"আমরা সবাই অধিবাসী হব, আদিবাসী নয়"- রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের এই ধরনের বক্তব্য মূলত আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে উস্কে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন করে অশান্তি ও গণ্ডগোল সৃষ্টির এক গভীর রাজনৈতিক পাঁয়তারা। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করে পার্বত্য অঞ্চলকে একটি ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা এবং অঞ্চলটিতে মার্কিন উপস্থিতি বা সামরিক ঘাটি স্থাপনের সুযোগ করে দেওয়ার কৌশল বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নটি আজ আর অমূলক নয়। যেভাবে সেখানে বিদেশি শক্তি বা আমেরিকান স্বার্থের আনাগোনা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তাতে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সাধারণ মানুষের সন্দেহ ঘনীভূত হওয়া স্বাভাবিক। আত্মপরিচয়ের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে নীতিনির্ধারকদের এই একপেশে অবস্থান পাহাড়ে অসন্তোষের যে আগুন জ্বালাচ্ছে, তা কেবল অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি করছে না, বরং বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপর পথকেই প্রশস্ত করছে।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় সংহতির দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত একটি বাক্য আমরা শুনে আসছি: “আমরা সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী হব, আদিবাসী কেউ হব না।” সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষপর্যায় থেকেও একই সুরে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই ভূখণ্ডে ‘আদিবাসী’ বলতে কোনো পৃথক সত্তা নেই—সবাই কেবল ‘অধিবাসী’ বা ‘বাংলাদেশি’। প্রথম দর্শনে এই বক্তব্যকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও রাষ্ট্রীয় ঐক্যের ডাক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক তত্ত্ব, মানবাধিকারের ব্যাকরণ এবং সংবিধানের নিবিড় পাঠের আলোকে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই বক্তব্যের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কেবল ভাষার বিতর্ক নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক অধিকারকে অস্বীকার করা এবং রাষ্ট্রকে একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক ছাঁচে ঢেলে সাজানোর সূক্ষ্ম প্রাতিষ্ঠানিক প্রবৃত্তি।
‘আদিবাসী’ (Indigenous) এবং ‘অধিবাসী’ (Inhabitant) কেবল দুটি প্রতিশব্দ নয়; আন্তর্জাতিক আইন ও রাজনীতির ইতিহাসে এই দুটি শব্দের আইনি, সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। আইন ও নৃবিজ্ঞানের ভাষায়, ‘অধিবাসী’ বলতে যেকোনো ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে বসবাসকারী যেকোনো জনগোষ্ঠীকে বোঝায়। কিন্তু ‘আদিবাসী’ একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আইনি সুরক্ষামূলক অনুধারণা। জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণা (UNDRIP) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) সংজ্ঞা অনুযায়ী, আদিবাসী হওয়ার মূল ভিত্তি হলো প্রথাগত ভূমি, নিজস্ব জীবনধারা, ভাষা এবং ঐতিহাসিক শেকড়ের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের আত্মপরিচয় (Self-identification) দাবি করার অধিকার।
রাষ্ট্র যখন কোনো পাহাড়ি বা সমতলের জাতিগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং সবাইকে এককভাবে ‘অধিবাসী’ বলে চিহ্নিত করে, তখন রাষ্ট্র মূলত তাঁদের প্রথাগত ভূমির অধিকার (Customary Land Rights), বন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অধিকার এবং ঐতিহ্যবাহী স্বশাসনের সংবিধিবদ্ধ দাবিকে এক লহমায় বাতিল করে দেয়। ‘সবাই অধিবাসী’ বলার অর্থ হলো—যিনি হাজার বছর ধরে জুমচাষ করে পাহাড়ে প্রথাগত ভূমিস্বত্ব বজায় রেখেছেন, আর যিনি গত পরশু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সেখানে বসতি স্থাপন করেছেন, উভয়েই সমান। এর ফলে ঐতিহাসিক ভূমি অধিকার হারিয়ে প্রান্তিক মানুষগুলো নিজ ভূমিতেই ভূমিশূন্য ও আশ্রিত শ্রেণিতে পরিণত হন। তাই ‘অধিবাসী’ তকমাটি কোনো ঐক্যের বার্তা নয়, বরং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক বঞ্চনাকে ধামাচাপা দেওয়ার একটি আইনি রাজনীতি।
রাষ্ট্রের মন্ত্রী ও নীতি নির্ধারকদের এই কঠোর Positions-এর পেছনে প্রধান রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দুটি: বহুমাত্রিক ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তাশঙ্কা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি (Majoritarian Nationalism)। পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সীমান্ত এলাকাগুলোকে রাষ্ট্র মূলত মানবিক স্থান হিসেবে না দেখে সর্বদা ‘নিরাপত্তাঝুঁকি’ (Security threat) বা ‘ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্তের’ চশমা দিয়ে দেখে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারের যেকোনো ন্যায়সঙ্গত দাবি বা ‘আদিবাসী’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি উঠলেই রাষ্ট্র সেখানে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ বা ‘বিদেশি এনজিওর চক্রান্তের’ ভীতি ছড়ায়। রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারকদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হলো, যেকোনো আন্তর্জাতিক কাঠামোর অধীনে (যেমন ILO Convention 169 বা UNDRIP) আদিবাসীদের যে স্বাধিকার ও প্রথাগত ভূমির অধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে, তা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখা।
আন্তর্জাতিক আইনকে এড়িয়ে চলার জন্য মন্ত্রীরা প্রায়ই দাবি করেন যে বাংলাদেশ ILO Convention 169 অনুস্বাক্ষর করেনি, সুতরাং আদিবাসী অধিকার প্রযোজ্য নয়। কিন্তু যা তাঁরা এড়িয়ে যান তা হলো, বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে গঠিত ILO Convention No. 107 অনুস্বাক্ষর করেছিল, যা এখনও বাংলাদেশে আইনিভাবে কার্যকর এবং যেখানে ভূমি ও সাংস্কৃতিক অধিকারের স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের ভয় দেখিয়ে রাষ্ট্র আসলে ভেতরের ঐতিহাসিক ভূমি সংঘাত ও রাজনৈতিক বঞ্চনাকে আড়াল করতে চায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর বক্তব্য বাংলাদেশের সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গেও আংশিক ও একপেশে সম্পর্ক তৈরি করে। সংবিধানের ৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমাদের রাজনৈতিক পরিচয় নিঃসন্দেহে ‘বাংলাদেশি’। কিন্তু আইনি নাগরিকত্ব আর জাতিগত পরিচয় (Ethnicity) এক বিষয় নয়। যুক্তরাজ্যের একজন নাগরিক রাজনৈতিকভাবে ‘ব্রিটিশ’, কিন্তু একই সাথে তিনি ‘স্কটিশ’, ‘ওয়েলশ’ বা ‘আইরিশ’। ঠিক তেমনি, আইনি পরিচয়ে একজন ব্যক্তি ‘বাংলাদেশি’ হলেও জাতিগত ও সামাজিকভাবে তিনি চাকমা, মারমা, গারো, সাঁওতাল বা ম্রো হতে পারেন। সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রকে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের’ সংস্কৃতি সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র নিজেই যেখানে স্বীকার করে নিয়েছে যে এ দেশে একাধিক সাংস্কৃতিক ও নৃ-গোষ্ঠীগত সত্তা বিদ্যমান, সেখানে নীতিনির্ধারকদের “সবাইকে এক পরিচয়ে বিলীন হতে হবে” জাতীয় বক্তব্য সংবিধানের বহুত্ববাদী চেতনাকে চরমভাবে খাটো করে।
সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে সমতা ও বৈষম্যহীনতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কাঠামোগত অসমতা যেখানে বিদ্যমান, সেখানে “সবাই সমান” বা “সবাই বাংলাদেশি অধিবাসী” বলাটা সাম্য নয়; বরং অসমান মানুষের ওপর সমান নিয়ম চাপিয়ে দিয়ে বৈষম্যকে আরও স্থায়ী রূপ দেওয়া। খাগড়াছড়ির একজন প্রত্যন্ত অঞ্চলের ম্রো নারী এবং ঢাকার একজন উচ্চবিত্ত বাঙালির পাসপোর্টে ‘বাংলাদেশি’ লেখা থাকলেও, তাঁদের ক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং প্রথাগত অধিকার সমান নয়। ‘সবাই অধিবাসী’ ধারণার মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই বাস্তব বঞ্চনাকে অদৃশ্য করে দেওয়া হয়।
“আমরা সবাই বাংলাদেশি”- এই সর্বজনীন রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের শক্তিমত্তা এতে নিহিত নয় যে, তা নাগরিকদের নিজ পূর্বপুরুষের শেকড় ও নাম প্রকাশে বাধ্যবাধকতা জারি করবে। একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এতটাই ভঙ্গুর হতে পারে না যে, পাহাড় বা সমতলের একজন নাগরিক নিজেকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে দাবি করলেই রাষ্ট্রের মানচিত্র কেঁপে উঠবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর “আমরা সবাই অধিবাসী, আদিবাসী কেউ নই” জাতীয় বক্তব্য আসলে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের বিপরীতে একটি একক সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক প্রয়াস। স্বাতন্ত্র্যের স্বীকৃতি দেওয়া মানে বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়; বরং স্বাতন্ত্র্যকে সংহত করে রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করাই প্রকৃত গণতন্ত্রের লক্ষণ। রাষ্ট্র কোনো অভিন্ন সামরিক ব্যারাক নয়, রাষ্ট্র হলো এক বৈচিত্র্যময় বাগান—যেখানে নাগরিকত্বের এক পতাকাতলে নিজ নিজ নাম, ইতিহাস ও আদিবাসী পরিচয় নিয়ে প্রতিটি মানুষ মর্যাদার সাথে বাঁচবে।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।