সপ্তম ও শেষ পর্ব: প্রিয় প্রেয়সী বধু
সময় কারও জন্য থেমে থাকে না। দেখতে দেখতে কেটে গেল কয়েকটি মাস। মূসা ও রৌদ্রময়ীর সংসারে এখন নতুন এক অপেক্ষা। তাদের ঘরে আসবে নতুন অতিথি।
রৌদ্রময়ীর শরীর আগের মতো নেই। কখনো ক্লান্ত লাগে, কখনো কিছু খেতে ইচ্ছে করে না। তবুও তার মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। কারণ তার ভেতরেই বেড়ে উঠছে তাদের ভালোবাসার ছোট্ট একটি অংশ।
মূসা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি যত্নশীল। অফিস থেকে ফিরে স্ত্রীর পাশে বসে, তার শরীরের খোঁজ নেয়, সময়মতো ওষুধ খেতে মনে করিয়ে দেয়।
একদিন রাতে রৌদ্রময়ী বিছানায় শুয়ে ছিল। মূসা পাশে বসে তার পায়ের কাছে বালিশ ঠিক করে দিচ্ছিল।
রৌদ্রময়ী মুচকি হেসে বলল,
— তুমি আজকাল আমাকে এত ভয় পাও কেন?
মূসা অবাক হয়ে বলল,
— ভয় পাই না তো!
— তাহলে এত যত্ন করো কেন?
— কারণ এখন তোমার ভেতরে শুধু তুমি নও, আমাদের আরেকটা ছোট্ট মানুষও আছে।
রৌদ্রময়ী হেসে বলল,
— তাহলে আমি কি এখন দুজনের দায়িত্ব?
মূসা তার হাত ধরে বলল,
— তুমি আমার কাছে সব সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর এখন তোমার যত্ন নেওয়া আমার আরও বড় দায়িত্ব।
রৌদ্রময়ী লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
দিনগুলো এভাবেই কেটে যাচ্ছিল। মূসার বাবার শরীরও আগের চেয়ে অনেকটা ভালো। পরিবারের সবাই নতুন অতিথির অপেক্ষায় দিন গুনছিল।
একদিন সন্ধ্যায় মূসা অফিস থেকে ফিরে দেখল, রৌদ্রময়ী বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
সে কাছে গিয়ে বলল,
— কী ভাবছো?
রৌদ্রময়ী বলল,
— ভাবছি, আমাদের সন্তান বড় হয়ে কেমন হবে!
মূসা পাশে বসে বলল,
— তোমার মতো হলে ভালো হয়।
— কেন?
— তোমার মতো মায়াবী মন হলে, মানুষের কষ্ট বুঝতে শিখবে। আর আমার মতো হলে একটু দুষ্টু হবে।
রৌদ্রময়ী হেসে বলল,
— তাহলে তো আমাদের সন্তানকে সামলানোই কঠিন হবে!
মূসা হেসে তার কাঁধে হাত রাখল।
— আমরা দুজন মিলে সামলে নেব।
হঠাৎ রৌদ্রময়ী মূসার দিকে তাকিয়ে বলল,
— একটা কথা বলব?
— বলো।
— আমাদের জীবনে এত কিছু ঘটল। কখনো অভিমান, কখনো ভুল বোঝাবুঝি, কখনো অভাব, আবার কখনো ভয়। তুমি কি কখনো ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলে?
মূসা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— হয়েছিলাম। কিন্তু তোমার হাতটা যখন আমার হাতে পেয়েছি, তখন মনে হয়েছে, সবকিছু আবার শুরু করা সম্ভব। সংসারে সমস্যা আসবেই। কিন্তু দুজন মানুষ যদি একে অপরকে ছেড়ে না যায়, তাহলে অনেক কঠিন সময়ও পার হয়ে যায়।
রৌদ্রময়ী মূসার কাঁধে মাথা রাখল।
— আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, মূসা।
মূসা মৃদু হেসে বলল,
— জানি। আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি, আমার প্রিয় প্রেয়সী বধু।
কয়েক সপ্তাহ পর এক রাতে রৌদ্রময়ীর প্রসবব্যথা শুরু হলো। মূসা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। পরিবারের সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
হাসপাতালের করিডোরে মূসা অস্থিরভাবে হাঁটছিল। কিছুক্ষণ পর চিকিৎসক বেরিয়ে এসে হাসিমুখে বললেন,
— অভিনন্দন! আপনাদের একটি কন্যাসন্তান হয়েছে। মা ও মেয়ে দুজনেই ভালো আছে।
কথাটা শুনে মূসার চোখে আনন্দের পানি চলে এল।
— আলহামদুলিল্লাহ!
সে প্রথমেই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করল।
কিছুক্ষণ পর তাকে মেয়েকে দেখানো হলো। ছোট্ট শিশুটিকে দেখে মূসার মনে হলো, পৃথিবীর সব সুখ যেন এক মুহূর্তে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
সে শিশুটির কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলল,
— স্বাগতম, আমার ছোট্ট রাজকন্যা।
এরপর মূসা রৌদ্রময়ীর কাছে গেল। সে ক্লান্ত, কিন্তু মুখে প্রশান্তির হাসি।
মূসা তার হাত ধরে বলল,
— কেমন আছো?
রৌদ্রময়ী মৃদু হেসে বলল,
— ভালো আছি। আমাদের মেয়েটা কেমন?
— একদম তোমার মতো সুন্দর।
রৌদ্রময়ী হেসে বলল,
— আর স্বভাব?
— সেটা এখনো বোঝা যায়নি। তবে তোমার মতো অভিমানী হলে আমার কপালে দুঃখ আছে!
দুজনেই হেসে উঠল।
মূসা স্ত্রীর কপালে চুমু দিয়ে বলল,
— ধন্যবাদ, রৌদ্রময়ী। আমাকে এত সুন্দর একটা উপহার দেওয়ার জন্য।
রৌদ্রময়ী মৃদু স্বরে বলল,
— উপহার তো আমরাই পেয়েছি। আল্লাহ আমাদের একটা আমানত দিয়েছেন।
মূসা মাথা নেড়ে বলল,
— ঠিক বলেছো।
কয়েক দিন পর তারা মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরল। ছোট্ট ঘরটিতে এখন নতুন এক প্রাণের উপস্থিতি। শিশুর কান্না, হাসি আর পরিবারের সবার আনন্দে বাড়িটা যেন অন্যরকম হয়ে উঠল।
মূসার বাবা নাতনিকে কোলে নিয়ে দোয়া করলেন। রৌদ্রময়ী পাশে বসে হাসিমুখে দেখছিল।
রাতের দিকে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর মূসা মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে ছিল। রৌদ্রময়ী পাশে এসে বলল,
— এবার ঘুমাবে না?
মূসা শিশুটির দিকে তাকিয়ে বলল,
— আরেকটু দেখি। এত ছোট্ট একটা মানুষ আমাদের জীবনটা কত সুন্দর করে দিল!
রৌদ্রময়ী মুচকি হেসে বলল,
— তুমি কি জানো, আজ তোমাকে খুব সুখী লাগছে?
মূসা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— কারণ আমার পৃথিবীটা এখন পূর্ণ।
রৌদ্রময়ী মাথা নিচু করে হাসল।
মূসা মেয়েকে বিছানায় শুইয়ে স্ত্রীর পাশে এসে বসল। তারপর তার হাত ধরে বলল,
— জানো, আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বিষয় কী?
— কী?
— আমরা সবসময় ধনী ছিলাম না। আমাদের জীবনে অভাব এসেছে, দুশ্চিন্তা এসেছে, ভুল বোঝাবুঝিও হয়েছে। কিন্তু আমরা একে অপরের হাত ছাড়িনি।
রৌদ্রময়ী বলল,
— কারণ ভালোবাসা শুধু সুন্দর সময়ে পাশে থাকার নাম নয়। কঠিন সময়েও একসঙ্গে থাকার নামই ভালোবাসা।
মূসা স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর প্রাপ্তি।
রৌদ্রময়ী তার কাঁধে মাথা রাখল।
বাইরে তখন গভীর রাত। জানালার ওপাশে চাঁদের আলো ছড়িয়ে আছে। ঘরের ভেতর ঘুমিয়ে আছে তাদের ছোট্ট রাজকন্যা। আর পাশাপাশি বসে আছে দুটি মানুষ, যারা একদিন এক শীতের সকালে এক কাপ চা ভাগ করে নিয়ে ভালোবাসার পথচলা শুরু করেছিল।
আজ তাদের জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু বদলায়নি একে অপরের প্রতি মায়া, সম্মান আর ভালোবাসা।
মূসা রৌদ্রময়ীর হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,
— আল্লাহ যেন আমাদের এই ভালোবাসা কবুল করেন। আমাদের সংসারে বরকত দেন। আর দুনিয়া ও আখিরাতে আমাদের একসঙ্গে রাখেন।
রৌদ্রময়ী চোখ বন্ধ করে বলল,
— আমিন।
তারপর মূসা মৃদু স্বরে ডাকল,
— আমার প্রিয় প্রেয়সী বধু!
রৌদ্রময়ী হেসে উত্তর দিল,
— জি, আমার প্রিয় স্বামী!
এভাবেই শেষ হলো মূসা ও রৌদ্রময়ীর ভালোবাসার গল্প।
তাদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
সংসার শুধু ভালোবাসার মিষ্টি মুহূর্ত দিয়ে তৈরি হয় না; তৈরি হয় বিশ্বাস, ধৈর্য, ক্ষমা, দায়িত্ব আর একে অপরের প্রতি সম্মান দিয়ে।
অভাব থাকতেই পারে, ভুল বোঝাবুঝি আসতেই পারে, জীবনে ঝড়ও উঠতে পারে। কিন্তু দুজন মানুষ যদি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে একে অপরের হাত ধরে রাখে, তাহলে ছোট্ট একটি ঘরও হয়ে উঠতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ঠিকানা।
সমাপ্ত।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।