চতুর্থ পর্ব: ভালোবাসার ঘরে সন্দেহের ছায়া

সকালের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে ঢুকেছে। মূসা ঘুম থেকে উঠে দেখল, রৌদ্রময়ী বিছানার এক পাশে চুপচাপ বসে আছে। তার হাতে ফোন। চোখেমুখে চিন্তার ছাপ।

মূসা কাছে এসে বলল,

— কী হয়েছে? এত সকালে ফোন নিয়ে বসে আছো কেন?

রৌদ্রময়ী তাড়াতাড়ি ফোনটা পাশে রেখে বলল,

— কিছু না। এমনিই দেখছিলাম।

মূসা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

— তোমার এই ‘কিছু না’ কথাটা এখন আমার খুব পরিচিত হয়ে গেছে।

রৌদ্রময়ী কোনো উত্তর দিল না।

মূসা একটু নরম স্বরে বলল,

— রৌদ্রময়ী, আমি কি তোমার কাছে এখনো আগের মতো আপন?

প্রশ্নটা শুনে সে চমকে উঠল।

— এসব কী বলছো?

— কিছু না। শুধু মনে হচ্ছে, তুমি আমার কাছ থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছো।

রৌদ্রময়ী মূসার হাত ধরে বলল,

— এমন কিছু নয়। তুমি অযথা ভাবছো।

মূসা আর কথা বাড়াল না। কিন্তু তার মনের ভেতর যে প্রশ্নগুলো জমতে শুরু করেছে, সেগুলোও আর আগের মতো সহজে দূর হচ্ছিল না।

সেদিন দুপুরে মূসা অফিসে যাওয়ার পর রৌদ্রময়ীর ফোনে আবার আরিফের কল এল। সে প্রথমে ধরতে চাইল না। কিন্তু বারবার কল আসতে থাকায় শেষ পর্যন্ত রিসিভ করল।

— কী চান আপনি?

ওপাশ থেকে আরিফ বলল,

— তোমার সঙ্গে একটু দেখা করা দরকার।

— আমি আগেই বলেছি, আপনার সঙ্গে আমার কোনো কথা নেই।

— বিষয়টা শুধু আমার আর তোমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, রৌদ্রময়ী। তোমার জানা দরকার এমন একটা কথা আছে।

— কী কথা?

— ফোনে বলা যাবে না। একবার দেখা করো।

রৌদ্রময়ী বিরক্ত হয়ে বলল,

— আপনি কেন বুঝতে চাইছেন না? আমার বিয়ে হয়েছে। আমার সংসার আছে। আমি আমার স্বামীর সঙ্গে ভালো আছি। দয়া করে আর যোগাযোগ করবেন না।

আরিফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— ঠিক আছে। তবে মনে রেখো, আমি তোমাকে কোনো বিপদে ফেলতে চাই না। শুধু একটা সত্যি জানাতে চাই।

রৌদ্রময়ী আর কোনো কথা না বলে ফোন কেটে দিল।

কিন্তু তার বুকের ভেতর অস্বস্তিটা আরও বেড়ে গেল।

বিকেলে মূসা বাসায় ফিরে দেখল, রৌদ্রময়ী বারান্দায় বসে আছে। সামনে এক কাপ চা, কিন্তু চায়ে হাত দেয়নি।

মূসা কাছে গিয়ে বলল,

— কী ভাবছো?

— কিছু না।

— আবার সেই একই উত্তর!

রৌদ্রময়ী এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

— সব সময় কি তোমাকে সবকিছু বলতে হবে?

মূসা থমকে গেল। এমনভাবে রৌদ্রময়ী আগে কখনো কথা বলেনি।

— আমি কি তোমাকে জোর করছি?

— না, কিন্তু তোমার এত প্রশ্ন আমার ভালো লাগছে না।

মূসা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

— ঠিক আছে। আর প্রশ্ন করব না।

কথাটা বলে সে ঘরে চলে গেল।

রৌদ্রময়ী বুঝতে পারল, কথাটা একটু বেশি কঠিন হয়ে গেছে। কিন্তু অভিমান আর অস্থিরতার কারণে সে মূসাকে ডেকে ক্ষমাও চাইতে পারল না।

রাতের খাবারের সময় দুজনের মধ্যে তেমন কোনো কথা হলো না। মূসা খাওয়া শেষ করে নিজের ঘরে চলে গেল। রৌদ্রময়ী টেবিল গোছাতে গোছাতে বারবার তার দিকে তাকাচ্ছিল।

কিছুক্ষণ পর সে ঘরে এসে দেখল, মূসা ফোনে কিছু একটা দেখছে।

রৌদ্রময়ী ধীরে ধীরে কাছে এসে বলল,

— তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছো?

মূসা ফোনটা রেখে বলল,

— না।

— তাহলে এমন চুপচাপ কেন?

— তুমি তো বলেছো, আমার এত প্রশ্ন তোমার ভালো লাগে না। তাই আর প্রশ্ন করছি না।

রৌদ্রময়ীর চোখ নিচু হয়ে গেল।

— আমি আসলে সেভাবে বলতে চাইনি।

মূসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— আমি তোমার অতীত নিয়ে কখনো প্রশ্ন তুলিনি। কিন্তু বর্তমানের কিছু বিষয় যখন আমার কাছ থেকে লুকানো হয়, তখন কষ্ট লাগে।

রৌদ্রময়ী চুপ করে রইল।

মূসা আবার বলল,

— তোমার ফোনে কারও কল আসে, তুমি অস্থির হয়ে পড়ো। কিছু জানতে চাইলে এড়িয়ে যাও। আমি কি এতটাই অপরিচিত যে তোমার কষ্টের কারণটাও জানতে পারব না?

রৌদ্রময়ীর চোখে পানি চলে এল।

— আমি তোমাকে হারাতে চাই না, মূসা।

মূসা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

— আমাকে হারানোর ভয় থাকলে আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছো কেন?

রৌদ্রময়ী কোনো উত্তর দিতে পারল না।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটি বার্তা এল। ফোনটা টেবিলের ওপর রাখা ছিল। স্ক্রিনে বার্তার কিছু অংশ ভেসে উঠল।

“আগামীকাল দেখা না করলে তোমার সংসারে এমন কিছু পৌঁছে যাবে, যা তুমি চাইবে না।”

মূসার চোখে বার্তাটা পড়ে গেল।

সে ধীরে ধীরে ফোনটার দিকে তাকাল। তারপর রৌদ্রময়ীর দিকে।

— এটা কার মেসেজ?

রৌদ্রময়ীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

— মূসা, আমি তোমাকে সব বলব।

— কে এই মানুষটা?

— একজন পুরোনো পরিচিত।

— সে তোমাকে এভাবে মেসেজ করছে কেন?

রৌদ্রময়ী কাঁপা গলায় বলল,

— আমি জানি না সে কেন এমন করছে। আমি তাকে বারবার নিষেধ করেছি।

মূসা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখে রাগের চেয়ে কষ্টই বেশি ছিল।

— তুমি কি তার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছো?

— না। কখনোই না।

— তাহলে ভয় পাচ্ছো কেন?

রৌদ্রময়ী এবার কান্নায় ভেঙে পড়ল।

— কারণ আমি জানি না, সে কী বলতে চাইছে। আর আমি এটাও জানি না, তার কথাগুলো আমাদের জীবনে কতটা সমস্যা তৈরি করবে।

মূসা তার পাশে এসে বসল।

— রৌদ্রময়ী, শোনো। বাইরের কেউ আমাদের সংসারে সমস্যা তৈরি করতে চাইলে আমরা তাকে সেই সুযোগ দেব না। কিন্তু তার জন্য আমাদের নিজেদের মধ্যে লুকোচুরি চলতে পারে না।

রৌদ্রময়ী চোখ মুছে বলল,

— আমি তোমাকে সব খুলে বলব। শুধু একটু সময় দাও।

মূসা তার হাত ধরে বলল,

— সময় দেব। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, বিশ্বাস ভেঙে গেলে শুধু ভালোবাসা দিয়ে সবকিছু আগের মতো করা যায় না। তাই সত্যিটা যত কঠিনই হোক, আমাদের সামনে আনতে হবে।

সেদিন রাতে দুজন পাশাপাশি শুয়ে ছিল, অথচ তাদের মাঝখানে যেন অদৃশ্য একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।

রৌদ্রময়ী বারবার মূসার দিকে তাকাচ্ছিল। বলতে চাচ্ছিল সবকিছু, কিন্তু শব্দগুলো যেন গলায় আটকে যাচ্ছিল।

অন্যদিকে মূসাও চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল। কিন্তু তার ঘুম আসছিল না।

সে ভাবছিল, যে মানুষটিকে সে এতটা বিশ্বাস করে, তার জীবনে এমন কী ঘটনা ঘটেছে, যা আজও তাকে এতটা ভীত করে রাখে?

রাত আরও গভীর হলো।

হঠাৎ রৌদ্রময়ীর ফোনে আবার একটি বার্তা এল।

এবার বার্তাটি ছিল আরও ছোট—

“তোমার স্বামীকে সত্যিটা জানার আগে আমার সঙ্গে একবার দেখা করতেই হবে।”

রৌদ্রময়ী ফোনটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।

সে জানত না, আগামীকাল তার জীবনে কী অপেক্ষা করছে।

আর মূসাও জানত না, তাদের ভালোবাসার ঘরে যে সন্দেহের ছায়া নেমে এসেছে, তার পেছনে লুকিয়ে আছে কত পুরোনো এক গল্প।

চলবে...