কোথায় যেতে পারি
বইয়ের দোকানটার নাম ছিল 'অক্ষর'। মাতাবাড়ির ঠাসা গলির ভেতরে, যেখানে ইলেকট্রিক রিকশার চাকা পাথরের রাস্তায় খড়খড় শব্দ তোলে আর ছাদের ওপর দিয়ে কাকেরা উড়ে যায় — সেই সরু গলির একটু ভেতরে ঢুকলেই দোকানটা চোখে পড়ে। দোকানের সামনে একটা পুরনো বেলগাছ আছে, যার শিকড় উঠে এসেছে মাটির বাইরে, যেন পৃথিবীর ভার আর বহন করতে পারছে না।
সেদিন সকালে ঋদ্ধিমা সেন প্রথমবার সেই দোকানে ঢুকেছিল। বয়স তার সতেরো। সে পড়ে একাদশ শ্রেণিতে, বিজ্ঞান বিভাগে — বাবার ইচ্ছায়। কিন্তু তার নিজের ইচ্ছা ছিল সাহিত্য পড়ার, গল্প লেখার, শব্দ দিয়ে জগৎ গড়ার। সেই ইচ্ছাটাকে সে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখে একটা পুরনো ডায়েরির মতো — কাউকে দেখায় না, শুধু মাঝে মাঝে নিজে খুলে দেখে।
দোকানে ঢুকতেই একটা গন্ধ এসে লাগল নাকে। সেই চেনা গন্ধ — নতুন বইয়ের গন্ধ। কাগজ, কালি আর সময়ের একটা মিশ্রণ। যে গন্ধ একবার শুঁকলে ভোলা যায় না। ঋদ্ধিমা চোখ বন্ধ করে একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল। মনে হলো সে যেন বহুদিন পর বাড়ি ফিরেছে।
দোকানের ভেতরটা ছোট্ট কিন্তু বইয়ে ঠাসা। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত তাক, তাকে তাকে বই। কোনোটা নতুন, কোনোটা পুরনো। কোনোটার মলাট উজ্জ্বল, কোনোটার মলাট ম্লান হয়ে এসেছে কালের আঁচে। একটা পুরনো টেবিলের পেছনে বসে ছিল একজন বৃদ্ধ মানুষ। মাথায় পাতলা সাদা চুল, চোখে মোটা কাচের চশমা। হাতে একটা বই খোলা।
ঋদ্ধিমা একটু ইতস্তত করে এগিয়ে গেল। বলল, 'আমি... একটু দেখতে পারি?'
বৃদ্ধ মাথা তুললেন। চশমার কাচের আড়াল থেকে চোখ দুটো উজ্জ্বল দেখাল। বললেন, 'বই দেখার জন্য অনুমতি লাগে না। দেখো।'
ঋদ্ধিমা ভেতরে ঢুকল। একটা তাকের সামনে দাঁড়াল। আঙুল বোলাল বইয়ের পাতার ওপর দিয়ে। হুমায়ূন আহমেদ, শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ। আর একটু এগোতেই বিদেশি লেখকদের বাংলা অনুবাদ — টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি, গার্সিয়া মার্কেজ।
হঠাৎ একটা বই চোখে পড়ল। পাতলা, সবুজ মলাটের। নাম লেখা 'শেষ চিঠির পর'। লেখকের নাম — অনন্যা চৌধুরী । নামটা অচেনা। ঋদ্ধিমা বইটা তুলে নিল।
পেছনে লেখা একটা ছোট্ট বর্ণনা — 'একজন মানুষের গল্প, যে কথা বলতে ভুলে গিয়েছিল। আর একটি চিঠির গল্প, যা কোনোদিন পাঠানো হয়নি।'
ঋদ্ধিমা বুকের ভেতরে কী যেন একটা নড়ে উঠল।
'ওটা ভালো বই।' বৃদ্ধের গলা শুনে ঋদ্ধিমা চমকে ঘুরে দাঁড়াল। বৃদ্ধ এগিয়ে এসেছেন। বললেন, 'অনন্যা চৌধুরী খুব কম লিখেছেন। মাত্র দুটো বই। তারপর লেখা ছেড়ে দিয়েছেন।'
'কেন ছেড়ে দিলেন?' ঋদ্ধিমা জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধ একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, 'বলেছিলেন, সংসার সামলাতে গিয়ে কলম রাখতে হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়, আসলে কেউ পড়েনি বলে।'
ঋদ্ধিমা বইটা বুকের কাছে ধরল। বলল, 'আমি নেব।'
পরদিন থেকে প্রতিদিন বিকেলে ঋদ্ধিমা আসতে লাগল 'অক্ষর'-এ। সে বইয়ের তাকে বই সাজাত, ধুলো মুছত, আর বৃদ্ধ — যার নাম সে জানল দীনবন্ধু রায় — তার সঙ্গে কথা বলত। তিনি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। পঞ্চাশ বছর ধরেই তারা বই বিক্রি করছেন, কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় হলো তিনি একজন পাঠক। পৃথিবীর সব ভালো বই পড়েছেন।
একদিন দীনবন্ধু রায় সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি নিজে লেখো?'
ঋদ্ধিমা থমকে গেল। তারপর মাথা নামিয়ে বলল, 'একটু একটু।'
'দেখাও।'
'না।'
দীনবন্ধু সাহেব হাসলেন। বললেন, 'ঠিক আছে। কিন্তু মনে রেখো, লেখা লুকিয়ে রাখার জিনিস নয়। লেখা হলো আলোর মতো — দেওয়াল দিয়ে আটকানো যায় না।'
সেদিন রাতে ঋদ্ধিমা তার পুরনো ডায়েরিটা খুলল। সে অনেকদিন ধরে একটা গল্প লিখছে — একটা মেয়ের গল্প, যে ডাক্তার হতে চায় না, গান গাইতে চায়। গল্পটা শেষ হয় না। কারণ ঋদ্ধিমা জানে না শেষটা কেমন হওয়া উচিত। গল্পের মেয়েটা কি তার স্বপ্নের পথে যেতে পারবে? নাকি পরিবারের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করবে?
সে লিখতে বসল। আজ অনেকদিন পর কলম আবার চলল। মনে হলো সেই বইয়ের গন্ধ — সবুজ মলাটের পাতলা বইয়ের গন্ধ — এসে লাগছে নাকে। কোথাও একটা জানালা খুলে গেছে।
তিনমাস পরের কথা।
একদিন দোকানে ঢুকে ঋদ্ধিমা দেখল দীনবন্ধু সাহেবের পাশে একজন মধ্যবয়সী নারী বসে আছেন। শাড়ি পরা, চুলে একটু পাক ধরেছে। চোখ দুটো শান্ত।
দীনবন্ধু সাহেব বললেন, 'ঋদ্ধিমা , ইনি অনন্যা চৌধুরী।'
ঋদ্ধিমা নিজের অজান্তেই প্রণাম করল ।
অনন্যা চৌধুরী মৃদু হাসলেন। বললেন, 'দীনবন্ধু দাদা বলেছেন তুমি আমার বই পড়েছ।'
'হ্যাঁ।' ঋদ্ধিমার গলা কাঁপল। 'পড়েছি। অনেকবার পড়েছি।'
'কেমন লাগল?'
ঋদ্ধিমা একটু ভাবল। তারপর বলল, 'মনে হলো কেউ আমার ভেতরের কথাগুলো বলে দিয়েছে। যেগুলো আমি বলতে পারতাম না।'
অনন্যা চৌধুরীর চোখে কী একটা ঝলকে উঠল। বললেন, 'এটাই লেখার কাজ।'
তারপর তিনি বললেন, 'দীনবন্ধু দাদা ভাই বলেছেন তুমিও লেখো।'
ঋদ্ধিমা দীনবন্ধু সাহেবের দিকে তাকাল। বুড়ো মানুষটা নির্বিকার মুখে চা খাচ্ছেন।
'একটু একটু।' ঋদ্ধিমা বলল।
'পড়তে পারি?'
ঋদ্ধিমা দ্বিধা করল। তারপর তার ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করল। ডায়েরিটা সে সবসময় সঙ্গে রাখে — অভ্যেস হয়ে গেছে। সে নির্দিষ্ট কয়েকটা পৃষ্ঠা খুলে দিল।
অনন্যা চৌধুরী পড়লেন। অনেকক্ষণ পড়লেন। পড়তে পড়তে একবার তাকালেন ঋদ্ধিমার দিকে, তারপর আবার নামিয়ে নিলেন চোখ।
পড়া শেষ করে তিনি বললেন, 'তুমি লেখিকা।'
ঋদ্ধিমা কিছু বলতে পারল না।
'কিন্তু,' অনন্যা চৌধুরী বললেন, 'তুমি গল্পটা শেষ করোনি। শেষটা কোথায়?'
'জানি না,' ঋদ্ধিমা বলল। 'মেয়েটা কী করবে বুঝতে পারছি না।'
অনন্যা চৌধুরী একটু হাসলেন। বললেন, 'মেয়েটা কী চায়?'
'গান গাইতে।'
'তাহলে সে গান গাইবে। এটুকুই তার গল্প।'
'কিন্তু পরিবার?'
'পরিবার আলাদা গল্প। সেটা পরে লিখবে।'
ঋদ্ধিমা চুপ করে রইল। তারপর বলল, 'আপনি কেন লেখা ছেড়ে দিলেন?'
অনন্যা চৌধুরী ডায়েরিটা ফেরত দিলেন। বললেন, 'ছেড়ে দিইনি। থামিয়ে রেখেছিলাম। আর থামানো আর ছেড়ে দেওয়া এক জিনিস নয়।'
সেদিন বিকেলে দোকান থেকে বের হয়ে ঋদ্ধিমা রাস্তায় দাঁড়াল। বেলগাছের নিচে একটু থামল। পুরনো গাছটার শিকড় মাটির বাইরে উঠে এসেছে, কিন্তু গাছটা দাঁড়িয়ে আছে। পাতায় পাতায় বিকেলের আলো।
ঋদ্ধিমা ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করল। পেন খুলল। এবার সে গল্পটার শেষ লিখল।
মেয়েটা গান গাইল। প্রথমে ছোট্ট করে, ঘরের কোণে। তারপর জানালা খুলে। তারপর ছাদে উঠে, রোদের ভেতরে। গলা কাঁপল, সুর ভাঙল, তবু থামল না।
ঋদ্ধিমা লিখল আর চোখের কোণ ভিজে গেল।
মাস ছয়েক পরে দীনবন্ধু সাহেব বললেন, 'তোমার বাবা কি জানেন তুমি এখানে আসো?'
ঋদ্ধিমা বলল, 'না।'
'জানাও।'
'কেন?'
'কারণ লুকিয়ে করা ভালো জিনিসও একসময় ভার হয়ে যায়।'
সেই রাতে ঋদ্ধিমা বাবার সামনে গিয়ে বসল। বাবা সংবাদপত্র পড়ছেন। ঋদ্ধিমা একটু গলা খাঁকারি দিল।
বাবা মাথা তুললেন। বললেন, 'কী হয়েছে?'
ঋদ্ধিমা ডায়েরিটা এগিয়ে দিল।
বাবা অবাক হয়ে ডায়েরিটা হাতে নিলেন। তারপর পড়তে লাগলেন। অনেকক্ষণ পড়লেন। রাফিয়া চুপ করে বসে রইল।
পড়া শেষ করে বাবা একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, 'এগুলো তুমি লিখেছ?'
'হ্যাঁ।'
আরও একটু চুপ। তারপর বাবা বললেন, 'তুমি ডাক্তার হতে চাও না?'
ঋদ্ধিমা বলল, 'না বাবা।'
বাবা দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। বললেন, 'তাহলে কী হতে চাও?'
'লেখিকা।'
ঘরে নীরবতা নেমে এল। বাইরে রাতের শহর তার নিজের শব্দে কথা বলছে। ঋদ্ধিমার বুকের ভেতরে একটা ঘড়ি টিকটিক করছে।
বাবা ডায়েরিটা ফেরত দিলেন। বললেন, 'ভালো লেখক হতে হলে অনেক পড়তে হয়।'
ঋদ্ধিমা বুঝল এটা সম্মতি নয়, তিরস্কারও নয়। এটা শুরু।
পরদিন 'অক্ষর'-এ গিয়ে ঋদ্ধিমা দীনবন্ধু সাহেবকে বলল সব।
দীনবন্ধু সাহেব মাথা নাড়লেন। বললেন, 'বাবারা সাধারণত সন্তানের চেয়ে বেশি ভয় পায়। কিন্তু ভালোবাসাও বেশি থাকে।'
সেদিন দোকানে নতুন বই এসেছিল। ক্যারটন থেকে বের করতে করতে ঋদ্ধিমা নাকে নিল সেই গন্ধ — নতুন বইয়ের গন্ধ। কাগজ, কালি, সময়ের মিশ্রণ।
হঠাৎ সে বুঝল এই গন্ধটা শুধু বইয়ের নয়। এটা সম্ভাবনার গন্ধ। এটা সেই গন্ধ, যে গন্ধ পায় মানুষ যখন কিছু একটা শুরু হওয়ার মুখে।
এক বছর পর ঋদ্ধিমার একটা গল্প একটি সাহিত্য পত্রিকায় ছাপা হলো। গল্পের নাম — 'নতুন বইয়ের গন্ধ'।
গল্পটা পড়ে অনন্যা চৌধুরী ফোন করলেন। বললেন, 'তুমি লিখতে পারো।'
ঋদ্ধিমা বলল, 'আপনার কাছ থেকে শিখেছি।'
'না,' অনন্যা চৌধুরী বললেন। 'তুমি শিখেছ বইয়ের কাছ থেকে। আমি শুধু দরজাটা দেখিয়ে দিয়েছি। ঢুকেছ তুমি নিজে।'
ওই রাতে ঋদ্ধিমা একা বসে তার ডায়েরির একটা নতুন পৃষ্ঠা খুলল। লিখল:
'প্রতিটি গল্পের শুরু হয় একটা গন্ধ থেকে। কখনো বৃষ্টির গন্ধ, কখনো মাটির, কখনো রান্নাঘরের। আমার গল্পের শুরু হয়েছিল নতুন বইয়ের গন্ধ থেকে। সেই গন্ধ আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল একটা ছোট্ট দোকানে, একজন বৃদ্ধ মানুষের কাছে, একজন হারিয়ে যাওয়া লেখকের কাছে। আর সেখান থেকে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম নিজেকে।'
'বই শুধু পড়ার জন্য নয়। বই আমাদের মনে করিয়ে দেয় — আমরা কোথায় ছিলাম, কোথায় আছি, কোথায় যেতে পারি।'
সেই রাতে মাতাবাড়ির গলিতে বাতাস বয়েছিল। বেলগাছের পাতা নড়েছিল। আর 'অক্ষর' দোকানের দরজার সামনে এক টুকরো চাঁদের আলো পড়েছিল — যেন কাউকে ডাকছে, বলছে: এখানে আসো, বই পড়ো, এখানে হারিয়ে গিয়ে নিজেকে খুঁজে পাও।
— সমাপ্ত —
সেদিন সকালে ঋদ্ধিমা সেন প্রথমবার সেই দোকানে ঢুকেছিল। বয়স তার সতেরো। সে পড়ে একাদশ শ্রেণিতে, বিজ্ঞান বিভাগে — বাবার ইচ্ছায়। কিন্তু তার নিজের ইচ্ছা ছিল সাহিত্য পড়ার, গল্প লেখার, শব্দ দিয়ে জগৎ গড়ার। সেই ইচ্ছাটাকে সে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখে একটা পুরনো ডায়েরির মতো — কাউকে দেখায় না, শুধু মাঝে মাঝে নিজে খুলে দেখে।
দোকানে ঢুকতেই একটা গন্ধ এসে লাগল নাকে। সেই চেনা গন্ধ — নতুন বইয়ের গন্ধ। কাগজ, কালি আর সময়ের একটা মিশ্রণ। যে গন্ধ একবার শুঁকলে ভোলা যায় না। ঋদ্ধিমা চোখ বন্ধ করে একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল। মনে হলো সে যেন বহুদিন পর বাড়ি ফিরেছে।
দোকানের ভেতরটা ছোট্ট কিন্তু বইয়ে ঠাসা। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত তাক, তাকে তাকে বই। কোনোটা নতুন, কোনোটা পুরনো। কোনোটার মলাট উজ্জ্বল, কোনোটার মলাট ম্লান হয়ে এসেছে কালের আঁচে। একটা পুরনো টেবিলের পেছনে বসে ছিল একজন বৃদ্ধ মানুষ। মাথায় পাতলা সাদা চুল, চোখে মোটা কাচের চশমা। হাতে একটা বই খোলা।
ঋদ্ধিমা একটু ইতস্তত করে এগিয়ে গেল। বলল, 'আমি... একটু দেখতে পারি?'
বৃদ্ধ মাথা তুললেন। চশমার কাচের আড়াল থেকে চোখ দুটো উজ্জ্বল দেখাল। বললেন, 'বই দেখার জন্য অনুমতি লাগে না। দেখো।'
ঋদ্ধিমা ভেতরে ঢুকল। একটা তাকের সামনে দাঁড়াল। আঙুল বোলাল বইয়ের পাতার ওপর দিয়ে। হুমায়ূন আহমেদ, শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ। আর একটু এগোতেই বিদেশি লেখকদের বাংলা অনুবাদ — টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি, গার্সিয়া মার্কেজ।
হঠাৎ একটা বই চোখে পড়ল। পাতলা, সবুজ মলাটের। নাম লেখা 'শেষ চিঠির পর'। লেখকের নাম — অনন্যা চৌধুরী । নামটা অচেনা। ঋদ্ধিমা বইটা তুলে নিল।
পেছনে লেখা একটা ছোট্ট বর্ণনা — 'একজন মানুষের গল্প, যে কথা বলতে ভুলে গিয়েছিল। আর একটি চিঠির গল্প, যা কোনোদিন পাঠানো হয়নি।'
ঋদ্ধিমা বুকের ভেতরে কী যেন একটা নড়ে উঠল।
'ওটা ভালো বই।' বৃদ্ধের গলা শুনে ঋদ্ধিমা চমকে ঘুরে দাঁড়াল। বৃদ্ধ এগিয়ে এসেছেন। বললেন, 'অনন্যা চৌধুরী খুব কম লিখেছেন। মাত্র দুটো বই। তারপর লেখা ছেড়ে দিয়েছেন।'
'কেন ছেড়ে দিলেন?' ঋদ্ধিমা জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধ একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, 'বলেছিলেন, সংসার সামলাতে গিয়ে কলম রাখতে হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়, আসলে কেউ পড়েনি বলে।'
ঋদ্ধিমা বইটা বুকের কাছে ধরল। বলল, 'আমি নেব।'
পরদিন থেকে প্রতিদিন বিকেলে ঋদ্ধিমা আসতে লাগল 'অক্ষর'-এ। সে বইয়ের তাকে বই সাজাত, ধুলো মুছত, আর বৃদ্ধ — যার নাম সে জানল দীনবন্ধু রায় — তার সঙ্গে কথা বলত। তিনি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। পঞ্চাশ বছর ধরেই তারা বই বিক্রি করছেন, কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় হলো তিনি একজন পাঠক। পৃথিবীর সব ভালো বই পড়েছেন।
একদিন দীনবন্ধু রায় সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি নিজে লেখো?'
ঋদ্ধিমা থমকে গেল। তারপর মাথা নামিয়ে বলল, 'একটু একটু।'
'দেখাও।'
'না।'
দীনবন্ধু সাহেব হাসলেন। বললেন, 'ঠিক আছে। কিন্তু মনে রেখো, লেখা লুকিয়ে রাখার জিনিস নয়। লেখা হলো আলোর মতো — দেওয়াল দিয়ে আটকানো যায় না।'
সেদিন রাতে ঋদ্ধিমা তার পুরনো ডায়েরিটা খুলল। সে অনেকদিন ধরে একটা গল্প লিখছে — একটা মেয়ের গল্প, যে ডাক্তার হতে চায় না, গান গাইতে চায়। গল্পটা শেষ হয় না। কারণ ঋদ্ধিমা জানে না শেষটা কেমন হওয়া উচিত। গল্পের মেয়েটা কি তার স্বপ্নের পথে যেতে পারবে? নাকি পরিবারের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করবে?
সে লিখতে বসল। আজ অনেকদিন পর কলম আবার চলল। মনে হলো সেই বইয়ের গন্ধ — সবুজ মলাটের পাতলা বইয়ের গন্ধ — এসে লাগছে নাকে। কোথাও একটা জানালা খুলে গেছে।
তিনমাস পরের কথা।
একদিন দোকানে ঢুকে ঋদ্ধিমা দেখল দীনবন্ধু সাহেবের পাশে একজন মধ্যবয়সী নারী বসে আছেন। শাড়ি পরা, চুলে একটু পাক ধরেছে। চোখ দুটো শান্ত।
দীনবন্ধু সাহেব বললেন, 'ঋদ্ধিমা , ইনি অনন্যা চৌধুরী।'
ঋদ্ধিমা নিজের অজান্তেই প্রণাম করল ।
অনন্যা চৌধুরী মৃদু হাসলেন। বললেন, 'দীনবন্ধু দাদা বলেছেন তুমি আমার বই পড়েছ।'
'হ্যাঁ।' ঋদ্ধিমার গলা কাঁপল। 'পড়েছি। অনেকবার পড়েছি।'
'কেমন লাগল?'
ঋদ্ধিমা একটু ভাবল। তারপর বলল, 'মনে হলো কেউ আমার ভেতরের কথাগুলো বলে দিয়েছে। যেগুলো আমি বলতে পারতাম না।'
অনন্যা চৌধুরীর চোখে কী একটা ঝলকে উঠল। বললেন, 'এটাই লেখার কাজ।'
তারপর তিনি বললেন, 'দীনবন্ধু দাদা ভাই বলেছেন তুমিও লেখো।'
ঋদ্ধিমা দীনবন্ধু সাহেবের দিকে তাকাল। বুড়ো মানুষটা নির্বিকার মুখে চা খাচ্ছেন।
'একটু একটু।' ঋদ্ধিমা বলল।
'পড়তে পারি?'
ঋদ্ধিমা দ্বিধা করল। তারপর তার ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করল। ডায়েরিটা সে সবসময় সঙ্গে রাখে — অভ্যেস হয়ে গেছে। সে নির্দিষ্ট কয়েকটা পৃষ্ঠা খুলে দিল।
অনন্যা চৌধুরী পড়লেন। অনেকক্ষণ পড়লেন। পড়তে পড়তে একবার তাকালেন ঋদ্ধিমার দিকে, তারপর আবার নামিয়ে নিলেন চোখ।
পড়া শেষ করে তিনি বললেন, 'তুমি লেখিকা।'
ঋদ্ধিমা কিছু বলতে পারল না।
'কিন্তু,' অনন্যা চৌধুরী বললেন, 'তুমি গল্পটা শেষ করোনি। শেষটা কোথায়?'
'জানি না,' ঋদ্ধিমা বলল। 'মেয়েটা কী করবে বুঝতে পারছি না।'
অনন্যা চৌধুরী একটু হাসলেন। বললেন, 'মেয়েটা কী চায়?'
'গান গাইতে।'
'তাহলে সে গান গাইবে। এটুকুই তার গল্প।'
'কিন্তু পরিবার?'
'পরিবার আলাদা গল্প। সেটা পরে লিখবে।'
ঋদ্ধিমা চুপ করে রইল। তারপর বলল, 'আপনি কেন লেখা ছেড়ে দিলেন?'
অনন্যা চৌধুরী ডায়েরিটা ফেরত দিলেন। বললেন, 'ছেড়ে দিইনি। থামিয়ে রেখেছিলাম। আর থামানো আর ছেড়ে দেওয়া এক জিনিস নয়।'
সেদিন বিকেলে দোকান থেকে বের হয়ে ঋদ্ধিমা রাস্তায় দাঁড়াল। বেলগাছের নিচে একটু থামল। পুরনো গাছটার শিকড় মাটির বাইরে উঠে এসেছে, কিন্তু গাছটা দাঁড়িয়ে আছে। পাতায় পাতায় বিকেলের আলো।
ঋদ্ধিমা ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করল। পেন খুলল। এবার সে গল্পটার শেষ লিখল।
মেয়েটা গান গাইল। প্রথমে ছোট্ট করে, ঘরের কোণে। তারপর জানালা খুলে। তারপর ছাদে উঠে, রোদের ভেতরে। গলা কাঁপল, সুর ভাঙল, তবু থামল না।
ঋদ্ধিমা লিখল আর চোখের কোণ ভিজে গেল।
মাস ছয়েক পরে দীনবন্ধু সাহেব বললেন, 'তোমার বাবা কি জানেন তুমি এখানে আসো?'
ঋদ্ধিমা বলল, 'না।'
'জানাও।'
'কেন?'
'কারণ লুকিয়ে করা ভালো জিনিসও একসময় ভার হয়ে যায়।'
সেই রাতে ঋদ্ধিমা বাবার সামনে গিয়ে বসল। বাবা সংবাদপত্র পড়ছেন। ঋদ্ধিমা একটু গলা খাঁকারি দিল।
বাবা মাথা তুললেন। বললেন, 'কী হয়েছে?'
ঋদ্ধিমা ডায়েরিটা এগিয়ে দিল।
বাবা অবাক হয়ে ডায়েরিটা হাতে নিলেন। তারপর পড়তে লাগলেন। অনেকক্ষণ পড়লেন। রাফিয়া চুপ করে বসে রইল।
পড়া শেষ করে বাবা একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, 'এগুলো তুমি লিখেছ?'
'হ্যাঁ।'
আরও একটু চুপ। তারপর বাবা বললেন, 'তুমি ডাক্তার হতে চাও না?'
ঋদ্ধিমা বলল, 'না বাবা।'
বাবা দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। বললেন, 'তাহলে কী হতে চাও?'
'লেখিকা।'
ঘরে নীরবতা নেমে এল। বাইরে রাতের শহর তার নিজের শব্দে কথা বলছে। ঋদ্ধিমার বুকের ভেতরে একটা ঘড়ি টিকটিক করছে।
বাবা ডায়েরিটা ফেরত দিলেন। বললেন, 'ভালো লেখক হতে হলে অনেক পড়তে হয়।'
ঋদ্ধিমা বুঝল এটা সম্মতি নয়, তিরস্কারও নয়। এটা শুরু।
পরদিন 'অক্ষর'-এ গিয়ে ঋদ্ধিমা দীনবন্ধু সাহেবকে বলল সব।
দীনবন্ধু সাহেব মাথা নাড়লেন। বললেন, 'বাবারা সাধারণত সন্তানের চেয়ে বেশি ভয় পায়। কিন্তু ভালোবাসাও বেশি থাকে।'
সেদিন দোকানে নতুন বই এসেছিল। ক্যারটন থেকে বের করতে করতে ঋদ্ধিমা নাকে নিল সেই গন্ধ — নতুন বইয়ের গন্ধ। কাগজ, কালি, সময়ের মিশ্রণ।
হঠাৎ সে বুঝল এই গন্ধটা শুধু বইয়ের নয়। এটা সম্ভাবনার গন্ধ। এটা সেই গন্ধ, যে গন্ধ পায় মানুষ যখন কিছু একটা শুরু হওয়ার মুখে।
এক বছর পর ঋদ্ধিমার একটা গল্প একটি সাহিত্য পত্রিকায় ছাপা হলো। গল্পের নাম — 'নতুন বইয়ের গন্ধ'।
গল্পটা পড়ে অনন্যা চৌধুরী ফোন করলেন। বললেন, 'তুমি লিখতে পারো।'
ঋদ্ধিমা বলল, 'আপনার কাছ থেকে শিখেছি।'
'না,' অনন্যা চৌধুরী বললেন। 'তুমি শিখেছ বইয়ের কাছ থেকে। আমি শুধু দরজাটা দেখিয়ে দিয়েছি। ঢুকেছ তুমি নিজে।'
ওই রাতে ঋদ্ধিমা একা বসে তার ডায়েরির একটা নতুন পৃষ্ঠা খুলল। লিখল:
'প্রতিটি গল্পের শুরু হয় একটা গন্ধ থেকে। কখনো বৃষ্টির গন্ধ, কখনো মাটির, কখনো রান্নাঘরের। আমার গল্পের শুরু হয়েছিল নতুন বইয়ের গন্ধ থেকে। সেই গন্ধ আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল একটা ছোট্ট দোকানে, একজন বৃদ্ধ মানুষের কাছে, একজন হারিয়ে যাওয়া লেখকের কাছে। আর সেখান থেকে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম নিজেকে।'
'বই শুধু পড়ার জন্য নয়। বই আমাদের মনে করিয়ে দেয় — আমরা কোথায় ছিলাম, কোথায় আছি, কোথায় যেতে পারি।'
সেই রাতে মাতাবাড়ির গলিতে বাতাস বয়েছিল। বেলগাছের পাতা নড়েছিল। আর 'অক্ষর' দোকানের দরজার সামনে এক টুকরো চাঁদের আলো পড়েছিল — যেন কাউকে ডাকছে, বলছে: এখানে আসো, বই পড়ো, এখানে হারিয়ে গিয়ে নিজেকে খুঁজে পাও।
— সমাপ্ত —
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
ফয়জুল মহী ০৩/০৩/২০২৬চমৎকার প্রকাশ,
