়াল। মুখে লাল, নীল, হলুদ রঙের ছড়াছড়ি। চুলে আবির। জামায় একশো রঙের দাগ। সে হাসল।

মা এসে দাঁড়ালেন পেছনে। বললেন, "কী দেখছিস?"

"নিজেকে," মালতী বলল। মালতী বুঝেছিল। রঙ মানে শুধু রঙ না — রঙ মানে হরিপদ কাকার চোখে জল, অনিমার হাসি, বাবার গান, আর আগুনের ফুলকি। রঙ মানে যোগাযোগ। রঙ মানে একটু কাছে আসা।

পরের দিন স্কুলে সবাই এল রঙমাখা মন নিয়ে। শিক্ষক সুবোধবাবু ক্লাসে ঢুকে হাসলেন। বললেন, "আজকে পড়া হবে না। আজকে গল্প বলব।"

সবাই খুশি হল। সুবোধবাবু বললেন, "জানো, দোলের রঙের একটা ইতিহাস আছে। অনেক অনেক বছর আগে, যখন মানুষ একে অপরের থেকে দূরে থাকত, তখন রঙ ছিল সেতু। একজন অপরজনের কাছে রঙ নিয়ে যেত মানে ভালোবাসা নিয়ে। রঙের কোনো জাত নেই, বর্ণ নেই, ধর্ম নেই।"

মালতী মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। তার পাশে অনিমা বসেছিল। দুজনের হাত পাশাপাশি রাখা।

সুবোধবাবু আরও বললেন, "প্রকৃতিও কিন্তু দোল খেলে প্রতি বছর। পলাশ লাল হয়, শিমুল লাল হয়, কৃষ্ণচূড়া কমলা হয়। গাছপালা বলে — এসো, রঙ নাও, আনন্দ নাও।"

মালতী জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। স্কুলের সামনে একটা পলাশগাছ। সেই গাছে লাল ফুলের মেলা। সত্যিই মনে হচ্ছিল, গাছটা হাসছে।

স্কুল থেকে ফেরার পথে মালতি হরিপদ কাকার বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। দেখল, সেই ভাঙা উঠোনে একটা ছোট্ট চারাগাছ লাগানো হয়েছে। আর হরিপদ কাকা সেই গাছে জল দিচ্ছেন। তাঁর মুখে হাসি।

মালতী ডাকল, "কাকা, কী গাছ?"

হরিপদ কাকা মুখ তুললেন। বললেন, "পলাশ।"

"কেন পলাশ?"

"কারণ," কাকা একটু থামলেন, "তুই সেদিন বলেছিলি রঙ সবার জন্য। তাই ভাবলাম, আমার উঠোনেও একটু রঙ থাকুক।"

মালতীর বুকটা ভরে গেল। বারো বছরের একটা মেয়ে বুঝল, কখনো কখনো একটা ছোট্ট কাজ — একটু আবির ছোঁয়ানো, একটু হাসি — মানুষের জীবনে পলাশগাছ হয়ে ওঠে।

সেই বছর ফাল্গুন শেষ হল। চৈত্র এল, বৈশাখ এল। কিন্তু রাঙামাটি গ্রামে সেই দোলের স্মৃতি রয়ে গেল অনেকদিন। হরিপদ কাকার পলাশগাছ বড় হতে লাগল। মালতী আর অনিমার বন্ধুত্ব গভীর হল।রঙ শুধু গায়ে মাখার জিনিস না — রঙ হল সেই ভাষা যা বলে: আমি তোমার কথা ভাবি। তুমি একা নও। রঙ — একটা মানুষের হাসি, একটা পুরনো ক্ষত সারিয়ে ওঠার আনন্দ, আবার একটা নতুন সম্পর্কের জন্ম দেয়।রঙের উৎসব শেষ হয় না। সে শুধু রূপ বদলায়। কখনো আবিরে, কখনো হাসিতে, কখনো একটা পলাশগাছে। আর সেই রঙ, একবার মনে লাগলে, সারাজীবন থেকে যায়।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১২৮ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ০৪/০৩/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast