প্রথম দেখায় প্রেম—কথাটার প্রতি অর্ণবের কোনো দিন বিশ্বাস ছিল না।

তার ধারণা ছিল, মানুষ প্রথমে সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়, তারপর সেই আকর্ষণের নাম দেয় ভালোবাসা। অথচ ভালোবাসা তো এত সহজ কিছু নয়। কাউকে ভালোবাসতে হলে তার চোখের রং জানার চেয়ে বেশি জরুরি তার মন খারাপের কারণ জানা। তার হাসির সৌন্দর্য দেখার চেয়ে বেশি জরুরি, কান্নার সময় সে কেন চুপ করে থাকে, তা বুঝতে পারা।

অর্ণব বিশ্বাস করত, ভালোবাসা জন্ম নেয় ধীরে ধীরে—কথার ভেতর, অভিমানের আড়ালে, অপেক্ষার দীর্ঘ সময়ে। কারও সঙ্গে কথা বলতে বলতে একদিন যখন তার অনুপস্থিতিও উপস্থিতির মতো অনুভব হয়, তখনই হয়তো ভালোবাসার শুরু।

অর্ণব নিজে ছিল খুব শান্ত স্বভাবের মানুষ। তার পৃথিবীটা ছিল ছোট। একটা ঘর, জানালার পাশে কাঠের বুকশেলফ, কয়েকটি পুরোনো ডায়েরি, আর বইয়ের পাতায় জমিয়ে রাখা অসংখ্য বিকেল।

বই পড়তে পড়তে সে কখনো কখনো এমন এক জগতে চলে যেত, যেখানে মানুষ চিঠির জন্য অপেক্ষা করে, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে প্রিয় মানুষের ফেরার পথ দেখে, কিংবা কাউকে না পেয়েও সারাজীবন ভালোবেসে যায়।

অর্ণব এসব গল্প পড়ত। মুগ্ধ হতো। তারপর বই বন্ধ করে নিজেকে বলত, বাস্তব জীবন উপন্যাস নয়।

বাস্তব জীবনে কেউ কারও জন্য সারারাত জেগে থাকে না। কেউ একটা ছোট্ট মেসেজের অপেক্ষায় বারবার ফোনের পর্দা দেখে না। কেউ এমন একজনকে ভালোবেসে ফেলে না, যাকে কোনো দিন সামনাসামনি দেখেনি।

অন্তত অর্ণব তা-ই ভাবত।

তারপর একদিন ফেসবুকের নীল পর্দায় একটি মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো।

মেয়েটির নাম মেহের।

কিন্তু অর্ণবের কাছে সে শুধু মেহের ছিল না। মেয়েটির নাম জানার পরও অর্ণব মনে মনে তাকে ডাকত—অপ্সরা।

নামটা সে নিজেই দিয়েছিল।

কেন দিয়েছিল, তা অর্ণব নিজেও ঠিক জানত না। হয়তো মেয়েটির মধ্যে এমন একটা দূরত্ব ছিল, যা তাকে কাছে টানত। হয়তো তার কথার মধ্যে এমন এক কোমলতা ছিল, যা অর্ণবের নিঃসঙ্গ দুপুরগুলোকে অদ্ভুতভাবে সুন্দর করে তুলত।

মেহেরের প্রোফাইলে খুব বেশি ছবি ছিল না। কখনো পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা অবয়ব, কখনো নদীর ধারে উড়তে থাকা ওড়না, কখনো মেঘে ঢাকা আকাশ।

মুখটা স্পষ্ট দেখা যেত না।

অর্ণব কখনো জানতে চায়নি, কেন মেয়েটি নিজের ছবি প্রকাশ করতে চায় না। সে শুধু ছবিগুলোর নিচে লেখা কথাগুলো পড়ত। মনে হতো, ছবির চেয়ে ক্যাপশনগুলোতেই মেয়েটি বেশি করে নিজের পরিচয় রেখে যায়।

একদিন মেহের পাহাড়ের একটা ছবি পোস্ট করল। চারদিকে মেঘ, পাহাড়ের গায়ে নেমে এসেছে কুয়াশা।

অর্ণব মন্তব্য করল,

— জায়গাটা কোথায়?

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল,

— এমন একটা জায়গা, যেখানে গেলে নিজের ভেতরের শব্দগুলো একটু কম শোনা যায়।

অর্ণব কথাটা পড়ে থমকে গেল।

তার মনে হলো, এই মেয়েটি বুঝি জানে—মানুষের ভেতরেও কখনো কখনো ভীষণ শব্দ হয়।

সে লিখল,

— নিজের ভেতরের শব্দগুলো কি কখনো থামে?

মেহের উত্তর দিল,

— পুরোপুরি থামে না। তবে কখনো কখনো এমন কাউকে পাওয়া যায়, যার সঙ্গে কথা বললে শব্দগুলো আর বিরক্ত করে না।

অর্ণব অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

কেন জানি না, কথাটা তার বুকের ভেতর গিয়ে আটকে গেল।

সে জানত না, এই সাধারণ কথোপকথনের মধ্যেই তার জীবনের একটা অসমাপ্ত গল্পের প্রথম লাইনটি লেখা হয়ে গেছে।


প্রথম দিন তারা কথা বলেছিল কয়েক মিনিট।

দ্বিতীয় দিন কথা হলো একটু বেশি।

তৃতীয় দিন মেহের নিজে থেকেই অর্ণবকে একটা ছবি পাঠাল—বিকেলের আকাশ। ছবির এক কোণে মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো বেরিয়ে এসেছে।

মেহের লিখেছিল,

— আজকের আকাশটা সুন্দর, তাই না?

অর্ণব উত্তর দিয়েছিল,

— সুন্দর। তবে ছবিতে যতটা সুন্দর, বাস্তবে হয়তো তার চেয়েও বেশি।

মেহের লিখেছিল,

— তুমি সবকিছু এত গভীরভাবে ভাবো কেন?

অর্ণব হেসে ফেলেছিল।

সে লিখল,

— জানি না। হয়তো সহজভাবে ভাবতে শিখিনি।

মেহের উত্তর দিয়েছিল,

— তাহলে একদিন তোমাকে কোথাও নিয়ে যাব। এমন একটা জায়গায়, যেখানে বসে শুধু আকাশ দেখবে। কোনো গভীর কথা বলা যাবে না।

অর্ণবের বুকের ভেতর কেমন যেন হলো।

কথাটা হয়তো মেহের মজা করে বলেছিল। হয়তো কথার কথা। কিন্তু অর্ণবের কাছে সেটা একটা ছোট্ট স্বপ্ন হয়ে রইল।

সে মনে মনে ভাবল, সত্যিই যদি কোনো দিন এমন হতো!

একটা বিকেল। নদীর ধারে নির্জন কোনো জায়গা। পাশে মেহের বসে আছে। দুজনের হাতে চায়ের কাপ। মেহের আকাশ দেখছে, আর অর্ণব আকাশের দিকে তাকানোর ভান করে আড়চোখে মেয়েটিকে দেখছে।

তারপর মেহের হঠাৎ জিজ্ঞেস করছে,

— কী দেখছ?

অর্ণব বলছে,

— আকাশ।

মেহের বিশ্বাস না করে হাসছে।

অর্ণবও হাসছে।

কত সামান্য একটা কল্পনা। অথচ অর্ণবের কাছে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে সুখী হওয়ার জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু দরকার নেই।

দিন গড়িয়ে রাত হলো। রাত গড়িয়ে আরেকটা দিন।

মাত্র দশ দিন।

ক্যালেন্ডারের পাতায় দশ দিন খুব ছোট সময়। কিন্তু অর্ণবের জীবনে এই দশ দিন যেন এক অদ্ভুত ঋতু নিয়ে এল। সে বুঝতে পারল, সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নেওয়ার একটা নতুন কারণ তৈরি হয়েছে। রাতে ঘুমানোর আগে কারও একটা মেসেজের অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করছে।

মেহেরের সঙ্গে কথা বলার সময় সে ঘড়ি দেখত না। কিন্তু কথা শেষ হলে সময়ের দিকে তাকাত। মনে হতো, এত দ্রুত সময় চলে গেল কেন?

একদিন মেহের বলল,

— জানো, আমি কিন্তু খুব বেশি কথা বলতে পছন্দ করি না।

অর্ণব লিখল,

— অথচ আমার সঙ্গে তো বেশ কথা বলো।

মেহের উত্তর দিল,

— তোমার সঙ্গে কথা বলতে আলাদা লাগে।

অর্ণব বাক্যটা বারবার পড়ল।

তারপর ফোনটা বুকের কাছে রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

মানুষের জীবনে কিছু বাক্য থাকে, যেগুলোর কোনো বিশেষ অর্থ নাও থাকতে পারে। কিন্তু যাকে বলা হয়, তার কাছে সেই বাক্যটাই হয়ে ওঠে সারাদিনের সবচেয়ে সুন্দর ঘটনা।

মেহের হয়তো কথাটা লিখে ভুলে গিয়েছিল।

অর্ণব ভুলতে পারেনি।

সেদিন রাতে ডায়েরির পাতায় সে লিখেছিল—

আজ একজন মানুষ বলল, আমার সঙ্গে কথা বলতে তার আলাদা লাগে। পৃথিবীর কাছে কথাটা খুব সাধারণ। কিন্তু আমার কাছে মনে হলো, এত দিনের নিঃসঙ্গ জীবনে কেউ যেন নিঃশব্দে একটা জানালা খুলে দিয়েছে।

অর্ণব তখনও জানত না, সব জানালা দিয়ে আলো আসে না। কিছু জানালা দিয়ে মানুষ শুধু দূরের আকাশ দেখতে পায়।

আর সেই আকাশকে ছুঁতে গিয়ে একসময় তার নিজের হাতই ক্লান্ত হয়ে যায়।


অর্ণব আর মেহের ছিল দুই মেরুর মানুষ।

অর্ণবের কাছে বই ছিল আশ্রয়, মেহেরের কাছে ভ্রমণ। অর্ণব ছুটির দিনে ঘরে বসে উপন্যাস পড়তে ভালোবাসত। মেহের ছুটির দিনে কোথাও না কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করত।

অর্ণব কোনো কথা বলার আগে অনেকবার ভাবত। মেহের সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারত। অর্ণবের ভালো লাগত নির্জনতা, মেহেরের ভালো লাগত পরিচিত মানুষের ভিড়।

তবু তাদের কথোপকথনের মধ্যে একটা অদ্ভুত সৌন্দর্য ছিল।

মেহের তার ভ্রমণের গল্প বলত। কোনো পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বৃষ্টি নেমে আসা, অচেনা শহরে রাস্তা হারিয়ে ফেলা, কিংবা নদীর ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা।

অর্ণব মন দিয়ে শুনত।

সে নিজে খুব বেশি কোথাও যেত না। তবু মেহেরের গল্প শুনতে শুনতে তার মনে হতো, সে যেন মেয়েটির সঙ্গে সেই পথগুলোতে হাঁটছে।

একদিন মেহের জিজ্ঞেস করল,

— তুমি কখনো কাউকে ভালোবেসেছ?

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লিখল,

— না। অন্তত এমনভাবে নয়, যেভাবে মানুষ ভালোবাসার গল্প বলে।

— তাহলে ভালোবাসা নিয়ে এত কথা জানো কীভাবে?

— বই পড়ে।

— বইয়ের ভালোবাসা আর বাস্তবের ভালোবাসা এক নয়, অর্ণব।

অর্ণব উত্তর দিল,

— জানি। বইয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত একে অপরকে খুঁজে পায়। বাস্তবে হয়তো খুঁজে পেলেও একসঙ্গে থাকা হয় না।

মেহের অনেকক্ষণ কোনো উত্তর দিল না।

তারপর লিখল,

— তুমি খুব বিষণ্ন কথা বলো।

অর্ণব হেসে লিখল,

— আমি বিষণ্ন নই। শুধু একটু বেশি ভাবি।

মেহের লিখল,

— একটু কম ভেবো। জীবনটা উপভোগ করো।

অর্ণব উত্তর দিল না।

সে মনে মনে ভাবল, তুমি যদি জানতে, তোমার সঙ্গে কথা বলার পর থেকেই জীবনটা একটু বেশি উপভোগ করতে ইচ্ছে করে।

কিন্তু সে কথাটা বলতে পারল না।

কারণ অর্ণবের ভয় ছিল, অনুভূতি প্রকাশ করলে মেহের হয়তো দূরে সরে যাবে।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যে ভয় থেকে সে কথাটা বলতে পারেনি, শেষ পর্যন্ত সেই দূরত্বই একদিন সত্যি হয়ে দাঁড়াল।


অর্ণবের কাছে মেহেরের কোনো ছবি ছিল না।

তবু সে মেয়েটিকে কল্পনা করত।

কল্পনায় মেহেরের চোখ দুটো ছিল শান্ত। কথা বলার সময় হয়তো একটু হাসত। মন খারাপ হলে চুপ করে থাকত। আর খুব আনন্দ পেলে এমনভাবে হাসত, যেন তার হাসির শব্দে চারপাশের বিষণ্নতা কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যায়।

অর্ণব জানত, এসবের কোনো নিশ্চয়তা নেই।

মেয়েটি বাস্তবে এমন কি না, তা সে জানে না।

তবু কল্পনা করতে তার ভালো লাগত।

কখনো সে ভাবত, মেহেরের সঙ্গে দেখা হলে প্রথমে কী বলবে।

হয়তো বলবে,

— তোমাকে দেখে আমার কেমন লাগছে, জানো?

মেহের জিজ্ঞেস করবে,

— কেমন?

অর্ণব হয়তো লজ্জা পেয়ে বলবে,

— মনে হচ্ছে, এত দিন ধরে যার সঙ্গে কথা বলেছি, তাকে আজ প্রথমবার চিনতে পারছি।

তারপর দুজনেই হাসবে।

অর্ণবের কল্পনায় তাদের প্রথম দেখা হতো কোনো নদীর ধারে। বিকেলবেলা। হালকা বাতাস বইছে। নদীর ওপারে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। মেহের কালো শাড়ি পরে এসেছে, কপালে ছোট্ট কালো টিপ। চুলের কিছু অংশ বাতাসে উড়ছে।

অর্ণব হয়তো প্রথমে কথা খুঁজে পাবে না।

মেহের বলবে,

— কী হলো? এত চুপ কেন?

অর্ণব বলবে,

— অনলাইনে তো অনেক কথা বলেছি। সামনে এসে সব কথা কোথায় যেন হারিয়ে গেল।

মেহের হেসে ফেলবে।

অর্ণবের কাছে সেই হাসিটুকুই হবে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দ।

কিন্তু কল্পনার পৃথিবীতে মানুষ যা চায়, বাস্তবের পৃথিবী তা দিতে বাধ্য নয়।

মেহের নিজের ছবি প্রকাশ করতে স্বচ্ছন্দ ছিল না। অর্ণব বিষয়টি সম্মান করত। সে কখনো জোর করেনি। তবু মনে মনে একটা আশা ছিল—হয়তো কোনো দিন মেয়েটি নিজে থেকেই তার কাছে একটু বেশি পরিচিত হয়ে উঠবে।

হয়তো একদিন বলবে,

— অর্ণব, তোমাকে একটা কথা বলব?

অর্ণব বলবে,

— বলো।

মেহের বললো,

— তোমার সঙ্গে কথা বলতে আমার ভালো লাগে।

অর্ণব তখন হয়তো কিছু বলবে না। শুধু হাসবে।

কিন্তু বাস্তবের মেহের কী ভাবছিল, অর্ণব তা জানত না। সে শুধু নিজের মনের মধ্যে একটা সুন্দর গল্প লিখে যাচ্ছিল।

একটা গল্প, যার প্রতিটি পাতায় মেহের ছিল।

শুধু শেষ পাতাটা ফাঁকা।


একদিন অর্ণব বুঝতে পারল, সে মেহেরকে ভালোবেসে ফেলেছে।

কোনো বিশেষ ঘটনা ঘটেনি। কোনো নাটকীয় মুহূর্ত ছিল না। মেহের তাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি, কোনো বিশেষ কথা বলেনি।

শুধু একদিন রাতে মেহেরের মেসেজের অপেক্ষা করতে করতে অর্ণবের মনে হলো, এই মানুষটির সঙ্গে কথা না হলে তার দিনটা যেন ঠিক পূর্ণ হয় না।

সে ফোনের পর্দা জ্বালিয়ে দেখল।

কোনো নতুন মেসেজ নেই।

আবার কিছুক্ষণ পর দেখল।

তবু নেই।

অর্ণব নিজেকে বোঝাল, মেহের হয়তো ব্যস্ত। তার নিজের জীবন আছে। সব সময় উত্তর দেওয়ার সুযোগ হয়তো পায় না।

কিন্তু মন সব সময় যুক্তির কথা শোনে না।

রাত বাড়তে লাগল। ঘরের বাতি নিভিয়ে বিছানায় শুয়েও অর্ণব বারবার ফোন দেখছিল।

হঠাৎ মেহেরের মেসেজ এল।

— ঘুমাওনি?

অর্ণবের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

সে লিখল,

— না। তুমি?

— আমিও না।

— কী করছ?

— কিছু না। তোমার কথা মনে হলো, তাই মেসেজ দিলাম।

অর্ণব যেন কিছুক্ষণের জন্য নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

তার মনে হলো, এই রাতটা বুঝি আর কোনো দিন শেষ না হোক।

সে লিখতে চাইল, আমারও তোমার কথা মনে পড়ছিল।

তারপর লিখল, অনেকক্ষণ ধরে তোমার অপেক্ষা করছিলাম।

আবার মুছে দিল।

শেষ পর্যন্ত শুধু লিখল,

— ভালো লাগল।

মেহের লিখল,

— কী ভালো লাগল?

অর্ণব উত্তর দিল,

— তুমি মেসেজ দিয়েছ, এটাই।

মেহের একটি হাসির ইমোজি পাঠাল।

তারপর তারা অনেকক্ষণ কথা বলল।

সেই রাতে ঘুমানোর আগে অর্ণব ডায়েরিতে লিখেছিল—

ভালোবাসা হয়তো এভাবেই শুরু হয়। কেউ এসে বলে না, আমি তোমার জীবনে বিশেষ একজন হতে চাই। শুধু একদিন তার একটা মেসেজে তোমার মন ভালো হয়ে যায়। তারপর তুমি অপেক্ষা করতে শেখো। তার ব্যস্ততাকে বুঝতে শেখো। তার ছোট্ট কথার ভেতর লুকিয়ে থাকা আনন্দ খুঁজে পাও। আর একসময় বুঝতে পারো, তোমার দিনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটি এখন আর তোমার নিজের হাতে নেই।

অর্ণব জানত না, এই অপেক্ষাই একদিন তার সবচেয়ে বড় কষ্ট হয়ে উঠবে।

কারণ অপেক্ষার সৌন্দর্য তখনই থাকে, যখন কোথাও ফিরে আসার একটা সম্ভাবনা থাকে।

আর সম্ভাবনাহীন অপেক্ষা?

সেটা ধীরে ধীরে মানুষকে নিজের ভেতরেই একা করে দেয়।


দুই মাস ধরে অর্ণব নিজের অনুভূতিকে লুকিয়ে রেখেছিল।

সে জানত না, মেহের তাকে কীভাবে দেখে। একজন বন্ধু হিসেবে? পরিচিত মানুষ হিসেবে? নাকি এমন একজন হিসেবে, যার সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা বলা যায়?

এই অনিশ্চয়তা তাকে অস্থির করে তুলছিল।

একদিন অনেক ভেবেচিন্তে সে মেহেরকে লিখল,

— একটা কথা বলব?

মেহের উত্তর দিল,

— বলো।

অর্ণব দীর্ঘ একটা মেসেজ লিখল। নিজের অনুভূতি, অপেক্ষা, মেহেরের সঙ্গে কথা বলার আনন্দ—সবকিছু বলতে চাইল। তারপর মনে হলো, এত কথা লিখলে মেহের বিরক্ত হতে পারে।

সে মেসেজটা মুছে ছোট করে লিখল,

— তোমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে তুমি আমার কাছে খুব বিশেষ একজন হয়ে গেছ। কখন যে তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি, বুঝতে পারিনি। তোমার কাছে কোনো দাবি নেই। শুধু চেয়েছিলাম, তুমি আমার অনুভূতিটা জানো।

মেসেজ পাঠিয়ে অর্ণব ফোনটা নামিয়ে রাখল।

তারপর আবার হাতে নিল।

মেহের মেসেজ দেখেছে।

কিন্তু উত্তর দেয়নি।

দশ মিনিট গেল।

আধঘণ্টা গেল।

অর্ণবের মনে হলো, হয়তো মেয়েটি কী বলবে বুঝতে পারছে না। হয়তো তারও কিছু অনুভূতি আছে, যা প্রকাশ করতে সময় লাগছে।

পরদিন মেহের উত্তর দিল,

— অর্ণব, আমি এসব নিয়ে এখন ভাবতে চাই না। আমাকে একটু সময় দাও।

অর্ণবের বুকের ভেতর একটা আশার আলো জ্বলে উঠল।

সে ভাবল, সময় তো দেওয়া যায়।

ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তবে অপেক্ষা করতে অসুবিধা কী?

সে মেহেরকে বলল,

— ঠিক আছে। আমি তোমাকে কোনো তাড়া দেব না।

এরপর অর্ণব অপেক্ষা করতে লাগল।

একটা সপ্তাহ।

দুই সপ্তাহ।

এক মাস।

মেহেরের সঙ্গে কথা হতো, কিন্তু আগের মতো নয়। কখনো সে হাসত, কখনো নিজের ভ্রমণের গল্প বলত, কখনো অর্ণবের কোনো কথা পড়ে শুধু একটা ছোট্ট উত্তর দিত।

অর্ণব প্রতিটি ছোট্ট কথার মধ্যে অর্থ খুঁজত।

মেহের ভালোভাবে কথা বললে মনে হতো, হয়তো সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে।

মেহের চুপ থাকলে মনে হতো, হয়তো সে আবার দূরে সরে যাচ্ছে।

অর্ণব বুঝতে পারেনি, অপেক্ষা করতে করতে সে নিজের সুখের দায়িত্বটুকুও অন্য একজন মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে।

মেহেরের একটি মেসেজে তার দিন ভালো হয়ে যেত। মেহেরের নীরবতায় তার রাত দীর্ঘ হয়ে উঠত।

এভাবে ভালোবাসা একসময় আনন্দের পাশাপাশি ভয়েরও নাম হয়ে গেল।


মেহেরের সঙ্গে অর্ণবের যোগাযোগ ধীরে ধীরে কমতে লাগল।

আগে মেহের নিজে থেকে কথা শুরু করত। এখন বেশির ভাগ সময় অর্ণবকেই মেসেজ দিতে হতো। আগে কথার মধ্যে হাসি থাকত, এখন উত্তরগুলো ছোট হয়ে আসত।

অর্ণব বুঝতে পারত, কিছু একটা বদলে গেছে।

তবু সে কথা বলার চেষ্টা করত।

মেহের কী করছে, দিন কেমন কাটল, কোথাও ঘুরতে গেল কি না—এসব জানতে চাইত। কখনো নিজের মনের কথা বলত। কখনো একই বিষয় নিয়ে বারবার কথা বলে ফেলত।

অর্ণবের একটা অভ্যাস ছিল, অনুভূতি বোঝাতে গিয়ে সে অনেক কথা বলত। একটা ছোট্ট বিষয়কেও ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দীর্ঘ করে ফেলত। সে ভাবত, বেশি করে বুঝিয়ে বললে হয়তো মানুষ তার মনের কথাটা বুঝতে পারবে।

কিন্তু সব মানুষ একইভাবে কথা শুনতে ভালোবাসে না।

একদিন মেহের বিরক্ত হয়ে বলল,

— অর্ণব, তুমি একই কথা বারবার বলো কেন?

অর্ণব অবাক হলো।

— কোন কথা?

— সবকিছু এত ব্যাখ্যা করার কী আছে? তুমি একটা কথা বলতে গিয়ে অনেক দূর চলে যাও। আমি সহজভাবে কথা বলতে চাই।

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর লিখল,

— আমি কি তোমাকে বিরক্ত করি?

মেহের উত্তর দিল,

— সত্যি বলতে, ইদানীং করি।

অর্ণবের মনে হলো, কেউ যেন খুব নীরবে তার বুকের ভেতর একটা দরজা বন্ধ করে দিল।

সে লিখল,

— আমি চেষ্টা করব নিজেকে ঠিক করতে।

মেহের বলল,

— নিজেকে আমার জন্য বদলানোর দরকার নেই। আমাদের চিন্তাভাবনা মেলে না। তুমি যেভাবে ভাবো, আমি সেভাবে ভাবি না।

অর্ণবের চোখ আটকে রইল বাক্যটার ওপর।

নিজেকে আমার জন্য বদলানোর দরকার নেই।

কথাটা হয়তো মেহের খুব সাধারণভাবে বলেছিল। কিন্তু অর্ণবের মনে হলো, সে যেন এত দিন ধরে যে মানুষটির কাছে নিজের মনের দরজা খুলে রেখেছিল, সেই মানুষটিই এখন তাকে জানিয়ে দিচ্ছে—এই ঘরে তোমার জন্য কোনো জায়গা নেই।

অর্ণব লিখল,

— আমি শুধু চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে একটু বুঝতে চেষ্টা করো।

মেহের উত্তর দিল,

— সবাইকে বুঝতে হবে, এমন কোনো কথা নেই, অর্ণব। আমি তোমার অনুভূতিকে অসম্মান করছি না। কিন্তু আমি তোমাকে সেইভাবে ভাবি না।

অর্ণব আর কিছু লিখল না।

সেদিন সে প্রথমবার বুঝতে পারল, দুজন মানুষের মধ্যে অনুভূতির গভীরতা সমান না হলে একজনের কাছে যে কথা ভালোবাসার প্রকাশ, অন্যজনের কাছে সেটাই হয়ে উঠতে পারে অস্বস্তি।

সে মেহেরকে দোষ দিতে চাইল না।

তবু তার খুব কষ্ট হলো।

কারণ সে তো কখনো মেহেরকে দামি কিছু দিতে চায়নি। কোনো প্রতিশ্রুতি আদায় করতে চায়নি। সে শুধু চেয়েছিল, মেয়েটি তার সঙ্গে কথা বলতে ভালো অনুভব করুক।

কিন্তু চাওয়া আর পাওয়া এক জিনিস নয়।

অর্ণব সেটা বুঝল, যদিও বুঝতে গিয়ে তার ভেতরে অনেক কিছু ভেঙে গেল।


সেদিন রাতে মেহের আবার মেসেজ দিল।

— অর্ণব, একটা কথা বলব?

অর্ণব লিখল,

— বলো।

— আমার মনে হয়, আমাদের আর যোগাযোগ না রাখাই ভালো।

অর্ণব কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, সে যেন এই বাক্যটা অনেক দিন ধরেই শুনতে পাচ্ছিল। শুধু আজ মেহের সেটাকে শব্দে লিখে দিল।

সে লিখল,

— আমার কোনো কথায় কি তুমি খুব কষ্ট পেয়েছ?

মেহের উত্তর দিল,

— না। তুমি খারাপ মানুষ নও। কিন্তু তোমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমি অস্বস্তি বোধ করি। তুমি আমাকে অনেক গুরুত্ব দাও, কিন্তু আমি সেইভাবে কিছু অনুভব করি না। আমি চাই না তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করো।

অর্ণবের মনে হলো, পৃথিবীর সব শব্দ যেন এক মুহূর্তে থেমে গেছে।

সে অনেক কিছু লিখতে চেয়েছিল।

বলতে চেয়েছিল, আমি তোমাকে কোনো দিন বাধ্য করতে চাইনি।

বলতে চেয়েছিল, তোমার সঙ্গে কথা বলাটা আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা তুমি জানো না।

বলতে চেয়েছিল, আমি তোমাকে ভালোবাসি বলে তোমার কাছ থেকে ভালোবাসা দাবি করছি না। শুধু চেয়েছিলাম, আমার অনুভূতিটাকে একটু কোমলভাবে বুঝতে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই বলল না।

কারণ কিছু কথা এমন সময় বলা হয়, যখন সেগুলো শোনার মতো মন আর অন্য মানুষের থাকে না।

অর্ণব শুধু লিখল,

— ঠিক আছে, মেহের। আমি তোমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। ভালো থেকো।

মেহের লিখল,

— তুমিও ভালো থেকো।

কথোপকথন শেষ।

অর্ণব ফোনটা টেবিলে রেখে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

বাইরে রাত। দূরের রাস্তায় দু-একটা গাড়ি চলছে। একটা কুকুর রাস্তার পাশে বসে আছে। পাশের বাড়ির জানালায় আলো জ্বলছে।

সবকিছু স্বাভাবিক।

শুধু অর্ণবের ভেতরটা আর স্বাভাবিক নেই।

সে বুঝতে পারছিল না, কেন এত কষ্ট হচ্ছে। মেয়েটির সঙ্গে তো তার কখনো দেখা হয়নি। কোনো দিন পাশাপাশি বসে চা খাওয়া হয়নি। কোনো বিকেলে একসঙ্গে হাঁটা হয়নি। কোনো হাত ধরে বলা হয়নি, ‘আমি আছি।’

তাহলে সে হারাল কী?

হয়তো একজন মানুষকে নয়।

হারাল সেই সম্ভাবনাটাকে, যেখানে সে কল্পনা করেছিল—একদিন মেহের তার পাশে বসবে, তার কথা শুনবে, তার অগোছালো ভাবনাগুলোর মধ্যে নিজের জন্য একটু জায়গা খুঁজে নেবে।

হারাল সেই বিকেলগুলো, যেগুলো কখনো আসেনি।

সেই কথোপকথনগুলো, যেগুলো কখনো শুরু হয়নি।

সেই ভবিষ্যৎ, যেটা বাস্তব হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল।

অর্ণবের চোখ ভিজে উঠল।

সে কাঁদল।

কিন্তু কান্নার মধ্যেও একটা কথা মনে রাখল—মেহেরকে আর মেসেজ দেওয়া যাবে না। তার সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।

ভালোবাসা যদি সত্যিই ভালোবাসা হয়, তবে সেখানে অন্য মানুষের ইচ্ছার জন্যও জায়গা থাকতে হয়।

সেই রাতে অর্ণব প্রথমবার বুঝল, কাউকে ছেড়ে দেওয়া আর কাউকে ভুলে যাওয়া এক জিনিস নয়।

কাউকে ছেড়ে দেওয়া যায় এক মুহূর্তে।

কিন্তু ভুলে যেতে কখনো কখনো একটা ঋতু পেরিয়ে যায়, কখনো কয়েক বছর, কখনো পুরো জীবন।


মেহেরের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হওয়ার কয়েক দিন পর অর্ণব এক রাতে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখল।

স্বপ্নে সে ছিল যমুনা নদীর মাঝখানে।

বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। নদীর পানি শান্ত। মাঝনদীতে একটা ছোট্ট নৌকা ভেসে চলেছে। চারপাশে নরম বাতাস, দূরের আকাশে জমে আছে কালচে মেঘ।

নৌকার এক প্রান্তে মেহের বসে আছে।

তার পরনে কালো শাড়ি, ফুলহাতা ব্লাউজ। কপালে ছোট্ট কালো টিপ। চুলগুলো বাতাসে আলতো করে উড়ছে। সে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে, যেন পানির ভেতর কোনো পুরোনো স্মৃতি খুঁজছে।

অর্ণব নৌকার অন্য প্রান্তে বসে তাকে দেখছিল।

কথা বলার সাহস হচ্ছিল না।

স্বপ্নের ভেতরেও তার মনে হচ্ছিল, মেহেরকে বিরক্ত করা উচিত নয়। মেয়েটি এত শান্তভাবে বসে আছে—যেন পৃথিবীর সব দুঃখ থেকে অনেক দূরে।

কিছুক্ষণ পর মেহের মুখ ফিরিয়ে তাকাল।

তাদের চোখাচোখি হলো।

অর্ণবের মনে হলো, মেহের তাকে চিনতে পেরেছে।

মেয়েটি মৃদু হেসে বলল,

— এত চুপ করে আছ কেন?

অর্ণব অবাক হয়ে গেল।

স্বপ্নের ভেতর সে কথা বলতে পারছে!

সে ধীরে বলল,

— তোমাকে দেখছি।

মেহের হাসল।

— আমাকে তো আগে কখনো দেখোনি। চিনবে কীভাবে?

অর্ণব উত্তর দিল,

— চেনার জন্য কি সব সময় চোখের প্রয়োজন হয়?

মেহের কিছু বলল না। শুধু নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।

ঠিক তখনই বৃষ্টি শুরু হলো।

প্রথমে কয়েক ফোঁটা। তারপর ধীরে ধীরে ঘন হয়ে এল। বৃষ্টির ফোঁটা নদীর পানিতে পড়ছে, নৌকার গায়ে পড়ছে, অর্ণবের মুখে এসে লাগছে।

অর্ণবের খুব ভালো লাগছিল।

তার মনে হচ্ছিল, এই বৃষ্টির মধ্যে সময় থেমে যাক। নৌকাটা যেন আর কোনো দিন তীরে না পৌঁছায়। মেহের যেন আর কোনো দিন উঠে চলে না যায়।

হঠাৎ আকাশ থেকে ঝরে পড়তে শুরু করল সাদা চালতা ফুলের পাপড়ি।

একটার পর একটা।

নৌকার ওপর, নদীর পানিতে, মেহেরের কালো শাড়ির ওপর।

সাদা পাপড়িগুলো কালো শাড়ির ওপর পড়ে এমন এক সৌন্দর্য তৈরি করছিল, যা অর্ণব আগে কখনো দেখেনি।

সে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।

তারপর মেহের ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

অর্ণব বলল,

— কোথায় যাচ্ছ?

মেহের মৃদু হেসে বলল,

— আমার তো যেতে হবে, অর্ণব।

— আবার আসবে?

মেহের উত্তর দিল না।

শুধু একবার পেছন ফিরে তাকাল।

তারপর কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেল।

অর্ণব উঠে দাঁড়িয়ে ডাকতে চাইল,

— অপ্সরা!

কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।

চারদিকে শুধু বৃষ্টি, নদী আর সাদা ফুলের পাপড়ি।

মেহের নেই।

অর্ণবের ঘুম ভেঙে গেল।

ঘরের ভেতর অন্ধকার। জানালার বাইরে রাতের বাতাস। সে বিছানায় উঠে বসে বুঝতে পারল, তার চোখ ভিজে গেছে।

কিছুক্ষণ পর সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

তার মনে হলো, মানুষ কখনো কখনো এমন কাউকে স্বপ্নে দেখে, যাকে বাস্তবে কোনো দিন ছুঁয়ে দেখা হয়নি। তবু স্বপ্নের মধ্যে সেই মানুষটি এতটা আপন হয়ে ওঠে যে, ঘুম ভাঙার পর তার অনুপস্থিতিও সত্যিকারের বিচ্ছেদের মতো কষ্ট দেয়।

অর্ণব সেদিন বুঝল, মেহেরকে সে শুধু একজন মানুষ হিসেবে ভালোবাসেনি। সে ভালোবেসেছিল মেহেরকে ঘিরে তৈরি হওয়া একটা অনুভূতিকে—যেখানে ছিল অপেক্ষা, কোমলতা, কিছু ছোট্ট কথার আনন্দ, আর একসঙ্গে ভবিষ্যৎ কল্পনা করার নীরব সাহস।

সে জানত, বাস্তবের মেহের তার কল্পনার মেহেরের মতো নয়। বাস্তবের মেহেরের নিজের পছন্দ আছে, নিজের সিদ্ধান্ত আছে। তার জীবনে অর্ণবের কোনো জায়গা না থাকলেও তাতে মেহেরের কোনো অপরাধ নেই।

তবু স্বপ্নের সেই কালো শাড়ি পরা মেয়েটিকে সে ভুলতে পারল না।

তার মনে হলো, মেহেরকে সে চালতা ফুলের মতো ভালোবেসেছিল।

নিঃশব্দে।

দূর থেকে।

কোনো দাবি ছাড়াই।


দিন পেরিয়ে সপ্তাহ হলো। সপ্তাহ পেরিয়ে মাস।

অর্ণব আর মেহেরকে মেসেজ দিল না। মেয়েটির প্রোফাইল চোখে পড়লে সে থেমে যেত, কিন্তু কথা শুরু করত না।

প্রথম দিকে খুব কষ্ট হতো।

রাতে ঘুমাতে গেলে মনে পড়ত, এই সময়ে হয়তো মেহের অনলাইনে আসত। সকালে ঘুম ভাঙলে মনে হতো, আজ হয়তো কোনো নতুন মেসেজ এসেছে।

তারপর ধীরে ধীরে অপেক্ষাটা কমে এল।

অর্ণব আবার বই পড়তে শুরু করল। নিজের ডায়েরিতে লিখতে লাগল। কখনো বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যেত। কখনো নদীর ধারে বসে থাকত।

তবু কিছু বিকেল ছিল, যখন হঠাৎ মেহেরের কথা মনে পড়ে যেত।

কোনো সুন্দর আকাশ দেখলে মনে হতো, মেহেরকে ছবিটা দেখালে ভালো হতো।

কোনো পাহাড়ের ছবি চোখে পড়লে মনে হতো, মেয়েটি নিশ্চয়ই জায়গাটা পছন্দ করত।

বৃষ্টির দিনে মনে হতো, মেহের হয়তো এখন কোথাও দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে।

অর্ণব বুঝতে পারল, কাউকে ভুলে যাওয়া মানে তার স্মৃতির প্রতিটি চিহ্ন মুছে ফেলা নয়। বরং স্মৃতিগুলোকে এমন একটা জায়গায় রেখে দেওয়া, যেখান থেকে তারা আর প্রতিদিন এসে বর্তমানকে ভেঙে দিতে পারে না।

একদিন সন্ধ্যায় সে ডায়েরি খুলে মেহেরের জন্য একটা চিঠি লিখল।

প্রিয় অপ্সরা,

জানো, তোমাকে আমি কোনো দিন সামনে থেকে দেখিনি। তোমার চোখের রং জানি না, তোমার হাসি কেমন, তা-ও জানি না। অথচ তোমাকে নিয়ে আমার মনে কতগুলো বিকেল জমে আছে!

কখনো মনে হয়, তুমি আমার পাশে বসে আছ। আমি বই পড়ছি, তুমি জানালার বাইরে তাকিয়ে আছ। হঠাৎ তুমি বলছ, ‘অর্ণব, চলো কোথাও ঘুরে আসি।’ আমি বই বন্ধ করে তোমার দিকে তাকাচ্ছি। তারপর আমরা দুজন বেরিয়ে পড়ছি—কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই, শুধু পাশাপাশি হাঁটার ইচ্ছে আছে।

জানি, এসব কখনো ঘটবে না। তবু কল্পনা করতে আমার ভালো লাগে। কারণ কল্পনার পৃথিবীতে তুমি কখনো আমাকে বিরক্ত বলে দূরে সরিয়ে দাও না। সেখানে তুমি আমার অগোছালো কথাগুলো শুনে হাসো, আমার মন খারাপ হলে চুপচাপ পাশে বসে থাকো।

কিন্তু বাস্তবের তুমি আলাদা। তোমার নিজের জীবন আছে, নিজের পছন্দ আছে। আমি তোমার সেই স্বাধীনতাকে সম্মান করি।

আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম, মেহের। কিন্তু ভালোবাসার নামে তোমার শান্তি নষ্ট করতে চাই না। তাই এই চিঠি তোমাকে পাঠাব না। তোমাকে আবার আমার অনুভূতির সামনে দাঁড় করাব না।

শুধু নিজের কাছে স্বীকার করে রাখলাম—তুমি আমার জীবনে খুব অল্প সময়ের জন্য এসেছিলে, অথচ সেই অল্প সময়টুকু আমার ভেতরে অনেক দিন ধরে আলো জ্বেলে রেখেছিল।

হয়তো একদিন তোমার কথা মনে পড়লে আর কষ্ট হবে না। হয়তো তোমার নাম শুনে বুকের ভেতরটা আর থমকে যাবে না। কিন্তু তোমাকে ঘিরে যে কোমল অনুভূতিটুকু তৈরি হয়েছিল, তাকে আমি অসম্মান করতে চাই না।

তুমি আমার হওনি, তাতে তোমার কোনো দোষ নেই। আমিও তোমার হতে পারিনি, তাতে আমার ভালোবাসা মিথ্যে হয়ে যায় না।

কোনো এক বৃষ্টির বিকেলে যদি চালতা ফুল ঝরে পড়তে দেখো, হয়তো আমার কথা মনে পড়বে না। তবু যদি এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়, পৃথিবীর কোথাও কেউ একদিন তোমাকে নীরবে খুব ভালোবেসেছিল—তাহলেই আমার গল্পের জন্য যথেষ্ট।

তুমি ভালো থেকো, অপ্সরা।

তোমার জীবনে এমন কেউ আসুক, যার সঙ্গে কথা বলতে তোমার ক্লান্তি লাগবে না। যে তোমার নীরবতাকে বুঝতে চেষ্টা করবে, তোমার হাসির কারণ হবে, আর তোমাকে কখনো নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বদলে যেতে বলবে না।

আর আমি? আমি আমার মতো করে বেঁচে থাকব। বই পড়ব, লিখব, বৃষ্টিতে ভিজব। একদিন হয়তো বুঝতে পারব, তোমাকে হারানো নয়—তোমাকে না পেয়েও নিজেকে হারিয়ে না ফেলাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

ভালো থেকো, মেহের।

—অর্ণব

চিঠিটা লেখা শেষ করে অর্ণব ডায়েরি বন্ধ করল।

তারপর জানালার বাইরে তাকাল।

আকাশে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। দূরের একটা বাড়ির ছাদে কেউ কাপড় তুলছে। রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে কয়েকজন মানুষ বসে গল্প করছে। একটা রিকশা ধীরে ধীরে চলে গেল।

পৃথিবী তার নিজের নিয়মে চলেছে।

অর্ণবও চলতে শিখছে।


অনেক দিন পর অর্ণব আবার নদীর ধারে গেল।

বিকেলের আলো পানির ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। বাতাসে হালকা শীতের আভাস। নদীর পাড়ে একটা পুরোনো গাছের নিচে বসে সে দূরের আকাশ দেখছিল।

আজ তার পাশে কেউ নেই।

তবু সে আর আগের মতো একাকিত্ব অনুভব করছিল না।

মেহেরের স্মৃতি তার মধ্যে আছে, কিন্তু সেই স্মৃতি এখন আর তার প্রতিটি মুহূর্ত দখল করে রাখে না। সে বুঝেছে, জীবনের সব গল্পের শেষ মিলন দিয়ে হয় না। কিছু গল্প শেষ হয় নীরবতায়, কিছু শেষ হয় একটা ছোট্ট বিদায়ে, আর কিছু গল্পের শেষ পাতায় শুধু একটা প্রশ্ন থেকে যায়।

অর্ণবের গল্পেও তাই।

সে জানে না, মেহের এখন কোথায়। হয়তো কোনো পাহাড়ি পথে হাঁটছে। হয়তো নদীর ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখছে। হয়তো তার জীবনে এমন কেউ এসেছে, যার সঙ্গে কথা বলতে তার ভালো লাগে। হয়তো সে নিজের মতো করেই সুখী।

অর্ণব এসব জানে না।

জানার প্রয়োজনও নেই।

সে শুধু চায়, মেয়েটি ভালো থাকুক।

তবু বুকের গভীরে একটা প্রশ্ন মাঝে মাঝে জেগে ওঠে—

যদি তাদের কথাগুলো আরেকটু সহজ হতো?

যদি অর্ণব নিজের অনুভূতিকে আরও সংযতভাবে প্রকাশ করতে পারত?

যদি মেহের তার মনের কথাগুলো আরেকটু বুঝতে চেষ্টা করত?

তাহলে কি তাদের গল্পটা অন্য রকম হতে পারত?

হয়তো।

আবার হয়তো না।

কিছু প্রশ্নের উত্তর মানুষ কোনো দিন পায় না। শুধু প্রশ্নগুলোকে সঙ্গে নিয়ে বেঁচে থাকতে শেখে।

অর্ণব নদীর দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,

অপ্সরা, তোমাকে কোনো দিন আমার হতে হবে না। আমার ভালোবাসার উত্তরও তোমাকে দিতে হবে না। তুমি শুধু তোমার মতো ভালো থেকো। আমি যে তোমাকে ভালোবেসেছিলাম, সেই ভালোবাসার বিনিময়ে তোমার কাছে কোনো ঋণ চাইব না।

বাতাস বয়ে গেল।

গাছের কয়েকটা পাতা ঝরে নদীর পানিতে পড়ল।

অর্ণব উঠে দাঁড়াল। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল শহরের দিকে।

তার সামনে এখনো অনেক পথ। অনেক সকাল, অনেক সন্ধ্যা, অনেক বইয়ের পাতা, অনেক মানুষের গল্প।

হয়তো একদিন সে আবার ভালোবাসবে। এমন কাউকে, যে তার সঙ্গে পাশাপাশি হাঁটতে চাইবে। যার কাছে তাকে নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে হবে না। যে তার অগোছালো কথাগুলো শুনে বিরক্ত না হয়ে বলবে, আচ্ছা, বলো, আমি শুনছি।

হয়তো সেই মানুষটির সঙ্গে অর্ণবের গল্পের শেষটা অন্য রকম হবে।

কিন্তু মেহের?

মেহের তার জীবনের একটা নীরব অধ্যায় হয়ে থাকবে।

একটা নাম, যেটা সে হয়তো কাউকে বলবে না।

একটা স্বপ্ন, যেটা সে আর বাস্তব করতে চাইবে না।

একটা চালতা ফুল, যেটা ঝরে পড়েছিল তার কল্পনার আকাশ থেকে।

অর্ণব হাঁটতে হাঁটতে একবার পেছনে তাকাল। নদীটা তখনও একইভাবে বয়ে চলেছে।

তার মনে হলো, কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে আমাদের সঙ্গে থেকে যাওয়ার জন্য নয়, আমাদের ভেতরের অচেনা মানুষটাকে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য।

মেহের এসেছিল অল্প কিছু দিনের কথোপকথন হয়ে।

কিন্তু সেই অল্প সময়ের মধ্যেই অর্ণব বুঝেছিল, তার বুকের ভেতরেও ভালোবাসার জন্য একটা জায়গা ছিল—যে জায়গার অস্তিত্ব সে নিজেই জানত না।

সেই জায়গাটা এখনো আছে।

শুধু সেখানে কেউ নেই।

অর্ণব মনে মনে একবার ডাকল—

অপ্সরা…

তারপর চুপ করে গেল।

কারণ সব ভালোবাসার গল্পে শেষ পর্যন্ত দুজন মানুষ থাকে না।

কিছু গল্পে একজন মানুষ থাকে, আরেকজনের স্মৃতি থাকে, আর থাকে একটা প্রশ্ন—যার উত্তর কোনো দিন মেলে না।

সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এল। অর্ণব শহরের ভিড়ে মিশে গেল। তার হাতে কোনো চিঠি নেই, চোখে কোনো অপেক্ষা নেই। তবু বুকের খুব গভীরে সে জানে, একটা নাম সে কোনো দিন পুরোপুরি ভুলতে পারবে না।

মেহের।

যাকে সে কখনো দেখেনি, অথচ যার জন্য তার মনে একদিন একটা সম্পূর্ণ পৃথিবী তৈরি হয়েছিল।

যে পৃথিবীতে তারা কখনো একসঙ্গে হাঁটেনি, তবু পাশাপাশি থাকার স্বপ্ন দেখেছিল।

যে গল্পে ভালোবাসা ছিল, অপেক্ষা ছিল, স্বপ্ন ছিল—শুধু একসঙ্গে থাকার ভাগ্য ছিল না।

আর অর্ণবের ডায়েরির শেষ পাতায় তাই লেখা রইল—

তোমাকে আমি চালতা ফুলের মতো ভালোবেসেছিলাম, অপ্সরা।

নিঃশব্দে, দূর থেকে, কোনো দাবি ছাড়া।

তুমি কোনো দিন আমার হওনি।

তবু আমার জীবনের একটা সুন্দর স্বপ্ন হয়ে তুমি থেকে যাবে—যে স্বপ্নের কথা কাউকে বলা যায় না, আবার পুরোপুরি ভুলেও থাকা যায় না।

হয়তো কোনো দিন আর তোমাকে মনে করে কষ্ট হবে না। কিন্তু যদি কোনো বৃষ্টিভেজা বিকেলে সাদা চালতা ফুল ঝরে পড়তে দেখি, আমার মনে পড়বে—একসময় আমি এমন একজনকে ভালোবেসেছিলাম, যাকে কখনো ছুঁয়ে দেখিনি, অথচ যার জন্য আমার হৃদয় একদিন অদ্ভুত কোমল হয়ে উঠেছিল।

তুমি ছিলে আমার কল্পনার সবচেয়ে সুন্দর বিকেল, আর সবচেয়ে দীর্ঘ রাত।

তুমি ছিলে সেই গল্প, যার শেষ আমি লিখতে চেয়েছিলাম, অথচ শেষ পর্যন্ত শুধু তোমার ভালো থাকার প্রার্থনাটুকুই লিখতে পেরেছি।

অপ্সরা—তুমি ভালো থেকো।