বড় হওয়ার টিকিট কেটে আমরা আসলে শৈশবের নির্বাসন কিনেছি

তখন আমাদের খুব তাড়া ছিল। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে উঁচু হয়ে দাঁড়াতাম আমরা, যেন আয়নার সামনে নিজেকে একটু বড় দেখালেই পৃথিবীর সমস্ত রহস্যের দরজা খুলে যাবে। শৈশব ছিল আমাদের কাছে এক বাধ্যতামূলক বন্দিদশা, আর আমরা ছিলাম সুযোগের অপেক্ষায় থাকা পালানোর কয়েদি।

আমাদের চোখে বড় হওয়া মানে ছিল এক অসীম স্বাধীনতা। কেউ শাসন করবে না, পড়ার টেবিল থেকে কেউ জোর করে ঘুম পাড়াতে পাঠাবে না, নিজের ইচ্ছেমতো রাত জাগা যাবে। পকেটে থাকবে নিজের উপার্জনের টাকা, আর যখন খুশি চলে যাওয়া যাবে অচেনা কোনো শহরে। বড় হওয়া মানে আমাদের কাছে ছিল নিজের পৃথিবী নিজেই তৈরি করার এক জাদুকরী ক্ষমতা।

তাই মহাকালের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আমরা আমাদের সমস্ত সঞ্চয় তুলে দিয়েছিলাম। ঘামে ভেজা বিকেলের মাঠ, খাতার শেষের পাতায় আঁকা হিজিবিজি ছবি, আর মায়ের বকুনি—সব দিয়ে আমরা একমুখী একটি টিকিট কিনেছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম, ওই টিকিটটিই আমাদের স্বাধীনতার ছাড়পত্র।

ট্রেন ছেড়েছিল। আমরা জানালা দিয়ে পেছনে ফেলে আসা স্টেশনটার দিকে একবারও তাকাইনি। সামনে ছিল এক বিশাল, আলোঝলমলে মোহময় পৃথিবী। আমরা স্বাধীন হচ্ছিলাম, একটু একটু করে নিজেদের স্বপ্নের মতো বড় হচ্ছিলাম।

কিন্তু আমরা টেরই পাইনি কখন নিঃশব্দে আমাদের স্কুলব্যাগগুলো ভারী অফিস ব্যাগে রূপান্তরিত হলো। কখন জ্যামিতি বাক্সের জায়গা দখল করে নিল মাসিক বিলের রসিদ, আর খেলার মাঠের বিকেলগুলো হারিয়ে গেল ডেডলাইনের ধূসর ক্যালেন্ডারে।

শৈশবে সময় ছিল এক সীমাহীন সমুদ্র, যার কোনো কূল-কিনারা ছিল না। বড় হওয়ার পর সময় হয়ে গেল মাপার পাত্রে রাখা এক নির্দিষ্ট তরল। এখন আমরা সময় মাপি। প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি ঘণ্টা এখন আমাদের কাছে একেকটি বিনিয়োগ। আমরা এখন আর সময় কাটাই না, আমরা সময় খরচ করি।

আনন্দ জিনিসটাও এখন আর হঠাৎ করে ছাদে কিংবা বৃষ্টিতে ভেজা রাস্তায় নামে না। এখন আমাদের আনন্দ করার জন্য সপ্তাহান্তের অপেক্ষা করতে হয়, অ্যালার্ম দিয়ে ছুটি কাটাতে হয়। স্বতঃস্ফূর্ত হাসির জায়গা নিয়েছে রুটিনমাফিক সামাজিক হাসিমুখ। স্বাধীনতা এসেছে ঠিকই, কিন্তু সেই স্বাধীনতার হাত ধরে ঘরে ঢুকেছে এক অদ্ভুত, সুসজ্জিত নিঃসঙ্গতা।

আজ হঠাৎ পুরোনো ড্রয়ার ঘাঁটতে গিয়ে যখন ধুলোমাখা একটি কাঁচের গুলি বা পুরোনো রাবার হাতে ঠেকে, তখন সেগুলোকে আর নিছক বস্তু মনে হয় না। মনে হয়, এগুলো যেন কোনো এক বিলুপ্ত সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক জীবাশ্ম। ওই বস্তুগুলো প্রমাণ করে যে, এই শরীরটার ভেতরে একসময় সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষ বাস করত, যার স্পন্দনের সাথে আজকের আমার কোনো মিল নেই।

আমরা ক্রমশ বুঝতে শুরু করি, বয়সের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার নাম বড় হওয়া নয়। বড় হওয়া মানে হলো অভিকর্ষের চাপ বাড়তে থাকা। এক অদৃশ্য দায়িত্বের ভারে প্রতিদিন একটু একটু করে মাটির দিকে নুয়ে পড়া। সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা মানেই যে পরিণামের ভার একা বয়ে বেড়ানোর নিঃশব্দ শাস্তি, তা আমরা অনেক পরে জেনেছি।

সবচেয়ে মর্মান্তিক সত্য হলো, কেউ আমাদের শৈশব থেকে জোর করে বের করে দেয়নি। কেউ আমাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বয়স্কদের এই ধুলোমাখা পৃথিবীতে পাঠায়নি।

আমরা নিজেরাই স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়েছিলাম। আমরা নিজেরাই লাটাই মাটিতে ফেলে দিয়ে হাতে তুলে নিয়েছিলাম ব্রিফকেস। আমরাই ভেবেছিলাম, এই পথটা আমাদের মুক্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের কেউ হারায়নি, আমরা নিজেরাই নিজেদের হারিয়ে যাওয়ার মানচিত্র এঁকেছিলাম।

আজ এত বছর পর, সেই টিকিটটার দিকে তাকালে অক্ষরগুলো যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে টিকিটটাকে আমরা স্বাধীনতার পাসপোর্ট ভেবেছিলাম, তার অন্য পিঠে আসলে লেখা ছিল এক অলঙ্ঘনীয় নির্বাসনের আদেশ।

প্রকৃত নির্বাসন তা নয়, যখন কেউ আপনাকে জোর করে দেশছাড়া করে। সবচেয়ে নির্মম নির্বাসন হলো সেটি, যখন আপনি নিজে হাসিমুখে আপনার মাতৃভূমির দরজা পার হয়ে আসেন এবং নিজের হাতে চাবিটা সমুদ্রে ছুড়ে ফেলে দেন, এই ভেবে যে আপনি স্বাধীন হলেন।

আমাদের বড় হওয়াটা হয়তো জরুরি ছিল। প্রকৃতির নিয়মে আমাদের এই রূপান্তর মেনে নিতেই হতো। কিন্তু যা কিছু জরুরি, তার যে কোনো চড়া মূল্য থাকে না—এমন তো নয়। আমরা বড় হয়েছি, এটাই হয়তো স্বাভাবিক; কিন্তু আমরা আর কখনো ছোট হতে পারব না, এটাই শূন্যতা।

আজ আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। আমাদের হাতে এখন অনেক ক্ষমতা, পকেটে টাকা, আর নিজেদের জীবন নিজেদের মতো চালানোর পূর্ণ অধিকার। কিন্তু এই বিশাল, স্বাধীন স্টেশনে দাঁড়িয়ে যখন বুকপকেট থেকে সেই পুরোনো টিকিটটা বের করি, তখন এক চরম স্তব্ধতা আমাদের গ্রাস করে। আমরা বুঝতে পারি, টিকিটটা আমাদের গন্তব্যে ঠিকই পৌঁছে দিয়েছে—শুধু মহাকালের কাউন্টারে শৈশবে ফেরার কোনো রিটার্ন টিকিট ছাপানোই হয়নি।