www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

বায়োগ্রাফি

আমার জন্মের কথা আমি নিজে জানি না। এটা অবশ্য কারো পক্ষেই জানা সম্ভব নয়। কিন্তু আমার মা বলতেন, সেদিন নাকি বৃষ্টি হচ্ছিল — এমন বৃষ্টি যেটা শুধু মাটি ভেজায় না, মানুষের ভেতরটাও ভিজিয়ে দেয়। আমি পৃথিবীতে এলাম আর আকাশ কাঁদল। তিনি বলতেন এটা শুভলক্ষণ। আমি ভাবতাম, হয়তো আকাশও জানত — এই ছেলেটার জীবন সহজ হবে না।
আমার নাম রাখা হয়েছিল মধু মঙ্গল। মনে আছে, একদিন আমি আমাদের ফিসারি বিশাল জলরাশির সামনে দাঁড়িয়ে আমি কাঁদতে শুরু করেছিলাম। বাবা ভেবেছিলেন ভয় পেয়েছি। আসলে ভয় পাইনি। কিন্তু কেন কাঁদছিলাম, সেটা সেদিন বুঝিনি। এখন মনে হয়, নিজের সাথে ফিসারীর প্রথম পরিচয়ের আবেগটা সহ্য করতে পারিনি।আরেক দিনের কথা মনে পড়ে ।আমি ছোট ছেলে। ক্লাস থ্রি অথবা ফৌরে পড়ি বন্ধুদের সাথে রেল রাস্তা দেখতে গিয়েছিলাম। বিদ্যালয়ের ছুটি হয়ে গেছে আমি বাড়িতে যাইনি। সবাই চিন্তিত হয়ে ছিলেন । এদিক ওদিক-খুঁজে আমাকে না পেয়ে সবাই বড় ফিশারিটাতে নেমে সাঁতার কেটে কেটে আমাকে খুঁজছিলেন- হয়তোবা আমি ওই ফিসারির জলে ডুবে মারা গেছি।
বাবা ছিলেন দর্জি।সংসারে টাকা কম ছিল, কিন্তু বই কম ছিল না। আমাদের বাড়ির একটা ঘরে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বই। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় — এই মানুষগুলো আমার শৈশবের প্রতিবেশী ছিলেন। মা মাঝেমধ্যে বলতেন, "ওই বইয়ের ঘরে বেশি সময় কাটাস না, চোখ খারাপ হয়ে যাবে।" বাবা শুনলে মৃদু হাসতেন। কিছু বলতেন না। নীরবতা দিয়ে যে সম্মতি দেওয়া যায়, বাবা সেটা জানতেন।
আমার একটা অভ্যাস ছিল ছোটবেলা থেকে — মানুষের গল্প বানানো। রাস্তায় কোনো বৃদ্ধকে দেখলে মনে মনে ভাবতাম, এই মানুষটা কোথা থেকে এসেছেন, কোন দুঃখ বুকে নিয়ে হাঁটছেন, কোন স্মৃতি এখনো তাকে রাতের বেলা জাগিয়ে রাখে। দোকানের সামনে বসা চাওয়ালাকে দেখে ভাবতাম, হয়তো সে একসময় কবিতা লিখত। হয়তো তার প্রেমিকা কোনোদিন চলে গেছে, আর সেই বিচ্ছেদের ব্যথাটুকু সে এখন গরম চায়ের ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করছে।
স্কুলে আমি মাঝারি মানের ছাত্র ছিলাম। অঙ্ক বিষয় কখনো ভালো করিনি, এটা নিয়ে বাবার একটু মনোকষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি কখনো চাপ দেননি। শুধু একদিন বলেছিলেন, "জীবনটাও একটা অঙ্কের মতো। যোগ বিয়োগ মেলাতে পারলে উত্তর ঠিক হয়।" আমি তখন মাথা নাড়িয়েছিলাম, বুঝেছিলাম কিনা জানি না। কিন্তু বাক্যটা মাথায় থেকে গিয়েছিল।
পনেরো বছর বয়সে আমি প্রথম প্রেমে পড়লাম।
মেয়েটির নাম ছিল পুষ্পলতা। অদ্ভুত নাম। কিন্তু তাকে দেখলে মনে হত নামটা ঠিকই আছে — তার চোখে সবসময় একটা আধো-আলো আধো-ছায়া ভাব। সে হাসত কম, কিন্তু যখন হাসত তখন মনে হত কোথাও কোনো জানালা খুলে গেল।
আমরা কখনো প্রেমের কথা বলিনি। কিন্তু প্রতিদিন স্কুলফে্রার পথে আমরা হাঁটতাম পাশাপাশি। কথা হত বই নিয়ে, আকাশ নিয়ে, অদ্ভুত সব প্রশ্ন নিয়ে। একদিন সে জিজ্ঞেস করেছিল, "তুমি মনে কর মানুষ মরে যাওয়ার পরেও তার ভালোবাসাটা কোথাও থাকে?" আমি বলেছিলাম, "থাকে। যাদের ভালোবেসেছিল তাদের ভেতরে থাকে।"
এরপর অনেক বছর কেটে গেল।
কলেজে পড়লাম দর্শন। বাবা একটু অবাক হয়েছিলেন, কিন্তু কিছু বলেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই যাত্রায় যেতে পারলাম না। সেটা আমার জীবনের প্রথম বড় দুঃখ ছিল ।
আগরতলা শহর আমাকে প্রথমে ভয় দেখিয়েছিল। এত মানুষ, এত শব্দ, এত তাড়া। মনে হয়েছিল শহরটা একটা জীবন্ত যন্ত্র — প্রতিনিয়ত ঘুরছে, কাউকে থামতে দিচ্ছে না। কিন্তু ধীরে ধীরে শিখলাম, এই শহরের বুকেও নিভৃত কোণ আছে?
কলেজে আমার বন্ধু হল তিনজন। সুব্রত, মণিকা আর গৌরীশ। গৌরীশ ছিল দার্শনিক প্রকৃতির — সব কিছুতে তত্ত্ব খুঁজত। মণিকা ছিল উল্টো — বলত, "তত্ত্ব দিয়ে পেট ভরে না, জীবন চলে।" আর সুব্রত ছিল দুজনের মাঝখানে এক স্নিগ্ধ সেতু।
আমরা চারজন মিলে রাত জাগতাম। চায়ের কাপ ঘিরে পৃথিবীর সব সমস্যা সমাধান করতাম। ভুলে যেতাম যে পরদিন পরীক্ষা। হেঁটে বেড়াতাম রাতের আগরতলা । কথা বলতাম সাহিত্য নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে, ভালোবাসা নিয়ে, মৃত্যু নিয়ে।
একরাতে গৌরীশ জিজ্ঞেস করেছিল, "মঢূ, তুই কি কখনো ভয় পাস না — যে তোর যা লেখার ইচ্ছে, সেটা লেখার আগেই যদি মরে যাস?"
আমি হেসেছিলাম। বলেছিলাম, "প্রতিদিন।"
সেই ভয়টাই আমাকে লিখতে বাধ্য করেছে। প্রতিটি লেখা যেন মৃত্যুর বিরুদ্ধে ছোট একটা বিদ্রোহ।
স্নাতক শেষ করার পর জীবন নানাদিকে গেল। চাকরি করলাম একটা প্রাইভেট স্কুলে। মাইনে কম ছিল।
বছর দুয়েক পরে বাবা অসুস্থ হলেন। মাথার সমস্যা। আমি ছুটে গেলাম হাসপাতালে সাদা ঘরে বাবাকে নিয়ে । দেখলাম — শক্তিমান মানুষটা হঠাৎ কেমন ছোট হয়ে গেছেন। তার হাত ধরে বসে ছিলাম।
বাবা বললেন, "আমি তোর জন্য অনেক কিছু করতে চেয়েছিলাম। পারিনি। কিন্তু তুই নিজে যা চাস তাই কর। শুধু যেন মনে থাকে — মানুষ হওয়াটাই আসল পরিচয়।"
বাবা সেবার সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু সেই কথাটা আমার ভেতরে একটা বীজ বুনে দিল। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম — কবিতা লিখব।
সেই কবিতা লিখতে লিখতে আমার বয়স পেরিয়ে গেল— কিন্তু লেখাটা থামল না। তিন বছর পর যখন শেষ হল, আমি বুঝলাম এগুলো আসলে শুধু একটা কবিতা নয়। এটা আমার জীবনূলএক একটা স্বীকারোক্তি — সেই সব মানুষের প্রতি, যারা আমাকে গড়েছেন।
বই বের হল একটা ছোট প্রকাশনী থেকে। খুব বড় হৈচৈ হল না। কিন্তু একদিন একটা চিঠি এল — হাতে লেখা। কোনো এক পাঠক লিখেছেন, "আপনার বইটা পড়তে পড়তে মনে হল, আমার নিজের কথা কেউ লিখে দিয়েছে।"
সেই চিঠিটা আমি এখনো রেখে দিয়েছি।
জীবনের এই মুহূর্তে পেছনে তাকালে মনে হয় — জীবনটা আসলে এক কাল্পনিক বায়োগ্রাফি। কারণ যতটুকু বাস্তব, তার চেয়ে অনেক বেশি কল্পনা দিয়ে আমরা নিজেদের গড়ি। স্মৃতিগুলো হুবহু থাকে না — রং পালটায়, আকার বদলায়।
আমরা সবাই নিজেদের জীবনের লেখক কবি। আর প্রতিটা জীবনই এক অর্থে কাল্পনিক — কারণ সত্যিটা কেউ জানে না, শুধু নিজের মতো করে বিশ্বাস করে নেয়।
আমি এখনো লিখি। প্রতিদিন ভোরবেলা, যখন শহর ঘুমিয়ে থাকে। জানালা দিয়ে আকাশটা দেখি। মনে পড়ে সেই বৃষ্টির কথা — যেদিন আমি পৃথিবীতে এসেছিলাম।
হয়তো আকাশ সেদিন সত্যিই জানত।
কিন্তু জীবন কি শুধু লেখায় শেষ হয়?
একদিন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখলাম — আগরতলা বই মেলাতে কবি হিসেবে আমন্ত্রণ। নামটা পড়েই বুকের ভেতরে কেমন একটা নাড়া দিল।
গেলাম।
উৎসবের দ্বিতীয় দিন, বইয়ের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি — হঠাৎ কেউ ডাকল, "মধুদা?" পরিচিত গলা, অথচ বহুদিনের ধুলো জমা।
ঘুরে তাকালাম।
পুষ্পলতা। কখনো কখনো পুষ্পলতার মাথায় সমস্যা দেখা দেয়; সে কিছু বলতে পারেনা।এই ধরনের কথাগুলো আমি শুনেছিলাম কিন্তু বাস্তবে দেখলাম ষোল আনা সঠিক আছে সে। একটা শান্তি পেলাম।
চুলে কিছুটা পাক ধরেছে, চোখের কোণে বয়সের ছাপ — কিন্তু সেই আধো-আলো আধো-ছায়া দৃষ্টি একটুও বদলায়নি। হাতে আমার লেখা বইটা।
সে হাসল। বলল, "এই বইটা পড়েই বুঝলাম কবি কে। তুমি এখনো সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে? ভালোবাসা মরে যাওয়ার পরেও থাকে কিনা?"
আমি চুপ করে রইলাম এক মুহূর্ত। তারপর বললাম, "থাকে। এইমাত্র প্রমাণ পেলাম।"
সে আর কিছু বলল না। আমিও না।
কিছু কথা আছে যেগুলো বলার নয় — শুধু অনুভব করার। কিছু মুহূর্ত আছে যেগুলো লেখায় ধরা যায় না — শুধু বুকের ভেতরে তুলে রাখতে হয়, যত্ন করে, যেন একটা পুরনো চিঠির মতো।
সেদিন ট্রেনে বসে ভাবলাম — জীবনটা সত্যিই এক কাল্পনিক বায়োগ্রাফি। কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হল, কল্পনাগুলোই একদিন সত্যি হয়ে যায়।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১৫৫ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৭/০২/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast