যে আল্লামা ইকবালকে ১৯০৯ সালে তাঁর রচিত কবিতা ' শিকওয়া' এবং ১৯১৫ সালে তাঁর ফারসি কাব্যগ্রন্থ 'আসরার-ই-খুদি' প্রকাশিত হলে তৎকালীন দেওবন্দী আলেম ও মৌলভীরা নাস্তিক ও কাফের বলে কটাক্ষ করতেন। মোল্লাদের দাবী ছিল আল্লামা ইকবাল তাঁর "শিকওয়া" কবিতায়-আল্লাহর কাছে মুসলিম উম্মাহর দুর্দশা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ ও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, আল্লাহর দরবারে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রশ্ন তোলা কুফরি ও নাস্তিকতার শামিল। এবং তাঁর লেখা 'আসরার-ই-খুদি' সম্পর্কে মোল্লারা দাবী করেন আল্লামা ইকবাল এই গ্রন্থে মানুষকেই খোদার স্থলাভিষিক্ত করছেন। সুতরাং তিনি কাফের, নাস্তিক। কিন্তু বর্তমানে সেই দেওবন্দের উত্তরসূরিরাই ওয়াজ মাহফিলে ধর্মের নামে আল্লামা ইকবালের গুণগান করেন। কেন?

​অন্যদিকে, ইবনে সীনাকে তাঁর দর্শনের জন্য ইমাম গাজ্জালি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘তাহাফুত আল-ফালাসিফা’ (দার্শনিকদের অসঙ্গতি)-এ তীব্র সমালোচনা করে ইবনে সীনাকে বিভ্রান্ত ও কাফের বলেছেন। ইবনে তাইমিয়া (রঃ) তাঁকে "নাস্তিক ও বাতেনি" বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং তাঁর বিখ্যাত ছাত্র ইবনুল কাইয়্যিম(রঃ) ইবনে সীনাকে "নাস্তিকদের ইমাম" (ইমামুল মুলহিদীন) হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এবং শিয়া ইসমাইলি ভাবধারার পরিবারে জন্ম নেওয়া সেই ইবনে সীনার নামে বাংলাদেশে যখন ধর্মের নামে রাজনীতি বা ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে, এবং জামায়াত-শিবির তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নামকরণে তাঁকে স্মরণ করে, তখন আমার প্রশ্ন জাগে- তারা কি প্রকারান্তরে একজন নাস্তিককেই সম্মানিত করছে না? নাকি এটি জামায়াত ও তাদের সমভাবাপন্নদের দ্বিমুখী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ, যারা ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষকে বোকা বানিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল ও ক্ষমতাবান হতে চায়?

১৯২১ সালের ডিসেম্বরে কবি নজরুল ইসলামের 'বিদ্রোহী' কবিতা রচিত হলে তৎকালীন মোল্লাগোষ্ঠী যেমন: মোহাম্মদ আকরম খাঁ (যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোর বিরোধিতা করেন), মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মোহাম্মদ রোজাব আলী খান প্রমুখের পত্রিকা গোষ্ঠী) নজরুলের বিরুদ্ধে প্রথম কঠোর অবস্থান নেন এবং কাফের আখ্যা দেন। ১৯২৫ সালে প্রকাশিত নজরুলের 'মানুষ' ও 'জাতের বজ্জাতি' কবিতা প্রকাশিত হলে আঞ্জুমানে ওলামা ও মৌলভী সমাজ কবি নজরুলকে নাস্তিক বলে আখ্যায়িত করেন। ১৯৩০সালে যখন কবি নজরুল "শ্যামা সংগীত ও ভজন" রচনা করেন তখন কট্টর সোলতান ও মোসলেম সমাজ এবং কিছু ওহাবি/ফরায়েজি ভাবধারার আলেম তাঁকে নাস্তিক বলে আখ্যায়িত করেন। এইছাড়াও তিনি প্রমিলা দেবীকে বিবাহের পর তাঁদের যে সন্তান হয়েছিল সেসব সন্তানদের নাম হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির মিশ্রণে (সব্যসাচী, অনিরুদ্ধ, কাজী বুলবুল, কাজী কৃষ্ণ মোহাম্মদ) রাখার কারণে মুসলিম সমাজ তাঁকে ‘মুরতাদ’ (ইসলামত্যাগী নাস্তিক) এবং হিন্দু সমাজ তাঁকে ‘যবন’ বলে বয়কট করে। অথচ তিনি নাস্তিক ছিলেন না। তিনি মনেপ্রাণে আল্লাহ ও নবীকে বিশ্বাস করতেন। সেসময়ের মোল্লাদের চরিত্র উন্মোচনে লেখার কারনে মোল্লারা তাদের ধর্ম ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য কবি নজরুলকে নাস্তিক বলে ফতোয়া দেন।

ঠিক একইভাবে, বিশ্বখ্যাত পারস্যের গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ ও কবি ওমর খৈয়াম-কেও তৎকালীন ও পরবর্তী কট্টরপন্থী আলেম সমাজ ও অর্থোডক্স মোল্লাতন্ত্র তীব্র আক্রমণ করেছে। খৈয়ামের রুবাইয়াত (চতুর্দশপদী কবিতা)-এ ধর্মের নামে ভণ্ডামি, অন্ধ বিশ্বাস, পরকালের ভয় দেখিয়ে ব্যবসা করা এবং মোল্লাদের সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে যে সুফিবাদী ও মুক্তচিন্তার তীক্ষ্ণ খোঁচা ছিল, তা মোল্লাতন্ত্রের সহ্য হয়নি। তাঁকে 'কাফের', 'ধর্মদ্রোহী' ও 'সুরা-প্রেমিক নাস্তিক' বলে অপবাদ দেওয়া হয়েছিল। অথচ আধুনিক যুগে এসে দেখা যায়, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও তাদের প্রচারকরা ওমর খৈয়ামকে "ইসলামী রেনেসাঁ ও বিজ্ঞান সাধনার পথিকৃৎ" হিসেবে নিজেদের স্বার্থে ও গৌরব গাথা গাইতে গর্বভরে ব্যবহার করে। অথচ যে স্বাধীন চিন্তাধারা ও জীবনদর্শনের জন্য ওমর খৈয়াম বিখ্যাত ছিলেন, তা আজকের মৌলবাদী মতাদর্শের একেবারেই বিপরীত। অতীতে যাকে 'কাফের' ও 'মদ্যপ' বানিয়ে বর্জন করা হয়েছিল, আজ নিজেদের মেধা ও মননের দৈন্য ঢাকতে তাকেই আবার 'ইসলামী সভ্যতার আইকন' হিসেবে গ্রহণ করা- তাদের এ এক অনন্য ঐতিহাসিক তামাশা।

একসময়ে যেসব মোল্লাদের কাছে যারা কাফের, মুরতাদ ও নাস্তিক ছিলেন, সেসব মোল্লাদের উত্তরসূরীদের কাছে এখন তাঁরা আইডল (আল্লামা ইকবাল, ইবনে সীনা ও নজরুল এবং ওমর খৈয়াম) অথচ রবীন্দ্রনাথ তাদের কাছে ঘৃণিত। অদ্ভুত দ্বিচারিতা নাকি জ্ঞানহীন একজাতি!

যাইহোক, ​আল্লামা ইকবাল ও ইবনে সীনার মতো ভিনদেশী- যাঁদের একসময় নাস্তিক ও কাফের আখ্যা দেওয়া হয়েছিল- তাঁদের প্রতি যদি বাংলাদেশের দেওবন্দ মাদ্রাসার অনুসারী হেফাজতী ও জামায়াতপন্থীদের মনে এত গভীর প্রেম থাকে, তবে আজ বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের প্রতি এতো ঘৃণা কেন?

প্রকৃতপক্ষে, এই রাজনৈতিক মোল্লাগোষ্ঠীর সাহিত্য বা দর্শনের প্রতি বিন্দুমাত্র অনুরাগের ইতিহাস কোনোকালেই ছিল না। ইতিহাস পাঠ করলে দেখা যায়, কালভেদে তাদের 'শত্রু' এবং 'আইডল' নির্বাচনের মাপকাঠি কেবলই কৌশলগত লাভ-ক্ষতির ওপর নির্ভরশীল। যখন যে বুদ্ধিজীবী বা চিন্তাবিদ ধর্মকে পুঁজি করে চলা ব্যবসাকে উন্মোচিত করেছেন, তখনই তাঁর কপালে জুটছে 'কাফের' বা 'মুরতাদ' তকমা। কিন্তু সময় গড়ালে যখন দেওবন্দী বা জামায়াতপন্থীরা দেখেছে যে ইকবাল, নজরুল বা ইবনে সীনার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতা সমাজ থেকে উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়, তখন তারা নিজেদের সুবিধাবাদী নীতি অনুযায়ী তাঁদের "ইসলামি আইকন" হিসেবে আত্মসাৎ বা অপব্যবহার করার ঘৃণ্য অপচেষ্টায় নেমেছে। এটি আকিদাগত কোনো পরিবর্তন নয়, বরং রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সুবিধাবাদ।

​অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি তাদের এই গভীর ঘৃণা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং মুক্তচিন্তার চেতনার ওপর তাদের দীর্ঘদিনের আক্রোশের প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণ করে তারা মূলত অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল চিন্তাধারাকে আঘাত করতে চায়, যা তাদের ধর্মভিত্তিক ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক এজেন্ডার সবচেয়ে বড় বাধা। তারা জানে, সাধারণ মানুষের মাঝে ধর্মীয় অনুভূতির সুড়সুড়ি দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে 'অন্য ধর্মের প্রতিনিধি' বা 'হিন্দু কবি' হিসেবে চিহ্নিত করা সহজ। ফলে ইতিহাসজুড়ে কাফের ফতোয়া দেওয়া মানুষদের সুবিধা অনুযায়ী আপন করে নেওয়া আর বিশ্বকবিকে বয়কট করা- এসবই ধর্মকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত রাখা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করার একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

  • ইকরামুল শামীম