www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

অদ্ভুত আবিষ্কার

পৃথিবীতে এমন অনেক জিনিষ আছে, যার সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। অনেক কিছু আছে যা মানুষ কোনদিন দেখে নি, কিন্তু বিশ্বাস করে। আবার অনেক কিছু এমন আছে যা মানুষ দেখেছে কিন্তু তবুও বিশ্বাস করে না। এই দুটোরই একটা উৎকৃষ্টতম উদাহারন হল ভূত। যদিও আজ আমি ভূতের কথা লিখতে বসিনি। এটা আসলে কিসের গল্প, তা আমি নিজেই জানি না। গল্পটা যাকে নিয়ে, তাকে আমি প্রায় তিরিশ বছর চিনি। তিনি একজন প্রখ্যাত জৈব রাসায়নিক, ডঃ সৌম্যদীপ দত্ত। আমরা দুজন একই পাড়ায় থাকলাম। ছোটবেলায় একই স্কুলে পড়েছি। আমরা ছিলাম ভীষণ ভালো বন্ধু। স্কুল শেষ করে ও চলে যায় আমেরিকায় ডাক্তারি পড়তে। আর আমি ভর্তি হলাম নিউ আলিপুর কলেজের বি কমে। আমেরিকা থেকে ও চলে যায় জার্মানি গবেষণা করতে। দেশে ফিরেছে এই বছর দশেক। তারপর থেকে প্রায় প্রতি বছর পুজোর সময় ও একবার কলকাতায় আসে। যত ব্যস্তই থাক না কেন, কলকাতায় এলে ও আমার সাথে দেখা করতে ভোলে না। কিন্তু এইবার পুজোয় ও আসে নি। কারণটা ঠিক জানা ছিল না সেই সময়।
গত ডিসেম্বর মাসের এক রবিবার সাকালে সবে স্নান করে বেরিয়েছে, ফোনটা বেজে উঠল। ফোনের অপর প্রান্তে সৌম্যর গলা শুনে বেশ অবাকই হলাম। অনেকদিন পর বন্ধুর ফোন পেয়ে বেশ আনন্দও হল। দুয়েকটা এদিক ওদিকের কথা বলে সৌম্য বেশ চিন্তিত গলায় বলল, “অফিসে ছুটি পাওনা আছে?”
“তা আছে। কিন্তু হঠাৎ?”
“তোর জন্য একটা নিমন্ত্রণ আছে আমার বাড়িতে। একটা মজার জিনিস দেখাবো। দিন দুয়েকের ছুটি নিয়ে চলে আয় এখানে,” এক নিশ্বাসে বলে গেল সৌম্য।
“কোন অসুবিধে নেই। দুদিন সময় দে। টিকিট কেটে জানাব। ওকে?”
ফোনটা রেখে আমি সোফায় গিয়ে বসলাম। আমি চ্যাটার্জি ইন্টারন্যাসানালে সামান্য একজন কেরানি। আর সৌম্য এত বড় একজন বৈজ্ঞানিক। ওর সব জিনিসই তো আমার কাছে মজার আর আশ্চর্যের। কিন্তু একটা ব্যপার আমাকে একটু বিচলিত করছিল। গত বিশ বছরে তো ও এইভাবে আমাকে কোনদিন ডাকে নি? তাহলে? নানা চিন্তার মধ্য আমি পরদিন অফিসে গিয়ে ছুটি নিলাম। দিন সাতেকের ছুটি পাওনা ছিল। পুরটাই নিয়ে নিলাম। দুদিন সৌম্যর ওখানে থেকে তারপর যাব রাউরকেলায় আমার পিসির বাড়ি। পিসির শরীরটাও ইদানীং ভালো যাচ্ছে না। তাই ওদিকটায় যখন যাচ্ছি, ভাবলাম একবার দেখা করে আসব পিসির সাথে। টিকিট কেটে সৌম্যকে জানিয়ে দিলাম যে সতেরো-য় আসছি।
হাওড়া থেকে ইস্পাত এক্সপ্রেস ধরে কান্সবাহাল। ওখান থেকে বাসে করে কুলনায় যেতে আর এক ঘণ্টা। বিদেশ থেকে ফিরে সৌম্য এই কুলনাতেই একটা বাড়ি কিনে বসবাস করা শুরু করে। বাড়িতেই ওর একটা ল্যাব-ও আছে শুনেছি। ওখানেই সৌম্য ওর রিসার্চ-এর কাজ কর্ম করে। কলকাতায় এত বড় বাড়ি থাকতে কেন যে উড়িষ্যার এই আধা গ্রাম, আধা শহরে এসে থাকতে শুরু করল ও, তা আমার কাছে এক রহস্য। ওকে জিজ্ঞেস করতে বলেছিল ওখানে নাকি ওর কাজ করতে সুবিধে হয়। কি জানি? এইসব বৈজ্ঞানিকদের ব্যপার ঠিক বুঝি না।
যাই হোক, বাস থেকে নেমে প্রায় আধ ঘণ্টা হেঁটে ওর বাড়িতে পৌঁছলাম। একজনকে জিজ্ঞেস করতে সে খুব সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে দিল রাস্তাটা। তাই, বাড়ি চিনতে অসুবিধে হল না। এই জায়গাটা পাহাড়ি তাই এই আধ ঘণ্টা হেঁটেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। ঘড়িতে দেখি সন্ধ্যে সাতটা। বিরাট তিনতলা বাড়ি। সামনে বিশাল বাগান। যদিও বাগানটা ঠিক দেখাশুনা করা হয় বলে মনে হয় না। চাঁদের আবছা আলোয় বুঝতে পারছি যে আগাছায় ভরে আছে। অবাক হলাম এই দেখে যে বাড়িটায় কোন আলো জ্বলছে না। সদর দরজার সামনে শুধু একটা টিমটিমে লালচে আলো। ব্যাস। আসে পাশে কোন বাড়ি ঘর নেই। ঝিঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। পরিবেষটাও ভীষণ থমথমে। একটু যেন ভয় ভয় লাগলো। ভাবলাম, বৈজ্ঞানিকরা একটু পাগলা গোছের হয় শুনেছি না হলে এই জায়গায় কোন সুস্থ মানুষের পক্ষে একা থাকা সম্ভব নয়। এখানে বলে রাখা ভালো যে সৌম্য বিবাহ করে নি।
আরও অবাক হলাম যখন বার পাঁচেক বেল বাজানোর পরও কেউ দরজা খুলল না। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে সৌম্যকে ফোন লাগালাম। কিন্তু কেউ ধরল না, বেজে বেজে কেটে গেল। বাড়ি নেই নাকি? কিন্তু আমি যে জানিয়েছিলাম আজ আসছি? তবে? এই ভাবে আরও মিনিট পনেরো কেটে গেল। কি করব ভাবছি এমন সময় শুকনো পাতার উপর একটা খচমচ শব্দ শুনে চমকে উঠলাম। পিছন ফিরে দেখি একটা ছায়ামূর্তি আমার দিকে এগিয়ে আসছে। হাতের টর্চটা ফেলতেই বুজলাম ওই ছায়ামূর্তিই আমার বাল্যবন্ধু সৌম্য ওরফে ডঃ সৌম্যদীপ দত্ত। যদিও ওকে হঠাৎ দেখে চেনার উপায় নেই। আগের থেকে অনেক রোগা হয়ে গেছে। পরনে কোট প্যান্ট আর গলায় ঝোলানো একটা নোজ মাস্ক। এই শেষের জিনিসটাই বারবার আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল। এগুলো সাধারণত তার পরে যাদের কোন বায়ু সংক্রামিত অসুখ থাকে। সৌম্যর সেরকম কোন অসুখ আছে বলে তো জানি না। তবে সাম্প্রতিক কালে হলে আলাদা ব্যপার।
আমার দিকে হাত নাড়িয়ে এগিয়ে আস্তে আস্তে সৌম্য নোজ মাস্কটা নাকের উপর টেনে নিল। তার ফলে ওর অর্ধেক নাক আর পুরো মুখটা ঢেকে গেল।
“আসতে কোন অসুবিধে হয় নি তো?” মাস্কটা পরার ফলে ওর গলাটা ভীষণ চাপা শোনাচ্ছিল। সেই থমথমে গলায় প্রশ্ন করল সৌম্য।
“না না। অসুবিধের কি আছে। তা তোর শরীর টরীর ভালো তো?” আমার দৃষ্টি তখনও ওই মাস্কটার দিকেই।
সৌম্য আমার দৃষ্টি অনুসরণ করেই বলল, “ও, এই মাস্কটার জন্য বলছিস? ওটা একটু প্রোটেকশন আর কি?”
“প্রোটেকশন? কিসের থেকে?” আমি প্রশ্ন করলাম।
ইতিমধ্যে সৌম্য দরজা খুলে দিয়েছে। ভিতরে ঢুকে একটা লালচে রঙের টিউব লাইট জ্বালিয়ে বলল, “ও কিছু না। পরে বলবোখন। তুই এখন ক্লান্ত। যা বিশ্রাম নে। কাল সন্ধ্যায় আবার দেখা হবে। আমি সকালে কাজে একটু ব্যস্ত থাকি। রামলাল বলে একটি চাকর আসে, সেই তোর দেখাশুনা করবে। ঠিক আছে?”
“আচ্ছা,” এই বলে সৌম্যর অঙ্গুলি নির্দেশ অনুযায়ী একটা ঘরের দিকে চলে গেলাম। আজকে আরও গল্প কারার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু শরীর দিল না। ঘরে ঢুকে দেখলাম এই ঘরের আলোগুলোও সব লাল কাগজে মোড়া। যার ফলে সারা ঘরে একটা হালকা লালচে আভা ছড়িয়ে আছে। ভাবলাম এই লাল কাগজের রহস্য কাল সৌম্যকে জিজ্ঞেস করব। একে ভীষণ ক্লান্ত, তার উপর এইসব আর ভাবতে ভালো লাগছে না। পোশাক পালটে শুয়ে পড়লাম। সৌম্য একবার খাবার জন্য বলেছিল। কিন্তু খিদে নেই বলে বারন করে দিই।
শুয়ে শুয়ে ভাবছি কি যেন একটা জিজ্ঞেস করব ভাবলাম সৌম্যকে? একদম ভুলে গেছি। অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারলাম না। পাশ ফিরে শুতেই চোখ পড়ল এক তাড়া খবরের কাগজের উপর। ওমনি বিদ্যুতের মত মনে পড়ে গেল খবরটা। এই কুলনারই না ছিল। সপ্তাহ খানেক আগের কথা।
এই কুলনায় একটা অদ্ভুত রকমের ঘটনা ঘটছে কিছুদিন ধরে। রোজই নাকি কোন এক জানোয়ার ছাগল, গরু ইত্যাদি প্রাণীর শরীর থেকে রক্ত খাচ্ছে। সকালে উঠে দেখা যাচ্ছে আজ এর গরু, কাল তার ছাগল মড়ে পড়ে আছে। গলার কাছে ইঞ্জেকশনের মত দুটো দাগ। এর বেশি কিছু আর লেখেনি। সে ঘটনা এখনও চলছে কিনা জানি না। কাগজে আর এই নিয়ে কিছু দেখি নি। খবরটা অফিসের সলিলবাবুকে বলতে উনি মুচকি হেসে বললেন, “কেন ভায়া, এতে অবাক হওয়ার কি আছে? ভ্যাম্পায়ার বাদুড়ের নাম শোন নি? এটা ওদেরই কাজ।”
তা ভ্যাম্পায়ারের কথা কে না শুনেছে। কিন্তু ওটা তো এ দেশে নেই বলেই জানতাম। বইতে পড়েছি যে ভ্যাম্পায়ার বাদুড় গরু, ঘোড়া ইত্যাদি গৃহপালিত পশুদের গলা থেকে রক্ত খায়। কিন্তু এত জায়গা থাকতে হঠাৎ উড়িষ্যার একটা গ্রামে এ বাদুড় দেখা যাবে, এটা মানতে ঠিক মন চাইল না।
যাই হোক, এই সব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। ঘুম ভাঙতে দেখি সাড়ে দশটা বাজে। হাত মুখ ধুয়ে নীচে গিয়ে দেখি টেবিলে খাবার রাখা আছে। আমাকে আসতে দেখে হাসি মুখে লুঙ্গী-ফতুয়া পরা এক বৃদ্ধ এগিয়ে এল। বেটে, রোগা লোকটা হেঁসে বলল, “হামার নাম রামলাল খাখা হ্যায় বাবু।খানা লাগা দিয়া হ্যায়। খা লিজিয়ে সাব।”
পরোটা আর আলুর দম খেয়ে বেরিয়ে গেলাম। অচেনা জায়গায় ঘুরতে ভীষণ ভালো লাগে। এদিক ওদিক ঘুরে সারা দিন কেটে গেল। পাহাড়ি এলাকা, ঘুরে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরতে তিনটে বেজে গেল। ঘরে ঢুকতেই রামলাল বলল, “বাবু, খানা লাগা দে?”
গরম ভাত আর পাঠার মাংসের ঝোল খেয়ে বিছানায় একটু শুতেই ঘুম এসে গেল। ঘুম ভাঙল সৌম্যর ডাকে। উঠে দেখি সাতটা বাজে। সৌম্য আমার খাটের পাশে একটা চেয়ারে বসে আছে। সেই একই পোশাক, সেই একই মাস্ক।
“সারাদিন খুব বোর হলি না?” প্রশ্ন করল সৌম্য।
“তা একটু হয়েছি বৈ কি। তারপর বল, কেমন আছিস?  
নানা রকম গল্প করে বেশ অনেকটাই সময় কেটে গেল। স্কুলের গল্প, কালী পূজোয় সমীর স্যারের বাড়ির চালে পটকা ছোড়ার গল্প, ই এস আই-এর মাঠে ক্রিকেট খেলার গল্প। অনেক দিন পর সৌম্যর সাথে গল্প করতে ভীষণ ভালো লাগছিলো। আগের মতই সেই নির্মল আনন্দ অনুভব করছিলাম।
ফ্লাস্ক থেকে সৌম্য আমাকে কফি ঢেলে দিল। কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে বললাম, “বল, কি মজার জিনিস দেখাবি বলেছিলি?”
“মজার একটা জিনিস আবিষ্কার করেছি, বুঝলি। কাউকে বলিনি এখনও। এই তোকেই বলছি প্রথম বার।”
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম সৌম্যর দিকে।
"আমার তো দর বেড়ে গেল রে। তোর আবিষ্কারের কথা কোন বৈজ্ঞানিককে না বলে আমার মত একজন মূর্খকে বলছিস?" একটু মজা করেই বললাম। কথাটা যেন ওর কানেই গেল না। একটু থেমে সৌম্য বলল, “অমরত্ব সম্বন্ধে তোর কি ধারণা?”
“মানে?” বেশ অবাক হলাম এরকম একটা প্রশ্ন শুনে।
“ধর, মানুষ যদি আরও অনেক বছর বেশি বাঁচত? মানে, ধর তোর আয়ু যদি দেড়শো বছর হত?”
“তা তো বেশ হয়। তবে হঠাৎ এই প্রশ্ন?”
“এটাই তো আমার আবিষ্কার রে। দীর্ঘায়ুর উপায়।”
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আরেব্বাস! তা এটা কি কোন বড়ি?”
“না। ইনজেকশন।”
“বাঃ। তা কারুর উপর প্রয়োগ করেছিস?”
“তা করেছি বৈ কি,” আমার কথা শেষ করতে দিল না সৌম্য। “প্রথমেই সাকসেস। দারুণ কাজ দিল। তারপর প্রয়োগ করেছিলাম একটা গিনিপিগের উপর। সাধারনত তিন বছর বাঁচে, সেটা বাঁচল প্রায় সাড়ে সাত বছর, বেশ সুস্থ সবল শরীরে। কিন্তু গোল বাধল পরের বার।”
সৌম্য একটু থামল। তারপর আবার বলতে শুরু করল।
“আমার তৃতীয় সাবজেক্টের অনেক সাইড এফেক্ট দেখা দিল। আসলে আমার এই ওষুধটা একটা ভ্যাকসিনেশন। তুই ভ্যাম্পায়ার বাদুড়ের নাম শুনেছিস?”
প্রশ্নটা শুনে বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। মুখে বললাম, “হ্যাঁ, তা কে না শুনেছে?”
“তুই কি জানিস, এই ভ্যাম্পায়ার বাদুড়ের আয়ু, সাধারন বাদুড়ের তুলনায় প্রায় তিন গুন বেশি হয়?”  
এই তথ্যটা আমার মত একজন সামান্য কেরানির পক্ষে জানা সম্ভব না। ভ্যাম্পায়ের নাম শুনেছি মাত্র। আর কয়েকটা ইংরেজি সিনেমায় দেখেছি। আর একবার কোন এক পত্রিকায় ছবি দেখেছিলাম। কোথায় দেখেছিলাম তা মনে নেই।
সৌম্য আবার বলতে লাগলো, "এই বিষয়টা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। বেশ কিছু পড়াশোনার পর, আমি ঠিক করি এই নিয়ে একটু গবেষণা করব। যেমন ভাবা, তেমন কাজ। আনিয়ে নিলাম পেন্সিলভেনিয়া থেকে কিছু ভ্যাম্পায়ার বাদুড়। খরচাও হল প্রচুর। পরীক্ষা করে জানতে পারলাম যে সাধারন বাদুড়ের তুলনায় এই ভ্যাম্পায়ার বাদুড়ের রক্তে এক বিশেষ ধরনের ভাইরাস আছে। এই ভাইরাসের নাম দিয়েছি বটুলাম আর্গোফেরম।"
"কি রাম?" আমার জিভে এই উচ্চারণ বেরল না।
"রাম না রম। বটুলাম আর্গোফেরম।"সৌম্যও ছাড়ার পাত্র নয়।
"ব-টু-লা-ম আর-গো-ফে-রম। বটুলাম আর্গোফেরম।" কেটে কেটে বললাম। বার দুয়েকের চেষ্টায় ঠিক উচ্চারণটা বেরল।
"হ্যাঁ। তা আমি ওদের রক্ত থেকে ভাইরাসটা আলাদা করি। তারপর সেটা আবার ইঞ্জেক্ট করি সাধারণ বাদুড়ের রক্তে।"
"বাদুড়টা কদিন বেঁচে ছিল?"
"তিন বছর সাত মাস তেরো দিন। এমনিতে দেড় বছরের বেশি বাঁচে না। তারপর গিনিপিগের উপর পরীক্ষাও সফল," বেশ প্রসন্ন লাগলো সৌম্যকে।
"এ তো তাজ্জব ব্যাপার। তা মানুষের ক্ষেত্রেও কি..." নিজের উত্তেজনা চাপতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম ওকে।
"আমার গাণিতিক ব্যাখ্যা যদি ঠিক থাকে তাহলে মানুষ অনায়াসে বাঁচবে দেড়শ বছর।"
"দেড় শো..." আমার মুখ হা হয়ে গেছে।
"কিন্তু ওই যে বললাম, যদি হিসেব মেনে চলে তাহলে।"
"মানে?" ঠিক বুঝতে পারলাম না ওর কথা।
"মানে বলছিলাম না সাইড এফেক্টের কথা।" একটু অন্যমনস্ক হয়ে বলল সৌম্য।
"কি আর এমন সাইড এফেক্ট হবে? তা ছাড়া এত বড় আবিষ্কারের টুকটাক সাইড এফেক্ট তো থাকতেই পারে।" অনেকটা না বুঝেই সৌম্যকে একটু সান্তনা দেওয়ার জন্য বললাম।
"পারফিউরিয়া," অন্যমনস্ক ভাবেই বলল সৌম্য।
"কি?" আমি আবার অথৈ জলে।
"পি ই আর এফ ইউ আর আই এ। পারফিউরিয়া।" বানান করে বলল সৌম্য।
"পারফিউরিয়া? সেটা আবার কি?"
আমার অজ্ঞানতায় একটুও বিরক্ত না হয়ে শান্ত গলায় বলে চলল সৌম্য, "পারফিউরিয়া এক ধরনের অসুখ। এতে মানুষের ফটোসেন্সিটিভিটি বেড়ে যায়।"
আমার 'ফটোসেন্সিটিভিটি কি' প্রশ্ন করার আগেই সৌম্য নিজেই উত্তর দিয়ে দিল। "মানে সূর্যের আলো সহ্য করার ক্ষমটা থাকে না। গায়ে সূর্যের আলো পড়লে অ্যালার্জি হয়। জ্বালা করে। তাছাড়া রক্তের আভাব মানে অ্যানিমিয়া দেখা দেয় ভীষণ ভাবে। আর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ক্যালসিয়ামের অধক্ষেপ পড়ে। শরীরে মেলানিন বেড়ে গিয়ে চামড়া কালো হয়ে যায়।"
দম নেওয়ার জন্য থামল সৌম্য। হঠাৎ একটা কথা মাথায় আসতে শরীরের রক্ত জল হয়ে গেল। "মানুষের শরীরে এই ভাইরাস ইঞ্জেক্ট করলে কি হ্য়,কি করে জানলি? তাঁর মানে কি...?"
কোন উত্তর দিল না সৌম্য। যেন আমার কথা শুনতেই পায় নি। ও বলে চলল, "ক্যালসিয়ামের অধক্ষেপ সব চেয়ে বেশি পড়েছে দাঁতের উপর। প্রধানত ক্যেনাইন বা কুকুরে দাঁতে। ওই দাঁতগুলো অন্য দাঁতের থেকে প্রায় আধ ইঞ্চি বেশি বড় হয়ে গেছে। গায়ের রঙ আগের থেকে প্রায় পাঁচ গুন বেশি কালো হয়ে গেছে। সবকটা সাইড এফেক্টই বীভৎস ভাবে দেখা দিয়েছে। তাছাড়া..."
আমি মন্ত্রমুগ্ধর মত শুনছি সৌম্যর আবিষ্কারের গল্প। আমার গায়ের সব রোম খাড়া হয়ে গেছে। কোনরকমে বললাম, "তাছাড়া?"
সৌম্য উঠে পড়ল। বলল, "আজ অনেক রাত হয়েছে। তোর আবার কাল সকালে ট্রেন। যা শুয়ে পড়।"
"না না, সে হয় না," উত্তেজিত হয়ে বললাম। "তুই কার উপরে প্রয়োগ করেছিলি?"
হঠাৎ মনে পড়ে গেল সৌম্যর চাকর রামলালের কথা। ওর দাঁতগুলো তো বেশ বড় ছিল। ওর গায়ের রঙও তো...। আমি আর ভাবতে পারলাম না। এ সৌম্য কি করল?
"আর ওই অ্যানিমিয়া...।"
"কি?" কাঁপা গলায় বললাম।
"ওটাই তো মজার। অ্যানিমিয়া ঠিক হয় নি। তবে ওকে রোজ রক্ত দিতে হয়। কিন্তু ...।" আবার থামল ও।
"কিন্তু কি?" আমার গলা দিয়ে যেন আওয়াজ বেরতে চাইলো না।
"কিন্তু, ভেন-এ না দিয়ে রক্তটা গ্লাসে দিতে হয়।" একটু হাসল ও।
"কি যাতা বলছিস? তার মানে তো...।" আমার কথা শেষ হল না। পুরো ব্যপারটা আমার চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। আমার জামাটা ঘামে সেঁটে গেছে আমার গায়ে। মনে পড়ে গেল কুলনার সেই রক্তখেকো পশুর খবরটা। আমাকে চুপ থাকতে দেখে সৌম্য শান্ত গলায় বলল, "তুই ঠিক ধরেছিস। ভ্যাম্পায়ারের ভাইরাস থেকে আমি দীর্ঘায়ুর ওষুধ বানিয়েছি ঠিকই, তবে যার উপর প্রয়োগ করেছি সেও ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হয়েছে। মানুষের রক্ত এখনও খায় নি, তবে খেতে কতক্ষন।"
আমি কিংকর্তব্যবিমুঢ়হ হয়ে বসে আছি। এ কি সব বলছে সৌম্য? এসব কি কখনও সত্যি হতে পারে? মানুষ মানুষের রক্ত খাবে? তাছাড়া খারাপ লাগছিল রামলালের জন্য। লোকটাকে বেশ ভালো বলেই মনে হয়েছিল। সিধেসাদা, সাধারণ। ওর সাথে সৌম্য এটা কি করল? সৌম্য উঠে দরজার দিকে পা বাড়িয়েছে।
"গুড নাইট ভাই। এখন শুয়ে পড়। এসব নিয়ে ভাবিস না। কাল সকালে তোর সাথে দেখা হবে না। রোদ আমার ঠিক সহ্য হয় না। ফোস্কা পড়ে। পুড়ে যায়। বললাম না সব সাইড এফেক্টই হাইপার হয়ে গেছে।"
আমি হতভম্বের মত দাড়িয়ে রইলাম। এই বলে সৌম্য ধীর গতিতে বেরিয়ে গেল। রামলাল না, সৌম্যর সাবজেক্ট অন্য কেউ নয়, সৌম্য নিজেই। মাস্ক পরার কারণটাও স্পষ্ট হয়ে গেল আমার কাছে।  
সেই রাতে আমি আর ঘুমোতে পারিনি। শুধু অপেক্ষা করেছি কখন সকাল হবে। কখন আমি এই বাড়ি থেকে বেরবো। আমার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে। সৌম্য বলেছিল, "মানুষের রক্ত এখনও খায় নি, তবে খেতে কতক্ষন।"
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৭২০ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১১/০৮/২০১৫

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • সাবাস ! পুরো গল্পটা টানটান। বন্ধুকে ডেকে আনার কারন স্পষ্ট নয়। এসব ক্ষেত্রে গোপন রাখাই তো স্বাভাবিক , তাছাড়া বন্ধুর করার কিছু ছিলনা।
    • অভিষেক মিত্র ০১/১০/২০১৫
      ধন্যবাদ দেবব্রত বাবু। আসলে ডাঃ দত্ত ওনার আবিস্কার at least একজনকে দেখাতে চেয়েছিলেন।
  • এল. এস. ডি ০৫/০৯/২০১৫
    দারুণ।
  • নীহার রঞ্জন মল্লিক ৩১/০৮/২০১৫
    AWESOME
  • অরিত্র পাল ২৫/০৮/২০১৫
    Great
  • দারুণ লাগলো অভিষেক
  • চঞ্চল সেন ২৪/০৮/২০১৫
    বাঃ।
  • খুব মন দিয়ে পরলাম সত্যি ভাল লাগলো
    তবে এই তারুণ্য তে আর লেখা জমা দেবেন কবি বন্ধু ।।
    • অভিষেক মিত্র ১৬/০৮/২০১৫
      ভালো লাগার জন্য ধন্যবাদ। আরও লেখা নিশ্চয়ই দেব। আপনার মন্তব্যে অনুপ্রাণিত হলাম।
  • জাভেদ ১৩/০৮/২০১৫
    ভালো লাগলো।
  • সুনীল চক্রবর্তী ১২/০৮/২০১৫
    ভালো লাগলো।
  • নাবিক ১২/০৮/২০১৫
    ওয়াও অনেক ভালো লাগলো
  • কিশোর কারুণিক ১১/০৮/২০১৫
    বেশ বেশ
  • আবুল হাসান ১১/০৮/২০১৫
    valo laglo
 
Quantcast