www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

শান্তি নীড়

রাত তখন প্রায় দশটা। শীতের কনকনে বাতাস জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ছিল ঘরে। সুধীর চন্দ্র বসু তাঁর পুরনো কাঁথাটা গায়ে জড়িয়ে বিছানায় বসে আছেন। হাতে একটি ছেঁড়া ডায়েরি। পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে বহু বছরের ভারে। তবু প্রতিটি পাতায় এখনও বেঁচে আছে তাঁর জীবনের সোনালী সময়গুলো।
ডায়েরির একটি পাতায় পেন্সিলে আঁকা একটি ছবি — একটি ছোট্ট ছেলে বাবার হাত ধরে হাঁটছে। নিচে লেখা: "রনি আর আমি — ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৫। আজ রনি প্রথম একা হাঁটতে শিখেছে।"
সুধীরবাবু ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। তাঁর চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো। তিনি হাতের কাঁপুনিতে ডায়েরিটা বন্ধ করলেন।
বাইরে "শান্তি নীড় বৃদ্ধাশ্রম"-এর বারান্দায় কেউ একজন কাশছেন। পাশের ঘরে বৃদ্ধা মালতী দেবী গুনগুন করে রামায়ণের শ্লোক পড়ছেন। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। এই একাকী রাতে, এই শীতল ঘরে, সুধীরবাবু আবার একবার ভাবলেন — জীবনটা কোথায় এসে ঠেকেছে।
নমাত্র বছর তিনেক আগের কথা।
সুধীর চন্দ্র বসু ছিলেন দক্ষিণ কলকাতার বাবুঘাট লেনের সেই চিরপরিচিত মুখ — যার হাসিতে পাড়া আলো হতো, যার বাড়িতে পুজোর ভোগ না খেলে পাড়ার ছেলেমেয়েদের পুজো সম্পূর্ণ হতো না। স্ত্রী সরলা ছিলেন তাঁর প্রাণ। রান্নাঘর থেকে সরলার গলার আওয়াজ ভেসে এলেই মনে হতো ঘরটা যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
ছেলে রণজিৎ — রনি — পড়াশোনায় ভালো ছিল। সুধীরবাবু নিজে স্কুলশিক্ষক হয়েও ছেলেকে বড় ইঞ্জিনিয়ার বানাতে পেরেছিলেন। সেটুকুই ছিল তাঁর গর্ব। রনি যখন প্রথম চাকরি পেয়ে প্রথম মাইনের টাকায় বাবার জন্য একটা পাঞ্জাবি কিনে এনেছিল, সুধীরবাবু সেই পাঞ্জাবিটা বুকে চেপে ধরে কেঁদেছিলেন। সরলা পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিল, "কাঁদছ কেন গো? ছেলে বড় হয়েছে — এটা তো আনন্দের দিন।"
"আনন্দেও চোখে জল আসে সরলা," সুধীরবাবু বলেছিলেন।
তারপর রনির বিয়ে হলো। বউ এলো — মিতা। শহুরে মেয়ে, চাকুরে, স্মার্ট। প্রথম প্রথম সব ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে একটা অদৃশ্য দেওয়াল উঠতে লাগলো। ছোট ছোট কথায়, ছোট ছোট অসুবিধায়।
"বাবা, রান্নাঘরে তেলের গন্ধ থাকলে আমার মাথা ধরে।"
"বাবা, বসার ঘরে এই পুরনো ছবিগুলো একটু সরিয়ে রাখুন না — কেই আসলে এলে দেখতে ভালো লাগে না।"
"বাবা, আপনি একটু কম কথা বললে ভালো হয়, মিটিং-এ থাকি তখন।"
সুধীরবাবু সরিয়ে নিলেন। সরে গেলেন। কথা কমালেন। কিন্তু সরলা পারলেন না। সরলা ছিলেন মাটির মানুষ — সকালে উঠে উঠোন লেপতেন, ঠাকুর ঘরে ধূপ দিতেন, বাড়ির সবার জন্য আলাদা আলাদা পছন্দের রান্না করতেন। এই স্বভাব তাঁর রক্তে মেশানো ছিল, বদলানো সম্ভব ছিল না।
একদিন মিতা রনিকে বলল, "তোমার মা-বাবা আর আমরা — একসাথে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।"
রনি সেদিন চুপ করে রইল।
তারপর একটা ভোরে — সরলা বুকে ব্যথা অনুভব করলেন। রনি তখন অফিসে, মিতা জিমে। সুধীরবাবু একাই অ্যাম্বুলেন্স ডাকলেন, হাসপাতালে গেলেন। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।
সরলা চলে গেলেন।

সরলা চলে যাওয়ার পর বাড়িটা কেমন যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
সুধীরবাবু প্রথম কয়েক মাস কোনোরকমে ছিলেন। রনি মাঝে মাঝে খোঁজ নিতো। মিতা বিনয়ের সাথে দূরত্ব বজায় রাখতো। একদিন রনি এসে বলল, "বাবা, একটা কথা বলব?"
"বল।"
"তুমি একা থাকলে আমাদের চিন্তা হয়। আর তুমি জানো, আমরাও ব্যস্ত থাকি সারাদিন। মিতার অফিস, আমার অফিস — তোমাকে ঠিকমতো সময় দিতে পারি না।" রনি একটু থামলো। "শান্তি নীড়ের কথা শুনেছ? ওখানে অনেকে থাকেন, সঙ্গ পাবে, দেখাশোনা হবে।"
সুধীরবাবু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। রনির চোখে সরাসরি তাকাতে পারছিলেন না সুধীরবাবু নিজেই।
"মানে বৃদ্ধাশ্রম?" সুধীরবাবু শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন।
"বাবা, এখন আর ওই নামে ডাকে না কেউ। অনেক আধুনিক হয়েছে। সুন্দর পরিবেশ—"
"আচ্ছা।"
শুধু এইটুকুই বললেন সুধীরবাবু। "আচ্ছা।"
রনি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু বাবার সেই একটি শব্দের ভেতরে যে হাজার বছরের ক্লান্তি ছিল, তা টের পেয়ে চুপ করে গেল।
যাওয়ার দিন সকালে সুধীরবাবু নিজেই সংসার গুছিয়ে নিলেন। দুটো ব্যাগে সমস্ত জীবন ভরতে হবে — এই হিসেব যখন মেলাতে বসলেন, তখন বুঝলেন কতটুকুই বা সংসারকে সাথে নেওয়া যায়।
সরলার শাড়িগুলো রেখে গেলেন আলমারিতে।মুখে বললেন না কিছু। শুধু একটা শাড়ি — সরলার বিয়ের লাল বেনারসি — ভাঁজ করে ব্যাগের তলায় রাখলেন।
পুরনো ডায়েরিটা রাখলেন।
ঠাকুরের ছবিটা রাখলেন।
আর রনির সেই ছোটবেলার একটা ছবি — রনি তখন বছর পাঁচেক, বাবার কাঁধে বসে হাসছে।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে একবার পেছনে তাকালেন। রান্নাঘরের দরজাটা খোলা ছিল। মনে হলো, সরলা যেন ভেতর থেকে বলছেন — "কোথায় যাচ্ছ গো?"
সুধীরবাবুর ঠোঁট কাঁপলো। তিনি দরজাটা টেনে দিলেন। গাড়িতে উঠলেন।
রনি গাড়ি চালাচ্ছিল। পুরো পথ কেউ কথা বলেনি।
শান্তি নীড়ের গেটের সামনে যখন গাড়ি থামলো, সুধীরবাবু নিজেই ব্যাগ নামিয়ে নিলেন। রনি বলল, "বাবা, আমি ভেতরে দিয়ে আসি।"
"না, তুই যা। অফিস আছে তোর।"
"বাবা—"
"যা বলছি।" একটু থেমে বললেন, "ভালো থাকিস।"
রনি গাড়িতে উঠল। গাড়ি চলে গেল। সুধীরবাবু দাঁড়িয়ে রইলেন যতক্ষণ গাড়িটা দেখা গেল। তারপর ধীরে ধীরে গেটের ভেতরে ঢুকলেন।
শান্তি নীড়ে প্রথম রাতটা কাটলো না ঘুমিয়ে।
ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে রইলেন। অচেনা ঘরের অচেনা গন্ধ। পাশের ঘর থেকে কারো ঘুমের মধ্যে কাঁদার আওয়াজ ভেসে আসছিল।
ধীরে ধীরে তিনি এই জায়গাটার সাথে মানিয়ে নিলেন। মালতী দেবীর সাথে বন্ধুত্ব হলো — তাঁরও ছেলে আছে বিদেশে। হরিপদবাবু আছেন, যিনি একসময় ব্যবসায়ী ছিলেন, এখন দিনের বেলা দাবা খেলেন আর সন্ধ্যায় চুপ করে বসে থাকেন। আরতি দিদি আছেন — স্বামী মারা গেছেন, মেয়ে বলেছে "মা, তুমি জামাইয়ের সাথে মিলবে না।"
এরা সবাই এখানে আছেন। এরা সবাই একই গল্পের চরিত্র।
মাসে একবার রনি আসতো। কখনো মিতাকে নিয়ে, কখনো একা। আসতো মিনিট পনেরো, বিশ। বলতো, "কেমন আছ বাবা? কোনো অসুবিধা নেই তো? ডাক্তার দেখিয়েছ?" তারপর চলে যেত।
একদিন সুধীরবাবু রনির হাত ধরলেন। বললেন, "রনি, তুই কি একটু বসবি? এত তাড়া কী?"
রনি বসলো। কিন্তু তার চোখ বারবার ঘড়ির দিকে যাচ্ছিল।
সুধীরবাবু আর কিছু বললেন না।
পৌষ মাসের এক বিকেলে হরিপদবাবু হঠাৎ বুকে ব্যথা পেলেন। অ্যাম্বুলেন্স এলো। হাসপাতালে নিয়ে গেল। পরের দিন খবর এলো — হরিপদবাবু আর নেই।
তাঁর ছেলে এলো লাশ নিতে। দ্রুত কাজ সেরে চলে গেল।
সেই বিকেলে সুধীরবাবু হরিপদবাবুর খালি চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। দাবার ছকটা এখনও সাজানো রয়েছে — মাঝপথে খেলা থেমে গেল।
মালতী দেবী পাশে এসে বসলেন। দুজন চুপ করে রইলেন।
তারপর মালতী দেবী বললেন, "দাদা, জানো — আমার ছেলে গত বছর বলেছিল এবার পুজোয় আসবে। সে আসেনি। এবারও বলেছে।"
সুধীরবাবু কিছু বললেন না। শুধু চোখ বন্ধ করলেন।
রনির ছেলে হলো। সুধীরবাবু খবর পেলেন ফোনে। রনি বলল, "বাবা, ছেলে হয়েছে। নাম রাখব 'আদিত্য'।"
সুধীরবাবুর বুকের ভেতরে কী একটা আলো জ্বলে উঠলো। নাতি! তিনি কাঁদলেন সেদিন — আনন্দে। মালতী দেবীকে মিষ্টি খাওয়ালেন।
মাস দুয়েক পর নাতিকে দেখতে গেলেন। মিতা দরজা খুললো। সুধীরবাবু ভেতরে ঢুকলেন। আদিত্য শুয়ে আছে — ছোট্ট, তুলতুলে শিশু।
সুধীরবাবু হাত বাড়ালেন।
"বাবা, এখন না," মিতা বলল। "ঘুমাচ্ছে। ওঠালে কাঁদবে।"
সুধীরবাবু হাত নামিয়ে নিলেন।
দুপুরে খাওয়ার পর রনি বলল, "বাবা, তুমি কি এখন যেতে পারবে? না বলছি সন্ধ্যা হয়ে গেলে যেতে অসুবিধা হবে কিনা?"
সুধীরবাবু উঠলেন। কোট গায়ে দিলেন। যাওয়ার আগে একবার আদিত্যের দিকে তাকালেন। ঘুমন্ত শিশুটা জানে না, তার দাদু তাকে দেখতে এসেছিলেন এই বিকেলে।
সেই রাতেই সুধীরবাবু ডায়েরিতে লিখলেন:
"আজ আদিত্যকে দেখলাম। স্পর্শ করতে পারলাম না। রনি যখন ছোট তিন চার বছরের ছিল, সারারাত কোলে নিয়ে বসে থাকতাম। সরলা বলতো — 'ছেলেটাকে মাটিতে রাখতে পারো না?' আমি হাসতাম। আজ বুঝলাম, মাটিতে রেখে দেওয়াটা কতটা সহজ হয়ে যায় একসময়। নিজের বাবা-মাকেও।"
বছর ঘুরলো। সুধীরবাবুর শরীর ভাঙতে লাগলো। হাঁটু ব্যথা বাড়লো। চোখে কম দেখছেন। একটু দূর হাঁটলেই হাঁপিয়ে ওঠেন।
শান্তি নীড়ের ডাক্তার বললেন, "আপনার পরিবারকে জানান। নিয়মিত চেকআপ দরকার।"
রনিকে ফোন করলেন। রনি বলল, "বাবা, ডাক্তারকে বলো, উনিই ব্যবস্থা করুন। আমরা পেমেন্ট করে দেব।"
সুধীরবাবু ফোন রেখে দিলেন।
সেদিন রাতে তিনি সরলার বেনারসি শাড়িটা বের করলেন। বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মনে হলো সরলার গায়ের গন্ধটা এখনও কোথাও আছে কাপড়ে।
"সরলা," সুধীরবাবু ক্ষীন কন্ঠে চোখের জল মুছে বললেন, "তুমি ঠিকই করেছিলে চলে গিয়ে। এই দিনটা দেখতে হয়নি তোমাকে।"
তারপর সারা রাত ধরে তিনি কাঁদলেন নিরবে। সেই কান্না শুধু বালিশ ভিজে যায় কেউ শুনতে পায় না।
অনেক দিন পরের রনি ফোন করে ছিল বাবাকে ।
"বাবা, তোমার সাথে দেখা করতে আসব এই রোববার। আদিত্যকেও নিয়ে আসব। ও এখন হাঁটতে শিখেছে।"
রোববার এলো। রনি এলো। মিতা এলো। আর এলো আদিত্য — টলমল পায়ে হাঁটছে, ঠিক যেভাবে একদিন রনি হেঁটেছিল।
সুধীরবাবু হাত বাড়ালেন।
এবার মিতা বাধা দিলো না।
আদিত্য এগিয়ে এলো। ছোট্ট হাতে দাদুর বড় আঙুলটা আঁকড়ে ধরল।
সুধীরবাবু চোখ বন্ধ করলেন। সেই স্পর্শে যেন সমস্ত জীবনের ব্যথাটা আরো একবার কেঁপে ।
রনি পাশে বসলো। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, "বাবা, আমি... আমি ভুল করেছি।"
সুধীরবাবু চোখ খুললেন। ছেলের দিকে তাকালেন।
"তুমি যখন আমাকে প্রথম হাঁটতে শিখিয়েছিলে," রনির গলা কাঁপছিল, "সেদিন তুমি আমার হাত ছাড়োনি। আর আমি..."
"থাক।" সুধীরবাবু বললেন।
"না বাবা, বলতে দাও—"
"থাক রনি।" সুধীরবাবু আদিত্যকে কোলে তুলে নিলেন। ছোট্ট শরীরটা বুকে জড়িয়ে ধরলেন। "তোমাকে ক্ষমা করা হয়ে গেছে। সেই কবেই।"
রনি মুখ ঢাকলো হাতে।
মিতার চোখেও জল।
বাইরে শীতের বিকেলের রোদ পড়েছে শান্তি নীড়ের উঠোনে। পাতা ঝরছে গাছ থেকে। সুধীরবাবু নাতিকে বুকে নিয়ে সেই রোদের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
জীবন অতীতকে ফিরিয়ে দেয় না। যা গেছে তা গেছেই। সরলা আর আসবে না। হারানো বছরগুলো আর ফেরত আসবে না। কিন্তু এই মুহূর্তে — এই একটু রোদে,নাতির এই ছোট্ট হাতের স্পর্শে — সুধীর চন্দ্র বসু অনুভব করলেন যে বুকের ভেতরের বেদনার পাথরটা বিগলিত হয়েছে।
শুধু একটু।
তবু সেটুকুই যথেষ্ট।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১৫৩ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৩/০২/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast