আমরা যারা চাকরি করি, তারা অফিসের নির্দিষ্ট কোনো একটি বিভাগে (যেমন: অ্যাকাউন্টস, মার্কেটিং কিংবা সেলস) দায়িত্ব পালন করি। মাস শেষে সেই দায়িত্বের বিপরীতে আমরা নির্দিষ্ট অংকের বেতন এবং বোনাসও পাই। এটিই প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের ঘরে থাকা মা, বোন কিংবা স্ত্রীরা কোনো বেতন বা বোনাসের আশা ছাড়াই একাধারে কতগুলো বড় বড় ডিপার্টমেন্ট একা হাতে সামলান!
চলুন, একজন গৃহিণীর (Housewife) প্রতিদিনের অদৃশ্য দায়িত্বগুলোর দিকে একটু নজর দেওয়া যাক:
১. ঘরের ভেতরের 'মাল্টি-ডিপার্টমেন্টাল' অফিস
ম্যানেজমেন্ট (সংসার পরিচালনা): সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সংসারের প্রতিটি কাজ নিখুঁতভাবে গুছিয়ে রাখা এবং পুরো ঘরকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে চালানো।
অ্যাকাউন্টস সেকশন (আর্থিক সমন্বয়): বাজারের বাজেট থেকে শুরু করে সংসারের ছোট-বড় খরচের হিসাব সীমিত আয়ের মধ্যে মিলিয়ে নেওয়া।
বেবি সিটার (সন্তান লালন-পালন): সন্তানের সার্বিক যত্ন, পড়ালেখা এবং তাদের মানসিক বিকাশের জন্য সার্বক্ষণিক সময় দেওয়া।
ডাক্তার ও নার্স (সেবাশুশ্রূষা): পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে দিন-রাত জেগে তার সেবা করা এবং ওষুধের রুটিন ঠিক রাখা।
ইনস্পেকশন (তত্ত্বাবধান): ঘরের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং সবার প্রয়োজন ঠিকঠাক মিটছে কিনা তা সার্বক্ষণিক নজরে রাখা।
যদি করপোরেট দুনিয়ার সাথে তুলনা করা হয়, তবে একজন নারী একাই একটি প্রতিষ্ঠানের ৫-৬টি গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন করছেন। সেই হিসাবে একজন গৃহিণীর বেতন পুরুষের চেয়ে অন্তত চার গুণ বেশি হওয়া উচিত ছিল। অথচ তারা কোনো আর্থিক প্রতিদানের আশা না করেই ভালোবেসে এই কাজগুলো করে যান।
২. "নারীবাদ" বনাম অধিকারের বাস্তবতা
অনেকে হয়তো এই ধরনের আলোচনাকে "নারীবাদী লেখা" বলে উড়িয়ে দিতে চাইবেন। কিংবা বলবেন, "স্বামী এত টাকা কোথায় পাবে?"। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো—কেউ তো বেতন বা টাকা চাচ্ছে না। এটা কেবল তাদের এই অমানুষিক পরিশ্রমের প্রতি এক ধরণের স্বীকৃতি ও সম্মান মনে করিয়ে দেওয়া।
আজকাল সমাজে নারী অধিকার নিয়ে কথা বলা লেখিকাদের সংখ্যা বাড়ছে এবং এটা বাড়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, দিনের পর দিন নারীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
৩. ইসলাম প্রদত্ত অধিকার ও আমাদের সামাজিক দ্বিমুখী নীতি
আমাদের সমাজে অনেকেই ধর্মীয় অনুশাসন পালনের দাবি করলেও, নারীর অধিকার ও সম্পদের ভাগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামের নিয়মগুলো পুরোপুরি এড়িয়ে যান।
স্ত্রীর হক ও আর্থিক অনিশ্চয়তা: অনেক পুরুষের জমি-জমা বা ব্যাংকে প্রচুর টাকা থাকে, কিন্তু তার স্ত্রীর হাতে জরুরি প্রয়োজনে খরচ করার মতো কোনো টাকা থাকে না। স্বামী অসুস্থ হলে বা মারা গেলে সেই নারীকে চরম আর্থিক সংকটে পড়তে হয়।
বোনের সম্পদের অধিকার: বাবা মারা যাওয়ার পর ভাইয়েরা সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন, কিন্তু বোনের যে হক্ক বা অংশ রয়েছে, তা দিতে চান না। বোন জীবিত এবং সুস্থ থাকা অবস্থায় তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া ভাইয়ের ধর্মীয় দায়িত্ব।
ভাইয়ের মৃত্যুর পর ভাবীর অধিকার: কোনো ভাই মারা গেলে, তার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে তার স্ত্রীর যে অধিকার রয়েছে, তা অনেক সময় যৌথ পরিবারের নামে বাকি ভাইয়েরা আত্মসাৎ করেন। মৃত ভাইয়ের স্ত্রীর হক বুঝিয়ে দেওয়া হয় না।
৪. মায়ের অধিকার ও শেষ বয়সের অবহেলা
পিতার মৃত্যুর পর সন্তানরা সম্পদ ভাগাভাগি করতে যতটা তৎপর থাকে, মায়ের অধিকার নিশ্চিত করতে ততটাই উদাসীন। ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী, স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে। কিন্তু সন্তানরা মায়ের অংশ বুঝিয়ে তো দেয়ই না, উল্টো শেষ বয়সে মায়ের ভরণপোষণ ও চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে একে অপরের ওপর দায় চাপায়।
অথচ মা যদি তার প্রাপ্য সম্পদ পেতেন, তবে শেষ বয়সে নিজের প্রয়োজনে সেই সম্পদ ব্যবহার করে বা বিক্রি করে নিজের চিকিৎসা ও ভরণপোষণের খরচ নিজেই চালাতে পারতেন। তাকে সন্তানদের মুখাপেক্ষী হতে হতো না।
৫. শেষ বয়সের "দান" ও আইনি চাতুর্য
আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যায়। বোনকে আজীবন তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে, একদম শেষ বয়সে বা মৃত্যুর আগে ভাইয়েরা বোনের বাড়ি গিয়ে কিছু টাকা বা উপহার দিয়ে আসেন। অনেকে আবার এই সুযোগে ভাগ্নেদের হাত থেকে সম্পদ বাঁচাতে বোনকে দিয়ে লিখিত বা টিপসই করিয়ে নেন। বোনের প্রাপ্য অধিকারকে জীবদ্দশায় বুঝিয়ে না দিয়ে, শেষ সময়ে এসে এভাবে "ভিক্ষা" বা দয়া দেখানোর মতো আচরণ কখনোই ইসলামসম্মত নয়।
আমাদের করণীয়: নারীদের প্রকৃত সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ
নারীদের মুখে শুধু অধিকারের বুলি না আউড়ে, আমাদের পুরুষদের মানসিকতা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। ইসলাম নারীকে যে অধিকার দিয়েছে, তা হাত পেতে নেওয়ার জিনিস নয়, তা পুরুষদের নিজে থেকে দিয়ে দেওয়া উচিত।
স্ত্রীর নামে ব্যাংকে কিছু টাকা জমিয়ে রাখুন, যেন যেকোনো বিপদে তিনি ব্যবহার করতে পারেন।
সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে গয়না কিনে দিন, যা নারীদের একটি বড় আর্থিক সুরক্ষা।
যদি সম্ভব হয়, স্ত্রীর নামে কিছু জমি বা সম্পত্তি কিনে দিন এবং এমনভাবে উইল (Will) বা দলিল করে দিন যেন সন্তানেরা চাইলেও মায়ের জীবদ্দশায় তা বিক্রি বা দখল করতে না পারে।
শেষ কথা: নারীরা দয়া চান না, তারা তাদের প্রাপ্য সম্মান এবং ইসলাম ও আইন প্রদত্ত অধিকার চান। আমরা যদি ঘরে-বাইরে তাদের এই অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারি, তবেই একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠন সম্ভব।
ইসলাম নারীকে মা, বোন, স্ত্রী ও কন্যা হিসেবে যে অসামান্য সম্মান ও সম্পদের সুনির্দিষ্ট অধিকার দিয়েছে, আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বাস্তব জীবনে তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বোনকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা, স্ত্রীর আর্থিক নিরাপত্তা না দেওয়া কিংবা ভাইয়ের মৃত্যুর পর ভাবীর হক্ক আত্মসাৎ করার মতো অন্যায়গুলো আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটছে।
এই ধারাবাহিক বঞ্চনা ও অধিকারহীনতার অবদমন থেকেই নারীদের মনে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের জন্ম হয়েছে। যখন একজন নারী দেখেন যে ধর্মীয় ও আইনি অধিকার থাকা সত্ত্বেও তাকে শেষ বয়সে অবহেলা বা অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে বাঁচতে হচ্ছে, তখন তিনি কলম ধরতে বাধ্য হন।
মূল কথা হলো: সমাজে নারীবাদী লেখিকাদের সংখ্যা বাড়ার মূল কারণ পুরুষদের অন্যায় আচরণ এবং নারীদের অধিকার হরণ। পুরুষরা যদি ইসলাম প্রদত্ত নারীর প্রকৃত অধিকার ও সম্মান স্বেচ্ছায় বুঝিয়ে দিত, তবে সমাজ থেকে এই ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সুর এমনিতেই মুছে যেত। অধিকার আদায়ে কলম ধরা তখন আর প্রয়োজন হতো না।

মন্তব্য (1)