আশরাফুল কবির মানুষটা বেশ আয়েশি। বয়স আটচল্লিশ পেরিয়েছে। শহরের অভিজাত এলাকায় নিজের বাড়ি, দামি গাড়ি, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা—জীবনে প্রাপ্তির তালিকাটা দীর্ঘ। অর্থের অভাব কোনো দিনই তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আত্মঅহংকারও বেড়েছে।
তিনি যা চান, তা-ই হতে হবে। তাঁর পছন্দই শেষ কথা। অন্যের অসুবিধা, অন্যের অনুভূতি কিংবা অন্যের স্বাধীনতা নিয়ে ভাবার অভ্যাস তাঁর কোনো দিন ছিল না।
কিন্তু গত কয়েক রাত ধরে তাঁর আয়েশি জীবনে একটা অদ্ভুত সমস্যা দেখা দিয়েছে।
মাঝরাতে ঘুমাতে গেলেই দূরের কোনো বাড়ি থেকে বাঁশির সুর ভেসে আসে। সুরটা খুব জোরে নয়, বরং মৃদু। অথচ সেই মৃদু সুরই আশরাফুলের কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে।
এক রাতে বিরক্ত হয়ে বিছানায় উঠে বসলেন তিনি।
—রাকিব!
পাশের ঘরে ঘুমিয়ে থাকা সহকারী তাড়াতাড়ি ছুটে এল।
—জি, স্যার।
—এই এলাকায় নতুন কে এসেছে? মাঝরাতে বাঁশি বাজায় কে?
রাকিব একটু ভেবে বলল,
—ঠিক জানি না, স্যার। তবে কয়েক দিন ধরে আমিও শুনছি।
—তুইও শুনিস?
—জি, স্যার।
—তোর বিরক্ত লাগে না?
রাকিব মৃদু হাসল।
—না, স্যার। আমার তো ভালোই লাগে। অনেক দিন পর এমন সুন্দর বাঁশির সুর শুনলাম।
আশরাফুল অবাক হয়ে তাকালেন।
—বাঁশির সুর ভালো লাগে তোর? মানুষের ঘুম নষ্ট হচ্ছে, আর তোর ভালো লাগছে?
রাকিব চুপ করে রইল।
—যা, দরজা-জানালা সব বন্ধ করে দে।
রাকিব নির্দেশ পালন করতে করতে নিচু স্বরে বলল,
—দরজা-জানালা বন্ধ করলেই তো সব শব্দ বন্ধ হয় না, স্যার।
—কী বললি?
—কিছু না, স্যার।
সব দরজা-জানালা বন্ধ হয়ে গেল। পর্দা টেনে দেওয়া হলো। ঘরের ভেতর এসির মৃদু শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাওয়ার কথা নয়।
অথচ কিছুক্ষণ পর আবার সেই বাঁশির সুর।
আশরাফুলের মনে হলো, কেউ যেন ইচ্ছা করেই তাঁর ঘুমের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
রাগে বালিশটা ছুড়ে মারলেন তিনি।
পরদিন সকালে দারোয়ানকে ডেকে পাঠালেন।
—এই বাঁশিওয়ালার খবর বের করো। কোথায় থাকে, কে, কী করে—সব জানতে চাই।
বিকেলে দারোয়ান রফিক এসে জানাল, পাশের গলির একুশ নম্বর বাড়িতে নতুন ভাড়াটে উঠেছেন। একজন মহিলা, সঙ্গে তাঁর মেয়ে। মেয়েটিই বাঁশি বাজায়।
আশরাফুল ভ্রু কুঁচকে বললেন,
—মেয়ে বাঁশি বাজায়?
—জি, স্যার।
—কী বয়স?
—উনিশ-কুড়ি হবে। তবে মেয়েটা হাঁটতে পারে না। হুইলচেয়ারে থাকে। ছবি আঁকে, বাঁশি বাজায়। তার দেখাশোনার জন্য একজন বয়স্ক মহিলা আছেন।
আশরাফুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
একজন প্রতিবন্ধী মেয়ে। হুইলচেয়ারে বসে বাঁশি বাজায়।
কথাটা তাঁর কাছে অদ্ভুত লাগল।
তবু বিরক্তি কমল না।
মনে মনে বললেন, মেয়েটার শখ থাকতে পারে। তাই বলে সারা পাড়ার মানুষকে সেই শখের মূল্য দিতে হবে কেন?
অথচ একটা বিষয় তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলল। একজন অসহায় মেয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন কীভাবে?
প্রশ্নটার উত্তর খুঁজে পেলেন না তিনি।
কিন্তু বাঁশির সুরটাকে মাথা থেকে সরাতেও পারলেন না।
মেয়েটির নাম তুলি।
তুলির পৃথিবীটা অন্যদের মতো নয়। জানালার ওপাশে তার আকাশ আছে, বৃষ্টি আছে, গাছের পাতায় রোদ পড়ে ঝলমল করে ওঠার দৃশ্য আছে। আছে পাখির ডাক, দূরের রেললাইনে ট্রেনের শব্দ, বিকেলের মায়াবী আলো।
শুধু নেই নিজের পায়ে হেঁটে কোথাও চলে যাওয়ার স্বাধীনতা।
জন্মের পর থেকেই তার দুই পায়ে স্বাভাবিক শক্তি ছিল না। চিকিৎসার জন্য মা অনেক চেষ্টা করেছেন। সামর্থ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব, করেছেন। কিন্তু সব চেষ্টা সব সময় মানুষকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দেয় না।
তবু তুলি নিজেকে অসহায় ভাবতে শেখেনি।
তার মনের সবচেয়ে কাছের আশ্রয় দুটি—রং আর বাঁশি।
কখনো ক্যানভাসে নদী আঁকে, কখনো বৃষ্টিভেজা জানালা। কখনো এমন এক মেয়েকে আঁকে, যার পায়ের কাছে শিউলি ফুল ঝরে আছে, অথচ মেয়েটির চোখে কোনো দুঃখ নেই।
আর যখন বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো কাউকে বলা যায় না, তখন সে বাঁশি হাতে নেয়।
সেদিন দুপুরে খাবারের টেবিলে বসে তুলির মন খারাপ হয়ে গেল।
পাতে আলুভর্তা আর ছোট মাছের ঝোল।
—আমি খাব না।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মালেকা খালা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—কী হয়েছে আবার? সকাল থেকে কিছু মুখে দিসনি। তোর মা কত কষ্ট করে সব সামলায়, সেটা তো বুঝিস।
—মা এখানে এল কেন?
—তোর জন্যই তো এসেছে।
তুলি তিক্ত স্বরে বলল,
—চাঁদপুরে আমরা ভালোই ছিলাম। মা স্কুলে পড়াত। বাড়ির পাশ দিয়ে নদী বয়ে যেত। বিকেলে জানালার কাছে বসে বাঁশি বাজাতাম। এখানে এসে কী পেলাম আমরা?
মালেকা খালা চুপ করে রইলেন।
তুলি নিজেই উত্তর দিল,
—মা গ্রামে থাকলে স্কুলের পরিচালনা কমিটির সভাপতি তাকে বিয়ে করতে চাইত। সেই লোকটার হাত থেকে বাঁচতে মা চাকরি ছেড়ে শহরে চলে এসেছে। নিজের এত বছরের পরিচিত জীবন ফেলে দিয়েছে। সবকিছু আমার জন্য!
শেষ কথাটা বলতে গিয়ে তুলির গলা কেঁপে উঠল।
তার মা শারমিন কখনো মেয়েকে এসব কথা বিস্তারিত বলেননি। কিন্তু পৃথিবীতে কিছু সত্য আছে, যেগুলো দরজা বন্ধ করে রাখলেও ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে।
তুলি বাঁশিটা হাতে নিল।
তারপর কাঁদতে কাঁদতে বাজাতে শুরু করল—
তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী,
আমি অবাক হয়ে শুনি...
বাঁশির সুর ঘরের দেয়াল পেরিয়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়ল।
দুপুরের রোদে ক্লান্ত শহরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। বাতাসে পর্দা নড়ে গেল। দূরে কোথাও একটা পাখি ডেকে উঠল।
আর সেই সুর শুনে মনে হলো, পৃথিবীর সব না-পাওয়ার ভেতরেও এমন কিছু আছে, যেটাকে কোনো অভাব স্পর্শ করতে পারে না।
আশরাফুল কবির সেদিন অফিসে বসেও কাজে মন দিতে পারছিলেন না।
একটা প্রতিবন্ধী মেয়ে বাঁশি বাজায়!
কথাটা তাঁর মাথায় বারবার ফিরে আসছিল।
তিনি নিজেও একসময় বাঁশি শেখার চেষ্টা করেছিলেন। তখন বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ। গ্রামের বাড়িতে ছুটিতে গেলে স্থানীয় এক বাঁশিওয়ালার কাছে কয়েক মাস শিখেছিলেন। লোকটির নাম ছিল আবদুল কাদের মিয়া। গ্রামের মানুষ তাঁকে কাদের বাউল বলে ডাকত।
কিন্তু যত চেষ্টা করেছেন, সুর তাঁর আয়ত্তে আসেনি।
কাদের বাউল অনেক চেষ্টা করেও তাঁকে শেখাতে পারেননি। একদিন রাগ করে বলেছিলেন,
—বাঁশি বাজাতে হলে আগে মনটাকে নরম করতে হয়, বাবা। শুধু দামি পোশাক আর বড়লোকের দাপট দিয়ে সুর ওঠে না।
কথাটা আশরাফুলের আত্মসম্মানে লেগেছিল। তিনি আর সেই বাড়িতে যাননি।
কাদের বাউলের একটি মেয়ে ছিল। নাম শারমিন।
মেয়েটি তখন তরুণী। আশরাফুলের প্রতি তার একধরনের দুর্বলতা ছিল। আশরাফুল সেটা বুঝতেন। বুঝেও গুরুত্ব দেননি। বরং নিজের আকর্ষণ আর প্রভাব নিয়ে খেলতে ভালো লাগত তাঁর।
শারমিনের অনুভূতিকে তিনি কখনো গুরুত্ব দেননি, আবার পুরোপুরি দূরেও সরিয়ে রাখেননি। যত দিন নিজের ভালো লেগেছে, তত দিন কাছে টেনেছেন। তারপর যখন দায়িত্ব নেওয়ার সময় এসেছে, তখন সরে পড়েছেন।
একদিন কাদের বাউল তাঁকে বাড়িতে আসতে নিষেধ করেছিলেন।
তারপর আশরাফুল গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে এসেছিলেন।
পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা—জীবন নিজের গতিতে এগিয়ে গিয়েছিল। কিছু স্মৃতি সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়ে যায়, কিছু স্মৃতিকে মানুষ ইচ্ছা করে ভুলে থাকতে শেখে।
শারমিনের কথা তিনি ভুলে গিয়েছিলেন বলেই বিশ্বাস করতেন।
কিন্তু মানুষ কি সত্যিই ভুলে যায়? নাকি নিজের সুবিধামতো স্মৃতির ওপর ধুলো জমতে দেয়?
তিনি ফোন করলেন গ্রামের পুরোনো বন্ধু সমীরকে।
—দোস্ত, কাদের চাচার কথা মনে আছে?
—কেন? এত বছর পর তাঁর কথা মনে পড়ল যে?
—এমনি। বাঁশি শেখাতেন তো। হঠাৎ মনে হলো।
সমীর হেসে বলল,
—শুধু বাঁশি শেখাতেন? তাঁর মেয়েটার কথা মনে নেই? শারমিন তোকে খুব পছন্দ করত।
আশরাফুলও হেসে উঠলেন।
—আরে, সেসব ছেলেমানুষি ছিল। এখন মনে পড়লে হাসি পায়।
কথাটা বলার পরও তাঁর হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
কারণ হঠাৎ তাঁর মনে হলো, কোনো কোনো মানুষের কাছে যেটা ছেলেমানুষি, অন্য কারও কাছে সেটাই সারা জীবনের ক্ষত হয়ে থাকে।
ফোন রেখে তিনি জানালার বাইরে তাকালেন।
দূরের একটা বাড়ির ছাদে কেউ কাপড় মেলছিল।
কিন্তু আশরাফুলের চোখের সামনে ভেসে উঠল বহু বছর আগের সেই গ্রামের বাড়ি। উঠানে বসে থাকা এক বৃদ্ধ বাঁশিওয়ালা। আর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণী।
সেই তরুণীর চোখে তখন কত স্বপ্ন ছিল!
রাতে শারমিন বিছানায় শুয়ে ছিলেন। স্কুল থেকে ফিরে মেয়ের ওষুধপত্র গুছিয়ে, পরদিনের ক্লাসের প্রস্তুতি নিয়ে শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।
তুলি হুইলচেয়ার ঠেলে মায়ের কাছে এল।
—মা?
—কী হয়েছে, তুলি?
তুলি মায়ের হাত ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, তাই না?
শারমিন মেয়ের দিকে তাকালেন।
—এ কথা বলছিস কেন?
—তুমি আমার জন্য কত কিছু ছেড়ে দিয়েছ। আমি মাঝেমধ্যে তোমার ওপর রাগ করি। তোমাকে কষ্ট দিই। কিন্তু তুমি কখনো আমাকে কিছু বলো না।
শারমিন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
—তুই আমার কষ্টের কারণ নস, মা। তুই আমার বেঁচে থাকার কারণ।
তুলির চোখ ভিজে উঠল।
—আমি যদি হাঁটতে পারতাম, তোমাকে এত কষ্ট করতে হতো না।
—সব মানুষ সবকিছু পারে না। তাই বলে তাদের জীবন মূল্যহীন হয়ে যায় না। তুই হাঁটতে পারিস না, কিন্তু তোর মনের যে শক্তি, সেটা অনেক সুস্থ মানুষেরও নেই।
তুলি মায়ের বুকে মুখ লুকাল।
শারমিন তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
—আর শোন, তুই বাঁশি বাজানো বন্ধ করবি না। ছবি আঁকাও বন্ধ করবি না। তোর বাঁশির সুর শুনলে আমার মনে হয়, এত কষ্টের মধ্যেও পৃথিবীটা সুন্দর আছে।
তুলি কিছু বলল না।
মায়ের বুকের কাছে মুখ রেখে শুধু কাঁদল।
সেই রাতে জানালার পাশে বসে আবার বাঁশি হাতে নিল সে।
বাইরে চাঁদ ছিল না। আকাশে মেঘ জমেছিল। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ।
তুলি এমন একটা সুর তুলল, যার মধ্যে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল না কাউকে ফিরে পাওয়ার আকুতি।
শুধু ছিল অপেক্ষা।
সেই অপেক্ষা কার জন্য, তুলি নিজেও জানত না।
অন্যদিকে পাশের বাড়িতে আশরাফুল আবার দরজা-জানালা বন্ধ করলেন। কানে বালিশ চেপে ধরলেন। তবু সুরটা থামল না।
রাত যত গভীর হলো, বাঁশির সুর তত স্পষ্ট হয়ে উঠল।
আশরাফুলের মনে হলো, বহু বছর আগে ফেলে আসা কোনো নদীর পাড় থেকে কেউ তাঁকে ডাকছে।
যে নদীর নাম তিনি ভুলে গেছেন।
যে নদীর কাছে তাঁর কিছু ঋণ রয়ে গেছে।
পরদিন সকালে শারমিন স্কুলে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর একুশ নম্বর বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
মালেকা খালা দরজা খুলে দেখলেন, সামনের বাড়ির সেই ধনী ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন।
—এই বাড়িতে যে বাঁশি বাজায়, সে কোথায়?
তুলি ভেতর থেকে বলল,
—আমি বাজাই। কেন?
আশরাফুল ঘরে ঢুকে হুইলচেয়ারে বসে থাকা মেয়েটির দিকে তাকালেন।
মেয়েটির মুখে অদ্ভুত প্রশান্তি। পাশে রঙতুলি, ক্যানভাস আর একটি পুরোনো বাঁশি।
—তুমি বাঁশি বাজাও কেন?
তুলি অবাক হয়ে বলল,
—ভালো লাগে বলে।
—জানো, তোমার বাঁশির সুরে মানুষের ঘুম নষ্ট হয়?
তুলি কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।
—আপনার ঘুম নষ্ট হয়?
—হ্যাঁ।
—আপনি কি কখনো বাঁশি বাজিয়েছেন?
প্রশ্নটা শুনে আশরাফুল থমকে গেলেন।
—অনেক বছর আগে শিখতাম।
—তাহলে আপনি জানেন, বাঁশি বাজাতে কত মন লাগে।
আশরাফুল উত্তর দিতে পারলেন না।
তুলি আবার বলল,
—আমার মা বাঁশি ভালোবাসেন। আমিও ভালোবাসি। আমার পা চলে না, তাই বলে আমার মনটাকেও কি থেমে থাকতে হবে?
আশরাফুল মেয়েটির চোখের দিকে তাকালেন।
সেই চোখে কোনো অভিযোগ নেই। বরং এমন এক সরল প্রশ্ন, যার উত্তর তাঁর সমস্ত অর্থসম্পদ, সামাজিক মর্যাদা আর আত্মঅহংকারের কোথাও নেই।
তিনি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন,
—তোমার মায়ের নাম কী?
—শারমিন আক্তার।
নামটা শুনে আশরাফুলের বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ল।
তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
—তোমার বাবার নাম কী?
তুলি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—আশরাফুল কবির।
ঘরের ভেতর হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এল।
আশরাফুল মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখের সামনে একে একে ভেসে উঠল গ্রামের সেই বাড়ি, বাঁশিওয়ালা কাদের বাউল, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শারমিন আর নিজের তরুণ বয়সের নিষ্ঠুর উদাসীনতা।
তিনি ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসলেন তুলির সামনে।
কাঁপা হাতে মেয়েটির হাত ধরলেন।
তুলি অবাক হয়ে বলল,
—আপনি কাঁদছেন কেন?
আশরাফুল কোনো উত্তর দিলেন না।
অনেকক্ষণ পর ফিসফিস করে বললেন,
—আমি একজন ব্যর্থ মানুষ, মা। জীবনে অনেক কিছু পেয়েছি। শুধু মানুষ হতে শিখিনি।
তুলি চুপ করে রইল।
আশরাফুল বললেন,
—তোমার নানার কাছে বাঁশি শিখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সুর শিখতে পারিনি। তাঁর মেয়ের অনুভূতির মূল্যও বুঝিনি। তারপর একদিন সবকিছু ছেড়ে চলে এসেছিলাম। আমি জানতাম না, আমার চলে যাওয়ার পর কতটা পথ তোমাদের একা হাঁটতে হয়েছে।
তুলি আস্তে করে বলল,
—আমার মা অনেক কষ্ট করেছেন।
—জানি, মা। এখন বুঝতে পারছি।
—তাহলে আপনি এত দিন কোথায় ছিলেন?
প্রশ্নটা খুব ছোট।
কিন্তু আশরাফুলের কাছে মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।
তিনি মেয়েটিকে বুকে টেনে নিলেন।
বহু বছর পর তাঁর চোখের জল গড়িয়ে পড়ল।
সেদিন দুপুরে মালেকা খালার রান্না করা খাবার টেবিলে বসে বাবা-মেয়ের কথা হলো।
তুলি তার মায়ের জীবনসংগ্রামের কথা বলল। কীভাবে শারমিন একা হাতে তাকে বড় করেছেন, কীভাবে চাকরি বাঁচাতে, মেয়ের চিকিৎসা আর ভবিষ্যতের জন্য তাঁকে প্রতিদিন লড়তে হয়েছে।
আশরাফুল নির্বাক হয়ে শুনলেন।
যে মানুষ নিজের সামান্য অসুবিধা সহ্য করতে পারতেন না, তিনি প্রথমবার উপলব্ধি করলেন—অন্য মানুষের জীবনে তাঁর রেখে যাওয়া ক্ষত কত গভীর হতে পারে।
বিকেলের দিকে শারমিন স্কুল থেকে ফিরে দরজায় দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখলেন।
তুলি হাসছে।
তার পাশে বসে আছেন আশরাফুল।
মেয়েটির মুখে এমন এক আনন্দ, যা শারমিন বহু বছর দেখেননি।
কিন্তু সেই দৃশ্য দেখে তাঁর চোখে আনন্দের বদলে জমে উঠল পুরোনো অপমানের আগুন।
—আপনি এখানে কী করছেন?
আশরাফুল উঠে দাঁড়ালেন।
—শারমিন, আমার কথা একবার শোনো।
—আমার নাম ধরে ডাকার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?
আশরাফুল মাথা নিচু করলেন।
—আমি জানি, তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ারও অধিকার আমার নেই। তবু একটা সুযোগ চাই। তোমাকে আর তুলিকে নিয়ে বাকি জীবনটা কাটাতে চাই।
শারমিনের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।
—এত বছর কোথায় ছিলেন আপনি?
—আমি অপরাধ করেছি।
—অপরাধ?
শব্দটা খুব সহজে বলে ফেললেন। জানেন, একটা মেয়েকে নিয়ে গ্রাম থেকে চলে আসার মতো জীবন কাটানো কাকে বলে? জানেন, নিজের সন্তানকে পৃথিবীতে আনার পর তার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিটি দিন আতঙ্কে কাটানো কাকে বলে?
আশরাফুল চুপ করে রইলেন।
শারমিন বললেন,
—আমার বাবা আমাকে নিয়ে গ্রাম ছেড়েছিলেন। মানুষ তাঁকে কত কথা বলেছে, আপনি জানেন? টাকার অভাবে চিকিৎসার জন্য কত মানুষের কাছে হাত পাততে হয়েছে, জানেন? কাঁথা সেলাই করে, মানুষের বাড়িতে কাজ করে আমি পড়াশোনা শেষ করেছি। একটা চাকরি পেয়ে ভেবেছিলাম, এবার অন্তত মেয়েটাকে নিয়ে বাঁচতে পারব। সেখানেও একজন ক্ষমতাবান মানুষের অন্যায় প্রস্তাবের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
তাঁর গলা কেঁপে উঠল।
—আমি ভেবেছিলাম, শহরে এলে অতীত থেকে দূরে থাকতে পারব। আর আজ আপনি আমার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন!
আশরাফুল হাত জোড় করলেন।
—আমাকে ক্ষমা করো। আমি প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই।
—আমার মেয়ের দায়িত্ব আমি একাই নিয়েছি। আমার জীবনের সিদ্ধান্তও আমি একাই নেব।
—শারমিন, আমাকে একটা সুযোগ দাও।
—আপনি এখনই আমার বাড়ি থেকে চলে যান।
আশরাফুল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তুলি হুইলচেয়ার ঠেলে বাবার কাছে এল।
—মা, বাবাকে আরেকটু সময় দাও।
শারমিন মেয়ের দিকে তাকালেন।
তুলি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—সকাল থেকে বাবা শুধু তোমার কথা বলেছে। কেঁদেছে। বলেছে, বিদেশে যে সংসার করেছিল, সেই সংসারও ভেঙে গেছে। এখন সে একা থাকে। মা, আমি এত বছর বাবাকে চিনতাম না। আজ প্রথমবার বাবাকে কাছে পেয়েছি। তুমি কি তাঁকে একেবারেই ক্ষমা করতে পারবে না?
শারমিনের চোখে জল এসে গেল।
কিন্তু সেই জল দুর্বলতার নয়। সেখানে জমে ছিল বহু বছরের অপমান, বঞ্চনা আর একাকিত্ব।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
—এক দিনের কান্না দিয়ে কি মানুষের জীবনের সব অপমান মুছে ফেলা যায়, তুলি? আমি যে রাতগুলো একা কাটিয়েছি, যে দিনগুলো তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়ে ভয়ে বেঁচেছি, যে অপমানগুলো কাউকে বলতে পারিনি—সেগুলোর মূল্য কে দেবে?
তিনি আশরাফুলের দিকে তাকালেন।
—আপনি যখন অন্য দেশে নিজের সংসার গড়ছিলেন, তখন আমি মেয়েকে নিয়ে একা লড়েছি। যখন আপনার জীবনে আনন্দ ছিল, তখন আমার জীবনে ছিল অনিশ্চয়তা। আজ আপনার একাকিত্ব হয়েছে বলে আপনি ফিরে এসেছেন। কিন্তু আমার একাকিত্বের দিনগুলো কি আর ফিরে আসবে?
আশরাফুলের চোখ নিচু হয়ে গেল।
—আমি জানি না কীভাবে তোমার কাছে ক্ষমা চাইব।
—ক্ষমা চাওয়ার আগে বুঝতে হয়, কীসের জন্য ক্ষমা চাইছেন। আমার জীবনের যে অংশটা আপনি নষ্ট করে দিয়েছেন, সেখানে কি আবার নতুন করে জীবন শুরু করা সম্ভব?
আশরাফুল কোনো উত্তর খুঁজে পেলেন না।
শারমিন দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
—দয়া করে চলে যান।
আশরাফুল মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। তারপর নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
দরজাটা বন্ধ হওয়ার আগে তুলি একবার বাবার দিকে তাকাল।
আশরাফুলও তাকালেন।
দুজনের চোখেই জল।
সেদিন সন্ধ্যায় শারমিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাইরে আকাশে মেঘ জমেছে। দূরের কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসছে নাম না-জানা পাখির ডাক।
তুলি ধীরে ধীরে বাঁশিটা হাতে তুলে নিল।
মা ফিরে তাকালেন না।
বাঁশির প্রথম সুরটা উঠতেই তাঁর বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না আর ধরে রাখা গেল না।
কারণ, কিছু সম্পর্কের শেষ হয় না। শুধু মানুষ একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যায়।
আর কিছু ক্ষমা আছে, যেগুলো মুখে বলা যায় না—যদিও হৃদয়ের কোনো এক গোপন কোণে তাদের জন্য অপেক্ষা করেই থাকে মানুষ।
সেদিন রাতে আশরাফুল নিজের বাড়িতে ফিরে দরজা-জানালা খোলা রাখলেন।
তিনি চাইলেন, বাঁশির সুরটা আসুক।
সুরটা এলও।
কিন্তু সেই সুরের মধ্যে এবার কোনো বিরক্তি ছিল না।
ছিল অনুশোচনা।
ছিল বহু বছর আগে হারিয়ে ফেলা এক জীবনের দীর্ঘশ্বাস।
আর ছিল একটি প্রশ্ন—
যে মানুষ একদিন ভালোবাসার মূল্য বুঝতে শেখেনি, সে কি কোনো একদিন ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য হয়ে উঠতে পারে?
আশরাফুল জানতেন না।
শুধু জানতেন, পরদিন তিনি আবার শারমিনের কাছে যাবেন না। তাঁকে সময় দেবেন। অপেক্ষা করবেন।
কারণ জীবনে প্রথমবার তিনি বুঝেছেন—কাউকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলেই তাকে নিজের করে পাওয়ার অধিকার জন্মায় না।
অন্যদিকে তুলি জানালার পাশে বসে বাঁশি বাজিয়ে চলেছে।
তার সুরে কোনো প্রতিশোধ নেই। কোনো অভিযোগও নেই।
আছে কেবল ভালোবাসা, যে ভালোবাসা মানুষকে কাছে টানে, আবার কখনো কখনো দূরে দাঁড়িয়ে থাকতেও শেখায়।
আশরাফুল চোখ বন্ধ করলেন।
বহু বছর আগে কাদের বাউল তাঁকে বলেছিলেন, বাঁশি বাজাতে হলে আগে মনটাকে নরম করতে হয়।
সেদিন তিনি কথাটার অর্থ বুঝতে পারেননি।
আজ বুঝলেন।
কিন্তু জীবনের সব উপলব্ধি কি সময়মতো আসে?
কিছু উপলব্ধি আসে তখন, যখন হারিয়ে যাওয়া মানুষটিকে ফিরে পাওয়ার অধিকার আর নিজের হাতে থাকে না।
বাঁশির সুর রাতের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল।
একটি জানালার ওপারে মা-মেয়ে।
অন্য জানালার এপারে একজন অনুতপ্ত বাবা।
তিনটি মানুষ, তিনটি আলাদা জীবন—তবু কোথাও যেন একই সুরে বাঁধা।
সেই সুরের নাম হয়তো ভালোবাসা।
হয়তো অনুশোচনা।
অথবা এমন এক অপেক্ষা, যার শেষ কোথায়, কেউ জানে না।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।