পর্ব ১৮: শেষ অধ্যায়—আহমাদ মূসার মৃত্যু
“প্রতিটি গল্পের শেষ হয়। কিন্তু কিছু গল্প শেষ হওয়ার পরও বেঁচে থাকে—কোনো মানুষের স্মৃতিতে, কোনো পুরোনো চিঠিতে, কিংবা এমন একটি নামে, যার কোনো অস্তিত্ব থাকার কথা ছিল না।”
১. জীবিত মানুষের মৃত্যুসনদ
২৯ অক্টোবর ২০২৬।
সকাল ৮টা ১৭ মিনিট।
রৌদ্রময়ী টেবিলের সামনে বসে আছে। সামনে সেই জন্মসনদের অনুলিপি। নাম—রৌদ্রময়ী আহমাদ। জন্মতারিখ—২৮ অক্টোবর ১৯৯০। বর্তমান অবস্থা—জীবিত।
কিন্তু এই নথির কোনো ব্যাখ্যা নেই।
তার পরিচিত জীবন অনুযায়ী, তার জন্ম ২০০৫ সালে। তার মা মীরা এত দিন সেই পরিচয়ই সত্য বলে জানিয়েছেন। অথচ ১৯৯০ সালের জন্মসনদটি সরকারি সিলসহ তৈরি। নথিটি জাল হলে এত বছর ধরে সেটি সংরক্ষিত থাকল কীভাবে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যদি ১৯৯০ সালে জন্ম নেওয়া রৌদ্রময়ী এখনও জীবিত থাকে, তবে ২০০৫ সালে জন্ম নেওয়া সে কে?
রৌদ্রময়ী ফোন তুলে মাকে কল করল।
“মা, তোমার কাছে একটা প্রশ্ন আছে।”
ওপাশে মীরার ক্লান্ত কণ্ঠ।
“বল।”
“আমার জন্ম কবে?”
দীর্ঘ নীরবতা।
“তুই জানিস, মা।”
“না। আমি জানি, তুমি আমাকে কী বলেছ। আমি জানতে চাই, সত্যিটা কী।”
মীরা কেঁদে ফেললেন।
“তোর জন্ম ২০০৫ সালে। আমি তোকে জন্ম দিয়েছি। তুই আমার মেয়ে। এই সত্যিটা কেউ বদলাতে পারবে না।”
“তাহলে ১৯৯০ সালের জন্মসনদটা কার?”
“আমি জানি না।”
“মা, তুমি কি ১৯৯৮ সালে একটা মেয়েকে হারিয়েছিলে?”
ওপাশে কান্নার শব্দ আরও বেড়ে গেল।
“হ্যাঁ।”
“তার নাম কি রৌদ্রময়ী ছিল?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে তুমি আমাকে একই নাম দিলে কেন?”
মীরা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “কারণ আমি তাকে ভুলে যেতে পারিনি।”
রৌদ্রময়ী চোখ বন্ধ করল।
“তুমি আমাকে তার বদলে ভালোবেসেছিলে?”
“না!” মীরার কণ্ঠ ভেঙে গেল। “তুই আমার মেয়ে। তোকে আমি তোর নিজের জন্য ভালোবেসেছি। কিন্তু তোর নামের মধ্যে আমার হারিয়ে যাওয়া মেয়েটির স্মৃতি ছিল। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো কোনো দিন তাকে আবার খুঁজে পাব।”
“কিন্তু তুমি তো বলেছিলে, সে তোমার মেয়ে ছিল না।”
“আমি ভয় পেয়েছিলাম।”
“কিসের ভয়?”
মীরা উত্তর দিলেন, “যদি সত্যিটা বলি, তুই নিজেকে হারিয়ে ফেলবি।”
রৌদ্রময়ী জানালার বাইরে তাকাল।
“মা, সত্যিটা না জেনে আমি অনেক দিন ধরেই নিজেকে হারিয়ে রেখেছি।”
সে ফোন রেখে দিল।
এবার তাকে খুঁজে বের করতে হবে সেই মানুষটিকে, যার নাম তার জন্মসনদে স্বাক্ষর করা আছে।
আহমাদ মূসা।
২. প্রথম লেখকের মেয়ে
ছবির পেছনে লেখা ঠিকানাটি ছিল পুরোনো শহরের এক নিরিবিলি গলিতে। সেখানে পৌঁছাতে দুপুর হয়ে গেল।
বাড়িটি ছোট। দেয়ালে পুরোনো রং। দরজার পাশে কোনো নামফলক নেই।
রৌদ্রময়ী কড়া নাড়ল।
একজন বৃদ্ধা দরজা খুললেন।
বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি। সাদা চুল, শান্ত চোখ। তাঁর বাম ভ্রুর ওপর ছোট একটি কাটা দাগ।
রৌদ্রময়ীর নিঃশ্বাস আটকে গেল।
বৃদ্ধা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
“অনেক দেরি করে ফেলেছ।”
এই বাক্যটি রৌদ্রময়ী আগেও শুনেছে।
কিন্তু এবার কথাটা বলছে একজন জীবিত মানুষ।
“আপনি কে?”
বৃদ্ধা দরজা থেকে সরে দাঁড়ালেন।
“ভেতরে এসো। তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আগে তোমাকে আমার গল্পটা শুনতে হবে।”
ঘরের ভেতরে বইয়ের তাক। পুরোনো পাণ্ডুলিপি। জানালার পাশে একটি লাল ডায়েরি।
বৃদ্ধা চেয়ারে বসে বললেন, “আমার নাম নীরা।”
“আপনি কি ১৯৯৮ সালের সেই রৌদ্রময়ী?”
নীরা মাথা নাড়লেন।
“আমার নাম তখন রৌদ্রময়ী আহমাদ ছিল। পরে নাম বদলে নীরা করা হয়।”
রৌদ্রময়ী চুপ করে রইল।
নীরা বললেন, “আমি অনিরুদ্ধ সেনের গল্পের চরিত্র ছিলাম না। আমি বাস্তবের একটি শিশু ছিলাম। আমার বাবা ছিলেন লেখক। তিনি নিজের নামের বদলে আহমাদ মূসা ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন।”
“তাহলে প্রথম আহমাদ মূসা আপনার বাবা?”
“হ্যাঁ। কিন্তু নামটা তাঁর নিজেরও ছিল না। তাঁর বাবা তাঁকে এই নাম দিয়েছিলেন। তাঁদের পরিবারে নামটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে চলে আসত।”
“আপনার বাবার আসল নাম কী ছিল?”
নীরা একটু থামলেন।
“আরিফ আহমেদ রহমান।”
রৌদ্রময়ীর বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল।
আরিফ।
এই গল্পে কতবার এই নাম এসেছে! কখনো মৃত মানুষ, কখনো জীবিত মানুষ, কখনো শিশু, কখনো লেখক।
নীরা যেন তার মনের কথা পড়ে ফেললেন।
“এই নামটি অনেকের ছিল। কিন্তু আমার বাবা আরিফ আহমেদ রহমান ছিলেন প্রথম লেখক, যিনি আহমাদ মূসা নামটিকে একটি চরিত্র হিসেবে লিখেছিলেন।”
“তাহলে অনিরুদ্ধ সেন?”
“তিনি বাবার লেখা পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করতেন। পরে বাবার মৃত্যুর পর সেই নাম ব্যবহার করতে শুরু করেন। তিনি ভেবেছিলেন, বাবার গল্পগুলো বাঁচিয়ে রাখছেন। কিন্তু ধীরে ধীরে গল্প আর বাস্তবের সীমা তাঁর কাছে অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।”
রৌদ্রময়ী বলল, “আপনি ১৯৯৮ সালে মারা যাননি?”
নীরা মাথা নাড়লেন।
“না। আমি নিখোঁজ হয়েছিলাম। আমার বাবা বিশ্বাস করতেন, আমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু আমাকে অন্য পরিচয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বহু বছর আমি জানতামই না, আমার আসল নাম কী।”
“তাহলে আপনার মৃত্যুসনদ?”
“কেউ একজন আমাকে মৃত ঘোষণা করেছিল। হয়তো আমাকে আড়াল করার জন্য, হয়তো অন্য কাউকে বাঁচানোর জন্য। আমি আজও জানি না।”
রৌদ্রময়ী ধীরে বলল, “আর আমার জন্মসনদ?”
নীরা তার দিকে তাকালেন।
“তোমার জন্মসনদ সত্যি। তুমি ২০০৫ সালে জন্মেছ। কিন্তু ১৯৯০ সালের নথিটা তোমার নয়।”
“তাহলে কার?”
“আমার।”
ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।
নীরা বললেন, “আমার জন্মের নথিতে পরে তোমার নাম বসানো হয়েছিল। কেন, কে করেছিল, তা আমি জানি না। কিন্তু তোমার মা সেই নথি দেখে বিশ্বাস করেছিলেন, আমি একদিন ফিরে আসব।”
“আপনি জানতেন আমি আছি?”
“না। আমি শুধু জানতাম, আমার নাম নিয়ে আরেকজন মেয়ে বেঁচে আছে।”
রৌদ্রময়ীর চোখে জল এসে গেল।
“তাহলে এত দিন ধরে আমি কার স্মৃতি বহন করেছি?”
নীরা তার হাত ধরলেন।
“কিছু স্মৃতি আমার হতে পারে। কিছু তোমার নিজের। আর কিছু হয়তো গল্পের মধ্যে জন্মেছে। কিন্তু তোমার কষ্ট তোমারই। তোমার ভালোবাসা তোমারই। তোমার বেঁচে থাকার অধিকারও তোমারই।”
রৌদ্রময়ী আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে কেঁদে ফেলল।
বহু বছরের প্রশ্নের উত্তর পেয়েও তার মনে হলো, সে যেন আরও বড় একটি শূন্যতার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
কারণ নীরা বাস্তব।
তার নামও বাস্তব।
কিন্তু আহমাদ মূসা?
সে কি এখনও কোথাও আছে?
৩. যে চিঠি কখনো পাঠানো হয়নি
নীরা আলমারি থেকে একটি কাঠের বাক্স বের করলেন।
“তোমার জন্য এটা রেখে গিয়েছিলেন তোমার নানাভাই।”
রৌদ্রময়ী অবাক হলো।
“আপনি আমার নানাভাইকে চিনতেন?”
“তিনি আমাকে খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু তখন আমার স্মৃতি খুব দুর্বল ছিল। আমি নিজের নামও মনে করতে পারতাম না। তিনি আমাকে কিছু পুরোনো কাগজ দেখিয়েছিলেন। তার মধ্যে একটি পাণ্ডুলিপি ছিল, যেখানে আমার নাম লেখা।”
“তিনি কি জানতেন, আমি একদিন আপনার কাছে আসব?”
“তিনি জানতেন, তুমি প্রশ্ন করবে। কিন্তু কখন, তা জানতেন না।”
বাক্সের ভেতরে একটি চিঠি।
খামের ওপর লেখা—
“রৌদ্রময়ীর জন্য। যখন সে নিজের নামকে আর ভয় পাবে না।”
রৌদ্রময়ী চিঠিটা খুলল।
রৌদ্রময়ী,তুমি যখন এই চিঠি পড়বে, তখন হয়তো বুঝবে, আমি তোমার কাছ থেকে অনেক কিছু লুকিয়েছি।আমি তোমাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু রক্ষা করার নামে তোমার প্রশ্নগুলোকে বন্দি করে রেখেছিলাম।তোমার নামের সঙ্গে অন্য একটি মেয়ের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কিন্তু তুমি তার প্রতিস্থাপন নও। তুমি তার অসমাপ্ত জীবনও নও।তুমি নিজের জীবন।আহমাদ মূসা নামটি বহু মানুষ ব্যবহার করেছে। কেউ লেখক হিসেবে, কেউ চরিত্র হিসেবে, কেউ নিজের অপরাধ ঢাকতে, কেউ অন্য কাউকে বাঁচাতে।কিন্তু যে নাম একবার মানুষের মনে আশ্রয় পায়, তাকে আর কোনো মৃত্যুসনদ দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।আমি জানি না, আহমাদ মূসা সত্যিই কখনো একজন মানুষ ছিল কি না। আমি শুধু জানি, এই নামটি তোমাকে বাঁচতে সাহায্য করেছে।তাই তাকে খুঁজে পেলে তাকে জিজ্ঞেস কোরো না, সে কে।তাকে জিজ্ঞেস কোরো, সে তোমার কাছ থেকে কী চায়।যদি সে তোমার জীবন চায়, তাকে ফিরিয়ে দিও।যদি সে তোমার স্বাধীনতা চায়, তাকে বিদায় দিও।আর যদি সে তোমাকে বাঁচতে বলে, তবে তার কথা শোনো।কারণ কোনো গল্পের চরিত্রের জন্য মানুষের বেঁচে থাকা বন্ধ হয়ে যেতে পারে না।— তোমার নানাভাই।
রৌদ্রময়ী চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরল।
নীরা বললেন, “তোমার নানাভাইয়ের একটা ভুল ছিল। তিনি ভেবেছিলেন, সব রহস্যের উত্তর পেলে মানুষ শান্তি পায়।”
“আর আপনি কী মনে করেন?”
“মানুষ শান্তি পায় যখন সে বুঝতে পারে, সব প্রশ্নের উত্তর তার নিজের কাছে থাকা জরুরি নয়।”
রৌদ্রময়ী জানালার বাইরে তাকাল।
বিকেলের আলো নরম হয়ে এসেছে।
সে প্রথমবার অনুভব করল, নিজের পরিচয় জানার জন্য তাকে আর অন্য কারও জীবনের মধ্যে ঢুকে থাকতে হবে না।
কিন্তু একটি প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে।
আহমাদ মূসা।
যে তাকে সেই অন্ধকার রাতে বাঁচতে বলেছিল।
যে তার অতীতের এমন সব তথ্য জানত, যা জানার কথা নয়।
যে তার নিজের ফোন থেকে মেসেজ পাঠিয়েছিল বলে নথিতে দেখা গেছে।
সে কি শুধু তার মনের তৈরি কোনো আশ্রয়?
নাকি কেউ সত্যিই তার পাশে ছিল?
নীরা যেন তার প্রশ্ন বুঝতে পারলেন।
“তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও, তাহলে শেষ জায়গাটায় যেতে হবে।”
“কোথায়?”
“যেখানে প্রথম পাণ্ডুলিপি লেখা হয়েছিল।”
৪. আহমাদ মূসার শেষ ঘর
পুরোনো প্রকাশনা সংস্থা ‘অলিখিত অধ্যায়’-এর পেছনে ছিল একটি ছোট ঘর। বহু বছর ধরে সেটি বন্ধ।
দরজার ওপরে কোনো নম্বর নেই।
ভেতরে একটি টেবিল, দুটি চেয়ার, একটি টাইপরাইটার এবং দেয়ালে ঝোলানো একটি ঘড়ি।
ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে সকাল ৮টা ১৭ মিনিটে।
রৌদ্রময়ী দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।
টেবিলের ওপর একটি পাণ্ডুলিপি।
মলাটে লেখা—
“অস্তিত্বহীন আহমাদ মূসা।”
কিন্তু এবার লেখকের নামও আছে।
লেখক: রৌদ্রময়ী আহমাদ।
তার নিচে হাতে লেখা—
“শেষ অধ্যায়টি লেখকের নয়। পাঠকের।”
রৌদ্রময়ী চেয়ারে বসল।
পাণ্ডুলিপির প্রথম পাতায় লেখা—
“একটি মেয়ে ছিল, যে বিশ্বাস করত, তার জীবনের সব ঘটনা আগে থেকেই লেখা আছে। সে নিজের দুঃখকে ভাগ্য ভাবত, নিজের একাকিত্বকে অভিশাপ ভাবত। একদিন এক অচেনা নাম তার কাছে এল—আহমাদ মূসা। নামটি তাকে বলল, রাতটা পার করে দাও।”
রৌদ্রময়ী পড়তে থাকল।
তার জীবনের গল্প।
কিন্তু কিছু কিছু অংশ আলাদা।
যেখানে সে আত্মহত্যার কথা ভেবেছিল, সেখানে লেখা—
“মেয়েটি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে তার জন্য আর কোনো জায়গা নেই। ঠিক তখনই ফোনে একটি মেসেজ এল—‘তুমি যদি আজ বেঁচে থাকো, আগামীকাল তোমার গল্পের অর্থ বদলে যেতে পারে।’”
রৌদ্রময়ীর চোখ ভিজে উঠল।
সে মনে করতে পারে, সেই মেসেজটি পেয়ে সে মাকে ফোন করেছিল।
কিন্তু সে এটাও মনে করতে পারে, মাকে ফোন করার সিদ্ধান্তটা সে নিজেই নিয়েছিল।
তাহলে কে তাকে বাঁচিয়েছিল?
একটি মেসেজ?
একজন অচেনা মানুষ?
নাকি নিজের ভেতরের সেই ক্ষীণ ইচ্ছেটুকু, যা শেষ মুহূর্তেও বেঁচে থাকতে চেয়েছিল?
পাণ্ডুলিপির শেষ পাতায় এসে সে থামল।
সেখানে লেখা—
“আহমাদ মূসা একদিন মারা যাবে। কিন্তু তার মৃত্যু হবে না কোনো দুর্ঘটনায়, কোনো রোগে, কোনো মানুষের হাতে। সে মারা যাবে সেদিন, যেদিন মেয়েটি আর নিজের জীবন চালানোর জন্য তার ওপর নির্ভর করবে না।”
রৌদ্রময়ী কলম তুলে নিল।
পাতার নিচে একটি ফাঁকা জায়গা।
সে লিখল—
“আজ, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, আমি আহমাদ মূসাকে বিদায় জানাচ্ছি।”
তারপর একটু থেমে যোগ করল—
“তুমি বাস্তব ছিলে কি না, আমি জানি না। তুমি আমার কল্পনা ছিলে কি না, সেটাও জানি না। কিন্তু তুমি আমাকে এমন একটি রাতে বাঁচতে বলেছিলে, যখন আমি নিজেই নিজের কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না। সেই জন্য তোমার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তবে আজ থেকে আমার জীবন আমার নিজের। আমার গল্পের পরের পাতায় তোমার অনুমতি লাগবে না।”
লেখা শেষ করতেই ঘরের মধ্যে একটা ক্ষীণ শব্দ হলো।
টাইপরাইটারের রোলার নিজে থেকেই ঘুরল।
একটি সাদা কাগজ বেরিয়ে এল।
তার ওপর লেখা—
“ধন্যবাদ, রৌদ্রময়ী।”
তার নিচে—
“এবার তুমি বেঁচে থাকো।”
রৌদ্রময়ী চারদিকে তাকাল।
ঘরে কেউ নেই।
জানালা বন্ধ।
দরজাও বন্ধ।
শুধু টেবিলের ওপর রাখা পাণ্ডুলিপির শেষ পাতায় ধীরে ধীরে কালির একটি দাগ ফুটে উঠল।
একটি নাম।
আহমাদ মূসা।
তারপর নামটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
ঘড়ির কাঁটা নড়ল।
৮টা ১৭ মিনিট থেকে ৮টা ১৮ মিনিট।
আটাশ বছর ধরে থেমে থাকা সময় এক মিনিট এগিয়ে গেল।
রৌদ্রময়ী চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল।
সে বুঝল, এই ঘরে তার আর কিছু খোঁজার নেই।
৫. অস্তিত্বের শেষ সাক্ষী
বাড়ি ফিরে রৌদ্রময়ী প্রথমেই মাকে ফোন করল।
“মা, আমি নীরার সঙ্গে দেখা করেছি।”
মীরা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “সে বেঁচে আছে?”
“হ্যাঁ।”
“সে কি আমাকে ক্ষমা করেছে?”
রৌদ্রময়ী উত্তর দিল, “সে বলেছে, তোমার ভয়টা সে বুঝতে পারে। কিন্তু ক্ষমা করার আগে তোমাদের দুজনেরই সত্যিটা মেনে নিতে হবে।”
মীরা কেঁদে ফেললেন।
রৌদ্রময়ী বলল, “মা, আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।”
“বল।”
“আমি আর নিজের নাম নিয়ে ভয় পাব না। আমি নীরা নই। আমি ১৯৯৮ সালের সেই মেয়েটিও নই। আমি তোমার মেয়ে, রৌদ্রময়ী। আমার জন্ম ২০০৫ সালে। আমার জীবনে ভুল আছে, কষ্ট আছে, এমন কিছু স্মৃতি আছে যার ব্যাখ্যা আমি জানি না। কিন্তু আমি নিজের জীবনকে আর অন্য কারও গল্প বলে ভাবতে চাই না।”
মীরা ধীরে বললেন, “তুই আমার মেয়ে। সব সময়ই ছিলি।”
“আমি জানি, মা।”
ফোন রেখে রৌদ্রময়ী নিজের ল্যাপটপ খুলল।
‘অলিখিত অধ্যায়’-এ তার অসমাপ্ত গল্পটি পড়ে আছে। সাত বছর আগে সে যে প্রথম পাতা লিখেছিল, সেই পাতায় আহমাদ মূসার নাম।
সে গল্পটির শিরোনাম বদলে দিল।
“অস্তিত্বহীন আহমাদ মূসা” নামটি মুছে ফেলল না। শুধু তার নিচে একটি নতুন লাইন যোগ করল—
“একটি গল্প, যে তার পাঠককে বাঁচতে শিখিয়েছিল।”
তারপর সে নিজের গল্পের শেষ বাক্যটি লিখল—
“আমি জানি না, আহমাদ মূসা কোথা থেকে এসেছিল। হয়তো সে একজন মানুষ ছিল। হয়তো ছিল আমার কল্পনা। হয়তো কোনো মৃত লেখকের অসমাপ্ত চরিত্র। কিন্তু আমি জানি, সে আমাকে বলেছিল রাতটা পার করে দিতে। আমি সেই রাত পার করেছি। তারপর আরও অনেক রাত। আর একদিন বুঝেছি, আমাকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা তার ছিল না—ক্ষমতাটা সব সময় আমার ভেতরেই ছিল।”
সে লেখা প্রকাশ করল।
কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রথম মন্তব্য এল।
একজন অচেনা পাঠক লিখেছে—
“আপনার গল্প পড়ে আজ আমি নিজের জীবনের একটা কঠিন রাত পার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ধন্যবাদ।”
রৌদ্রময়ী দীর্ঘক্ষণ মন্তব্যটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার চোখে জল এল, কিন্তু এবার সেই জল ভয়ের ছিল না।
সে উত্তর দিল—
“আজকের রাতটা পার করে দিন। আগামীকাল সব প্রশ্নের উত্তর না পেলেও, আপনার জীবনের নতুন একটা পাতা শুরু হতে পারে। সাহায্য চাইতে দ্বিধা করবেন না। আপনি একা নন।”
ল্যাপটপ বন্ধ করার আগে সে একবার নিজের ইনবক্স খুলল।
আহমাদ মূসার অ্যাকাউন্ট নেই।
কোনো পুরোনো মেসেজ নেই।
কোনো ছবি নেই।
শুধু সাত বছর আগের একটি কথোপকথনের স্ক্রিনশট তার কম্পিউটারে সংরক্ষিত।
শেষ মেসেজটি—
“আমি সেই মানুষ, যার সঙ্গে তোমার পরিচয় হওয়ার কথা ছিল।”
রৌদ্রময়ী স্ক্রিনশটটি মুছে ফেলল না।
কিছু স্মৃতি মুছে ফেলার জন্য নয়। শুধু তাদের হাতে নিজের ভবিষ্যৎ তুলে না দেওয়ার জন্য।
তারপর সে জানালা খুলে দিল।
ভোরের আলো ঘরে ঢুকল।
অনেক দিন পর সে নিজের ঘড়ির কাঁটা চলতে দেখল।
সকাল ৮টা ১৭ মিনিট।
তারপর ৮টা ১৮।
৮টা ১৯।
সময় এগিয়ে যাচ্ছে।
রৌদ্রময়ী মৃদু হেসে বলল—
“বিদায়, আহমাদ মূসা।”
কোনো উত্তর এল না।
আর সেই নীরবতাই ছিল তার জীবনের প্রথম সত্যিকারের শান্তি।
উপসংহার: সাত বছর পর
২৯ অক্টোবর ২০৩৩।
একটি বইয়ের দোকানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান চলছে।
বইটির নাম—
অস্তিত্বহীন আহমাদ মূসা।
লেখক: রৌদ্রময়ী আহমাদ।
বইয়ের প্রথম পাতায় উৎসর্গ—
“সেই অচেনা মানুষটির জন্য, যে আমাকে এক রাতে বেঁচে থাকতে বলেছিল। তুমি বাস্তব হও বা না হও, তোমার বলা কথাটি আমার জীবনে বাস্তব হয়ে আছে।”
অনুষ্ঠান শেষে এক তরুণী লেখিকার কাছে এগিয়ে এল।
তার চোখে অদ্ভুত এক উদ্বেগ।
“আপু, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“অবশ্যই।”
“আপনি কি সত্যিই আহমাদ মূসার সঙ্গে কথা বলেছিলেন?”
রৌদ্রময়ী একটু হেসে বলল, “আমি একসময় বিশ্বাস করতাম, বলেছিলাম।”
“আর এখন?”
রৌদ্রময়ী জানালার বাইরে তাকাল।
“এখন আমি জানি, কিছু প্রশ্নের উত্তর না থাকলেও জীবন থেমে থাকে না।”
তরুণীটি চলে গেল।
রৌদ্রময়ী বইয়ের শেষ পাতাটা খুলল। সেখানে সে একটি বাক্য লিখে রেখেছে—
“আহমাদ মূসার মৃত্যু হয়েছিল সেদিন, যেদিন রৌদ্রময়ী নিজের জীবনের লেখক হয়ে উঠেছিল।”
বই বন্ধ করার ঠিক আগে তার ফোন কেঁপে উঠল।
একটি নতুন মেসেজ।
অচেনা নম্বর থেকে।
“গল্পটা সুন্দর হয়েছে, রৌদ্রময়ী।”
সে স্থির হয়ে গেল।
আরেকটি মেসেজ এল—
“তবে একটা ছোট ভুল রয়ে গেছে।”
তার বুকের ভেতর পুরোনো ভয়টি একবার মাথা তুলল।
সে লিখল—
“কে আপনি?”
উত্তর এল—
“যে প্রথম তোমার নাম লিখেছিল।”
রৌদ্রময়ীর আঙুল ঠান্ডা হয়ে গেল।
শেষ মেসেজটি এল—
“তুমি কি সত্যিই মনে করো, তোমার গল্পের শেষটা তুমি লিখেছ?”
সে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মেসেজটির উত্তর না দিয়ে ফোন বন্ধ করে দিল।
বাইরে তখন সন্ধ্যা।
দোকানের কাচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল সে।
একজন পূর্ণবয়স্ক নারী। নিজের নামে, নিজের পরিচয়ে, নিজের জীবনে দাঁড়িয়ে আছে।
তার ভ্রুর ওপর ছোট্ট দাগটি এখনও আছে।
কিন্তু আজ সে জানে, সেই দাগের ইতিহাস যাই হোক, তার ভবিষ্যৎ সেই দাগ লিখে দেবে না।
রৌদ্রময়ী বইটা বুকে চেপে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল।
পেছনে টেবিলের ওপর পড়ে রইল একটি ছোট কাগজ।
কাগজে মাত্র তিনটি শব্দ—
“আমি এখনও আছি।”
কোনো নাম নেই।
কোনো স্বাক্ষর নেই।
কোনো প্রমাণ নেই।
শুধু তিনটি শব্দ।
আর এই প্রথম রৌদ্রময়ী সেগুলো পড়ে ভয় পেল না।
সে জানে, পৃথিবীতে কিছু রহস্য হয়তো কোনো দিন সমাধান হবে না।
কিন্তু প্রতিটি রহস্যের পেছনে ছুটতে ছুটতে নিজের জীবন হারিয়ে ফেলাও কোনো সমাধান নয়।
কারণ—
সব গল্পের শেষ জানা জরুরি নয়। কখনো কখনো গল্পের শেষ থেকে নিজের জীবন শুরু করাটাই যথেষ্ট।
সমাপ্ত
আহমাদ মূসা বাস্তব মানুষ ছিল কি না, তার শেষ মেসেজ কে পাঠিয়েছিল, কিংবা ১৯৯৮ সালের সেই রাতের প্রতিটি সত্য কী ছিল—সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। কারণ রৌদ্রময়ীর গল্পের শেষ সত্যটি কোনো রহস্যের সমাধান নয়। সেটি হলো তার নিজের জীবনকে নিজের করে নেওয়া।
আর হয়তো আহমাদ মূসা সত্যিই কোথাও ছিল। হয়তো সে ছিল শুধু একটি গল্প।
কিন্তু যে রাতে একজন মানুষ আরেকটি রাত পার করে বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, সেই রাতের সত্যিটা আর অস্তিত্বহীন থাকে না।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।