www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

সেলফি তুলতে গিয়ে

পূজার ছুটিতে আমাদের পরিবার সিদ্ধান্ত নিল উনকোটি যাবে।
উনকোটি — ত্রিপুরার সেই পবিত্র তীর্থস্থান, যেখানে পাথরের গায়ে খোদাই করা শিবের মুখ হাজার বছর ধরে নিরবে তাকিয়ে আছেন। মা বললেন, "ঠাকুরের দর্শন নেব।" বাবা বললেন, "প্রকৃতি দেখব।" আর আমি —স্মার্টফোনের নতুন ক্যামেরা পরীক্ষা করার সুযোগ পেয়ে মনে মনে বললাম, "ইনস্টাগ্রামে এবার ঝড় তুলব।"
রওনা হওয়ার আগের রাতেই আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি প্র্যাকটিস শুরু করলাম। কোন কোণে মুখ ধরলে বেশি "হিরোইক" দেখায়, চিবুকটা একটু তুললে ভালো কি না, নাকি সামান্য কাত করলে "ডিপ থটফুল" ভাব আসে — এই গভীর দার্শনিক প্রশ্নগুলো নিয়ে রাত বারোটা পর্যন্ত গবেষণা চলল।
পিসি দরজায় উঁকি দিয়ে বললেন, "রাহুল, ঘুমাবি না? কাল ভোরে উঠতে হবে।"
"হ্যাঁ পিসি, এক মিনিট।"
সেই এক মিনিট শেষ হলো রাত দেড়টায়।
পরদিন সকালে গাড়িতে উঠতে উঠতে মা জিজ্ঞেস করলেন, "ফোন চার্জ দিয়েছিস?"
"হ্যাঁ মা।"
"পাওয়ার ব্যাংক নিয়েছিস?"
"হ্যাঁ।"
"জুতো?"
আমি চুপ করে রইলাম। গাড়ি ততক্ষণে গেট পেরিয়ে গেছে।
বাবা বললেন, "ওই স্যান্ডেলেই চলবে। পাহাড়ে উঠবি, পা পিছলাবে, পড়বি, সেলফি তুলবি।" শেষ কথাটা তিনি নিজে বলেননি, কিন্তু চোখ দিয়ে বললেন।

উনকোটি পৌঁছে প্রথম দর্শনেই মন ভরে গেল। সত্যিই অসাধারণ জায়গা। পাথরের গা বেয়ে ঝরনা নামছে, চারদিকে ঘন সবুজ পাহাড়, আর সেই বিশাল শিবমূর্তি — কোটি দেবতার মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে যেন সমস্ত পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছেন।
মা হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বাবা নিঃশব্দে প্রণাম করলেন। ছোট ভাই রিতু হাঁ করে চেয়ে রইল।
আর আমি ফোন বের করে ভাবলাম — এই ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা সেলফি হলে ইনস্টাগ্রামে কমপক্ষে পাঁচশো লাইক।
প্রথম চেষ্টা করলাম নিজেই। হাত লম্বা করে ক্যামেরা তুললাম। ছবি দেখে বুঝলাম — শুধু আমার কপাল আর পেছনে ঝরনার জল। শিবমূর্তি ফ্রেমেই নেই।
দ্বিতীয়বার সেলফি স্টিক বের করলাম। রিতু বলল, "দাদা, তুই কি মাছ ধরতে এসেছিস?"
তখন চোখ পড়ল পাশে দাঁড়ানো এক ভদ্রলোকের দিকে। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, গলায় ক্যামেরা ঝোলানো, দেখেই বোঝা যাচ্ছে ফটোগ্রাফিতে আগ্রহ আছে।
আমি এগিয়ে গিয়ে বিনয়ের সাথে বললাম, "দাদা, একটু ছবি তুলে দেবেন?"
ভদ্রলোক সানন্দে রাজি হলেন।
আমি জায়গা বুঝিয়ে দিলাম, অ্যাঙ্গেল বললাম, আলো কোথা থেকে আসছে সেটা ব্যাখ্যা করলাম। ভদ্রলোক মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর ফোন তুলে — তুললেন। আমি পোজ দিলাম।
ফোন ফেরত পেয়ে ছবি দেখি — শুধু আকাশ।
নীল আকাশ। সাদা মেঘ। পাখি একটা উড়ছে।
আমি কোথাও নেই।
ভদ্রলোক বললেন, "সুন্দর হয়েছে না? আলো দেখো কেমন!"
আমি হাসলাম। দাঁতে দাঁত চেপে।
এরপর সিদ্ধান্ত নিলাম নিজেই ব্যবস্থা করব। পাশে একটা পাথরের উপর উঠলাম — একটু উঁচু থেকে ছবি তুললে পুরো দৃশ্যটা ধরা যাবে। পাথরে উঠলাম, ক্যামেরা তুললাম, পোজ দিলাম —
তখনই পা পিছলাল।
পড়লাম না, তবে এমনভাবে দুলে উঠলাম যে পাশের এক বৃদ্ধা মহিলা আঁতকে উঠে বললেন, "বাবা রে! ছেলেটা পড়ে যাবে!"
মা দৌড়ে এলেন। বাবা দূর থেকে দেখলেন, মুখে কিছু বললেন না, কিন্তু মুখের ভাব বলল — "বলেছিলাম।"
এরপর নজর পড়ল একটু দূরে একটা গাছের দিকে। মাঝারি উচ্চতা, শক্ত ডাল, আর সেখান থেকে উঠলে পেছনে শিবমূর্তি আর ঝরনা দুটোই ফ্রেমে আসবে।
রিতু বলল, "দাদা, তুই কি গাছে উঠবি?"
"শুধু একটু।"
"তুই তো গত বছর বাড়ির ছাদে উঠতে গিয়ে মইয়ে পড়ে গিয়েছিলি।"
"সেটা আলাদা ঘটনা।"
গাছে উঠলাম। প্রথম ডাল পর্যন্ত ঠিকঠাক। দ্বিতীয় ডালে পৌঁছে ফোন বের করলাম। পোজ দিলাম। শাটার টিপলাম।
নিচে তাকিয়ে দেখি — মা, বাবা, রিতু, পাশের সেই বৃদ্ধা মহিলা, এবং আরও জনা দশেক পর্যটক সবাই ওপরে তাকিয়ে আছেন। কেউ উদ্বিগ্ন, কেউ কৌতূহলী, কেউ হাসছেন।
বাবা বললেন, "নামবি কখন?"
ছবি দেখলাম। এবার আমি আছি। কিন্তু পেছনে শিবমূর্তি নেই — শুধু গাছের পাতা।
শেষমেশ ক্লান্ত হয়ে একটা পাথরের উপর বসলাম। রিতু পাশে এসে বসল। মা প্রসাদ হাতে নিয়ে এলেন, বাবা ঝরনার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন।
রিতু বলল, "দাদা, আমি একটা ছবি তুলি?"
আমি বললাম, "তুই পারবি?"
সে আমার ফোন নিল। কোনো নির্দেশনা ছাড়া, কোনো অ্যাঙ্গেল বিশ্লেষণ ছাড়া, শুধু তুলল।
ছবিটা দেখলাম।
আমি পাথরে বসে আছি, একটু ক্লান্ত, একটু এলোমেলো চুল, পেছনে শিবমূর্তি, পাশে ঝরনা, আলো এসে পড়েছে ঠিক মুখের উপর।
ছবিটা অসাধারণ হয়েছে।
ইনস্টাগ্রামে দিলাম। ক্যাপশন লিখলাম — "উনকোটি, ত্রিপুরা।"
তিনশো লাইক পড়ল রাতের মধ্যে।
বাড়ি ফেরার পথে বাবা গাড়িতে বললেন, "ঠাকুর দেখলি?"
আমি একটু চুপ করে থেকে বললাম, "হ্যাঁ বাবা। দেখলাম।"
মা মুচকি হাসলেন।
রিতু বলল, "গাছে উঠে দেখলি, নাকি পাথরে পড়তে গিয়ে দেখলি?"
সত্যি বলতে, উনকোটির সেই শিবমূর্তি সারাদিন আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। হয়তো ভেবেছিলেন — কোটি দেবতার মাঝে এই একটি মূর্খ কেন এলো?
উত্তর একটাই — সেলফির জন্য।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১৩৫ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১৮/০২/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast