পর্ব-০৩: মনুষ্যত্ব

"তাহলে আগামী মাসে ডাবল ভাড়া দিই?"

আহমাদ মূসা কথাটা এমনভাবে বলল, যেন এই মাসের ভাড়া দিতে না পারাটা কোনো সমস্যাই নয়।

হিমু অনেকবার তাকে বুঝিয়েছে, সে তার শুধু রুমমেট নয়, বন্ধু, ভাই। তার কাছ থেকে ভাড়া নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু আহমাদ মূসার কথা একটাই, বিনা পয়সায় থাকলে তার আত্মসম্মান থাকে না।

তাই বিরক্ত হলেও হিমু আর কিছু বলল না।

আহমাদ মূসা গোসল করে কিছুক্ষণ ঘুমাল। রাত আটটার দিকে হিমু তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল।

উঠেই আহমাদ মূসা বলল,

"দোস্ত, আমার প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। সারাদিন কিছু খাইনি।"

হিমু বলল,

"আমরা তো ক্যান্টিনেই যাচ্ছি। ওখানে গিয়ে খেয়ে নিস। এখন তাড়াতাড়ি চল। আর বিতর্কের বিষয়টা তো জানিস?"

"কী বিষয়?"

"পুরুষরা জঘন্য, ঘৃণ্য পশু! আমরা এর বিপক্ষে।"

আহমাদ মূসা বিছানা থেকে উঠে তৈরি হতে লাগল।

দুজন একসঙ্গে রওনা দিল।

ক্যান্টিনে গিয়ে দেখা গেল, হিমু আর আহমাদ মূসাই সবার শেষে এসেছে। বাকিরা অনেক আগেই এসে বসে আছে।

তাদের দেখে বিউটি খান কী যেন বিড়বিড় করে বললেন। ছেলেরা শুধু 'সময়জ্ঞান' শব্দটা বুঝতে পারল।

যাই হোক, প্রথমে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। হিমু আড়চোখে লক্ষ করল, মিম মাঝেমধ্যেই আহমাদ মূসার দিকে তাকাচ্ছে।

বিষয়টা তার চোখ এড়াল না।

বিউটি খান বললেন,

"তাহলে শুরু করা যাক?"

মেয়েরা একসঙ্গে বলল,

"হ্যাঁ, শুরু করেন।"

ঠিক তখনই আহমাদ মূসা হিমুর কানে কানে বলল,

"দোস্ত, আমার প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। এখনই কিছু খাওয়া উচিত।"

হিমু একটু চিন্তায় পড়ে গেল।

এর আগে একটি ওয়ার্কশপে এক নারীনেত্রীর বক্তব্য শোনার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছিল তার। দশ মিনিট সময় চেয়ে সেই নারী প্রায় তিন ঘণ্টা বক্তব্য দিয়েছিলেন। তাও আবার চিৎকার করে।

শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানের উপস্থাপক বাধ্য হয়ে তার হাত থেকে মাইক্রোফোন কেড়ে নিয়েছিলেন। আর তখনই তিনি বলতে শুরু করেছিলেন,

"এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা পুরুষের অত্যাচারের শিকার। এমনকি বাইরে এসে দু-চারটে কথা বলার সুযোগটুকুও আমাদের দেওয়া হয় না। এই দেখুন, সামান্য একটু কথা বললাম, আর এই লোকটা আমার মাইক কেড়ে নিল!"

এরপর অনুষ্ঠানে রীতিমতো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল।

তাই আজও যদি একই ঘটনা ঘটে, তাহলে কারও রাতে খাওয়া হবে না।

বিশেষ করে আহমাদ মূসা যেহেতু সারাদিন কিছু খায়নি, তাই হিমু আর দেরি করল না।

সবার সামনেই খাবারের অর্ডার দিয়ে বসল সে।

বিউটি খান একটু বাঁকা হাসি দিয়ে বললেন,

"বাহ! আমাদের নরম করার জন্য আগেই খাইয়ে দিচ্ছেন?"

হিমু নিষ্পাপ মুখে উত্তর দিল,

"না, না। বিল তো যার যার, সে নিজেই দেবে। তবে যার যার পক্ষের অতিথিকে সেই পক্ষই খাওয়াবে।"

কথাটা শুনে বিউটি খানের মুখ এমনভাবে কুঁচকে গেল যে হিমুর ভয় হলো, ঠোঁটটা বুঝি মুখের ভেতরে হারিয়ে গেছে!

অবশেষে শুরু হলো বিতর্ক।

বিউটি খান গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে শুরু করলেন,

"আজকের বক্তব্যের বিষয়টি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং যৌক্তিক। 'পুরুষরা জঘন্য পশু'। এর চেয়ে বড় সত্য আর কিছু হতে পারে না। সময় যেহেতু স্বল্প, তাই আমি সংক্ষেপে কিছু কথা বলব।

আশপাশে তাকান আপনারা। তাকান!"

শান্ত আশপাশে তাকাল।

বিউটি খান আবার বললেন,

"দেখুন, নারীরা আজ কতটা নিগৃহীত, নির্যাতিত ও নিপীড়িত!"

শান্ত সুমনের কানে কানে বলল,

"কই দোস্ত, নির্যাতিত নারী?"

সুমন ফিসফিস করে বলল,

"চুপ কর!"

বিউটি খান বলতে থাকলেন,

"এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষরা নারীকে মানুষ বলেই মনে করে না। সারাদিন গাধার মতো ঘরে খাটায়। বাচ্চা জন্ম দিতে হয় নারীকে, সেগুলো পালন করতে হয় নারীকে, রান্না করতে হয়, ঘর মোছা, কাপড় কাচা, থালাবাসন ধোয়া, সব কাজ নারীকে করতে হয়। অথচ এসব কাজ বিনা বেতনে করিয়ে নেওয়া হয়!

আবার বাইরে বের হতেও দেওয়া হয় না। ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা হয়।"

ক্যান্টিনে তখন প্রায় ৩৫ জন মানুষ উপস্থিত। তাদের মধ্যে ২৩ জনই নারী। বাকি ১২ জন পুরুষের দুজন আবার ক্যান্টিনের কর্মচারী।

বিউটি খান বক্তব্য চালিয়ে গেলেন।

"বিয়ের ক্ষেত্রেও নারীদের স্বাধীনতা নেই। বাবার পছন্দ করা পাত্রের সঙ্গে সারাজীবন কাটাতে হয় বাধ্য হয়ে। সেই অপরিচিত মানুষের সব কথা মেনে চলতে হয়, যেন মধ্যযুগের কোনো দাসী!

একজন নারী বাইরে গিয়ে নিজের পছন্দমতো কাজ করতে গেলেও পুরুষ বাধা দেয়। অথচ অনেক পুরুষ আছে, যারা স্ত্রীর উপার্জনেই খায়। কিন্তু তারাই আবার স্ত্রীকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে চায় না।

এই যে সানি লিওন, নায়লা নাঈম, এরা নিজেদের পছন্দমতো কাজ করার সাহস দেখিয়েছে। আর পুরুষরা তাদের নিয়ে কত বাজে কথা বলে, অপমান করে! অথচ জনি সিন্সকে নিয়ে নারীরা তো এমন কিছু বলে না! কেন? কারণ, এটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ!"

এবার পুরো ক্যান্টিনের মানুষ নিশ্চুপ হয়ে বিউটি খানের বক্তব্য শুনতে লাগল।

কয়েকজন ছেলে মোবাইলে ভিডিও রেকর্ড করতে শুরু করেছে। কেউ কেউ আবার মজা নিচ্ছে।

রাহিয়া, মিম আর তিথির গাল লাল হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে হিমু, আহমাদ মূসা, সুমন আর শান্ত হা করে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।

ঠিক এমন সময় খাবার চলে এল।

ক্ষুধার তাড়নায় আহমাদ মূসা আর অপেক্ষা করতে পারল না। সে খাওয়া শুরু করে দিল।

বিউটি খান বিষয়টি লক্ষ করে বললেন,

"আর পুরুষরা যে পশু, সেটা বোঝার আরও অনেক উপায় আছে। সারাদিন কষ্ট করে রান্না করে মেয়েরা, আর পুরুষরা খাবার সামনে পেলেই গপাগপ খেতে শুরু করে। এই যে, এই টেবিলেই একজন মহিলা কষ্ট করে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, আরেকজন পুরুষ খাবার পেয়েই খাওয়া শুরু করে দিয়েছেন!"

আহমাদ মূসা মুখের খাবার থামিয়ে অপরাধীর মতো চোখ বড় করে তাকাল।

মেয়েরা মুচকি হাসতে লাগল।

যদিও মিম হাসল না।

হিমু বেশ বিরক্ত হলো। কিন্তু আগের অভিজ্ঞতা থেকে জানে, এই মহিলাকে এখন কিছু বলতে গেলেই তিনি চিৎকার করে পুরো ক্যান্টিনের মানুষকে জড়ো করে ফেলবেন।

এদিকে সুমন তিথির কানে কানে বলল,

"তোরা তো তর্কে কত ভালো ভালো যুক্তি দিস, বাস্তব ঘটনার উদাহরণ দিস। এই মহিলা এসব কী বলছে? কোনো আগা-মাথা তো খুঁজে পাচ্ছি না!"

তিথি সাধারণত নারীদের বিরুদ্ধে কিছু বললে বেশ প্রতিক্রিয়া দেখায়। কিন্তু আজ সে চুপ করে রইল।

বিউটি খান প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে বক্তব্য দিলেন।

সবাই যখন ভাবতে শুরু করেছে, অবশেষে বুঝি বক্তব্য শেষ হলো, ঠিক তখনই তিনি ব্যাগ থেকে একগাদা পত্রিকার কাটিং বের করলেন।

এবার শুরু হলো নারী নির্যাতন, ইভটিজিং ও ধর্ষণের খবর পড়া।

একটার পর একটা খবর পড়তে লাগলেন তিনি।

তবে প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে অপরাধী ধরা পড়েছে কি না, বিচার হয়েছে কি না, কিংবা অপরাধী শাস্তি পেয়েছে কি না, এসব বিষয় এড়িয়ে গেলেন।

হিমু লক্ষ করল, পত্রিকার উল্টো পাতায় বেশ কয়েকটি পরকীয়ার জেরে স্বামী হত্যার খবরও রয়েছে। কিন্তু বিউটি খান সেগুলো একবারও উল্লেখ করলেন না।

শান্ত বিষয়টি ধরিয়ে দিতেই বিউটি খান বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন।

তিনি বললেন,

"মহিলাটা পরকীয়া করেছে কার সঙ্গে? পুরুষের সঙ্গেই তো? একজন পুরুষের জন্য আরেকজন পুরুষ মরছে! একদম পশুদের মতো। সুতরাং মামলাটা এখানেই শেষ!"

শান্ত আর কিছু বলল না।

তবে পত্রিকার কাটিংয়ে থাকা কিছু নারী নির্যাতনের খবর সত্যিই হৃদয়বিদারক ছিল।

ছেলেদেরও মন খারাপ হয়ে গেল। অপরাধীদের প্রতি ঘৃণা তৈরি হলো তাদের মনে।

হিমু ভাবতে লাগল, কোনো নারীকে নির্যাতন করা, ধর্ষণ করা কিংবা হত্যা করার মতো জঘন্য অপরাধের কোনো যুক্তি হতে পারে না। অপরাধী পুরুষ হলে তার শাস্তি হওয়া উচিত। এখানে পুরুষের পক্ষ নেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।

ঠিক তখনই একটি খবরের দিকে তার চোখ আটকে গেল।

শ্বশুরবাড়িতে গৃহবধূ হত্যার খবর।

খবরটির বিবরণে বলা হয়েছে, শাশুড়ির অত্যাচারে গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। অথচ সংবাদটির শিরোনাম কিংবা পরবর্তী বিবরণে দায়ী করা হয়েছে স্বামীকে।

হিমু বিষয়টি নিয়ে একটু ভাবল।

শান্তও খেয়াল করল, এমন কয়েকটি খবরে একই ধরনের বর্ণনা রয়েছে।

তার মনে প্রশ্ন জাগল, শাশুড়ি যদি নির্যাতন করে থাকে, তাহলে স্বামীর দায় কতটুকু? স্বামী কি বিষয়টি জানত? সে কি নির্যাতন ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল, নাকি নীরব দর্শক হয়ে ছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে শুধু শিরোনাম দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কতটা যুক্তিসংগত?

হিমু মনে মনে ভাবল, সাংবাদিককে সামনে পেলে বিষয়টা জিজ্ঞেস করা যেত।

এদিকে শান্ত রাহিয়ার কানে কানে বলল,

"ভুল হয়ে গেছে দোস্ত। সময় বেঁধে দেওয়া উচিত ছিল।"

রাহিয়া অবাক হয়ে বলল,

"আমরা তো ৩০ মিনিট সময় দিয়েছিলাম!"

শান্তর চোখ প্রায় কপালে উঠে গেল।

"কী বলিস! তাহলে এই ৩০ মিনিটের বক্তব্য এখন পর্যন্ত তিন ঘণ্টা ধরে চলছে কেন?"

অবশেষে ৩ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ধরে ক্যান্টিনের টেবিলে ঝড় তুলে বিউটি খান তার 'সংক্ষিপ্ত' বক্তব্য শেষ করলেন।

রাত আটটায় সবাই এসেছিল। এখন প্রায় বারোটা বাজে।

বিউটি খান এবার একটু থেমে বললেন,

"আসলে দেরি হয়ে গেছে। এই ছেলেরা আমার বক্তব্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে বারবার ভুল ধরার চেষ্টা করেছে। আমার বক্তব্যের ধারাবাহিকতা নষ্ট করেছে। তাই তাদের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে একটু সময় বেশি লেগে গেছে আর কী!"

উপস্থিত সবাই বিরক্তির চোখে তাকাল।

মজার ব্যাপার হলো, ক্যান্টিনের সেই ৩৫ জন মানুষের একজনও এখনো চলে যায়নি। মেয়েরাও নয়।

সবাই এই বিতর্কের শেষ দেখতে চায়।

বিউটি খান এবার আহমাদ মূসার দিকে তাকিয়ে বললেন,

"আমরা আপনাকে বক্তব্যের মাঝে বাধা দেব না। প্রত্যেকের জন্য ৩০ মিনিট সময় বরাদ্দ। আপনি ঠিক ৩০ মিনিট সময় পাচ্ছেন আপনার কথা বলার জন্য।"

আহমাদ মূসা তখনো খাবারের প্লেটের দিকে তাকিয়ে ছিল।

একটু পর মুখ তুলে বলল,

"৩০ মিনিট? বেশ তো! তবে একটা অনুরোধ আছে।"

বিউটি খান বললেন,

"কী অনুরোধ?"

আহমাদ মূসা শান্তভাবে বলল,

"আমি কি আগে খাওয়াটা শেষ করতে পারি? কারণ, আমি সারাদিন কিছু খাইনি। আর খালি পেটে কথা বললে মাথা ঠিকমতো কাজ করে না।"

ক্যান্টিনে আবার হাসির রোল উঠল।

মিম এবারও হাসল না।

সে শুধু আহমাদ মূসার দিকে তাকিয়ে রইল।

হিমু বিষয়টি আবারও লক্ষ করল।

কিন্তু কেন যেন তার মনে হলো, আজকের রাতটা শুধু বিতর্কের রাত নয়। এর পরেও কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

[চলবে...]