১৯৭৫ সালের পূর্বে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ কেউ করেনি কিন্তু ১৯৭৬ সালের পর থেকে শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে হাজার হাজার অভিযোগ, তবে কেন? সত্য জানুন-
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের "ভাগ করো ও শাসন করো" নীতির মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর যে আঘাত নেমে এসেছিল, তার প্রতিবাদে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সর্বস্তরের বাঙালি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে। এই গণআন্দোলনকে অনুপ্রাণিত ও বেগবান করতে ১৯০৫ সালের আগস্ট মাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর "আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি" গানটি রচনা করেন। একই বছর ৭ই সেপ্টেম্বর ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকায় গানটি প্রকাশিত হয়। এবং বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে বাঙালি জাতির অখণ্ডতা, মাটি ও মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করতেই কবিগুরু " আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে" এই অমর গানটি রচনা করেছিলেন। যা ১৯০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে "ভান্ডার" পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এইছাড়াও সেসময়ে তিনি বাংলাকে নিয়ে প্রায় ত্রিশটি গান রচনা করেন, যার মধ্যে রয়েছে কালজয়ী গান "ও আমার দেশের মাটি, তোমার 'পরে ঠেকাই মাথা" এবং "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে"।
পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন অস্থায়ী মুজিবনগর সরকার "আমার সোনার বাংলা" গানটিকে বাংলাদেশের "জাতীয় সংগীত" হিসেবে ঘোষণা করে। রবীন্দ্রনাথের রচিত গানের " আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে" বাংলাদেশ শব্দটিকে কোড করে, ১৯৬৯ সালের ৫ই ডিসেম্বরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন- "একসময় এদেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে 'বাংলা' কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও মুছে ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে। জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি- আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম 'পূর্ব পাকিস্তান'-এর পরিবর্তে শুধুই 'বাংলাদেশ'।" সে অনুসারে মুজিবনগর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার যে ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে, তাতে নবগঠিত স্বাধীন রাষ্ট্রের নাম দেওয়া হয় ‘বাংলাদেশ’।
১৯৭৫ সালের পর থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার ও মিথ্যাচার শুরু হয়। মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিগুলোই এই অপপ্রচারের রূপকার। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব তারা কখনো মেনে নিতে পারেনি, আর তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত আমাদের জাতীয় সংগীত ও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির নাম পরিবর্তন করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।
মূলত, স্বাধীনতা বিরোধীদের রবীন্দ্রনাথ বিরোধিতার পেছনে মূল কারণ হলো- বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীক আমাদের জাতীয় সংগীতটি বদলে ফেলার একটি অপচেষ্টা। যদি তাই না হয় তাহলে এই বাঙ্গুরা ১৯৭৫ সালের আগে রবীন্দ্রনাথের নামে এমন অভিযোগের একটি প্রমান দিতে বলুন, তারা দিতে পারবে না। কারন এমন কোনো সত্য ঘটনাই ঘটে নাই, এবং সেসময়ে এমন অভিযোগও তারা করে নাই। তখন কেন করে নাই, এখন কেন করছে? তাই এই অপপ্রচারের মূল সত্য ও সঠিক তথ্য সবার জানা অত্যন্ত জরুরি।
১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার টাউন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ সভা হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। সেই সময়ে তিনি কুষ্টিয়ার শিলাইদহে অবস্থান করছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যারা বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের প্রধান ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী এবং ড. রাসবিহারী ঘোষ। সেই বিরোধিতাকারীদের তালিকায় রবীন্দ্রনাথের নাম ছিল না।
তৎকালীন ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালে ঢাকা সফর শেষে কলকাতায় ফিরে গেলে, ১২ ফেব্রুয়ারি ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তাঁর সাথে দেখা করে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা করে একটি স্মারকলিপি পেশ করে। লর্ড হার্ডিঞ্জ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে জানতে চান- কিসের বিনিময়ে তিনি এই বিরোধিতা থেকে সরে আসবেন? পরবর্তীতে স্যার আশুতোষের শর্তসাপেক্ষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটি নতুন অধ্যাপক পদ সৃষ্টির মাধ্যমে সেই বিরোধিতার অবসান ঘটে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ব্যাপক সহযোগিতা করেছিলেন।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের কোথাও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন না। তাহলে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী হয়ে উঠলেন? অপপ্রচারকারীরা প্রায়ই দাবি করে- ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে নাকি একটি সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তৎকালীন সময়ে রবীন্দ্রনাথ কলকাতায়ই ছিলেন না, তাই সভাপতির পদে উপস্থিত থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
এছাড়া, যারা সেই সময়ে বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের অনেকের সাথেই রবীন্দ্রনাথের সুসম্পর্ক ছিল- এই অজুহাত তুলে অনেকে রবীন্দ্রনাথকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালায়। কিন্তু তৎকালীন সময়ে রবীন্দ্রনাথের সামাজিক অবস্থান তারা অনুধাবন করতে পারে না। তিনি ছিলেন তদানীন্তন সমাজের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ও আইকন, ফলে সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে তাঁর সম্পর্ক থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রাসঙ্গিক ছিল।
রবীন্দ্রনাথ যদি সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী হতেন, তবে ১৯২৬ সালে- প্রতিষ্ঠার মাত্র ৫ বছর পর- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে কেন বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা দিয়েছিল? তাছাড়াও ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক 'ডি-লিট' (Doctor of Literature) ডিগ্রি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যা ১৯৩৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হয়।
আরও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে একাত্তরের পরাজিত ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী একটি মনগড়া বয়ান তৈরি করতে চাইছে যে- রবীন্দ্রনাথ নাকি 'বাংলাদেশ বিরোধী' ছিলেন। এটি কতটাই না হাস্যকর ও অযুক্তিকর ন্যারোটিভ! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুবরণ করেন ১৯৪১ সালে। তাঁর প্রয়াণের ৬ বছর পর ভারত-পাকিস্তান বিভক্ত হয় এবং তারও ২৪ বছর পর (১৯৭১ সালে) বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। যে দেশটি তাঁর মৃত্যুর তিন দশক পর অস্তিত্ব লাভ করলো, রবীন্দ্রনাথ কীভাবে সেই দেশের বিরোধী হতে পারেন? মূলত বাঙালী জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতা বিরোধী ও কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বারবার এই মিথ্যাচারগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। কারন তাদের একটি মাত্র দুঃখ- বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের কেন জন্ম হলো...
আরো একটি সত্য জানা সবার দরকার যে- রবীন্দ্রনাথ তাঁর নোবেল প্রাইজের পুরা অর্থ এক লাখ আট হাজার টাকা বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান কৃষকদের জন্য দিয়ে দিয়েছিলেন। নিজের বাড়িতে এই বাঙালী মুসলমানদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়েছিলেন। এইসব নিয়ে ব্লগ লিখবো। তবে সঠিক ইতিহাস চর্চ না করে শুধু পাকিপ্রেমী হয়ে যে বা যারা মিথ্যাচার করে তারা কে বা কি? মিথ্যাচার করা কি তাদের ধর্ম?
ইকরামুল শামীম

মন্তব্য (1)