আমার এক বন্ধু আছে—অভি।
খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু, অথচ প্রতিদিন দেখা হয় না। মাসের পর মাস কেটে যায়, হঠাৎ কোনো এক বিকেলে ফোন করে বলে,

—দোস্ত, দেখা করবি?

অভিকে আমি চিনি। ও অকারণে ফোন করে না। তাই আজও ফোনটা পেয়ে মনে হলো, নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হয়েছে।

আমি মজা করে বললাম,

—হঠাৎ আমার কথা মনে পড়ল কেন? আবার কোনো বিপদে পড়েছিস নাকি?

ও ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—হ্যাঁ… একটু সমস্যা হয়েছে। কিছুদিন ধরে একটা বিষয় নিয়ে খুব অস্থির আছি। তোকে না বললে মনে হয় শান্তি পাব না।

আমি বললাম,

—ঠিক আছে, অফিস ছুটির পর দেখা কর। সব শুনব।

ফোন রেখে নিজের কাজ করতে বসলাম। কিন্তু মাথার ভেতর একটা প্রশ্ন ঘুরতেই থাকল—অভির আবার কী হয়েছে?

কিছুদিন আগে তো বলেছিল, একটা মেয়েকে ভালোবাসে। মেয়েটাও নাকি তাকে ভালোবাসে। তাহলে সমস্যা কোথায়?

অফিস থেকে বের হওয়ার আগে আবার অভিকে ফোন দিলাম।

—কোথায় আছিস?

—ফার্মগেটে আসছি। প্রেমাকেও সঙ্গে নিয়ে আসছি।

আমি একটু অবাক হলাম।

—প্রেমা আসবে?

ও হেসে বলল,

—সমস্যাটা আসলে প্রেমাকে নিয়েই। তোকে সবকিছু একসঙ্গে বলতে চাই।

আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।

ফার্মগেটে গিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে বসে ওদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।

কিছুক্ষণ পর অভি আর প্রেমা এলো।

দুজনকেই কেমন যেন চুপচাপ লাগছিল।

আমি ওদের দেখে বললাম,

—কী হয়েছে তোমাদের? এমন চুপচাপ কেন?

অভি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

—তুই আমার খুব ভালো বন্ধু। তাই তোকে না বলে থাকতে পারলাম না।

আমি চুপ করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।

অভি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,

—তুই তো জানিস, আমি খুব ছোট একটা চাকরি করি। বেতন যা পাই, তাতে নিজের খরচ চালিয়ে পরিবারকে কিছু দেওয়া—সব মিলিয়ে মাস শেষ হওয়ার আগেই পকেট ফাঁকা হয়ে যায়।

আমি বললাম,

—সেটা তো জানি। কিন্তু সমস্যাটা কোথায়?

অভি এবার প্রেমার দিকে তাকাল।

প্রেমা মাথা নিচু করে বসে ছিল।

—প্রেমার বাসা থেকে ওর বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে।

আমি অবাক হয়ে বললাম,

—তাহলে তো ভালোই! তোরা দুজন একে অপরকে ভালোবাসিস। বিয়ে করে নে।

অভি মৃদু হেসে বলল,

—ইচ্ছেটা তো আমাদেরও সেটাই।

—তাহলে?

অভি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমরা বিয়ের পর কোথায় থাকব, সেটাই তো বুঝতে পারছি না।

আমি একটু থেমে বললাম,

—বাসা ভাড়া নে।

অভি হেসে ফেলল। সেই হাসির মধ্যে আনন্দের চেয়ে অসহায়ত্বই বেশি ছিল।

—বাসা খুঁজতে গিয়েছিলাম। একটা ছোট্ট বাসা দেখে ভালোও লেগেছিল। কিন্তু ভাড়া শুনে মনে হলো, আমরা যেন বাসা না—স্বপ্ন কিনতে গেছি!

প্রেমা এতক্ষণ চুপ ছিল। এবার আস্তে করে বলল,

—দুজন মিলে শুধু বাসা ভাড়াটাই হয়তো দিতে পারব। কিন্তু তারপর মাসের বাকি দিনগুলো চলব কীভাবে?

কথাটা শুনে আমি চুপ হয়ে গেলাম।

সত্যিই তো।

ভালোবাসার গল্পে আমরা খুব সহজেই বলি—
দুজন একসঙ্গে থাকলেই তো জীবন সুন্দর।

কিন্তু জীবন কি শুধু ভালোবাসায় চলে?

বাড়িভাড়া লাগে।
বাজার লাগে।
বিদ্যুৎ বিল লাগে।
অসুস্থ হলে ওষুধ লাগে।
পরিবারের দায়িত্ব থাকে।

স্বপ্নের পাশে বাস্তবতারও একটা হিসাব থাকে।

আমি বললাম,

—তাহলে সাবলেট নে। খরচ কিছুটা কম হবে।

অভি এবার একটু তিক্ত হেসে বলল,

—সেটাও ভেবেছি দোস্ত।

তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—জানিস, মানুষ এখন কতটা বাণিজ্যিক হয়ে গেছে?

আমি তাকিয়ে রইলাম।

—একজন বাড়িওয়ালার কাছ থেকে বাসা ভাড়া নিয়ে আরেকজন নিজেই যেন বাড়িওয়ালা হয়ে যায়। সাবলেটের নামে এমন ভাড়া চায়, যেন পুরো বাসাটার মালিক সে-ই!

আমি কিছু বললাম না।

কারণ ওর কথার সঙ্গে তর্ক করার মতো কিছু আমার কাছে ছিল না।

প্রেমা তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

হয়তো ও ভাবছিল—একটা ছোট্ট ঘর, একটা জানালা, দুটো মানুষ আর একটু শান্তি—এতটুকু চাওয়াও কি আজকাল খুব বেশি?

আমি ওদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলাম—

আমরা প্রেমের গল্পে নায়ক-নায়িকার জন্য পাহাড়, সমুদ্র, বৃষ্টি আর চাঁদের আলো খুঁজি।

কিন্তু বাস্তব জীবনের প্রেমিক-প্রেমিকারা কখনো কখনো শুধু একটা ছোট্ট ভাড়া বাসা খোঁজে।

যেখানে মাসের শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে ভালোবাসাটাকে যেন বন্ধক রাখতে না হয়।

আমি অভিকে বললাম,

—তোরা খুঁজতে থাক। একটা না একটা ব্যবস্থা হবেই।

অভি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—তুই শুধু এই কথাটাই বললি, সেটাই অনেক।

সেদিন রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সময় প্রেমা খুব আস্তে বলেছিল,

—দোয়া করবেন, যেন একটা ছোট বাসা পাই।

আমি হাসলাম।

বললাম,

—বাসা না, তোমরা একটা ঘর খুঁজে পাও। বাসা আর ঘরের মধ্যে কিন্তু অনেক পার্থক্য আছে।

ওরা দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

আমি পেছনে দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখছিলাম।

হয়তো ওরা কোনো একদিন সত্যিই একটা ছোট্ট ঘর খুঁজে পাবে।

হয়তো সেই ঘরে থাকবে একটা পুরোনো সোফা, ছোট একটা টেবিল, রান্নাঘরে দুটো কাপ, জানালার পাশে কিছু গাছ।

হয়তো মাসের শেষে টানাটানি থাকবে।

হয়তো অনেক হিসাব করতে হবে।

তবুও সন্ধ্যায় দুজন পাশাপাশি বসে এক কাপ চা ভাগ করে খেতে পারবে।

আর তখন হয়তো ওরা বুঝবে—

ভালোবাসার জন্য সবসময় বড় বাড়ি লাগে না।

লাগে শুধু এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে ছোট্ট একটা ঘরকেও পুরো পৃথিবী মনে হয়।

অভি আর প্রেমা এখনও বাসা খুঁজছে।

হয়তো একদিন তারা একটা বাসা পেয়ে যাবে।
হয়তো খুব বড় নয়, খুব সুন্দরও নয়—ছোট্ট একটা ঘর, একটা জানালা, দুটো মানুষ আর অনেকগুলো স্বপ্ন।

মাসের শেষে হয়তো হিসাব মিলবে না।
কখনো হয়তো বাজারের টাকা কম পড়বে, কখনো বিদ্যুৎ বিল নিয়ে চিন্তা হবে।
তবুও দিনের শেষে দুজন পাশাপাশি বসে এক কাপ চা ভাগ করে খাবে।

আর সেদিন হয়তো প্রেমা অভিকে বলবে,

—দেখো, আমাদের ঘরটা খুব ছোট!

অভি হয়তো হেসে বলবে,

—ঘর ছোট হলে কী হয়েছে? তুমি তো আছো।

আমি জানি না, তাদের গল্পের শেষ কোথায়।

কিন্তু সেদিন রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর একটা কথা খুব গভীরভাবে মনে হয়েছিল—

আমরা ভালোবাসার গল্পে বড় বড় স্বপ্নের কথা বলি, অথচ বাস্তব জীবনে অনেক ভালোবাসা শুধু একটা ছোট্ট ঠিকানার অভাবে অপূর্ণ থেকে যায়।

কেউ কাউকে ভালোবাসে না বলে সম্পর্ক ভেঙে যায় না সবসময়।
কখনো কখনো ভালোবাসা হেরে যায় বাড়িভাড়ার কাছে, মাসের হিসাবের কাছে, দায়িত্বের কাছে, বাস্তবতার কাছে।

তাই আজও যখন কোনো নতুন বাসার “To-Let” লেখা দেখি, অজান্তেই অভি আর প্রেমার কথা মনে পড়ে।

ভাবি—

এই শহরে কত মানুষ একটা বাসা খুঁজছে,
আর কত ভালোবাসা সেই বাসার দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে।

হয়তো তাদেরও একদিন একটা ঠিকানা হবে।

কিন্তু যদি না হয়?

তাহলে তাদের ভালোবাসাটা কি সত্যিই অপূর্ণ?

নাকি আমরা এমন এক সমাজে বাস করি,
যেখানে দুজন মানুষের একসঙ্গে থাকার জন্য ভালোবাসার চেয়েও বেশি প্রয়োজন—
একটা ভাড়া বাসা?

সেদিন থেকে আমার কাছে “To-Let” লেখা প্রতিটি সাইনবোর্ড আর শুধু একটা খালি বাসার বিজ্ঞাপন নয়।

মনে হয়—

কোথাও হয়তো একটা ভালোবাসা দাঁড়িয়ে আছে,
শুধু তার থাকার মতো একটা ঘর নেই।