www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর ভেতরে বাইরে

বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্র, তিন বছর মেয়াদি তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্র চালু আছে। এছাড়া বাংলাদেশ প্রাইজ বন্ড, ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউ. এস. ডলার প্রিমিয়াম বন্ড ও ইউ. এস. ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড নামে সঞ্চয় বন্ড চালু আছে। অন্যান্য স্কিমের মধ্যে রয়েছে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের-সাধারণ হিসাব, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক- মেয়াদী হিসাব ও ডাক জীবন বীমা এবং অ্যানুইটি।
সঞ্চয়পত্র প্রচলনের পেছনে উদ্দেশ্য ছিলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে জনগণকে আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা প্রদান, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থ পাচার রোধ, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট রোধ, সরকারি ঋণের সুষম ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি। এসব উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার সময়ে সময়ে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার পর্যালোচনা করে থাকে। কাজেই সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বাড়ানো বা কমানো নতুন কোন বিষয় নয়। বাজারের সুদহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য না হলেই সুদের হার পর্যালোচনা করা হয়। প্রয়োজনে সরকার প্রতি বছর বা কয়েকবছর পরপর সুদের হার পর্যালোচনা করতে পারে। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২৩ মে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমিয়েছিল সরকার। বর্তমান বাস্তবতায় সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রাইভেট বা ব্যক্তিগত বাজেটের সাথে পাবলিক বা সরকারি বাজেটের একটি মৌলিক তফাৎ হলো ব্যক্তি পর্যায়ে আয় বুঝে ব্যয় করা হয়. অন্যদিকে সরকার ব্যয় বুঝে আয় করে। উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখনও উন্নয়ন কর্মকান্ডের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। এজন্য সরকার প্রতি বছর উন্নয়ন বাজেট করে থাকে। উন্নয়ন বাজেটের আরেক নাম ঘাটতি বাজেট। ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে বৈষম্য দূর করে টেকসই উন্নয়ন করার লক্ষ্য নিয়ে চলতি (২০১৮-১৯) অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে। অনুদানসহ মোট আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। ফলে বাজেটে ঘাটতি থাকছে ১ লাখ ২১ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। সরকার ১২ মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। বিগত পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) সঞ্চয়পত্র থেকে নিট বিনিয়োগ এসেছে ২১ হাজার ৬৬১ কোটি ৯৩ লক্ষ টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮৩ শতাংশ।সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ এতটাই বেড়ে গেছে যে, বর্তমানে বছরে এ ঋণের সুদবাবদ সরকারকে ব্যয় করতে হচ্ছে ৫৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন-ভাতায় বছরে যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয় তার থেকেও এ ব্যয় এক হাজার কোটি টাকা বেশি। তাই শিগগিরই সঞ্চয়পত্র বিক্রির লাগাম টানা দরকার।
সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে সরকার সরাসরি জনগণের উপর নির্ভরশীল। তাই সরকারের পক্ষে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে আগাম ঋণসীমা নির্ধারণ করা কঠিন। জনগণ বেশি সঞ্চয়পত্র ক্রয় করলে সরকারের ঋণের পরিমাণ বাড়বে। আবার জনগণ কম সঞ্চয়পত্র ক্রয় করলে সরকারের ঋণের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। সেক্ষেত্রে সরকারকে ঋণের ভিন্ন উৎস অনুসন্ধান করতে হবে। সম্ভাব্য ও সহজলভ্য অভ্যন্তরীণ উৎস হলো ব্যাংকিং খাত। কিন্তু ব্যাংকে আমানত ঘাটতি থাকলে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কেননা এ অবস্থায় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করলে ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দিতে পারে। সুতরাং সুষম ঋণ ব্যবস্থাপনার স্বার্থেই সরকারকে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাড়ানো/কমানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।
বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে আমানতের গড় সুদহার ৪.২৩ শতাংশ। আমানতের সুদহার কমানোর পেছনের প্রধান কারণ হলো ঋণের সুদ কমানো। সরকার উপর্যপরি দুই দফা ঋণের সুদ হার কমানোর ঘোষণা দেয়। বর্তমানে ঋণের গড় সুদহার ৯.৪৯ শতাংশ এবং আমানত ও ঋণের সুদ হারের পার্থক্য ৩ শতাংশ। ঋণের সুদ হার কমানোর পেছনে সরকারের সুপ্ত উদ্দেশ্য আছে বলে প্রতীয়মান হয়। বর্তমানে দেশে তরুণ সমাজের একটি বৃহৎ অংশ বেকার। সরকার তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে চায়। এক্ষেত্রে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি তথা প্রাইভেট সেক্টরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের লক্ষ্য। এজন্য স্বল্প সুদে ঋণ সহজলভ্য করা হয়েছে। তবে ঋণ সহজলভ্য করতে গিয়ে ব্যাংকের আমানতের সুদ অনেক কমে গেছে। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রের সুদ দীর্ঘসময় ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের গড় সুদ হার ১১ শতাংশের উপরে। ফলে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে। বর্তমানে মানুষের মোট সঞ্চয়ের ৩২ শতাংশ সঞ্চয়পত্রে এবং অভিযোগ আছে এর ৮০ শতাংশ অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ হয়েছে। এহেন পরিস্থিতিতে সঞ্চয়পত্র বিক্রির লাগাম টানা ছাড়া সরকারের হাতে বিকল্প পথ নেই।
জনগণ সঞ্চয়পত্রে বেশি না কম বিনিয়োগ করবে তা কতিপয় বিষয়ের উপর নির্ভর করে। ব্যাংকের আমানত সুদহার, পুঁজিবাজারের অবস্থাসহ অন্যান্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র কতটুকু নিরাপদ- এসব বিষয় উল্লেখযোগ্য। যেমন ২০১৫ সালের ২৩ মে তারিখে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমলেও বিক্রি কমেনি, বরং বেড়েছে। বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেসময় ব্যাংকগুলোতে আমানতের সুদের হার ছিলো কম। আবার পুঁজিবাজারে দীর্ঘ মন্দা বিরাজ করছিলো। এসব কারণে একটু বেশি লাভের আশায় সবাই ‘নিরাপদ’ বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকেছিল।
বিগত প্রায় এক দশক ধরে মুদ্রাষ্ফীতি সরকারের নিয়ন্ত্রণেই আছে – এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তাই সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে বাজারে নগদ অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের যে কৌশল রয়েছে তা বর্তমান বাস্তবতায় প্রয়োগ না করলেও চলে। তবে অর্থ পাচার রোধ করতে সঞ্চয়পত্র যে ভূমিকা পালনের কথা তা পুরোপুরি সফল হয়েছে – এ কথা বলা যাবে না। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেগ্রিটির তথ্যমতে, ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে ৫৯০ কোটি ডলার বা ৫০ হাজার কোটি টাকা। তাই অর্থ পাচার রোধ করতে সরকারকে অপরাপর কৌশল প্রয়োগ জোরদার করতে হবে।
বিষয়শ্রেণী: সমসাময়িক
ব্লগটি ১৪৬ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ০৫/০২/২০১৯

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast