বিকেলের আকাশটা সেদিন অদ্ভুত সুন্দর ছিল। পশ্চিমের জানালা দিয়ে এক টুকরো রোদ এসে পড়েছিল টেবিলের ওপর। বাইরে বৃষ্টি হবে হবে করছে, অথচ বৃষ্টি নামছে না। ঠিক যেমন কিছু কথা বুকের ভেতর জমে থাকে, অথচ মুখ দিয়ে বের হয় না।
আবির জানালার পাশে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল। হঠাৎ ফোনের স্ক্রিনে একটা নাম ভেসে উঠল— নবনীতা।
নামটা দেখেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে, যাদের একটা ছোট্ট মেসেজও মন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। নবনীতা ছিল আবিরের জীবনে ঠিক তেমনই একজন।
মেসেজে লেখা—
— কী করছ?
আবির লিখল—
— তোমার কথা ভাবছি।
ওপাশ থেকে উত্তর এল—
— মিথ্যে কথা!
আবির মৃদু হেসে লিখল—
— আচ্ছা, তাহলে সত্যিটা বলি? তোমার কথা ভাবতে ভাবতে চা ঠান্ডা করে ফেলেছি।
নবনীতা একটা হাসির ইমোজি পাঠাল। তারপর লিখল—
— তুমি এত কথা বলতে পারো কীভাবে?
আবির কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর লিখল—
— যার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে, তার কাছে কথার অভাব হয় না। আর যার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না, তার কাছে পৃথিবীর সব কথাও কম মনে হয়।
সেদিন নবনীতা আর কোনো উত্তর দেয়নি। কিন্তু আবির জানত না, ফোনের ওপাশে মেয়েটা কথাটা পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল। তার চোখের কোণে জমেছিল একটুখানি জল, আর ঠোঁটে ছিল অদ্ভুত এক হাসি।
কারণ নবনীতারও যে আবিরকে ভালো লাগত!
শুধু মেয়েটা নিজের অনুভূতিকে স্বীকার করতে ভয় পেত। জীবনে একবার বিশ্বাস করে কষ্ট পেয়েছিল সে। তাই নতুন করে কারও কাছে নিজেকে মেলে ধরতে তার ভয় হতো। সে ভাবত, মানুষ প্রথমে খুব যত্ন করে, তারপর একদিন সেই যত্নটুকুও অভ্যাসের মতো হারিয়ে যায়।
আবির অবশ্য নবনীতার ভয়গুলো বুঝত। সে কখনো জোর করে জানতে চাইত না, কেন মেয়েটা হঠাৎ চুপ হয়ে যায়। কেন কোনো কোনো দিন মেসেজের উত্তর দিতে দেরি করে। কেন মন খারাপ হলে সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
আবির শুধু বলত—
— তোমার যখন কথা বলতে ইচ্ছে করবে, আমাকে ডেকো। আমি থাকব।
নবনীতা একদিন জানতে চেয়েছিল—
— সবাই কি সত্যিই থাকে, আবির?
আবির উত্তর দিয়েছিল—
— সবাই থাকে না। কেউ কেউ থাকার অভিনয় করে। তবে কাউকে ভালোবাসলে অন্তত তার কাছে মিথ্যে করে থাকার অভিনয়টা করতে নেই।
নবনীতা সেদিন কিছু বলেনি। শুধু মনে মনে ভেবেছিল, এই মানুষটাকে যদি একবার বিশ্বাস করা যায়!
নবনীতার সাথে আবির এর পরিচয় হয়েছিল ফেসবুকে। কয়েক মাসের কথাবার্তা, রাত জেগে গল্প, ছোট ছোট অভিমান আর অকারণ হাসির পর একদিন নবনীতা নিজেই বলল—
— আচ্ছা, তোমাকে সামনে থেকে দেখলে কেমন লাগবে আমার?
আবির মজা করে বলল—
— খুব খারাপ লাগবে। কারণ তখন আর আমাকে শুধু ফোনের ওপাশে রেখে দিতে পারবে না।
নবনীতা লিখল—
— এত আত্মবিশ্বাস ভালো না।
— আত্মবিশ্বাস না, নবনীতা। তোমার সামনে দাঁড়ানোর স্বপ্ন।
অবশেষে এক শুক্রবার তাদের দেখা করার কথা হলো। জায়গা ঠিক হলো ধানমন্ডি লেকের পাশে।
আবির নির্ধারিত সময়ের আধা ঘণ্টা আগেই পৌঁছে গেল। জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্যও সে এত আগে কোথাও পৌঁছায়নি। অথচ সেদিন তার হাতের ঘড়ির কাঁটা যেন কিছুতেই এগোতে চাইছিল না।
বারবার ফোনের স্ক্রিন দেখছিল সে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা মিষ্টি কণ্ঠ ভেসে এল—
— আপনি কি আবির?
আবির ফিরে তাকাল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে নবনীতা।
হালকা নীল রঙের পোশাক, খোলা চুল, চোখে কাজল আর মুখে এমন একটা লাজুক হাসি—যেন মেয়েটা পৃথিবীর সব অভিমান ভুলে একটু একটু করে হাসতে শিখছে।
আবির কিছুক্ষণ কথা বলতে ভুলে গেল।
নবনীতা ভ্রু কুঁচকে বলল—
— কী হলো? চিনতে পারেননি?
আবির হেসে বলল—
— চিনেছি। কিন্তু ছবির সঙ্গে একটা সমস্যা আছে।
— কী সমস্যা?
— ছবিতে তোমার চোখের মায়াটা বোঝা যায় না।
নবনীতা চোখ নামিয়ে ফেলল। গাল দুটো লাল হয়ে উঠল সামান্য।
সেদিন তারা অনেক হাঁটল। রাস্তার পাশের দোকান থেকে ফুচকা খেল, এক কাপ চা ভাগ করে নিল। কত সাধারণ কিছু মুহূর্ত! অথচ আবিরের মনে হচ্ছিল, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলোর একটি সে পেয়ে গেছে।
ফেরার সময় নবনীতা বলল—
— আজকের দিনটা মনে থাকবে।
আবির জিজ্ঞেস করল—
— শুধু আজকের দিনটা?
নবনীতা মৃদু হেসে বলল—
— কিছু কিছু দিনের কথা মানুষকে আগে থেকে বলে দিতে নেই। সময় হলে নিজেই বুঝে যায়।
সেদিন বাসায় ফিরে আবির একটা মেসেজ লিখেছিল—
আজ তোমাকে দেখে মনে হলো, এতদিন আমি একটা মানুষের সঙ্গে কথা বলিনি; একটা অপেক্ষার সঙ্গে কথা বলেছি। আর আজ সেই অপেক্ষাটার মুখ দেখতে পেলাম।
নবনীতা মেসেজটা পড়ে অনেকক্ষণ কিছু লিখতে পারেনি। তারপর শুধু বলেছিল—
— আবির, তুমি এমন করে কথা বলো কেন?
আবিরের উত্তর ছিল—
— কারণ তোমাকে নিয়ে মিথ্যে সুন্দর কিছু বলতে চাই না। যা অনুভব করি, সেটাই বলি।
এরপর দিনগুলো কেমন করে যেন বদলে গেল।
আবিরের সকাল শুরু হতো নবনীতার একটা মেসেজ দিয়ে। আর রাত শেষ হতো তার কণ্ঠ শুনে।
নবনীতা সকালে ঘুম থেকে উঠে বলত—
— জানো, আজ তোমাকে স্বপ্নে দেখেছি।
আবির জানতে চাইত—
— কী দেখেছ?
— বলব না।
— কেন?
— বলে দিলে স্বপ্নটা সত্যি হবে না।
আবির হেসে বলত—
— তাহলে আমি প্রতিদিন তোমার স্বপ্নে আসব। একদিন না একদিন তো সত্যি হবই।
এভাবেই তাদের মধ্যে ভালোবাসা জন্ম নিল। খুব বড় কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়, দামি উপহার দিয়ে নয়, কিংবা পৃথিবী উল্টে দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটিয়ে নয়।
ভালোবাসাটা জন্মেছিল ছোট ছোট যত্নে।
নবনীতার মাথা ব্যথা করলে আবির বারবার জিজ্ঞেস করত, ওষুধ খেয়েছে কি না। আবিরের মন খারাপ হলে নবনীতা নিজের গল্প বাদ দিয়ে তার কথা শুনত। ব্যস্ত দিনের শেষে দুজনের হাতে সময় কম থাকলেও তারা অন্তত একবার জিজ্ঞেস করত—
— তুমি ভালো আছ তো?
কখনো কখনো ভালোবাসা মানে শুধু এইটুকু—পৃথিবীর হাজার মানুষের ভিড়ে একজন মানুষ তোমার ভালো না থাকার বিষয়টাও খেয়াল করে।
একদিন নবনীতা বলেছিল—
— আবির, তুমি আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না তো?
প্রশ্নটা শুনে আবিরের হাসি থেমে গিয়েছিল।
সে নবনীতার হাতটা ধরে বলেছিল—
— ভবিষ্যৎ কী লিখে রেখেছে, সেটা আমি জানি না। তবে তোমাকে ভালোবাসার সময়টুকুতে আমি কখনো তোমাকে অবহেলা করতে চাই না। আর কোনোদিন যদি আমাদের পথ আলাদা হয়ও, তোমাকে অসম্মান করে যাব না।
নবনীতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল—
— আমি শুধু এমন কাউকে চাই, যার কাছে আমাকে ভালোবাসার জন্য প্রতিদিন পরীক্ষা দিতে হবে না।
আবির তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরেছিল।
— তাহলে আজ থেকে তোমার একটা পরীক্ষা শেষ। আমাকে বিশ্বাস করতে পারো কি না, সেই পরীক্ষাটা আমি তোমার কাছ থেকে কেড়ে নিলাম। তুমি সময় নাও। আমি তাড়াহুড়ো করব না।
নবনীতা সেদিন আবিরের কাঁধে মাথা রেখেছিল।
শহরের চারপাশে তখন সন্ধ্যা নামছিল। দূরে গাড়ির হর্ন, মানুষের ব্যস্ততা, লেকের পানিতে কাঁপতে থাকা আলো—সবকিছুর মাঝেও তাদের মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা বুঝি কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেছে।
সব গল্পে কি সুখ একই রকম থাকে?
হয়তো থাকে না।
কিছুদিন পর নবনীতার আচরণ বদলাতে শুরু করল। আগের মতো নিয়মিত কথা বলত না। কখনো মেসেজ দেখেও উত্তর দিত না। ফোন করলে বলত, ব্যস্ত আছে।
আবির প্রথমে কিছু মনে করেনি। ভেবেছিল, হয়তো কাজের চাপ। হয়তো পরিবারের কোনো সমস্যা। হয়তো মেয়েটার নিজের জন্য একটু সময় দরকার।
কিন্তু দিন যত গেল, নীরবতা তত দীর্ঘ হলো।
এক রাতে আবির লিখল—
— নবনীতা, তোমার কি আমার সঙ্গে কথা বলতে আর ভালো লাগে না?
অনেকক্ষণ পর উত্তর এল—
— এমন কেন ভাবছ?
— কারণ তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্য এখন আমাকে সময় চাইতে হয়।
নবনীতা লিখল—
— আমি একটু সমস্যার মধ্যে আছি, আবির। সবকিছু এখন তোমাকে বোঝাতে পারব না।
আবির আর প্রশ্ন করল না।
সে শুধু লিখল—
— ঠিক আছে। তুমি যখন পারবে, বলো। তবে একটা কথা মনে রেখো, তোমার সমস্যা হলে আমাকে দূরে সরিয়ে রাখতেই হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।
সেদিনও নবনীতা আর উত্তর দেয়নি।
আবির জানালার পাশে বসে ছিল অনেক রাত পর্যন্ত। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। বৃষ্টির শব্দের ভেতর সে বারবার সেই প্রথম দিনের কথা মনে করছিল, যেদিন নবনীতা তাকে বলেছিল—কিছু কিছু দিনের কথা মানুষকে আগে থেকে বলে দিতে নেই।
আবির বুঝতে পারছিল না, তাদের সুন্দর দিনগুলোর পর এবার কী আসতে চলেছে।
কয়েক দিন পর নবনীতা নিজেই দেখা করতে চাইল।
তাদের দেখা হলো সেই পুরোনো লেকের পাশে। জায়গাটা একই ছিল, বিকেলের আলোও প্রায় একই রকম। শুধু নবনীতার মুখে সেই পরিচিত হাসিটা ছিল না।
সে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল—
— আবির, তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।
আবিরের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
— বলো।
নবনীতা নিচের দিকে তাকিয়ে বলল—
— আমার পরিবার আমার বিয়ের কথা বলছে। একজনকে পছন্দ করেছে। আমি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু তারা শুনতে চাইছে না।
আবির চুপ করে রইল।
নবনীতা এবার তার দিকে তাকাল। চোখ দুটো ভেজা।
— আমি জানি, তোমাকে এসব বলা উচিত ছিল আগে। কিন্তু আমি নিজেই বুঝতে পারছিলাম না কী করব। আমি তোমাকে হারাতে চাই না, আবির। অথচ তোমাকে নিয়ে লড়াই করার সাহসও আমার হচ্ছে না।
আবিরের মনে হলো, কেউ যেন তার বুকের ভেতর থেকে সমস্ত শব্দ কেড়ে নিয়েছে।
সে অনেক কিছু বলতে পারত। বলতে পারত, সে নবনীতার জন্য অপেক্ষা করবে। বলতে পারত, সবকিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। বলতে পারত, ভালোবাসলে ভয় পেতে নেই।
কিন্তু সে দেখল, নবনীতা শুধু কাঁদছে না—সে ভেতরে ভেতরে ভেঙেও পড়ছে।
আবির ধীরে বলল—
— তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?
নবনীতা মাথা নেড়ে বলল—
— ভালোবাসি।
— তাহলে তুমি কী চাও?
নবনীতা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
— আমি চাই তুমি আমাকে এমন একটা পথ দেখাও, যেখানে কাউকে কষ্ট না দিয়ে তোমাকে নিজের কাছে রাখতে পারব।
আবির মৃদু হেসে ফেলল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না।
— নবনীতা, ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন দিক জানো কী? কাউকে নিজের কাছে রাখার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কখনো কখনো তাকে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে দিতে হয়।
— তার মানে তুমি আমাকে ছেড়ে দেবে?
আবির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
— আমি তোমাকে ছেড়ে দেওয়ার মতো করে ভালোবাসিনি। কিন্তু তোমাকে ভালোবাসি বলেই তোমার হয়ে তোমার জীবনটাও বেছে নিতে পারি না।
নবনীতা কাঁদতে কাঁদতে বলল—
— তুমি কি আমাকে ঘৃণা করবে?
আবির মাথা নাড়ল।
— না। তবে হয়তো অনেক দিন তোমাকে মনে পড়বে। হয়তো কোনো বৃষ্টির দিনে, কোনো পরিচিত গানে, কিংবা চায়ের কাপ হাতে বসে থাকতে থাকতে তোমার কথা মনে পড়বে। কিন্তু তোমার ওপর রাগ করে তোমাকে ছোট করব না। তুমি আমার জীবনের একটা সুন্দর অধ্যায় ছিলে, নবনীতা। অধ্যায় শেষ হয়ে গেলেও তার সৌন্দর্য মিথ্যে হয়ে যায় না।
সেদিন তারা পাশাপাশি বসেছিল অনেকক্ষণ।
কেউ কাউকে থামতে বলেনি। কেউ কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
ফেরার আগে নবনীতা শুধু একবার আবিরের হাত ধরেছিল।
তারপর খুব আস্তে বলেছিল—
— যদি কোনোদিন আবার দেখা হয়, তুমি কি আমার সঙ্গে কথা বলবে?
আবির বলেছিল—
— তুমি যদি তখনও নবনীতা থাকো, আর আমি যদি তখনও আবির থাকি, তাহলে কথা বলব।
ছয় মাস কেটে গেল।
নবনীতার বিয়ে হয়েছিল কি না, আবির নিশ্চিতভাবে জানত না। মাঝেমধ্যে তার প্রোফাইল দেখত, কিন্তু কোনো প্রশ্ন করত না। নিজের কাজ, নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করত।
মানুষ সব কষ্ট ভুলে যায় না। কিছু কষ্টের সঙ্গে শুধু বসবাস করতে শিখে যায়।
একদিন শীতের বিকেলে আবির একটা বইয়ের দোকানে গিয়েছিল। বই খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ পেছন থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠ শুনল—
— আপনি কি আবির?
আবির ফিরে তাকাল।
নবনীতা।
হালকা রঙের শাল জড়ানো, মুখে আগের সেই মায়া। শুধু চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। দুজনেই কয়েক মুহূর্ত একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর আবির মৃদু হেসে বলল—
— কেমন আছ, নবনীতা?
মেয়েটা উত্তর দিল—
— ভালো আছি। তুমি?
— আমিও ভালো।
এই ‘ভালো আছি’ কথাটার ভেতরে কতটা সত্যি ছিল, তা দুজনেই জানত। তবু তারা কেউ কাউকে প্রশ্ন করল না।
বইয়ের দোকান থেকে বেরিয়ে তারা রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট চায়ের দোকানে বসল।
নবনীতা বলল—
— জানো, অনেক দিন ধরে তোমাকে একটা কথা বলতে চেয়েছি।
আবির চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল।
— বলো।
— সেদিন আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করেছিলাম। যদি আবার দেখা হয়, তুমি কথা বলবে কি না।
— মনে আছে।
নবনীতা একটু হাসল।
— তোমার উত্তরটা আমার মনে ছিল। তাই আজ কথা বলতে এলাম।
আবির জিজ্ঞেস করল—
— তোমার জীবন কেমন চলছে?
নবনীতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—
— চলছে। তবে একটা জিনিস বুঝেছি, আবির। মানুষ সব সময় নিজের ইচ্ছেমতো জীবন বেছে নিতে পারে না। কিন্তু নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করে থাকলেও সেটা একদিন না একদিন ফিরে আসে।
আবিরের বুকের ভেতর পুরোনো একটা ব্যথা নড়ে উঠল।
— তুমি কি সুখী?
নবনীতা জানালার বাইরে তাকাল।
তারপর বলল—
— সুখী হওয়ার চেষ্টা করছি। আর তুমি?
আবির মৃদু হাসল।
— আমিও।
সেদিন তারা অনেক কথা বলেছিল। পুরোনো দিনের গল্প, বৃষ্টির বিকেল, প্রথম দেখা, ভাগ করে খাওয়া ফুচকা, সেই একটা চায়ের কাপ—সবকিছু নিয়ে।
বিদায়ের সময় নবনীতা বলল—
— আবির, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— করো।
— তুমি কি আমাকে এখনও ভালোবাসো?
প্রশ্নটা শুনে আবির অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
— ভালোবাসা কি সুইচের মতো, নবনীতা? ইচ্ছে হলো জ্বালিয়ে দিলাম, ইচ্ছে হলো নিভিয়ে দিলাম? তোমাকে নিয়ে আমার অনুভূতিটা হয়তো আগের মতো নেই। সময় অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। কিন্তু তোমাকে ভালোবাসতাম—এই সত্যিটা আমি মুছে ফেলতে পারব না।
নবনীতার চোখ ভিজে উঠল।
— তাহলে কি আমাদের আর কোনোদিন একসঙ্গে হওয়া হবে না?
আবির এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল—
— ভবিষ্যৎ জানি না। তবে একটা কথা জানি, শুধু কাউকে ভালোবাসলেই তার সঙ্গে জীবন কাটানো যায় না। দুজনের ইচ্ছা, সাহস আর সিদ্ধান্তও লাগে।
নবনীতা মাথা নিচু করে ফেলল।
আবির উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে বলল—
— ভালো থেকো, নবনীতা। সত্যি সত্যিই ভালো থেকো। আমার জীবনে তোমার যে জায়গাটুকু ছিল, সেটা কেউ মুছে দিতে পারবে না। কিন্তু সেই জায়গাটুকুর দিকে তাকিয়ে আমি আর আমার জীবন থামিয়ে রাখব না।
নবনীতা কিছু বলল না।
শুধু আবিরের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
সেদিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আবির ফোনের পুরোনো মেসেজগুলো খুলেছিল। নবনীতার পাঠানো হাসির ইমোজি, প্রথম দেখা করার দিনের কথা, সেই রাতের কথোপকথন—সবকিছু চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।
একটা পুরোনো মেসেজে চোখ আটকে গেল।
নবনীতা লিখেছিল—
তুমি আমাকে কখনো ভুলে যাবে না তো?
আবির অনেকক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের মনেই বলল—
না, নবনীতা। তোমাকে ভুলে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি আমি কোনোদিন দিইনি। শুধু তোমাকে মনে রেখেও কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়, সেটা শিখে নিয়েছি।
বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
আবির জানালাটা বন্ধ করতে গিয়ে থেমে গেল। বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, জীবনে কিছু মানুষ আসে আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য নয়—আমাদের ভেতরে ভালোবাসার অর্থটা বদলে দেওয়ার জন্য।
নবনীতা তার জীবনে এসেছিল। তাকে হাসিয়েছিল, অপেক্ষা করতে শিখিয়েছিল, কষ্ট দিয়েছিল, আবার সেই কষ্টের মধ্য দিয়েই বড় হতে শিখিয়েছিল।
তাদের গল্পটা হয়তো একসঙ্গে থাকার গল্প হয়ে ওঠেনি।
তবু গল্পটা মিথ্যে ছিল না।
কারণ সব ভালোবাসার শেষ পরিণয় এক ছাদের নিচে থাকা নয়। কিছু ভালোবাসার পরিণতি হলো—একদিন দূর থেকে কারও ভালো থাকার খবর শুনে নীরবে হাসতে পারা।
আর কিছু ভালোবাসা?
সেগুলো পুরোনো বইয়ের ভাঁজে রাখা শুকনো ফুলের মতো। রং হারিয়ে যায়, গন্ধ কমে আসে, কিন্তু কেউ হঠাৎ বইটা খুললে ফুলটা আবার মনে করিয়ে দেয়—একদিন এখানে বসন্ত এসেছিল।
নবনীতা ছিল আবিরের জীবনের সেই বসন্ত।
যে বসন্ত চলে গেছে, অথচ যার কথা মনে পড়লে আজও আবিরের মনে হয়—
জীবনে যদি আর একবার শুরু করার সুযোগ পেতাম, তাহলে হয়তো আবারও নবনীতার প্রেমেই পড়তাম।
তবে এবার তাকে পাওয়ার জন্য নয়—তাকে ভালোবাসার সৌন্দর্যটা আরেকবার অনুভব করার জন্য।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।