জুলাই পরবর্তী সময়ে জুলাইকে দাঁড় করানো হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের বিপক্ষে। আওয়ামীপন্থীরা যেটাকে ফ্রেম করছে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে আগ্রাসন হিসেবে। জুলাইয়ের ডানপন্থী শক্তি জুলাইকে দাঁড় করাতে চায় ডানপন্থীদের প্রথম কোনো বিজয় হিসেবে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শক্তি আর ডানপন্থীদের মাঝে পড়ে জুলাই তার স্বকীয় চরিত্র হাজির করতে বেগ পাচ্ছে। এর ফল হিসেবে জুলাই দাঁড়িয়ে গেছে একাত্তরের বিপক্ষে। অথচ জুলাই একাত্তরের ধারাবাহিকতা হিসেবেই রাজনীতিতে টিকে থাকবে।

আজ পনেরই আগস্ট। শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিক। এইদিন উপলক্ষে কিছু মুজিবপ্রেমী ধানমন্ডি ৩২ এ উপস্থিত হয়েছিল। ‘জুলাইযোদ্ধা’ পরিচয়ে মানুষকে ধানমন্ডি ৩২-এ যেতে বাধা দিয়েছে, তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকেই আঘাত করেছে। কোনো মানুষ শেখ মুজিবুর রহমানকে ভালোবাসতে পারেন—এটা তাঁর নাগরিক অধিকার, তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত পছন্দ। সেই ভালোবাসার কারণে কাউকে হেনস্তা করা গণতন্ত্রের ভাষা নয়; এটা নিছক গুন্ডামি। আচ্ছা, আপনাদের কী একবারও মনে হয়নি যে, নিছক আওয়ামীলীগ করার কারণে আপনার একজনের নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করছেন! আর হেনস্তার শিকার ব্যক্তিকেই পুলিশ বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আসামি করা রাষ্ট্রীয় জুলুমের শামিল। এমন প্রবণতা বন্ধ না হলে তা কেবল অন্যায়ের পুনরাবৃত্তিই ঘটাবে; শাসকের মুখ বদলাবে, কিন্তু শাসনের চরিত্র বদলাবে না।

শেখ মুজিবকে ভালোবাসা যেমন অপরাধ নয়, তেমনি তাঁর সমালোচনা করাও অপরাধ হতে পারে না। তিনি ফেরেশতা ছিলেন না, আবার শয়তানও নন। তিনি ছিলেন রক্তমাংসের একজন মানুষ, একজন পেশাদার রাজনীতিবিদ, যাঁর জীবন ও কর্মে যেমন মহত্ত্বের অধ্যায় আছে, তেমনি আছে বিতর্ক, সীমাবদ্ধতা ও ভুলের ইতিহাসও। ইতিহাসের মানুষদের বিচার করতে হলে তাঁদের সম্পূর্ণতাকে দেখতে হয়; পূজার বেদিতে বসিয়েও নয়, ঘৃণার অন্ধকারে নিক্ষেপ করেও নয়।

শেখ হাসিনার শাসনামলে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রকৃত গবেষণার চেয়ে বেশি হয়েছে বন্দনা ও স্তুতি। তাঁর নাম ও স্মৃতিকে ব্যবহার করা হয়েছে ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা, বাধ্যতামূলক শোক এবং একমুখী বয়ানের ভিড়ে মানুষ প্রকৃত শেখ মুজিবকে জানার সুযোগ পায়নি। ফলে তিনি অনেকের কাছে পরিচিত হয়েও অজানা রয়ে গেছেন।

আজ ইতিহাসকে নতুন করে পাঠ করার, মুক্ত আলোচনায় বঙ্গবন্ধুকে জানার ও বোঝার সুযোগ এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পুরোনো রোগ আবারও ফিরে আসছে। একপক্ষ রাজনীতিক শেখ মুজিবকে এমন এক অলৌকিক মর্যাদায় উন্নীত করতে চায়, যেখানে তাঁর যে কোনো সমালোচনা ধর্মদ্রোহিতার সমার্থক। অন্যপক্ষ আবার তাঁর স্মৃতি, অবদান ও অস্তিত্বের সব চিহ্ন মুছে ফেলতে চায়। উভয় অবস্থানই ইতিহাসের প্রতি অন্যায়।

ইতিহাস কখনো উগ্র ভক্তির হাতে নিরাপদ নয়, আবার প্রতিহিংসার হাতেও নয়। ইতিহাসের জন্য প্রয়োজন সংযম, বস্তুনিষ্ঠতা এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। যে জাতি তার অতীতকে নির্ভয়ে, নিরপেক্ষভাবে এবং নির্মোহ দৃষ্টিতে বিচার করতে পারে না, সে জাতি ভবিষ্যতের পথও স্পষ্টভাবে দেখতে পারে না। ইতিহাসকে ইতিহাসের মতোই থাকতে দিতে হবে—না দেবত্বের আসনে, না ধ্বংসের স্তূপে। কারণ নির্মোহতা ছাড়া ইতিহাস হয় না; হয় কেবল মিথ, কিংবা বিদ্বেষের কাহিনি।