ঢাকা শহরের রাতগুলো কেমন যেন অদ্ভুত। দিনের বেলায় যে শহর হাজারো মানুষের কোলাহলে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়, রাত গভীর হলে সেই শহরই আবার নিঃশব্দে নিজের ক্লান্তি লুকিয়ে ফেলে। রাস্তায় আলো জ্বলে থাকে, গাড়ি ছুটে চলে, কোথাও কোনো জানালায় একাকী মানুষ জেগে থাকে। অথচ এত মানুষের ভিড়েও কারও কারও জীবন বড় নিঃসঙ্গ।
অর্ণবের জীবনটাও ছিল তেমন।
বাইরে থেকে দেখলে তাকে বেশ গোছানো একজন মানুষ বলেই মনে হতো। ভালো চাকরি, নিজের একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট, নিয়মিত জীবনযাপন—সবকিছুই ছিল। শুধু ছিল না এমন কিছু, যার জন্য দিনশেষে বাড়ি ফেরার তাড়া অনুভব করা যায়। সন্ধ্যার পর ফ্ল্যাটে ফিরে সে প্রায়ই জানালার পাশে বসে থাকত। দূরের বিল্ডিংগুলোর জানালায় আলো জ্বলতে দেখত। মনে হতো, প্রতিটি আলোর পেছনে হয়তো একটা গল্প আছে। কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করছে, কেউ অভিমানে কথা বলছে না, কেউ আবার অনেক দূরের কোনো মানুষকে মনে করে নিঃশব্দে কাঁদছে।
অর্ণবের নিজের গল্পটা তখনো শুরু হয়নি।
অথবা, কে জানে—হয়তো সে অনেক দিন ধরেই একটা গল্পের ভেতর বাস করছিল, শুধু গল্পের মানুষটিকে খুঁজে পায়নি।
তার দাদার একটা পুরোনো পাহাড়ি কটেজ ছিল সাজেকে। বহু বছর আগে, যখন সাজেক আজকের মতো পর্যটকদের কাছে এতটা পরিচিত হয়ে ওঠেনি, তখন অর্ণবের দাদা সেখানে ছোট্ট একটি কাঠের বাড়ি তৈরি করেছিলেন। বাড়িটির সামনে ছিল কয়েকটি বুনো ফুলের গাছ, পেছনে পাহাড়ের ঢাল আর দূরে মেঘে ঢাকা উপত্যকা। দাদা বেঁচে থাকতে প্রায়ই বলতেন, পাহাড়ের কাছে গেলে মানুষ নিজের ভেতরের শব্দগুলো শুনতে পায়।
অর্ণব তখন এসব কথার কোনো মানে বুঝত না।
দাদা মারা যাওয়ার পর কটেজটা ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। কাঠের বারান্দায় শ্যাওলা জমে, জানালার পাল্লা ভেঙে যায়, বাগানের ফুলগাছগুলো শুকিয়ে আসে। একসময় বাড়িটা শুধু পুরোনো কিছু ছবির মধ্যে বেঁচে ছিল।
বছর কয়েক পর হঠাৎ অর্ণবের মনে হলো, সে আর শহরের এই একঘেয়ে জীবন চালিয়ে যেতে পারছে না। অফিসের নির্দিষ্ট সময়, একই ধরনের মিটিং, একই মুখের হাসি, একই প্রশ্ন—সবকিছু কেমন অর্থহীন লাগতে শুরু করেছিল। একদিন সকালে অফিসে বসে কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে সিদ্ধান্ত নিল, চাকরিটা ছেড়ে দেবে।
বন্ধুরা অবাক হয়েছিল।
মা চিন্তিত হয়ে বলেছিলেন,
— এত ভালো একটা চাকরি ছেড়ে পাহাড়ে গিয়ে কী করবে?
অর্ণব হেসেছিল।
— জানি না মা। তবে এখানে থেকে যে কিছু একটা করছি, সেটাও তো আর বুঝতে পারছি না।
মা আর কিছু বলেননি। শুধু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অর্ণবের ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার সব প্রস্তুতি শেষ হয়ে গেল। তার পরিকল্পনা ছিল, দাদার পুরোনো কটেজটাকে নতুন করে গড়ে তুলবে। আশপাশের পাহাড়ি মানুষদের নিয়ে ছোট্ট একটা ইকো-রিসোর্ট তৈরি করবে। খুব বড় কিছু নয়। এমন একটা জায়গা, যেখানে মানুষ এসে কিছুদিনের জন্য হলেও নিজের ব্যস্ত জীবন ভুলে থাকতে পারবে।
অর্ণব জানত না, পাহাড়ে যাওয়ার সেই সিদ্ধান্ত তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়ে উঠবে।
কারণ, মানুষ কখনো কখনো নিজের গন্তব্য ঠিক করে রওনা দেয়, অথচ ভাগ্য তার জন্য অন্য কোথাও অন্য কারও সঙ্গে দেখা হওয়ার ব্যবস্থা করে রাখে।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী রাতের শেষ আন্তঃনগর ট্রেনটা যখন কমলাপুর স্টেশন ছেড়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল, তখন রাত বেশ গভীর।
ট্রেনের জানালার বাইরে শহরের আলো পেছনে সরে যাচ্ছিল। কামরার ভেতর বেশির ভাগ যাত্রীই নিজেদের মতো গুটিয়ে নিয়েছে। কেউ ঘুমাচ্ছে, কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউ আবার জানালার পাশে বসে বাইরের অন্ধকার দেখছে।
অর্ণব জানালার পাশে বসে ছিল। কোলে একটা বই খোলা, কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে সে একই পাতায় চোখ রেখে আছে। বইয়ের কথাগুলো মাথায় ঢুকছিল না।
ঠিক তখনই তার সামনের আসনে এসে বসল একটি মেয়ে।
মেয়েটির পরনে সাদা কুর্তি, গায়ে হালকা সরিষা-রঙা শাল। কাঁধে ঝোলানো ক্যামেরা আর হাতে একটা ছোট ব্যাকপ্যাক। চুলগুলো এলোমেলো, চোখে অদ্ভুত এক ধরনের উচ্ছ্বাস। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবকিছুতেই তার কৌতূহল আছে।
সিটে বসেই সে জানালার বাইরে তাকাল। তারপর ব্যাগ থেকে কাগজের কাপ বের করে অর্ণবের হাতে থাকা চায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
— আচ্ছা, আপনি কি চিনি ছাড়া চা খান?
অর্ণব একটু অবাক হয়ে তাকাল।
— জি।
— স্বেচ্ছায়?
— মানে?
মেয়েটি গম্ভীর মুখে বলল,
— চিনি ছাড়া চা খাওয়া আর স্বেচ্ছায় দুঃখী থাকা আমার কাছে একই ব্যাপার। দুটোর কোনোটাই আমি বুঝি না।
অর্ণব হেসে ফেলল।
অনেক দিন পর সে এমনভাবে হেসেছিল, যেন হাসিটা তার নিজেরই ছিল না; কোথাও জমে থাকা কোনো পুরোনো স্মৃতি হঠাৎ মুখের কাছে এসে পড়েছে।
— সবকিছুতে মিষ্টি থাকাটা জরুরি নয়, বলল অর্ণব।
মেয়েটি মাথা কাত করল।
— কথাটা বেশ দার্শনিক হয়ে গেল। আপনি কি সব সময় এমন কথা বলেন?
— না। আজকেই প্রথম বললাম।
— তাহলে ভালো। আপনার কথা বলার অভ্যাস তৈরি হলে হয়তো আরও ভালো কিছু শুনতে পাব।
মেয়েটি নিজেই হেসে উঠল।
তার হাসির মধ্যে কোনো সংকোচ ছিল না। যেন সে পৃথিবীর কাছে এখনো কিছু হারায়নি, তাই হারানোর ভয়ও শেখেনি।
অর্ণব মনে মনে ভাবল, কিছু মানুষের সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার মুহূর্তেই একটা অদ্ভুত পরিচিতি অনুভব হয়। মনে হয়, এই মানুষটাকে কোথাও দেখেছি। হয়তো কোনো স্বপ্নে, হয়তো বহুদিন আগের কোনো বিকেলে, কিংবা এমন কোনো জীবনে, যার কথা মনে রাখার ক্ষমতা আমাদের নেই।
মেয়েটির নাম অনিন্দিতা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। বন্ধুদের সঙ্গে সাজেক বেড়াতে যাচ্ছে। পাহাড়ের ছবি তোলা তার শখ। তার ধারণা, মানুষের মুখের চেয়ে প্রকৃতির ছবি অনেক বেশি সত্যি কথা বলে। কারণ মানুষ হাসতে জানে, অথচ পাহাড় কখনো নিজের কষ্ট লুকাতে পারে না। পাহাড়ের গায়ে ধস নামলে সেটা দেখা যায়, নদী শুকিয়ে গেলে বোঝা যায়, কিন্তু মানুষের ভেতরে কী ভাঙছে, তা সব সময় বোঝা যায় না।
কথাটা শুনে অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।
তারপর বলেছিল,
— আপনি তাহলে মানুষের ছবি তোলেন না কেন?
অনিন্দিতা ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে বলল,
— তুলি। তবে অনুমতি ছাড়া নয়।
— আর মানুষের মনের ছবি?
— সেটা তোলার জন্য ক্যামেরা লাগে না। একটু সময় লাগে।
কথাটা বলেই সে জানালার বাইরে তাকিয়েছিল।
অর্ণব জানত না, সেই মুহূর্তে তার মনের একটা বন্ধ জানালা সামান্য খুলে গিয়েছিল।
রাত বাড়তে থাকল। ট্রেন ছুটে চলল অন্ধকারের ভেতর দিয়ে। মাঝেমধ্যে কোনো ছোট স্টেশনে থামলে দূরে চায়ের দোকানের আলো দেখা যাচ্ছিল। কোনো কোনো জানালায় ঘুমন্ত শিশুর মুখ, কোথাও ক্লান্ত বাবার কাঁধে মাথা রেখে বসে থাকা মেয়ে। ট্রেনের চাকার একটানা শব্দের মধ্যে দুজনের গল্প এগিয়ে চলল।
অনিন্দিতা জানতে চাইল, অর্ণব কোথায় যাচ্ছে।
অর্ণব বলল, সাজেকে।
— বেড়াতে?
— না। থাকতে।
অনিন্দিতা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
— মানে, বেড়াতে গিয়ে থেকে যাবেন?
— অনেকটা সে রকমই।
তারপর অর্ণব দাদার পুরোনো কটেজের গল্প বলল। কীভাবে বাড়িটা বহু বছর ধরে অবহেলায় পড়ে আছে, কীভাবে সে সব ছেড়ে সেখানে নতুন কিছু গড়ে তুলতে চায়।
অনিন্দিতা মন দিয়ে শুনল।
সব কথা শেষ হলে সে বলল,
— জানেন, আপনার একটা সমস্যা আছে।
— কী সমস্যা?
— আপনি স্বপ্ন দেখেন খুব গম্ভীরভাবে। স্বপ্ন দেখার সময় একটু হাসতে হয়। তা না হলে স্বপ্নও একসময় অফিসের কাজের মতো হয়ে যায়।
অর্ণব মৃদু হেসে বলল,
— আর আপনার সমস্যা?
— আমার? আমি খুব সহজে মানুষকে বিশ্বাস করে ফেলি।
— সেটা কি খুব খারাপ?
অনিন্দিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— সব সময় না। তবে ভুল মানুষকে বিশ্বাস করলে পরে নিজেকেই বোকা মনে হয়।
কথাটার পর তার মুখে হাসি থাকলেও চোখে যেন এক মুহূর্তের জন্য ছায়া নেমে এসেছিল।
অর্ণব আর প্রশ্ন করেনি।
কিছু কিছু নীরবতারও ব্যক্তিগত অধিকার থাকে। প্রথম পরিচয়েই সব দরজা খুলে দিতে হয় না।
রাতের শেষ ভাগে দুজনের কথাবার্তা কমে এল। অনিন্দিতা জানালার পাশে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। তার কোলের ওপর ক্যামেরাটা রাখা। ট্রেনের দুলুনিতে শালটা কাঁধ থেকে একটু সরে গিয়েছিল।
অর্ণব নিজের ব্যাগ থেকে একটা পাতলা চাদর বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিল। তারপর আবার জানালার বাইরে তাকাল।
আকাশ তখনো অন্ধকার। দূরে কোথাও ভোরের আলো তৈরি হচ্ছে।
অর্ণবের মনে হলো, জীবনে প্রথমবার তার কোথাও পৌঁছানোর তাড়া নেই।
সে শুধু চাইছিল, এই রাতটা আরেকটু দীর্ঘ হোক।
কারণ, কখনো কখনো অচেনা একজন মানুষের সঙ্গে কাটানো কয়েক ঘণ্টা পরিচিত বহু বছরের চেয়েও বেশি আপন হয়ে ওঠে।
ভোরের আলো ফুটতেই ট্রেন চট্টগ্রাম স্টেশনে এসে থামল।
অনিন্দিতা ঘুম থেকে উঠে প্রথমে নিজের ক্যামেরাটা খুঁজল, তারপর অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনি কি সারা রাত ঘুমাননি?
— ঘুমিয়েছি।
— মিথ্যা বলছেন। আপনার চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
অর্ণব হাসল।
— আপনি তো মানুষের মনের ছবি তুলতে পারেন। চোখ দেখে ঘুমের খবরও জেনে গেলেন?
— অবশ্যই। তবে এই ছবির জন্য কোনো টাকা নেব না।
স্টেশনে নেমে দুজনের পথ আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। অনিন্দিতার বন্ধুদের সঙ্গে আগে থেকেই গাড়ি বুক করা ছিল। অর্ণবও অন্য একটি গাড়ির ব্যবস্থা করেছিল।
কিন্তু পাহাড়ের পথে যাওয়ার সময় জানা গেল, দুটো দলের গাড়িই একই চাঁদের গাড়ি।
অনিন্দিতা ব্যাপারটাকে ভাগ্যের কাণ্ড বলে ঘোষণা করল।
অর্ণব বলল,
— ভাগ্য বলে কিছু আছে কি না জানি না।
— আছে। নইলে আপনি আমার সামনে বসে চিনি ছাড়া চা খাচ্ছিলেন কেন?
— এটা ভাগ্য হলো কীভাবে?
— আমি চিনি ছাড়া চা খাওয়া মানুষদের সঙ্গে পরিচিত হতে চাই। তাদের জীবনটা কেমন, সেটা জানা দরকার।
গাড়ির অন্য যাত্রীরা হেসে উঠল।
চট্টগ্রাম শহর পেছনে ফেলে গাড়ি যখন পাহাড়ি পথে উঠতে শুরু করল, চারপাশের দৃশ্য বদলে গেল। রাস্তার দুই পাশে সবুজ পাহাড়, কোথাও বাঁশবন, কোথাও ছোট ছোট ঘর। মাঝে মাঝে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের দেখা যাচ্ছিল। তারা পর্যটকদের গাড়ির দিকে তাকিয়ে হাসছিল।
অনিন্দিতা একটার পর একটা ছবি তুলছিল। কখনো জানালার বাইরে ক্যামেরা ধরছে, কখনো গাড়ির ভেতর থেকেই বন্ধুদের হাসিমুখ বন্দি করছে।
একসময় গাড়ি একটা বাঁক ঘুরতেই দূরের পাহাড়ের গায়ে মেঘ দেখা গেল। সাদা মেঘগুলো যেন সবুজ পাহাড়ের কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে আছে।
অনিন্দিতা বিস্ময়ে বলে উঠল,
— অর্ণব, দেখুন! মেঘগুলো পাহাড়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে!
অর্ণব তার দিকে তাকাল।
— আপনি সবকিছুর মধ্যে গল্প খুঁজে পান কীভাবে?
— গল্প তো সবখানেই আছে। শুধু মানুষ ব্যস্ত হয়ে গেছে বলে দেখতে পায় না।
অর্ণব কিছু বলল না।
তার মনে হলো, এই মেয়েটি হয়তো ঠিক সেই কথাগুলোই বলতে পারে, যেগুলো সে এত বছর ধরে নিজের ভেতরে খুঁজে বেড়িয়েছে।
পাহাড়ের পথে সেদিন অনেকবার গাড়ি থামল। কখনো ছবি তোলার জন্য, কখনো চা খাওয়ার জন্য। এক জায়গায় রাস্তার পাশে ছোট্ট একটা দোকানে বসে তারা গরম চা খেল। অনিন্দিতা চায়ের কাপে চিনি মিশিয়ে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনার জীবনটা খুব তেতো না?
অর্ণব কাপের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,
— আগে মনে হতো। এখন মনে হচ্ছে, হয়তো আমি শুধু মিষ্টি জিনিস খুঁজতে ভুলে গিয়েছিলাম।
অনিন্দিতা হঠাৎ চুপ করে গেল।
তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,
— তাহলে খুঁজবেন। পাহাড়ে অনেক মিষ্টি জিনিস পাওয়া যায়।
অর্ণব জানতে চাইল,
— কী কী?
অনিন্দিতা আঙুল গুনে বলতে শুরু করল,
— সকালের রোদ, বিকেলের মেঘ, বৃষ্টির গন্ধ, পাহাড়ি ফুল, গরম চা...
একটু থেমে সে যোগ করল,
— আর কখনো কখনো এমন কিছু মানুষ, যাদের সঙ্গে দেখা না হলে জীবনটা একটু কম সুন্দর থাকত।
অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে রইল।
কথাটা কি সে ইচ্ছে করে বলেছিল?
নাকি অনিন্দিতা সব সময়ই এ রকম কথা বলে, আর অর্ণবই আজকাল সাধারণ কথার মধ্যে অসাধারণ কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে?
সে আর জিজ্ঞেস করেনি।
কিছু প্রশ্নের উত্তর না জানাই ভালো। উত্তর জানা হয়ে গেলে কল্পনার সৌন্দর্যটা নষ্ট হয়ে যায়।
সাজেকে পৌঁছানোর পর অনিন্দিতা আর অর্ণবের পথ কিছুটা আলাদা হয়ে গেল। অনিন্দিতা তার বন্ধুদের সঙ্গে একটি কটেজে উঠল। অর্ণব চলে গেল দাদার পুরোনো বাড়িটিতে।
সন্ধ্যায় পাহাড়ের আকাশে মেঘ জমেছিল। অর্ণব বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল, দূরের উপত্যকা ধীরে ধীরে কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে। পুরোনো কাঠের বাড়িটার চারপাশে নীরবতা। বহু বছর পর সেখানে মানুষের পায়ের শব্দ ফিরেছে।
হঠাৎ ফোনে একটি বার্তা এল।
অনিন্দিতা লিখেছে—
পাহাড়ে এসে প্রথম সন্ধ্যা। আপনার স্বপ্নের বাড়িটা দেখতে ইচ্ছে করছে। তবে অনুমতি ছাড়া কারও বাড়িতে যাওয়া ঠিক নয়, তাই দূর থেকেই শুভেচ্ছা জানালাম।
অর্ণব বার্তাটা পড়ে হাসল।
উত্তর দিল,
বাড়িটা এখনো খুব সুন্দর নয়। তবে একদিন হবে।
কিছুক্ষণ পর অনিন্দিতার উত্তর এল,
বাড়ি সুন্দর হওয়ার আগে সেখানে সুন্দর মানুষের থাকা দরকার। আপনি আছেন, বাকিটা হয়ে যাবে।
অর্ণব অনেকক্ষণ ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল,
কাল বিকেলে আসবেন? চা খাওয়াব।
অনিন্দিতা উত্তর দিল,
চিনি ছাড়া?
অর্ণব লিখল,
আপনার জন্য চিনি থাকবে।
বার্তাটা পাঠিয়ে সে নিজেই হেসে ফেলল।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, একজন মানুষের জন্য ছোট্ট একটা পরিবর্তন করতেও কখনো কখনো কতটা ভালো লাগে!
পরদিন বিকেলে অনিন্দিতা এসেছিল।
সঙ্গে ক্যামেরা, ছোট্ট একটা নোটবুক আর পাহাড় থেকে কুড়িয়ে পাওয়া কয়েকটি বুনো ফুল। অর্ণব তাকে বাড়ির প্রতিটি ঘর দেখাল। কোথায় কী হবে, কোথায় বসার জায়গা থাকবে, কোথায় ছোট্ট একটা পাঠাগার তৈরি করবে—সব পরিকল্পনা খুলে বলল।
অনিন্দিতা মন দিয়ে শুনল। তারপর বাড়ির পেছনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
সেখান থেকে পাহাড়ের অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। বিকেলের আলোয় সবুজ পাহাড়ের গায়ে সোনালি রং লেগেছে। নিচে মেঘের ছায়া ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
অনিন্দিতা বলল,
— এখানে একটা দোলনা দিলে কেমন হয়?
অর্ণব বলল,
— রিসোর্টে দোলনা?
— হ্যাঁ। এমন একটা দোলনা, যেখানে বসে কেউ বই পড়বে, কেউ চা খাবে, আর কেউ হয়তো কারও জন্য অপেক্ষা করবে।
অর্ণব তার দিকে তাকাল।
— কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করবে কেন?
অনিন্দিতা হাসল।
— সবকিছুর কারণ থাকতে হয় নাকি?
তারপর দুজনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
বিকেলের আলো তখন আরও নরম হয়ে এসেছে। পাহাড়ের ওপর দিয়ে মেঘ ভেসে যাচ্ছিল। অনিন্দিতা ক্যামেরা তুলে অর্ণবের একটা ছবি তুলল।
অর্ণব আপত্তি করল।
— আমার ছবি তুললেন কেন?
— কারণ আপনি যখন নিজের স্বপ্নের কথা বলেন, তখন আপনার চোখ দুটো অন্য রকম হয়ে যায়।
— কেমন?
— মনে হয়, আপনি আর এই পৃথিবীতে নেই। অন্য কোথাও চলে গেছেন।
অর্ণব মৃদু হেসে বলল,
— হয়তো সেই জায়গাটার নামই স্বপ্ন।
অনিন্দিতা ক্যামেরা নামিয়ে ফেলল।
— তাহলে আপনার স্বপ্নের মধ্যে একটু জায়গা রাখবেন?
অর্ণবের বুকের ভেতর কেমন একটা অনুভূতি হলো।
সে উত্তর দিতে পারল না।
শুধু মনে মনে ভাবল, এই মেয়েটা যদি জানত, সে ইতিমধ্যেই তার স্বপ্নের কতটা জায়গা দখল করে ফেলেছে!
সাজেকে অনিন্দিতাদের থাকার সময়টা খুব দ্রুত ফুরিয়ে এল।
শেষ বিকেলে সবাই যখন ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে, অনিন্দিতা তখন অর্ণবের বাড়ির বারান্দায় বসে ছিল। সামনে দুটো চায়ের কাপ। একটা কাপ খালি, অন্যটায় চা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
অর্ণব বলল,
— আপনার বন্ধুরা অপেক্ষা করছে।
— জানি।
— তাহলে যাচ্ছেন না কেন?
অনিন্দিতা চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— আচ্ছা, মানুষ কোনো জায়গায় অল্প সময় থাকলেও সেই জায়গাটাকে এত আপন মনে করে কেন?
অর্ণব উত্তর দিল,
— হয়তো জায়গাটার জন্য নয়।
অনিন্দিতা তার দিকে তাকাল।
অর্ণব কথাটা শেষ করল না।
কিছু কথা মুখে আনার জন্য সাহস লাগে। অর্ণবের সেই সাহস তখনো হয়নি।
অনিন্দিতা ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট বুকমার্ক বের করল। সাদা কাগজের ওপর হাতে লেখা কয়েকটি শব্দ।
সে বুকমার্কটা অর্ণবের হাতে দিয়ে বলল,
— আপনার বইয়ের মধ্যে রাখবেন। যখন খুব একা লাগবে, তখন পড়বেন।
অর্ণব লেখাটা পড়ল।
যে মানুষ স্বপ্নের জন্য পাহাড়ে থেকে যেতে পারে, তার জন্য অপেক্ষা করাও সুন্দর।
সে মুখ তুলে তাকাতেই অনিন্দিতা হেসে বলল,
— বেশি ভাববেন না। এটা কোনো প্রতিশ্রুতি নয়।
অর্ণব বুকমার্কটা হাতে ধরে বলল,
— আমি তো কিছু জিজ্ঞেস করিনি।
— আপনার চোখ জিজ্ঞেস করছিল।
দুজনেই হেসে উঠল।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে একটা বিদায় জমে ছিল।
চাঁদের গাড়িটা যখন চলতে শুরু করল, অনিন্দিতা জানালার পাশে বসে ছিল। পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে বাঁকে গাড়ি ছোট হয়ে আসছিল, আর অর্ণব দাঁড়িয়ে ছিল বাড়ির সামনে।
একসময় কুয়াশা নেমে এল।
অনিন্দিতা আর অর্ণবকে দেখতে পেল না।
অর্ণবও আর গাড়িটাকে দেখতে পেল না।
শুধু তার হাতে রয়ে গেল একটা ছোট্ট বুকমার্ক, আর বুকের ভেতর এমন একটা শূন্যতা, যার কোনো নাম সে তখনো জানত না।
সেদিন রাতে অর্ণব প্রথমবার বুঝল, কিছু মানুষের চলে যাওয়ার পরও তারা ঠিক চলে যায় না। তারা থেকে যায় একটা চায়ের কাপে, একটা বিকেলের আলোয়, কিংবা এমন কোনো কথার মধ্যে, যা মনে পড়লে নিজের অজান্তেই হাসি পায়।
আর সেই হাসির পরেই বুকের ভেতর হালকা ব্যথা হয়।
ঢাকায় ফিরে অনিন্দিতা আবার তার পুরোনো জীবনে ফিরে গেল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা—সবকিছু আগের মতোই চলতে লাগল। কিন্তু তার দিনের ভেতর ছোট্ট একটা পরিবর্তন এসেছিল।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে ফোনের দিকে তাকাত।
কখনো অর্ণবের বার্তা আসত।
‘আজ সকালে পাহাড়ে খুব মেঘ ছিল।’
সঙ্গে একটা ছবি।
কখনো লিখত,
পুরোনো বারান্দার কাঠ বদলানো শুরু করেছি। আপনার দোলনার জায়গাটাও ঠিক করে রেখেছি।
অনিন্দিতা উত্তর দিত,
আমার দোলনা? আমি কি এখানে কোনো দোলনা বুক করে গিয়েছিলাম?
অর্ণব লিখত,
আপনার জন্য। তবে বসার অনুমতি নিতে হবে।
অনিন্দিতা হাসতে হাসতে লিখত,
অনুমতি দেব। তবে শর্ত আছে।
কী শর্ত?
চায়ে চিনি দিতে হবে।
অর্ণবের উত্তর আসত,
কিছু মানুষকে খুশি করার জন্য চায়ের স্বাদ বদলানো যায়।
এই কথাগুলো তাদের দিনের ছোট্ট আনন্দ হয়ে উঠল।
কখনো ফোনে কথা হতো। কখনো অনেকক্ষণ কথা না হলেও রাতের শেষে একটা বার্তা আসত।
অর্ণব একদিন লিখেছিল,
আজ সারাদিন খুব ব্যস্ত ছিলাম। সন্ধ্যায় হঠাৎ মনে হলো, তোমাকে একটা বিকেলের ছবি পাঠাই।
সেই প্রথম সে অনিন্দিতাকে ‘আপনি’ না বলে ‘তুমি’ লিখেছিল।
বার্তাটা পাঠানোর পর অর্ণব অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, কোনো বড় ভুল করে ফেলেছে।
অনিন্দিতা উত্তর দিল বেশ কিছুক্ষণ পর।
তাহলে আজ থেকে বিকেলটা আমার?
অর্ণব লিখল,
যত দিন তুমি নিতে চাও।
অনিন্দিতা উত্তর দিল,
আমি শুধু বিকেল নিতে চাই না, অর্ণব। কোনো কোনো বিকেল মানুষকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিয়ে যায়। তারপর সন্ধ্যা থেকে রাত।
অর্ণবের মনে হলো, পৃথিবীর সব আলো যেন এক মুহূর্তে তার ঘরে এসে জ্বলে উঠেছে।
কিন্তু ভালোবাসা সব সময় আলোয় শুরু হয় না।
কখনো কখনো তার শুরু হয় অপেক্ষায়। কেউ কারও বার্তার জন্য অপেক্ষা করে, কেউ একটি কণ্ঠ শোনার জন্য, কেউ আবার দূরের কোনো পাহাড়ে বসে একই আকাশের নিচে থাকা মানুষটিকে মনে করে।
অর্ণব আর অনিন্দিতার সম্পর্কটাও তেমনই হয়ে উঠল।
তারা প্রতিদিন দেখা করত না। একই শহরে থাকত না। ইচ্ছে হলেই একসঙ্গে চা খেতে পারত না। তবু দিনের শেষে তাদের দুজনেরই মনে হতো, কোথাও একজন মানুষ আছে, যার কাছে নিজের কথা বলা যায়।
অনিন্দিতা তার ছোট ছোট দুঃখের কথা বলত। কোনো বন্ধুর সঙ্গে মনোমালিন্য হলে অর্ণবকে জানাত। পরীক্ষার ফল খারাপ হলে বলত, তার জীবন শেষ হয়ে গেছে।
অর্ণব গম্ভীর হয়ে বলত,
— জীবন এত সহজে শেষ হয় না।
অনিন্দিতা বলত,
— আপনি কীভাবে জানেন?
— কারণ আমার জীবনও অনেকবার শেষ হয়েছে বলে মনে হয়েছে। তবু দেখো, আমি এখনো চা খাচ্ছি।
অনিন্দিতা হেসে উঠত।
আবার কোনো কোনো রাতে অনিন্দিতা চুপ করে থাকত। অর্ণব জিজ্ঞেস করলে বলত,
— কিছু না।
অর্ণব আর জোর করত না।
সে জানত, মানুষের মনের সব দরজা একই সময়ে খোলে না। ভালোবাসা মানে সব কথা জেনে ফেলা নয়; কখনো কখনো কথা না বলার অধিকারটুকু আগলে রাখাও ভালোবাসা।
দিনের পর দিন এভাবেই কেটে গেল।
পাহাড়ে অর্ণবের রিসোর্ট তৈরির কাজ এগিয়ে চলল। পুরোনো কাঠের বাড়ি নতুন রূপ পেল। বারান্দায় দোলনা বসানো হলো। বাগানে লাগানো হলো ফুলের গাছ। ছোট্ট একটা পাঠাগারের জন্য অর্ণব নিজের প্রিয় বইগুলো সাজিয়ে রাখল।
একদিন অনিন্দিতা ফোনে বলল,
— আমার জন্য একটা বই রাখবেন।
অর্ণব জিজ্ঞেস করল,
— কোন বই?
— সেটা আপনি ঠিক করবেন।
— যদি আপনার ভালো না লাগে?
— তাহলে আপনার পছন্দের বই পড়ে আপনাকে ভালো লাগানোর চেষ্টা করব।
অর্ণব হেসেছিল।
তারপর বইয়ের তাকের একটা কোণে সে একটি বই রেখে দিল। বইটির প্রথম পাতায় লিখল,
অনিন্দিতার জন্য।
যদি কোনো দিন এই পাহাড়ে এসে খুব একা লাগে, তাহলে বইটা খুলে পড়বে। হয়তো কোনো একটা পাতায় তোমার জন্য অপেক্ষা করে থাকা আমার কথাটা খুঁজে পাবে।’
সে বইটির ছবি তুলে অনিন্দিতাকে পাঠাল।
অনিন্দিতা অনেকক্ষণ পর উত্তর দিয়েছিল,
আমি বইটা পড়তে আসব, অর্ণব। একদিন ঠিক আসব।
সেদিন রাতে অর্ণব প্রথমবার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবল।
সে কল্পনা করল, একদিন অনিন্দিতা এই পাহাড়েই থাকবে। সকালে দুজনে বারান্দায় বসে চা খাবে। অনিন্দিতা ক্যামেরা নিয়ে বাগানে ঘুরে বেড়াবে। অর্ণব কাজের ফাঁকে তাকে খুঁজতে বের হবে। সন্ধ্যায় মেঘ নামলে দুজনে দোলনায় বসে থাকবে।
কল্পনাটা এত সুন্দর ছিল যে, অর্ণব নিজেই ভয় পেয়ে গেল।
কারণ, মানুষ যখন কাউকে হারানোর ভয় পেতে শুরু করে, তখন বুঝতে হয় সে মানুষটিকে নিজের জীবনের খুব গভীরে জায়গা দিয়ে ফেলেছে।
এক বছর কেটে গেল।
অর্ণবের ইকো-রিসোর্টের নাম রাখা হলো ‘মেঘবাড়ি’।
নামটা অনিন্দিতারই দেওয়া।
একদিন সে লিখেছিল, পাহাড়ের ওপর তোমার বাড়িটা তো শুধু বাড়ি নয়। এখানে মেঘ এসে মানুষের মতো বসে থাকে। নাম দাও মেঘবাড়ি।
অর্ণব নামটা শুনে আর কিছু ভাবেনি।
মনে হয়েছিল, বাড়িটার নাম এর চেয়ে সুন্দর আর কিছু হতে পারে না।
উদ্বোধনের দিন ঠিক হলো শরতের এক বিকেলে। সাজেকের আকাশ সেদিন পরিষ্কার ছিল। দূরে পাহাড়ের সারি, নিচে সাদা মেঘের ভেলা। রিসোর্টের সামনে ছোট্ট একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আশপাশের মানুষজন এসেছে, এসেছে অর্ণবের কয়েকজন বন্ধু আর পরিচিত মানুষ।
সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল।
শুধু অর্ণবের মনটা বারবার চলে যাচ্ছিল পাহাড়ি রাস্তার দিকে।
অনিন্দিতা আসবে কি না, সে জানত না।
কয়েক দিন ধরে তাদের কথা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু অনিন্দিতা আসার কথা বলেনি। অর্ণবও জিজ্ঞেস করেনি। সে ভয় পেত, যদি প্রশ্ন করার পর উত্তরটা এমন কিছু হয়, যা তার সমস্ত অপেক্ষাকে এক মুহূর্তে শেষ করে দেবে?
বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছিল।
অনুষ্ঠানের ব্যস্ততার মাঝেও অর্ণব একবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। দোলনাটা বাতাসে একটু একটু করে দুলছিল। তার পাশের ছোট্ট টেবিলে দুটো চায়ের কাপ রাখা।
একটা তার জন্য।
অন্যটা অনিন্দিতার জন্য।
কেউ জানত না, কেন সে দুটো কাপ রেখেছে।
হয়তো সে নিজেও জানত না।
ঠিক তখন দূরে একটা চাঁদের গাড়ি দেখা গেল।
গাড়িটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে রিসোর্টের সামনে থামল।
প্রথমে কয়েকজন যাত্রী নামল। তারপর গাড়ির দরজা ধরে নিচে নামল একটি মেয়ে।
হালকা নীল শাল। কাঁধে ক্যামেরা। চুলগুলো আগের মতোই এলোমেলো।
অর্ণব কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
অনিন্দিতা তাকে দেখেই হাসল।
সেই পুরোনো হাসি।
যে হাসি একসময় একটা রাতের ট্রেনের কামরায় অর্ণবের নীরবতা ভেঙে দিয়েছিল।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,
— শুনলাম, এখানে একজন মানুষ তার স্বপ্নের বাড়ি তৈরি করেছে। ভাবলাম, একবার দেখে যাই।
অর্ণবের গলায় কথা আটকে গেল।
অনিন্দিতা চারদিকে তাকিয়ে বলল,
— বেশ সুন্দর হয়েছে তো! আমার দোলনাটাও আছে দেখছি।
অর্ণব মৃদু হেসে বলল,
— দোলনাটা এক বছর ধরে অপেক্ষা করছে।
অনিন্দিতা দোলনার দিকে তাকাল।
তারপর অর্ণবের চোখের দিকে।
— শুধু দোলনাটা?
অর্ণব এবার আর চোখ সরিয়ে নিতে পারল না।
সে বলল,
— না। আরও একজন।
অনিন্দিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার চোখের কোণে খুব সামান্য জল চিকচিক করছিল। সে মুখ ঘুরিয়ে পাহাড়ের দিকে তাকাল, যেন নিজের অনুভূতিটুকু আড়াল করার জন্য একটু সময় দরকার।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— জানো, ঢাকায় ফিরে কতবার মনে হয়েছে, তোমার কাছে চলে আসি। আবার ভেবেছি, তোমার স্বপ্নের মধ্যে আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, সেটা তো জানি না।
অর্ণব বলল,
— তুমি আমার স্বপ্নের বাইরে কখনো ছিলে না।
অনিন্দিতা তার দিকে তাকাল।
— তাহলে আগে বলোনি কেন?
অর্ণব একটু হাসল।
— ভয় পেয়েছিলাম।
— কীসের ভয়?
— তোমাকে নিজের জীবনের অংশ ভাবতে শুরু করলে, একদিন তোমাকে ছাড়া সেই জীবনটা কল্পনা করতে পারব না। তখন যদি তুমি না থাকো?
অনিন্দিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— অর্ণব, মানুষকে ভালোবাসার সবচেয়ে বড় সমস্যা জানো কী?
অর্ণব মাথা নাড়ল।
— মানুষ ভবিষ্যৎ হারানোর ভয়ে বর্তমানটাকেও ঠিকমতো বাঁচতে পারে না। তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে সেটা বলো। আমি থাকব কি থাকব না, সেই সিদ্ধান্ত সময় নেবে। কিন্তু ভয়ের কারণে নিজের সত্যিটা লুকিয়ে রেখো না।
অর্ণব তার হাতের দিকে তাকাল।
তারপর খুব ধীরে বলল,
— আমি তোমাকে ভালোবাসি, অনিন্দিতা। ট্রেনের সেই রাত থেকে হয়তো। অথবা তারও আগে, যখন তোমাকে চিনতাম না, অথচ মনে হতো আমার জীবনে এমন একজন মানুষ আসা দরকার, যার সঙ্গে আমি নিজের নীরবতাটুকুও ভাগ করে নিতে পারব।
অনিন্দিতা কিছু বলল না।
অর্ণব আবার বলল,
— আমি জানি না, ভালোবাসার জন্য কত বড় বড় কথা বলতে হয়। শুধু জানি, এই পাহাড়ে যতবার মেঘ নামে, আমার মনে হয় তুমি থাকলে ভালো হতো। সকালের চা বানাতে গিয়ে মনে হয়, তোমার কাপটাও তৈরি করে রাখি। কোনো নতুন ফুল ফুটলে মনে হয়, তোমাকে ছবিটা পাঠাই। আমি আমার জীবনে অনেক কিছু নতুন করে গড়েছি, অনিন্দিতা। শুধু তোমাকে ছাড়া সেই জীবনটা কেমন হবে, তা কখনো কল্পনা করতে পারিনি।
অনিন্দিতা এবার হেসে ফেলল।
চোখের জল মুছতে মুছতে বলল,
— এত দিনে বললে?
অর্ণব অবাক হয়ে তাকাল।
— তুমি আগে থেকেই জানতে?
— তোমার মতো চিনি ছাড়া চা খাওয়া মানুষের প্রেমে পড়তে খুব বেশি বুদ্ধি লাগে না।
অর্ণব হেসে উঠল।
অনিন্দিতা তার হাতটা ধরে বলল,
— আমি তোমার কাছে শুধু একটা বিকেল নিতে আসিনি, অর্ণব।
সে একটু থামল।
দূরে পাহাড়ের ওপর দিয়ে মেঘ ভেসে আসছিল। বিকেলের আলো ক্রমশ নরম হয়ে উঠছিল। চারপাশে মানুষের কোলাহল থাকলেও তাদের দুজনের কাছে সময়টা যেন থমকে গিয়েছিল।
অনিন্দিতা বলল,
— আমি দেখতে এসেছি, তোমার স্বপ্নের মধ্যে আমার জন্য সত্যিই কোনো জায়গা আছে কি না। যদি থাকে, তাহলে শুধু একটা বিকেল নয়, জীবনের বাকি সময়টাও এখানে রেখে যেতে চাই।
অর্ণব তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।
কিছু কথা শুনে মানুষ উত্তর দিতে পারে না। কারণ, সেই কথার উত্তর শব্দ দিয়ে দেওয়া যায় না। অর্ণবও কিছু বলল না। শুধু অনিন্দিতাকে নিজের কাছে টেনে নিল।
পাহাড়ের ওপর তখন মেঘ নামছে।
সাদা মেঘের আড়ালে ধীরে ধীরে ঢেকে যাচ্ছে দূরের পাহাড়গুলো।
অনিন্দিতা অর্ণবের কাঁধে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল,
— আচ্ছা, তোমার এখানে চিনি ছাড়া চা পাওয়া যায়?
অর্ণব হেসে বলল,
— পাওয়া যায়। তবে তোমার জন্য চিনি দেওয়া চা-ও আছে।
— ভালো। কারণ, আমি সারা জীবন তেতো চা খেতে পারব না।
— আর আমি?
অনিন্দিতা মুখ তুলে তাকাল।
— তুমি আমার সঙ্গে থাকলে আর তেতো চা খেতে হবে না।
সন্ধ্যা নামার আগে তারা দুজনে বারান্দার দোলনায় এসে বসল।
টেবিলে রাখা চায়ের কাপ দুটো থেকে তখনো হালকা ধোঁয়া উঠছে। অনিন্দিতা চায়ে চুমুক দিয়ে মুখ কুঁচকে বলল,
— এত চিনি দিয়েছ কেন?
অর্ণব বলল,
— তোমার জন্য।
— আমার জন্য বলে কি আমাকে মেরে ফেলবে?
অর্ণব হেসে ফেলল।
অনিন্দিতাও হাসল।
দূরে পাহাড়ের গায়ে মেঘ জমছে। কোথাও পাখি ডেকে উঠল। বাতাসে বুনো ফুলের গন্ধ।
অর্ণবের মনে পড়ল, এক বছর আগে এই একই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে সে একটা মেয়েকে বিদায় দিয়েছিল। তখন তার হাতে ছিল একটা বুকমার্ক, আর মনে ছিল অদ্ভুত এক শূন্যতা। সে জানত না, অপেক্ষা কখনো সত্যি হয় কি না। জানত না, কোনো মানুষ ফিরে আসে কি না।
আজ সেই মেয়েটি তার পাশে বসে আছে।
তবু অর্ণবের মনে হলো, ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত হয়তো কাউকে পাওয়ার মুহূর্ত নয়। বরং সেই মুহূর্ত, যখন মানুষ বুঝতে পারে—তার এত দিনের অপেক্ষা বৃথা যায়নি।
অনিন্দিতা হঠাৎ বলল,
— অর্ণব?
— হুম?
— তুমি কি মনে করো, আমাদের গল্পটা ট্রেনে শুরু হয়েছিল?
অর্ণব কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
— হয়তো।
— আর আমার মনে হয়, আমাদের গল্পটা শুরু হয়েছিল তারও আগে। যখন আমরা দুজনেই আলাদা আলাদা জায়গায় বসে ভাবছিলাম, জীবনে এমন একজন মানুষ দরকার, যার কাছে নিজের মতো করে থাকা যায়।
অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে রইল।
অনিন্দিতা আবার বলল,
— তারপর একদিন ট্রেন আমাদের একই কামরায় বসিয়ে দিল। বাকিটা আমরা নিজেরাই লিখেছি।
অর্ণব মৃদু হেসে বলল,
— তাহলে গল্পটার শেষ কোথায়?
অনিন্দিতা তার হাত ধরে পাহাড়ের দিকে তাকাল।
— সব গল্পের শেষ থাকতে হয় না। কিছু গল্পের শুধু একটা ঠিকানা থাকে।
— আমাদের গল্পের ঠিকানা?
অনিন্দিতা হাসল।
— মেঘবাড়ি। পাহাড়ের বুকে, মেঘের খুব কাছে।
সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে নিভে আসছে। দূরের পাহাড়গুলো একে একে অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে। তাদের ওপর দিয়ে মেঘ ভেসে চলেছে নিঃশব্দে।
অর্ণব অনিন্দিতার হাত ধরে বসে রইল।
তার মনে হলো, জীবন আসলে সব সময় বড় কোনো সুখের প্রতিশ্রুতি দেয় না। কখনো কখনো জীবন শুধু একজন মানুষকে পাঠিয়ে দেয়, যে আপনার এলোমেলো দিনগুলো একটু গুছিয়ে দেবে। যে আপনার নীরবতার পাশে বসে থাকবে। যে আপনাকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা না করে আপনার মতো করেই গ্রহণ করবে।
আর তখনই বুঝতে পারবেন, এত দিন আপনি আসলে সুখ খুঁজছিলেন না।
খুঁজছিলেন এমন একজনকে, যার পাশে বসে সুখের সংজ্ঞা ভুলে থাকা যায়।
সেই রাতে মেঘবাড়ির বারান্দায় দুটি চায়ের কাপ পাশাপাশি পড়ে ছিল।
একটি কাপে চিনি কম, অন্যটিতে একটু বেশি।
কিন্তু দুটো কাপের পাশে বসে থাকা মানুষ দুটির মধ্যে কোনো দূরত্ব ছিল না।
বাইরে পাহাড়ের ওপর মেঘ নামছিল। ভেতরে দুটি মানুষ তাদের ভবিষ্যতের গল্প লিখতে শুরু করেছিল।
কেউ জানত না, সেই গল্পে কত বসন্ত আসবে, কত বর্ষা পেরিয়ে যাবে, কিংবা কোনো একদিন জীবনের কঠিন সময় তাদের কতটা পরীক্ষা নেবে।
শুধু অর্ণব জানত, সে আর কোনো বিকেল একা রেখে দিতে চায় না।
আর অনিন্দিতা জানত, পৃথিবীর সব পথের শেষ গন্তব্য এক হয় না। কোনো কোনো পথ মানুষকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে পৌঁছানোর পর আর কোথাও যাওয়ার তাড়া থাকে না।
যেখানে মেঘ আসে, আবার চলে যায়।
যেখানে বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যা নামে।
যেখানে ভালোবাসা বড় বড় প্রতিশ্রুতির চেয়ে ছোট ছোট যত্নে বেঁচে থাকে।
আর যেখানে একজন মানুষ প্রতিদিন আরেকজনকে বলতে পারে—
‘আজও তোমার জন্য একটা বিকেল রেখে দিলাম।’
সাজেকের পাহাড়ের বুকে সেই বিকেলগুলো জমতে থাকল।
একটার পর একটা।
দিনের পর দিন।
বছরের পর বছর।
আর মেঘের আড়ালে, পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেকে দূরে, অর্ণব আর অনিন্দিতার গল্পটা ধীরে ধীরে হয়ে উঠল এমন এক উপন্যাস, যার শেষ পৃষ্ঠা কেউ কোনো দিন লিখতে চাইল না।
কারণ, কিছু ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়ার জন্য জন্মায় না।
কিছু ভালোবাসা শুধু একটা ঠিকানা খুঁজে পায়।
মেঘের আড়ালে, পাহাড়ের বুকে—যেখানে তুমি আছ, আর যেখানে আমিও থেকে যেতে চাই।

মন্তব্য (1)