চর হাজীগঞ্জের বিকেলগুলো এখনও আগের মতোই নরম।

পদ্মার বুক থেকে ভেসে আসা বাতাসে বিকেল নামলে চরভদ্রাসনের রাস্তার ধুলোও কেমন যেন শান্ত হয়ে যায়। দূরের নৌকাগুলো ধীরে ধীরে ঘাটের দিকে ফেরে। নদীর ওপরে সূর্যের শেষ আলোটা যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন মনে হয়—দিনটা বুঝি কোথাও যাওয়ার আগে একটু থেমে বিদায় নিচ্ছে।

আবির এই সময়টাকে খুব ভালোবাসত।

অবশ্য এখন আর শুধু সময়টাকে ভালোবাসে না।

এই সময়টার সঙ্গে একটা মানুষ জড়িয়ে আছে।

নাবিলা।

প্রায় চার বছর হয়ে গেছে নাবিলাকে দেখেনি আবির।

তবুও আজও বিকেলের বাতাসে কখনো কখনো তার মনে হয়, নাবিলা বুঝি পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।

সাদা ওড়নাটা বাতাসে উড়ছে।

হাতে একটা বই।

চোখে সেই শান্ত হাসি।

আর মুখে সেই পুরোনো প্রশ্ন—

এত চুপচাপ থাকো কেন, আবির?

আবির তখন বলত,

তোমার কথা শুনি।

নাবিলা বিরক্ত হওয়ার ভান করে বলত,

আমি তো কিছু বলছি না।

তবুও শুনি।

কী শুনো?

তোমার নীরবতা।

নাবিলা তখন হেসে ফেলত।

সেই হাসিটা আজও আবিরের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত শব্দ।

তাদের গল্পের শুরুটা খুব সাধারণ ছিল।

চর হাজীগঞ্জের ছোট্ট বাজারের পাশে একটা চায়ের দোকান ছিল। দোকানটার সামনে বাঁশের বেঞ্চ। বিকেল হলেই সেখানে কয়েকজন বয়স্ক মানুষ বসে নদীর খবর, গ্রামের খবর আর দেশের খবর নিয়ে আলোচনা করত।

আবির প্রায় প্রতিদিন সেখানে চা খেত।

একদিন হঠাৎ দেখল, নাবিলা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

হাতে একটা ছাতা।

বৃষ্টি তখনও নামেনি, কিন্তু আকাশ কালো হয়ে এসেছিল।

দোকানদারকে সে জিজ্ঞেস করছিল,

চাচা, এখানে কি মোবাইল চার্জ দেওয়া যাবে?

আবির পাশ থেকে বলেছিল,

যাবে।

নাবিলা তাকিয়ে বলেছিল,

আপনি জানেন?

আমি প্রতিদিন চা খাই। তাই দোকানের সব নিয়ম জানি।

নাবিলা হেসে বলেছিল,

তাহলে আপনাকে দোকানের ম্যানেজার বলা উচিত।

আবির বলেছিল,

চা খাওয়ার জন্য কোনো পদবির দরকার হয় না।

সেদিন নাবিলা প্রথমবার হেসেছিল।

আবির জানত না, সেই হাসির শব্দই একদিন তার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি হয়ে থাকবে।

তারপর ধীরে ধীরে পরিচয়।

তারপর বন্ধুত্ব।

তারপর এমন একটা সম্পর্ক, যার নাম দুজনের কেউ মুখে উচ্চারণ করেনি।

নাবিলা মাঝে মাঝে বলত,

তুমি কি জানো, কিছু মানুষ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই খুব আপন হয়ে যায়?

আবির বলত,

জানি।

কীভাবে?

কারণ তুমি হয়ে গেছো।

নাবিলা তখন চুপ করে থাকত।

হয়তো লজ্জায়।

হয়তো ভয় পেয়ে।

অথবা হয়তো সেও বুঝেছিল—এই সম্পর্কটা বন্ধুত্বের জায়গায় আর নেই।

তাদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল নদীর ঘাট।

সন্ধ্যার পর দুজন পাশাপাশি বসে থাকত।

কখনো কথা হতো।

কখনো হতো না।

নাবিলা নদীর দিকে তাকিয়ে বলত,

মানুষ কি কাউকে না পেয়েও ভালোবাসতে পারে?

আবির বলত,

পারে।

তাহলে ভালোবাসার দরকার কী?

আবির একটু হেসে বলত,

সব ভালোবাসার উদ্দেশ্য পাওয়া নয়।

নাবিলা তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করত,

তাহলে?

কখনো কখনো কাউকে ভালোবাসা মানে, তার কথা মনে পড়লে নিজের অজান্তেই হাসতে পারা।

নাবিলা কিছু বলত না।

শুধু নদীর দিকে তাকিয়ে থাকত।

আবির জানত না, নাবিলার পরিবার তখন তার বিয়ের কথা ভাবছে।

নাবিলা জানত।

কিন্তু বলতে পারছিল না।

কারণ সে জানত, আবিরের কাছে যাওয়ার মতো সাহস তার আছে, কিন্তু পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো শক্তি তার নেই।

এক সন্ধ্যায় নাবিলা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলেছিল,

আবির, যদি কোনোদিন আমি অনেক দূরে চলে যাই?

আবির হেসে বলেছিল,

তুমি কোথায় যাবে?

জানি না।

তাহলে আমিও জানি না।

তুমি কি আমাকে খুঁজবে?

আবির কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল,

তুমি যদি হারিয়ে যাও, খুঁজব।

নাবিলা খুব আস্তে বলেছিল,

যদি ইচ্ছে করেই হারিয়ে যাই?

আবিরের হাসিটা থেমে গিয়েছিল।

তাহলে?

নাবিলা উত্তর দেয়নি।

সেদিন নদীর পানি অনেকটা অন্ধকার ছিল।

কয়েকদিন পর নাবিলা চলে গেল।

কোনো ঝগড়া হয়নি।

কোনো শেষ দেখা হয়নি।

কোনো বিদায়ও না।

শুধু এক সকালে আবির জানতে পারল—নাবিলাদের পরিবার শহর ছেড়ে চলে গেছে।

আবির প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি।

সেদিন বিকেলে সে নদীর ঘাটে গিয়েছিল।

অনেকক্ষণ বসে ছিল।

তারপর রাত নেমে এসেছিল।

নাবিলা আসেনি।

আবির সেদিন প্রথম বুঝেছিল—

কিছু মানুষ বিদায় না জানিয়েও মানুষের জীবন থেকে চলে যায়।

আর সেই না-বলা বিদায়টাই সবচেয়ে দীর্ঘ হয়।

সময় চলে গেল।

চর হাজীগঞ্জ বদলে গেল।

পুরোনো চায়ের দোকানের জায়গায় নতুন দোকান হলো।

রাস্তার পাশে নতুন ঘর উঠল।

কিছু পরিচিত মুখ আর দেখা গেল না।

কিন্তু আবিরের জীবনে একটা জায়গা একই রয়ে গেল।

নাবিলা।

সে বিয়ে করেনি।

কেউ জিজ্ঞেস করলে হেসে বলত,

সময় হয়নি।

আসলে সময় হয়েছিল।

শুধু মনটা হয়নি।

চার বছর পর একদিন আবির চরভদ্রাসনের বাজারে গিয়েছিল।

বাজারের ভিড় পেরিয়ে হঠাৎ একটা পরিচিত কণ্ঠ শুনল।

এক কাপ চা দেবেন?

আবিরের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সে ঘুরে দাঁড়াল।

নাবিলা।

চার বছর পর।

চোখের নিচে সামান্য ক্লান্তি।

চুলে আগের চেয়ে বেশি পরিপক্বতা।

কিন্তু চোখ দুটো—

একই।

আবির কিছু বলতে পারল না।

নাবিলাও প্রথমে চুপ করে ছিল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

চেনোনি?

আবির অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

চেনার জন্য কি কখনো ভুলে যেতে হয়?

নাবিলার চোখ ভিজে উঠল।

সে বসে পড়ল।

দুজনের সামনে দুই কাপ চা এল।

চার বছর পর।

একই চায়ের গন্ধ।

শুধু মাঝখানে অনেকগুলো বছর।

নাবিলা বলল,

তুমি আমাকে খুঁজেছিলে?

আবির মৃদু হেসে বলল,

তোমাকে খুঁজতে হলে কোথায় খুঁজব, সেটাই তো জানতাম না।

আমার কথা মনে পড়ত?

প্রতিদিন।

এখনও?

আবির চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে বলল,

কিছু প্রশ্নের উত্তর বদলায় না।

নাবিলা চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

আমার বিয়ে হয়েছিল।

আবিরের আঙুল কাপের ওপর থেমে গেল।

হয়েছিল?

হ্যাঁ।

এখন?

নাবিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

টেকেনি।

আবির আর কোনো প্রশ্ন করল না।

নাবিলা নিজেই বলল,

কিছু সম্পর্কে মানুষ থাকে, কিন্তু ভালোবাসা থাকে না। আবার কিছু ভালোবাসা থাকে, কিন্তু মানুষ দুজন একসঙ্গে থাকতে পারে না।

আবির ধীরে বলল,

আমাদেরটা কোনটা ছিল?

নাবিলা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

আমাদেরটা ছিল—থাকার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু থাকার সুযোগ ছিল না।

সেদিন তারা অনেকক্ষণ কথা বলেছিল।

পুরোনো স্মৃতি নিয়ে।

কে কতটা কেঁদেছিল, সেটা নিয়ে নয়।

কে কাকে বেশি ভালোবাসত, সেটাও নয়।

শুধু সেইসব ছোট ছোট মুহূর্ত নিয়ে, যেগুলো এত বছর পরও তাদের মনে একই রকম জীবন্ত।

চায়ের কাপ শেষ হয়ে গেল।

বিকেল সন্ধ্যায় ঢলে পড়ল।

নাবিলা উঠে দাঁড়াল।

তারপর হঠাৎ বলল,

আবির?

হুম?

কখনো যদি আবার তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়?

আবির মৃদু হেসে বলল,

তাহলে?

তখন কি আমার সঙ্গে এক কাপ চা খাবে?

আবির তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

তুমি ডাকলে এক কাপ নয়, সারাজীবন বসে থাকতে পারি।

নাবিলা হাসল।

কিন্তু সেই হাসির ভেতরে কেমন একটা বিষণ্ণতা ছিল।

সে চলে গেল।

আবির অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর আরও কয়েক মাস কেটে গেল।

নাবিলা আর আসেনি।

আবির মাঝে মাঝে একই চায়ের দোকানে বসে থাকে।

দু'কাপ চা অর্ডার করে না।

শুধু এক কাপ।

কারণ সে জানে—

সব অপেক্ষার শেষ দেখা দিয়ে হয় না।

কিছু মানুষ ফিরে আসে শুধু মনে করিয়ে দিতে—

তোমাদের ভালোবাসা মিথ্যে ছিল না।

শুধু সময়টা তোমাদের পক্ষে ছিল না।

একদিন সন্ধ্যায় আবির নদীর ঘাটে বসেছিল।

আকাশে তখন শেষ আলো।

পদ্মার ওপারে ধীরে ধীরে অন্ধকার নামছে।

হঠাৎ তার ফোনে একটা মেসেজ এল।

নাবিলা।

মাত্র কয়েকটা শব্দ—

কখনো যদি আমার শহরে কিংবা তোমার শহরে আবার দেখা হয়ে যায়, আমাকে ডাকবে তো?

আবির অনেকক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর লিখল—

তুমি সামনে দাঁড়ালে তোমাকে না চেনার ভান করার মতো নিষ্ঠুরতা আমার কোনোদিন ছিল না।

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—

তাহলে একদিন এক কাপ চা তোমার কাছে পাওনা রইল।

আবির লিখল—

চা ঠান্ডা হয়ে গেলেও অপেক্ষা করব।

তারপর আর কোনো উত্তর এল না।

কিন্তু সেদিন অনেকদিন পর আবিরের মনে হলো—

কিছু অপূর্ণতা মানুষকে কাঁদায় ঠিকই,

তবু সেই অপূর্ণতার ভেতরেও একটা অদ্ভুত শান্তি থাকে।

কারণ সে অন্তত জানে—

তার ভালোবাসা একা ছিল না।

নাবিলাও একদিন তাকে ভালোবেসেছিল।

শুধু দুজনের চাওয়ার মাঝখানে জীবন এসে দাঁড়িয়েছিল।

আর জীবন কখনো কখনো এমন নির্মম—

সে মানুষকে তার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মানুষটির সামনে এনে দাঁড় করায়,

কিন্তু হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁতে দেয় না।

চর হাজীগঞ্জের সেই পুরোনো নদীর ঘাট আজও আছে।

সন্ধ্যা নামলে সেখানে বাতাস আসে।

নৌকা যায়।

চায়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠে।

আর আবির মাঝে মাঝে একা বসে থাকে।

হয়তো নাবিলা কোনোদিন আবার আসবে।

হয়তো আসবে না।

তবু তার মনে একটা চাওয়া এখনও বেঁচে আছে—

কোনো এক অচেনা বিকেলে, হঠাৎ যদি নাবিলা সামনে এসে দাঁড়ায়, আবির যেন অন্তত তাকে এক কাপ চা খাওয়াতে পারে।

কথা খুব বেশি দরকার নেই।

শুধু পাশাপাশি বসে কিছুক্ষণ নীরব থাকা যাবে।