www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

মেকআপ

সকালের আলো জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ছিল ঘরে। আয়নার সামনে বসে রিয়া তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। বাইশ বছর বয়সী এই মেয়েটির চোখে ছিল এক অদ্ভুত শূন্যতা। টেবিলে সাজানো ছিল রঙিন মেকআপের সামগ্রী—লিপস্টিক, আইশ্যাডো, ব্লাশ, ফাউন্ডেশন। কিন্তু আজ কিছুতেই হাত বাড়াতে পারছিল না সে।

"রিয়া, তাড়াতাড়ি কর! অফিসে লেট হয়ে যাবে," মা ডাক দিলেন বাইরে থেকে।

"আসছি মা," যান্ত্রিক গলায় উত্তর দিল রিয়া।

মেকআপ। এই শব্দটা তার জীবনে অনেক অর্থ বহন করে । এটা শুধু মুখে রঙ মাখার একটা প্রক্রিয়া নয় এটা, এটা একটা মুখোশ, যা পরে সে বেরোয় পৃথিবীর সামনে।

রিয়ার মনে পড়ে গেল সেই দিনের কথা। সে তখন ক্লাস এইটে পড়ে। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে নাচ করবে বলে খুব উত্তেজিত ছিল। প্রথমবার মেকআপ করার সুযোগ। মায়ের কাছ থেকে চুরি করে একটু লিপস্টিক লাগিয়েছিল ঠোঁটে। আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হয়েছিল রূপকথার রাজকন্যা। কিন্তু স্কুলে গিয়েই সব ভেঙে গিয়েছিল।

"দেখো দেখো, রিয়া লিপস্টিক মেখেছে! কী যে বোকা দেখাচ্ছে!" তার সহপাঠী মিতুল হেসেছিল তাকে দেখে।

"কালো মেয়ে লিপস্টিক মেখে কী করবে? আরও খারাপ লাগছে," আরেকজন যোগ দিয়েছিল।

সেদিন রিয়া বুঝে গিয়েছিল, তার ত্বকের রঙ একটা সমস্যা। সমাজের চোখে সে 'সুন্দর' নয়।

ফাউন্ডেশনের বোতলটা হাতে নিল রিয়া। কত টাকা খরচ করেছে এই বোতলের জন্য। 'ফেয়ারনেস', 'হোয়াইটেনিং', 'ব্রাইটেনিং'—এই শব্দগুলো যেন তার পিছু ছাড়ে না। প্রতিটি বিজ্ঞাপনে বলা হয় ফর্সা হলেই জীবনে সব পাওয়া যাবে—চাকরি, বিয়ে, সম্মান।

কলেজে ঢোকার পর থেকে রিয়া নিয়মিত মেকআপ করতে শুরু করেছিল। প্রথমে হালকা, তারপর ধীরে ধীরে ঘন ফাউন্ডেশন দিয়ে ঢেকে দিত তার আসল ত্বকের রঙ, কনসিলার দিয়ে লুকাতে চাইত চোখের নিচের কালো দাগ, হাইলাইটার দিয়ে তৈরি করত কৃত্রিম উজ্জ্বলতা।

"রিয়া, তুমি মেকআপ করলে অনেক সুন্দর লাগ," তার বন্ধু সানিয়া প্রায়ই বলত।

কিন্তু এই প্রশংসাটা রিয়ার কানে কেমন যেন বিদ্রূপের মতো লাগত। মানে কি? মেকআপ ছাড়া সে সুন্দর নয়?

অফিস জীবন শুরু হওয়ার পর মেকআপ হয়ে উঠেছিল তার দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিদিন সকালে ঘণ্টাখানেক সময় ব্যয় করত আয়নার সামনে। মুখে রঙ মাখতে মাখতে মনে হতো, সে যেন একজন শিল্পী যে তার নিজের মুখটাকে একটা ক্যানভাস বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু এই শিল্পের উদ্দেশ্য কী? নিজেকে সুন্দর করা, নাকি নিজেকে লুকানো?

অফিসের সহকর্মীদের সাথেও প্রতিদিন চলত এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা। কে কত ভালো দেখাচ্ছে, কার মেকআপ কেমন, কে কোন ব্র্যান্ডের লিপস্টিক ব্যবহার করে—এসব নিয়ে আলোচনা, তুলনা।

"তুমি কি নতুন ফাউন্ডেশন ইউজ করছ? স্কিন তো একদম গ্লোয়িং লাগছে," সহকর্মী নীলা একদিন জিজ্ঞেস করেছিল।

রিয়া হেসে উত্তর দিয়েছিল, কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা তিক্ততা অনুভব করেছিল। এই গ্লো তো কৃত্রিম, এই উজ্জ্বলতা তো মিথ্যা।

তারপর এসেছিল বিয়ের প্রস্তাব। ছেলে দেখা, পাত্র দেখা—এই পুরো প্রক্রিয়ায় মেকআপের ভূমিকা ছিল প্রধান।

"ভালো করে তৈয়ার হয়ে নিস। ছেলেরা প্রথমে চেহারাটাই দেখে," মা বলেছিলেন।

রিয়া সেদিন এত মেকআপ করেছিল যে আয়নায় নিজেকে চিনতেই পারছিল না। কিন্তু সবাই বলেছিল দারুণ লাগছে।

ছেলেটির নাম ছিল অভীক। ভদ্র, শিক্ষিত, ভালো চাকরি। বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। কিন্তু রিয়ার মনে একটা ভয় কাজ করছিল। অভীক তো তাকে দেখেছে মেকআপ করা অবস্থায়। বিয়ের পর যখন সে আসল মুখটা দেখবে, তখন?

বিয়ের রাতে ভারী মেকআপ করা বধূ রিয়া যখন রুমে এল, অভীক মৃদু হেসে বলেছিল, "এত মেকআপ কেন? তুমি তো সুন্দর।"

রিয়া অবাক হয়েছিল। কিন্তু সাহস করে মেকআপ তুলতে পারেনি।

দিন যেতে থাকল। বিবাহিত জীবন মোটামুটি ভালোই চলছিল। কিন্তু রিয়ার মনের ভিতরের দ্বন্দ্ব কমছিল না। প্রতিদিন সকালে উঠে প্রথম কাজ মেকআপ। অভীকের সামনেও নিজের খোলামেলা মুখ দেখাতে সংকোচ বোধ করত।

একদিন সন্ধ্যায় অভীক অফিস থেকে ফিরে দেখে রিয়া আয়নার সামনে বসে কাঁদছে। মুখ ভর্তি মেকআপ, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে, কালো কাজল মিশে গিয়ে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত ছবি।

"কী হয়েছে রিয়া?" অভীক কাছে এসে বসল।

"আমি... আমি ক্লান্ত অভীক। এই মেকআপ করতে করতে, এই মুখোশ পরে পরে খুব ক্লান্ত।"

অভীক চুপ করে শুনছিল।

"তুমি জানো, আমি কখনো নিজের আসল মুখটা কাউকে দেখাইনি? এমনকি তোমাকেও না। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই আয়নায় নিজেকে দেখি আর মনে হয়, এই মুখ নিয়ে বাইরে বেরোনো যাবে না। সবাই কী ভাববে? সবাই তো অপেক্ষা করে থাকে মেকআপ করা, সাজানো গোছানো রিয়াকে দেখার জন্য।"

অভীক আস্তে আস্তে রিয়ার হাত থেকে টিস্যু বক্সটা নিয়ে তার মুখের মেকআপ মুছতে শুরু করল। রিয়া চমকে উঠল।

"কী করছ তুমি?"

"তোমার আসল মুখ দেখতে চাই।"

"না, ছাড়ো। আমাকে দেখতে ভালো লাগব না।"

"কে বলল? তুমি জানো, আমি প্রথম তোমার দিকে আকৃষ্ট হয়েছিলাম তোমার চোখের জন্য। সেই চোখে একটা গভীরতা আছে, একটা সততা আছে। মেকআপ তো শুধু ওপরের আবরণ, আসল সৌন্দর্য তো ভিতরে।"

রিয়ার চোখ দিয়ে আরও জল এল। অভীক ধীরে ধীরে তার সব মেকআপ মুছে ফেলল। খোলা মুখে রিয়াকে দেখে অভীক হাসল।

"দেখেছ? তুমি কত সুন্দর। কিন্তু সৌন্দর্য তো শুধু মুখে নেই। তোমার হাসিতে আছে, তোমার কথায় আছে, তোমার চিন্তায় আছে।"

সেই রাতে রিয়া অনেকক্ষণ আয়নার সামনে বসে ছিল। মেকআপবিহীন নিজের মুখটা দেখছিল। কতদিন পর এই মুখ দেখল সে? এই মুখে কালো দাগ আছে, ত্বক মসৃণ নয়, রঙ ফর্সা নয়। কিন্তু এই মুখটা তার নিজের। এই মুখেই সে হেসেছে, কেঁদেছে, স্বপ্ন দেখেছে।

পরদিন সকালে রিয়া আয়নার সামনে বসে প্রথমবারের মতো দ্বিধা করল। মেকআপ করবে কি না? অফিসে যেতে হবে, সবাই তো সাজগোজ করেই আসে।

"তুমি ইচ্ছা করলে মেকআপ করো, নো প্রবলেম। কিন্তু নিজের জন্য করো, অন্যদের খুশি করার জন্য নয়," অভীক বলেছিল।

রিয়া সেদিন হালকা একটু মেকআপ করল। শুধু ঠোঁটে একটু রঙ, চোখে হালকা কাজল। ফাউন্ডেশন নয়, কনসিলার নয়।

অফিসে গিয়ে প্রথমে একটু অস্বস্তি লাগছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই অস্বস্তি কেটে গেল। আর কেউ কিছু বলল না, কেউ খেয়াল করল না।

মাস খানেক পর একদিন সানিয়া বলল, "তুমি কেমন চেঞ্জ চেঞ্জ লাগছ রিয়া। আগের চেয়ে বেশি রিল্যাক্স, বেশি কনফিডেন্ট।"

রিয়া হেসে ফেলল। হ্যাঁ, সে এখন বেশি আত্মবিশ্বাসী। কারণ এখন সে নিজেকে গ্রহণ করতে শিখেছে।

তবে এই যাত্রা সহজ ছিল না। মাঝে মাঝে পুরনো অনিরাপত্তা ফিরে আসত। বিশেষ করে যখন টিভিতে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ফর্সা ত্বকের বিজ্ঞাপন দেখত, বা যখন কেউ মন্তব্য করত "তুমি একটু ফর্সা হলে আরও ভালো লাগতে"—এমন সময় মনে হতো আবার ফিরে যাই পুরনো মেকআপের জগতে।

কিন্তু অভীক পাশে ছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা, রিয়া নিজেই তার নিজের সবচেয়ে বড় সমর্থক হয়ে উঠছিল।

একদিন রিয়ার ছোট বোন তানিয়া এসেছিল। সে এখন কলেজে পড়ে। তার মুখভর্তি মেকআপ দেখে রিয়া চিনতেই পারেনি প্রথমে।

"এত মেকআপ কেন তানিয়া?" রিয়া জিজ্ঞেস করল।

"আরে, কলেজে সবাই তো করে। আমি না করলে খারাপ লাগে।"

রিয়া বুঝতে পারল, তানিয়াও সেই একই পথে হাঁটছে যে পথে সে কয়েক বছর আগে হেঁটেছিল।

"দেখো তানিয়া, মেকআপ করা খারাপ নয়। এটা একটা শিল্প, একটা আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। কিন্তু এটা যদি তোমার নিজেকে লুকানোর উপায় হয়ে যায়, যদি তুমি মনে করতে শুরু করো যে মেকআপ ছাড়া তুমি অসুন্দর, তাহলে সমস্যা। সৌন্দর্য মানে শুধু একটা নির্দিষ্ট ত্বকের রঙ নয়, একটা নির্দিষ্ট চেহারা নয়। সৌন্দর্য হলো তুমি কীভাবে নিজেকে বহন করো, কীভাবে অন্যদের সাথে ব্যবহার করো, তোমার ভিতরের মানুষটা কেমন।"

তানিয়া মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।

"আর জানিস, সবচেয়ে বড় কথা হলো—তুই যদি মেকআপ করতে চাস, করবি নিজের জন্য। নিজের ভালো লাগার জন্য। অন্যদের প্রত্যাশা পূরণ করার জন্য নয়, সমাজের একটা স্ট্যান্ডার্ডে নিজেকে ফিট করানোর জন্য নয়।"

সেদিন রাতে রিয়া অনেকদিন পর ডায়েরি লিখল। লিখল তার এই যাত্রার কথা—মেকআপের মুখোশ পরা থেকে শুরু করে সেই মুখোশ খুলে ফেলা পর্যন্ত।

ডায়েরিতে সে লিখল: "মেকআপ একটা শিল্প, কিন্তু জীবন শুধু মেকআপের ক্যানভাস নয়। আমি শিখেছি যে বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের প্রতি সৎ থাকা। সমাজ আমাদের শেখায় নিজেকে ঢেকে রাখতে, লুকিয়ে রাখতে, পরিবর্তন করতে। কিন্তু আসল সাহস হলো নিজের খোলা মুখটা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরা, সব দুর্বলতা, সব ত্রুটি নিয়ে।

আজ আমি জানি, আমার ত্বক যে রঙেরই হোক, আমার মুখে যত দাগই থাকুক, আমি সুন্দরী। কারণ সৌন্দর্য আসে ভিতর থেকে, আত্মবিশ্বাস থেকে, নিজেকে গ্রহণ করার ক্ষমতা থেকে।"

বছর দুয়েক পর রিয়া একটা ব্লগ শুরু করল। নাম দিল "Beyond Makeup"। সেখানে সে লিখত তার অভিজ্ঞতা, মেকআপ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি, এবং কীভাবে মেয়েরা নিজেদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে।

ব্লগটা ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠল। অনেক মেয়ে তাকে মেসেজ করত, বলত তারাও একই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

একদিন এক পাঠিকা লিখল: "আপনার লেখা পড়ে আমি প্রথমবারের মতো বুঝলাম যে আমার কালো ত্বক নিয়ে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। আমিও সুন্দরী, এটা এখন বিশ্বাস করতে শিখছি।"

রিয়ার চোখে জল এসে গেল এই মেসেজ পড়ে। সে বুঝল, তার এই যাত্রা শুধু তার একার নয়, এটা অসংখ্য মেয়ের যাত্রা।

আজ সকালে আয়নার সামনে বসে রিয়া হাসল। মেকআপ সামগ্রী এখনো আছে তার টেবিলে। কখনো সখনো সে মেকআপ করে, তবে এখন সেটা একটা বাধ্যবাধকতা নয়, একটা আনন্দ। সে এখন জানে কখন মেকআপ করবে, কখন করবে না।

সবচেয়ে বড় কথা, এখন সে আয়নায় নিজের মুখ দেখে ভয় পায় না, লজ্জা পায় না। সে দেখে একজন আত্মবিশ্বাসী নারীকে, যে জীবনে লড়াই করেছে, নিজেকে খুঁজে পেয়েছে।

মেকআপ এখন শুধুই মেকআপ। কিন্তু জীবন মেকআপের চেয়ে অনেক সুন্দর,অনেক বেশি রঙিন।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৮৩ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১৭/০২/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

 
Quantcast