“আফগানিস্তানের রাজধানীর নাম কী?”

আচমকা আমার প্রশ্ন শুনে প্রতিমা ভীষণ চমকে গিয়েছিল। এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়েছিল, যেন আমি তাকে রাজধানীর নাম নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কোনো ধাঁধা জিজ্ঞেস করে বসেছিলাম।

এক মিনিট থেমে ও বলেছিল, “কাবুল। কেন, হঠাৎ রাজধানীর নাম জেনে কী হবে?”

আমি মুখে যতটা সম্ভব নিরীহ ভাব এনে বলেছিলাম, “এই ঠান্ডায় কানটা কেমন জানি কাজ করছে না। আরেকবার বলো তো, কী বললে যেন?”

প্রতিমা ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়েছিল।

“কাবুল।”

“কী?”

এবার ও একটু জোরে বলেছিল, “কা-বুল!”

আমি কানের কাছে হাত নিয়ে বলেছিলাম, “আহা, একটু আস্তে বলো। এত চিৎকার করছ কেন? আবার বলো তো, লাস্ট টাইম, প্লিজ!”

প্রতিমা এবার বিরক্ত হয়ে প্রায় চেঁচিয়েই বলেছিল, “আরে ভাই, কাবুল!”

“ইউরেকা!”

আমি দাঁত বের করে এমনভাবে হেসেছিলাম, যেন জীবনে প্রথমবার কোনো অঙ্কের উত্তর মেলাতে পেরেছি।

প্রতিমা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “তোমার কী হয়েছে?”

“কই? কিছুই তো হয়নি!”

“তাহলে এমন হাসছ কেন?”

“মানুষ কি হাসতেও পারবে না?”

“পারবে। কিন্তু তোমার হাসিটা দেখে মনে হচ্ছে, তুমি কোনো একটা বদমায়েশি করেছ।”

আমি বুকের ওপর হাত রেখে আহত গলায় বলেছিলাম, “ছি ছি, প্রতিমা! তুমি আমাকে এত খারাপ ভাবো?”

“হ্যাঁ।”

“এতটুকুও বিশ্বাস নেই?”

“না।”

“বাহ্‌! বন্ধুত্বের এই নমুনা!”

প্রতিমা এবার হেসে ফেলেছিল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “আচ্ছা, এবার সত্যি করে বলো। রাজধানীর নাম হঠাৎ জানতে চাইলে কেন?”

আমি গম্ভীর মুখে বলেছিলাম, “ইতিহাসের সাক্ষী থাকো, প্রিয়তমা!”
কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে যেতেই থেমে গেলাম।
প্রতিমা চোখ ছোট করে বলল, “কী বললে?”
আমি কাশির ভান করে বললাম, “প্রিয়... প্রিয়... প্রিয় প্রশ্ন! তোমার কাছে আমার অনেক প্রশ্ন আছে। সেটা একটা ইতিহাস”

“কিসের ইতিহাস?”

“আমাদের ইতিহাস।”

প্রতিমার হাসিটা একটু থেমে গিয়েছিল।
আমি লজ্জিত মুখে বলেছিলাম, “আরে, মানে আমাদের বন্ধুত্বের ইতিহাস!”

“ওহ্‌! তা তোমার ইতিহাসে আমার ভূমিকা কী?”

“গুরুত্বপূর্ণ।”

“কতটা গুরুত্বপূর্ণ?”

আমি একটু ভেবে বলেছিলাম, “পরীক্ষার খাতায় ফুল মার্কস পাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ।”

প্রতিমা হেসে বলেছিল, “তোমার মাথাটা সত্যিই গেছে।”

আমি মনে মনে বলেছিলাম, মাথা ঠিক থাকলে কি আর তোমার প্রেমে পড়তাম, ম্যাডাম?

আসলে আমার কাজিনরাই আমাকে এই বুদ্ধিটা দিয়েছিল। ওদের যুক্তি ছিল, তিনবার ‘কবুল’ বললে নাকি বিয়ে হয়ে যায়। সেই থেকে আমার মাথায় একটা মহৎ পরিকল্পনা এসেছিল—প্রতিমাকে দিয়ে তিনবার ‘কাবুল’ বলিয়ে নেব, তারপর নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ ঘোষণা করব।

পরিকল্পনাটা যে কতটা বোকামিপূর্ণ ছিল, সেটা তখনো বুঝিনি।

প্রতিমা হঠাৎ আমার সামনে হাত নাড়তে নাড়তে বলেছিল, “এই যে, কোথায় হারিয়ে গেলে?”

আমি চমকে উঠে বলেছিলাম, “কোথাও না!”

“তাহলে চুপ করে আছ কেন?”

“তোমার সৌন্দর্য দেখে বাক্‌শক্তি হারিয়ে ফেলেছি।”

কথাটা বলেই মনে হয়েছিল, আজ বুঝি নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারলাম।

প্রতিমা কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিল, “কী বললে?”

আমি তাড়াতাড়ি বলেছিলাম, “তোমার... তোমার বুদ্ধি দেখে! বুদ্ধি দেখে বাক্‌শক্তি হারিয়েছি।”

“তাই নাকি?”

“একদম!”

“তাহলে তোমার বুদ্ধিটা একটু পরীক্ষা করি?”

আমি ঢোক গিলে বলেছিলাম, “কী পরীক্ষা?”

প্রতিমা মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করেছিল, “বাংলাদেশের রাজধানীর নাম কী?”

আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেছিলাম, “ঢাকা!”

“বাহ্‌! এটা তো জানো। আচ্ছা, তিন আর তিনে কত?”

“ছয়।”

“আর পাঁচ আর পাঁচে?”

“দশ।”

প্রতিমা এবার দুহাত কোমরে রেখে বলেছিল, “তাহলে বলো তো, তিনবার ‘কাবুল’ বললে কী হয়?”

আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠেছিল।

আমি যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলেছিলাম, “আফগানিস্তানের রাজধানীর নাম তিনবার বলা হয়।”

“তাই?”

“হ্যাঁ।”

“তা হলে তুমি একটু আগে ইউরেকা বলে চিৎকার করলে কেন?”

আমি মুখ চুলকাতে চুলকাতে বলেছিলাম, “আনন্দে।”

“কীসের আনন্দে?”

“রাজধানীটা মনে রাখতে পেরেছি বলে।”

প্রতিমা এবার এমনভাবে হেসেছিল যে পাশ দিয়ে যাওয়া দু-একজনও ফিরে তাকিয়েছিল।

“নিলয়, তুমি একটা আস্ত গাধা!”

আমি প্রতিবাদ করে বলেছিলাম, “গাধা হলে এত সুন্দর পরিকল্পনা করতে পারতাম?”

“কী পরিকল্পনা?”

“সেটা গোপনীয়।”

“ওহ্‌! তা হলে তোমার গোপনীয় পরিকল্পনাটা তোমার কাছেই থাকুক।”

কথাটা বলে প্রতিমা ব্যাগটা কাঁধে তুলে হাঁটতে শুরু করেছিল।

আমি পেছন পেছন গিয়ে বলেছিলাম, “আচ্ছা, রাগ করলে নাকি?”

“না।”

“তাহলে কথা বলছ না কেন?”

“কথা বলার মতো বুদ্ধিমান কাউকে খুঁজছি।”

“এই যে আমি!”

“তোমাকে তো বাদই দিলাম।”

আমি বুকের বাঁ পাশে হাত রেখে বলেছিলাম, “আহা! এ কেমন নিষ্ঠুরতা!”

প্রতিমা হেসে মাথা নাড়তে নাড়তে এগিয়ে গিয়েছিল।

আমি ওর পেছনে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে ভেবেছিলাম, পরিকল্পনা ব্যর্থ হলেও দিনটা মন্দ কাটেনি। অন্তত প্রতিমাকে এতক্ষণ হাসাতে পেরেছিলাম।

কিন্তু ঠিক তখনই ও হঠাৎ থেমে গিয়েছিল।

“নিলয়?”

“হ্যাঁ?”

“একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”

“করো।”

প্রতিমা কয়েক মুহূর্ত আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিল, “তুমি কি কাউকে ভালোবাসো?”

প্রশ্নটা শুনে আমার পায়ের নিচের রাস্তা পর্যন্ত কেমন অচেনা মনে হয়েছিল।

আমি হেসে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে বলেছিলাম, “হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?”

“এমনিই। উত্তর দাও।”

“না।”

প্রতিমা আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসেছিল।

“মিথ্যে বললে তোমার বাঁ ভ্রুটা একটু কেঁপে ওঠে, জানো?”

আমি তাড়াতাড়ি ভ্রুতে হাত দিয়েছিলাম।

ও হেসে বলেছিল, “দেখলে? আবার কাঁপল!”

আমি লজ্জা ঢাকতে বলেছিলাম, “তুমি অতিরিক্ত গোয়েন্দাগিরি করো।”

“আর তুমি অতিরিক্ত মিথ্যে বলো।”

তারপর ও আবার হাঁটতে শুরু করেছিল। আমি পেছনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

আমার মনে হয়েছিল, হয়তো ও কিছু বুঝতে পেরেছে। হয়তো আবার কিছুই বোঝেনি।

কিন্তু বাড়ি ফেরার আগে প্রতিমা একবার পেছনে ফিরে যে কথাটা বলেছিল, সেটা আমার সমস্ত হিসাব এলোমেলো করে দিয়েছিল।

“আর হ্যাঁ, নিলয়—তোমার ওই তিনবার ‘কাবুল’ বলানোর পরিকল্পনাটা তোমার কাজিনদের কাছেই রেখো। আমি বোকা নই!”

আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম।

মানে, সবটা ও বুঝে গিয়েছিল!

আমি যখন এই হিসাব মেলানোর চেষ্টা করছিলাম, ঠিক তখনই প্রতিমা আবার ফিরে এসে আমার হাতে একটা ছোট্ট কাগজ গুঁজে দিয়েছিল।

“এটা কী?” আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম।

“ঘরে গিয়ে পড়ো।”

“কী লেখা আছে?”

“এত কৌতূহল ভালো না।”

ও চলে গিয়েছিল।

আমি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েই কাগজটা খুলেছিলাম।

ভেতরে মাত্র এক লাইন লেখা ছিল—

“নিলয়, তুমি যদি সত্যিই কাউকে ভালোবেসে থাকো, তাহলে তাকে বোকা বানানোর বদলে একদিন সত্যিটা বলার সাহস কোরো।”

কাগজটা হাতে নিয়ে আমি অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

প্রতিমা কি জানত?

আমার মনের কথাটা?

নাকি কথাটা নিছক বন্ধুত্বের খুনসুটি ছিল?

সেদিন প্রথমবার আমার মনে হয়েছিল, হয়তো প্রতিমাকে দিয়ে তিনবার ‘কাবুল’ বলিয়ে নেওয়ার চেয়ে অনেক কঠিন একটা কাজ আমার সামনে অপেক্ষা করছিল।

নিজের ভালোবাসার কথাটা ওকে বলা।

আর সেই কাজটার জন্য কোনো কাজিনই আমাকে বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য করতে পারত না।