www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

এক টুকরা জীবন

সকালের আলো যখন জানালা দিয়ে ঢুকছিল, অমরেশ তখন তার ছোট্ট চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। পঞ্চাশ বছর বয়স তার, কিন্তু মনে হয় যেন সত্তর পেরিয়ে গেছে। জীবন তাকে অনেক কিছু দিয়েছে, আবার অনেক কিছু কেড়েও নিয়েছে।
এই ছোট্ট চায়ের দোকান রহিমের সব। শহরের একটা সরু গলিতে, যেখানে সকালে রিকশার ঘণ্টি আর মানুষের কোলাহলে দিন শুরু হয়। দোকানটা বেশ পুরনো, দেয়ালের রঙ উঠে গেছে, কিন্তু অমরেশের হাতের চা খেতে মানুষ এখনও আসে।
"অমরেশ ভাই, এক কাপ চা দেন তো!"
পাশের মুদি দোকানের করিম এসে বসল। অমরেশ হাসল, "আসছে ভাই। আজ কেমন আছেন?"
"আর বলবেন না ভাই। ছেলের পরীক্ষা সামনে, টিউশনি বাবদ অনেক টাকা লাগছে। কিন্তু কী করব, ছেলেকে তো মানুষ করতে হবে।"
অমরেশ চা বানাতে বানাতে মাথা নাড়ল। সে জানে এই কষ্ট কী। তার নিজেরও একসময় স্বপ্ন ছিল। একটা ছেলে ছিল, নাম প্রাণেশ। কিন্তু সে গল্প অনেক পুরনো, অনেক বেদনার।
চা বানিয়ে দিতে দিতে অমরেশ মনে করল, কীভাবে সে এই শহরে এসেছিল। ২৫ বছর আগের কথা। গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেছিল, পকেটে মাত্র দুশো টাকা নিয়ে। বাবা মারা গিয়েছিল, মায়ের চিকিৎসার জন্য টাকা লাগত। গ্রামে কোনো কাজ ছিল না। তাই শহরে এসেছিল স্বপ্ন নিয়ে।
প্রথম দিকে একটা হোটেলে বাসন মাজার কাজ করত। দিনে ১৬ ঘণ্টা কাজ, রাতে হোটেলের রান্নাঘরের এক কোণে ঘুম। কিন্তু অমরেশ হাল ছাড়েনি। একটু একটু করে টাকা জমিয়েছে। মাকে গ্রামে টাকা পাঠাত। তারপর একদিন খবর এল, মা নেই। অমরেশ সেদিন কেঁদেছিল অঝোর ধারায়। কিন্তু শহরে কে কার কান্না শোনে?
"অমরেশ ভাই, স্বপ্নে আছেন নাকি?" করিমের কথায় ভাবনা ভাঙল।
"না না, কিছু না। এই যে আপনার চা।"
করিম চুমুক দিয়ে বলল, "আহা! এই চায়ের স্বাদ কোথাও পাব না। আপনার হাতে যেন জাদু আছে।"
অমরেশ হাসল। "জাদু না ভাই, ভালোবাসা। আমি যা-ই করি, ভালোবেসে করি।"
এই কথাটা সত্যি। অমরেশ যখন হোটেল ছেড়ে প্রথম এই ছোট্ট দোকানটা খুলেছিল, তখন তার কাছে কিছুই ছিল না। একটা পুরনো চুলা, কয়েকটা কাপ, আর বিশ্বাস। বিশ্বাস যে সে পারবে।
প্রথম দিন মাত্র তিনজন এসেছিল চা খেতে। কিন্তু অমরেশ ছিল খুশি। আস্তে আস্তে মানুষ আসতে শুরু করল। অমরেশের ব্যবহার ছিল ভালো, চা ছিল সুস্বাদু, দাম ছিল সৎ। এটাই তার পুঁজি ছিল।
তারপর একদিন সুমিকে দেখেছিল। পাশের বাড়ির মেয়ে। প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় দোকানের সামনে দিয়ে যেত। লাজুক হাসি, সরল চোখ। অমরেশ মনে মনে ভাবত, এমন মেয়েই তার জীবনসঙ্গী হওয়া উচিত।
একদিন সাহস করে সুমির বাবার সাথে কথা বলল। আশ্চর্যের বিষয়, সুমির বাবা রাজি হলেন। বললেন, "ছেলে, তুমি সৎ মানুষ। আমার মেয়ে তোমার সাথে সুখী হবে।"
বিয়ে হল সাদামাটা ভাবে। কিন্তু অমরেশের জীবনে নতুন রঙ এল। সুমি ছিল তার স্বপ্ন, তার ভালোবাসা, তার সংসার। তারপর এক বছর পরএর প্রানেশ এল। ছোট্ট, নরম হাতের শিশু। অমরেশ যখন প্রথম তাকে কোলে নিল, তার চোখে জল এসে গেল। সে প্রতিজ্ঞা করল, এই ছেলেকে সে সব কিছু দেবে যা সে নিজে পায়নি।
প্রানেশ বড় হতে লাগল। চালাক ছিল ছেলেটা, পড়াশোনায় খুব মনোযোগী। স্কুলে সবসময় ভালো রেজাল্ট করত। অমরেশ রাত-দিন পরিশ্রম করত যাতে ছেলের পড়াশোনায় কোনো সমস্যা না হয়। সুমি সেলাইয়ের কাজ করত বাড়িতে বসে। দু'জনে মিলে যেভাবেই হোক সংসার চালাত।
অমরেশ যখন এসএসসি পাস করল, তখন সে বলল, "বাবা, আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই।"
অমরেশের বুক ভরে গেল গর্বে। ইঞ্জিনিয়ার! তার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে! কিন্তু মনে মনে চিন্তা হল। এত টাকা আসবে কোথা থেকে? তবুও সে হাসল, "হবি বাবা, তুই হবি। বাবা সব ব্যবস্থা করবে।"
সেই থেকে অমরেশ আরও বেশি পরিশ্রম শুরু করল। সকাল চারটায় উঠে দোকান খুলত, রাত দশটায় বন্ধ করত। ছুটি বলে কিছু ছিল না। এমনকি অসুখেও দোকান খুলত। টাকা জমাতে হবে, ছেলেকে ভর্তি করাতে হবে।
কিন্তু জীবন যেমন খুশি থাকতে দেয় না, তেমনি দুঃখও এড়িয়ে যায় না।
প্রানেশ যখন কলেজে ভর্তি হল, তখন অমরেশ ভাবল তার সব স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেল। কিন্তু বিধি বাম। প্রানেশ শহরের অন্য রকম জীবন দেখল। ধনী বন্ধুরা, বড় বড় গাড়ি, দামী কাপড়। ছেলেটা বদলাতে শুরু করল।
প্রথমে খুব সূক্ষ্মভাবে। বাড়িতে কম আসা, বাবা-মায়ের সাথে কম কথা বলা। তারপর ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। একদিন প্রানেশ বলল, "বাবা, আমার ল্যাপটপ লাগবে। সবার আছে, আমার নেই।"
অমরেশ জানত ল্যাপটপ কেনার মতো টাকা নেই। কিন্তু ছেলের চাহিদা। সে ঋণ নিল। সুদের টাকা শোধ করতে আরও বেশি পরিশ্রম করতে লাগল।
কিন্তু প্রানেশ খুশি হল না। সে চাইত আরও অনেক কিছু। একদিন অমরেশ দেখল প্রানেশ তার বাবার দোকান নিয়ে লজ্জা পায়। বন্ধুদের সামনে বলে, তার বাবা ব্যবসা করেন।
সেদিন অমরেশের খুব কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু সে কিছু বলেনি। ভাবল, ছেলে হয়তো বুঝবে একদিন।
কিন্তু সে দিন আর এল না। প্রানেশ পাস করার পর একটা ভালো চাকরি পেল। তারপর বিয়ে করল এক ধনী ব্যবসায়ীর মেয়েকে। বাবা-মাকে সেই বিয়েতে ডাকেনি। বলল, "বাবা, তুমি আসলে সবাই জানবে তুমি চা বিক্রেতা। আমার চাকরিতে সমস্যা হবে।"
অমরেশ সেদিন কেঁদেছিল। সুমিও। কিন্তু কী করবে? ছেলে তো তাদের। তারপর থেকে প্রানেশ খুব কমই আসে। বছরে একবার, দুবার, সেটাও খুব কম সময়ের জন্য।
"অমরেশ ভাই, আরেক কাপ দেন।"
করিমের কথায় অমরেশ বর্তমানে ফিরল। চা বানাতে লাগল। হাত দিয়ে কাজ করছে, কিন্তু মন অন্য কোথাও।
সুমি দুই বছর আগে মারা গিয়েছিল। ক্যান্সার। চিকিৎসার টাকা ছিল না। ছেলেকে ফোন করেছিল অমরেশ। ছেলে বলল, "বাবা, আমার এখন অনেক খরচ। তুমি ম্যানেজ করো।"
সুমি মারা যাওয়ার আগে অমরেশকে বলেছিল, "তুমি রাগ করো না প্রানের উপর। সে আমাদের ছেলে। একদিন সে ফিরবে।"
কিন্তু সুমি ভুল করেছিল। প্রানেশ ফেরেনি।
এখন অমরেশ একা। দোকান তার সঙ্গী, চা তার সান্ত্বনা, আর পুরনো স্মৃতি তার সম্পদ।
হঠাৎ দোকানের সামনে একটা ছোট্ট ছেলে এসে দাঁড়াল। ছেঁড়া জামা, ময়লা মুখ, কিন্তু চোখে অদ্ভুত এক আলো।
"কাকা , আমার খুব খিদে পেয়েছে। আপনার কাছে বিস্কুট আছে?" ছেলেটা জিজ্ঞেস করল।
অমরেশ তাকাল। বুঝল ছেলেটা রাস্তার শিশু। সে হাসল, "বিস্কুট আছে বাবা। তুমি বসো। আমি চা আর বিস্কুট দিচ্ছি।"
"কিন্তু কাকা, আমার যে টাকা নেই।" ছেলেটা মাথা নামিয়ে বলল।
"টাকা লাগবে না। তুমি খাও।"
ছেলেটা বসল। অমরেশ চা আর বিস্কুট দিল। ছেলেটা খুব ক্ষুধার্ত ছিল, তা বোঝা গেল। গোগ্রাসে খেল।
খাওয়া শেষে ছেলেটা বলল, "কাকা আপনি খুব ভালো মানুষ।"
অমরেশ হাসল। "তোমার নাম কী বাবা?"
"রফিক। আমার বাবা-মা নেই। আমি রাস্তায় থাকি।"
অমরেশের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। এই ছেলেটা কেমন যেন তার ছোট্টবেলার কথা মনে করিয়ে দেয়।
"তুমি কী করো রফিক?"
‘বোতল জমিয়ে বিক্রি করি। টাকা পয়সা জমাই। একদিন স্কুলে যাব।"
অমরেশ অবাক হল। এই ছেলেটার চোখে যে স্বপ্ন, সে স্বপ্ন তো তার ছেলের চোখে নেই।
"তুমি প্রতিদিন আসবে বাবা। আমি তোমাকে খাওয়াব।" অমরেশ বলল।
"সত্যি কাকা?" অমরেশের চোখ জল জল হোল।
"সত্যি।"
সেদিন থেকে রফিক প্রতিদিন আসে অমরেশে দোকানে সাহায্য করতে লাগল। সকালে চা আর বিস্কুট, দুপুরে ভাত, সন্ধ্যায় আবার কিছু খাবার। অমরেশ তাকে দত্তক নেয়নি, কিন্তু নিজের ছেলের মতোই দেখতে লাগল।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১২১ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১৮/০২/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

 
Quantcast