যে চিঠির কোনো প্রাপক নেই
মফস্বল শহরের পুরোনো পৈতৃক বাড়ির চিলেকোঠার ঘরে একটা ভারী সেগুন কাঠের আলমারি ছিল। বহু বছর ধরে এর দরজা খোলা হয়নি। বাবার মৃত্যুর পর আজ প্রথম আমি মরচে-ধরা চাবিটা দিয়ে এর পাল্লা দুটো খুললাম। ভেতর থেকে এক ঝাপটা স্যাঁতস্যাঁতে বাতাস, পুরোনো কাগজের ধুলো আর কর্পূরের গন্ধ এসে আমার মুখে লাগল। তাকগুলোর ওপর স্তরে স্তরে সাজানো পুরনো দলিল, জমির পর্চা, পলিথিনে মোড়ানো কয়েকটা বাতিল ঘড়ি আর চামড়ার মলাট দেওয়া কিছু পুরোনো ডায়রি। সেই ডায়রিগুলোর একটা সরাতে গিয়ে একটা হলদেটে খাম মাটিতে পড়ে গেল।
খামটা একদম আনকোরা নয়। এর কোণাগুলো সামান্য দুমড়ানো, আর মুখটা আঠা দিয়ে খুব সন্তর্পণে আটকানো। ডান দিকের ওপরের কোণায় একটা পুরোনো ডাকটিকিটও লাগানো আছে। কিন্তু খামের ওপরে, যেখানে প্রাপকের নাম আর ঠিকানা থাকার কথা, সেই জায়গাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। গাঢ় নীল কালিতে শুধু 'প্রাপক' শব্দটা লেখা, তার নিচে কোনো মানুষের নাম নেই, কোনো শহরের পিন কোড নেই। একটা দীর্ঘ শূন্যস্থান কেবল অপেক্ষা করছে।
আমি খামটা হাতে নিয়ে মেঝেতে বসে পড়লাম। একটা বদ্ধ খাম, যার ভেতরে হয়তো একটা চিঠি আছে, অথচ তার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। এই সাধারণ দৃশ্যটা আমাকে হঠাৎ এমন একটা মনস্তাত্ত্বিক অস্বস্তির ভেতর ফেলে দিল, যার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আমরা সাধারণত ভাবি, মানুষের জীবনে না-বলা কথার প্রধান কারণ হলো সাহসের অভাব। আমরা মনে করি, ঠিক সময়মতো মনের জোরটুকু সঞ্চয় করতে পারলে হয়তো সব কথা বলে ফেলা যেত। কিন্তু এই ঠিকানাবিহীন খামটা আমাকে একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাল। আমাদের ভেতরে এমন অনেক অনুভূতি থাকে, যা অনুচ্চারিত থেকে যায় সাহসের অভাবে নয়; বরং সেই অনুভূতিগুলো গ্রহণ করার মতো সঠিক কোনো প্রাপক আর পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকে না বলে।
আমার আর বাবার সম্পর্কটা কখনো খুব তিক্ত ছিল না, আবার খুব সহজও ছিল না। আমাদের মাঝখানে সবসময় একটা অদৃশ্য, ভারী পর্দা ঝোলানো থাকত—যার নাম 'সম্মান' অথবা 'দূরত্ব'। আমি ছোটবেলা থেকেই একটা নিখুঁত, বাধ্য সন্তানের অভিনয় করে গেছি। তিনি যা চেয়েছেন, যেটাকে একটা নিরাপদ 'ক্যারিয়ার' বা স্থিতিশীল জীবন বলে বিশ্বাস করেছেন, আমি বিনা বাক্যব্যয়ে সেই ছকে নিজেকে আটকে নিয়েছি। আমার নিজের ভেতরে যে একটা প্রবল আপত্তি ছিল, একটা সম্পূর্ণ অন্যরকম জীবন যাপনের আকাঙ্ক্ষা ছিল—তা আমি কখনো তাকে বলিনি। আমি ভাবতাম, একদিন যখন আমি আমার নিজের পায়ে দাঁড়াব, যেদিন সমাজ আমাকে সফল বলে স্বীকৃতি দেবে, সেদিন আমি তাকে আমার ভেতরের এই দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভ আর ক্লান্তির কথাগুলো বলব। আমি তাকে বলব, "আপনার স্বপ্নের ছাঁচে নিজেকে ঢালতে গিয়ে আমি আমার নিজের অস্তিত্বকে কতবার খুন করেছি, তা কি আপনি জানেন?"
কিন্তু সেই 'একদিন' আর কখনো আসেনি। আমি বড় হয়েছি, সফল হয়েছি। আর তার সাথে সাথে বাবাও বদলে গেছেন। যে কড়া, রাশভারী মানুষটার কাছে আমার কৈশোরের সমস্ত অভিযোগ জমা ছিল, তিনি ধীরে ধীরে একজন শান্ত, দুর্বল, আর স্মৃতিভ্রম হওয়া বৃদ্ধে পরিণত হলেন। তখন আমি হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, আমার সেই তীব্র অভিযোগ আর অভিমানগুলো জানানোর কোনো জায়গা আর নেই। যে মানুষটার ওপর আমার রাগ ছিল, সেই মানুষটা আর অস্তিত্বেই নেই। তার জায়গায় বসে আছেন এমন একজন মানুষ, যিনি আমার একটুখানি সঙ্গ পাওয়ার জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করেন। তখন আমার সেই পুরোনো ক্ষোভগুলো কার কাছে পাঠাব? একটা চল্লিশ বছর বয়সী মানুষের প্রতি জমা হওয়া অভিমান তো একজন সত্তর বছর বয়সী ক্লান্ত বৃদ্ধের কাছে ডেলিভারি দেওয়া যায় না।
আবেগ আর অনুভূতিরও বোধহয় একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। একটা সময়ের পর সেগুলো আর কোনো নির্দিষ্ট মানুষের মাপে খাপ খায় না। এই যে ফাঁকা খামটা আমার হাতে, এর ভেতরে হয়তো এমন কোনো স্বীকারোক্তি ছিল, যা কেবল একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তের জন্যই সত্য ছিল। মুহূর্তটা পার হয়ে যাওয়ার পর, সেই স্বীকারোক্তির আর কোনো গন্তব্য নেই।
আমরা সারা জীবন ধরে এমন কতগুলো ঠিকানাবিহীন চিঠি বুকের ভেতর জমিয়ে রাখি। হয়তো কোনো এক পুরনো বন্ধুর কাছে আমাদের একটা ক্ষমা চাওয়ার কথা ছিল। কোনো একদিন তুচ্ছ একটা কারণে তর্ক হয়েছিল, তারপর অহংকার আর ব্যস্ততার অজুহাতে আর কথা বলা হয়নি। যখন মনে হলো যে ক্ষমাটা চাওয়া দরকার, তখন দেখলাম সেই বন্ধুটির জীবনের মানচিত্র এত বদলে গেছে যে, আমার এই দেরিতে আসা অনুশোচনার সেখানে আর কোনো জায়গা নেই। হয়তো মায়ের কাছে একটা ছোট কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কথা ছিল। যে দিনগুলোতে তিনি নিজের শখগুলোকে গলা টিপে মেরে আমাদের পাতে ভালো খাবারটা তুলে দিতেন, সেদিন আমরা বুঝতে পারিনি। যখন বুঝলাম, তখন তিনি এমন একটা জগতে চলে গেছেন যেখানে আমাদের কোনো ডাকটিকিট আর পৌঁছায় না।
সবচেয়ে অদ্ভুত লাগে যখন বুঝতে পারি, এই যে প্রাপক হারিয়ে যাওয়ার ট্র্যাজেডি—এর জন্য অন্য কেউ নয়, আমি নিজেই সম্পূর্ণ দায়ী। আমি নিজেই তো দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছি। আমি ভেবেছি, অনুভূতিগুলো প্রকাশের একটা নিখুঁত সময় আসবে। আমি আমার প্রাত্যহিক 'রুটিন', অফিসের ব্যস্ততা আর সামাজিক মানরক্ষার আড়ালে নিজের নীরবতাকে একটা পরিণত মানুষের লক্ষণ বলে চালিয়ে দিয়েছি। আমি আসলে ভয় পেয়েছিলাম। একটা মানুষকে তার চোখের দিকে তাকিয়ে সত্যি কথাটা বলার যে মানসিক শ্রম, আমি সেই শ্রমটুকু দিতে চাইনি। তাই আমি ক্রমাগত সময় কিনেছি। আমি ধরে নিয়েছিলাম, পৃথিবীর অন্যান্য সবকিছুর মতো মানুষের শোনার আগ্রহ আর বোঝার ক্ষমতাও অনন্তকাল আমার জন্য অপেক্ষা করবে। আমার এই অহংকার আর দীর্ঘসূত্রিতাই আসলে প্রাপকের নামটা চিরকালের মতো মুছে দিয়েছে।
আমাদের চারপাশের এই পৃথিবীতে সবকিছুর একটা নির্দিষ্ট হিসাব আছে। এই যে আলমারিটা আমি আজ পরিষ্কার করছি, এর ভেতরের প্রতিটি দলিল, প্রতিটি পর্চা, আর ব্যাংকের পাসবই আমাকে বলে দেবে আমার বাবার জীবনের অর্থনৈতিক মূল্য কতটুকু ছিল। সমাজ খুব সহজেই একটা মানুষের সম্পত্তি, তার পদবি আর তার সফলতার পরিমাপ করতে পারে। কিন্তু এই যে একটা বন্ধ খাম, এর ভেতরে যে একটা মানুষের না-বলা যন্ত্রণা, একটা আটকে থাকা দীর্ঘশ্বাস, অথবা একটা পৌঁছাতে না পারা ক্ষমা জমা হয়ে আছে—এর কোনো হিসাব, কোনো রসিদ সমাজের কাছে নেই। অথচ দিনের শেষে, যখন একটা মানুষ তার জীবনের সমস্ত হিসাব মেলাতে বসে, তখন ওই সফলতার দলিলগুলোর চেয়ে এই ঠিকানাবিহীন খামগুলোই তার বুকে বেশি ওড়ন তৈরি করে।
কখনো কখনো আমার মনে হয়, এই চিঠিগুলো কি কেবলই অন্যের জন্য লেখা? নাকি এগুলো আসলে আমাদের নিজেদেরই কোনো একটা পুরোনো সংস্করণের জন্য লেখা? যে ছেলেটা কৈশোরে নিজের ইচ্ছেগুলোকে গলা টিপে মেরেছিল, আমি হয়তো আজও সেই ছেলেটার কাছেই একটা ক্ষমাপ্রার্থনার চিঠি লিখে যাচ্ছি। আমি হয়তো তাকে বলতে চাইছি, "আমাকে মাফ করে দিস। আমি তোকে বাঁচাতে পারিনি।" কিন্তু নিজের অতীতের ঠিকানায় তো আর কোনো খাম পাঠানো যায় না। তাই সেগুলো কেবল একটা নামহীন 'প্রাপক' হয়ে আমাদের বর্তমানের কোণায় জমে থাকে।
বাইরে বিকেলের আলো ম্লান হয়ে আসছে। আলমারির ভেতরের স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধটা এখন আর ততটা তীক্ষ্ণ লাগছে না। আমি খামটার দিকে শেষবারের মতো তাকালাম। আমি চাইলেই এখন এই খামটা ছিঁড়ে ফেলতে পারি। অথবা একটা কলম নিয়ে এর ওপরে কোনো একটা নাম লিখে দিতে পারি। কিন্তু আমি তার কোনোটাই করলাম না।
আমি বুঝতে পারলাম, কিছু জিনিসের অসম্পূর্ণ থাকাই তাদের চূড়ান্ত পরিণতি। যে শব্দের কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই, তাকে জোর করে কোনো ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়ার চেয়ে বড় মিথ্যা আর কিছু হতে পারে না।
আমি খামটা আবার বাবার সেই পুরোনো ডায়রির ভাঁজে সযত্নে রেখে দিলাম। আলমারির দলিলপত্র আর পৈতৃক সম্পত্তির ফাইলের ঠিক পাশেই। এই বাড়ির জমি, ইট, আর কাঠ হয়তো আমার নামে আইনত হস্তান্তরিত হবে। কিন্তু এই ডায়রির পাতার ঠিকানাবিহীন খামটা আমাকে আজীবন মনে করিয়ে দেবে—পৃথিবীতে আমরা সবচেয়ে মূল্যবান যে জিনিসগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে পাই, সেগুলো আসলে সেইসব শব্দ, যেগুলো কখনো কারো কাছে পৌঁছাতে পারেনি।
যে চিঠির কোনো প্রাপক নেই

মন্তব্য (1)