পর্ব ১৭: যে স্মৃতি আমার ছিল না

“স্মৃতি সব সময় অতীতের সাক্ষী নয়। কখনো কখনো স্মৃতি এমন একটি মিথ্যা, যা আমরা বেঁচে থাকার জন্য নিজের ভেতরে লুকিয়ে রাখি।”

১. ঘরের ভেতর আট বছরের মেয়ে

রৌদ্রময়ী নড়তে পারছিল না।

তার শোবার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটির হাতে লাল ডায়েরি। মুখটা তার নিজের শৈশবের ছবির মতো। বাম ভ্রুর ওপর ছোট্ট কাটা দাগ। চোখের কোণে সেই একই অদ্ভুত বিষণ্ণতা।

শুধু একটি পার্থক্য।

রৌদ্রময়ীর শৈশবের ছবিগুলোতে সে কখনো এতটা শান্ত ছিল না।

শিশুটি বলল, “তুমি আমাকে চিনতে পারছ না?”

রৌদ্রময়ী শুকনো গলায় বলল, “তুমি কে?”

“তুমি।”

“অসম্ভব।”

“তোমার কাছে সব অসম্ভব জিনিসের একটা নাম আছে। তুমি সেগুলোকে গল্প বলো।”

শিশুটি ঘরে ঢুকে লাল ডায়েরিটা টেবিলে রাখল।

“তুমি আমাকে ভুলে গেছ। কিন্তু আমি তোমাকে ভুলিনি।”

রৌদ্রময়ী পিছিয়ে গেল। “তুমি কি ১৯৯৮ সালের সেই মেয়ে?”

শিশুটি মাথা নাড়ল।

“তাহলে তুমি এখনো আট বছর বয়সী কেন?”

“কারণ তুমি আমাকে ওই রাতের পর আর বড় হতে দাওনি।”

বাইরে বজ্রপাত হলো। এক মুহূর্তের জন্য ঘরটা আলোয় ভরে উঠল।

তারপর শিশুটি বলল, “তুমি আমাকে মেরে ফেলেছিলে, রৌদ্রময়ী।”

রৌদ্রময়ী দুহাতে কান চেপে ধরল।

“না! আমি তখন জন্মাইনি!”

“তোমার শরীর জন্মায়নি। কিন্তু তোমার নাম জন্মেছিল। তোমার গল্প জন্মেছিল। আর তোমার ভেতরে যে স্মৃতিটা আটকে আছে, সেটা আমার।”

“তুমি কী বলতে চাইছ?”

শিশুটি ডায়েরি খুলল।

প্রথম পাতায় একটি শিশুর হাতের লেখা—

“আজ আমার আট বছর পূর্ণ হলো। মা বলেছে, আজ আমাকে একজন নতুন মানুষের সঙ্গে দেখা করাবে। তার নাম আহমাদ মূসা। সে নাকি আমার গল্পের শেষটা জানে।”

নিচে তারিখ—

২৮ অক্টোবর ১৯৯৮।

রৌদ্রময়ী পাতাটা ছিনিয়ে নিল।

পরের পাতায় লেখা—

“আহমাদ বলেছে, আমি যদি আমার গল্প শেষ করতে চাই, তাহলে আমাকে একটা নাম ছেড়ে দিতে হবে।”

তারপরের পাতায়—

“আমি রাজি হইনি।”

আর শেষ পাতায়, কাঁপা হাতে লেখা কয়েকটি শব্দ—

“আমি কাউকে মরতে দেব না। দরকার হলে আমি নিজেই মরে যাব।”

রৌদ্রময়ী ডায়েরিটা বন্ধ করল।

তার মনে পড়ছে না কিছুই।

কিন্তু ডায়েরির প্রতিটি শব্দ তার ভেতরে এমনভাবে আঘাত করছিল, যেন সে নিজেই লিখেছিল।

শিশুটি বলল, “তুমি সেই রাতটা মনে করতে পারছ না, কারণ তোমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।”

“কে ভুলিয়েছিল?”

“তোমার মা নয়। তোমার বাবা নয়। যে মানুষটি তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিল, সেই।”

রৌদ্রময়ীর গলা কেঁপে উঠল।

“আহমাদ মূসা?”

শিশুটি মাথা নাড়ল।

“না। আহমাদ মূসা ছিল আমার গল্পের নাম। যে আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল, তার নাম ছিল অনিরুদ্ধ সেন।”

২. যে রাতের সত্যি কেউ জানত না

মীরা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর চোখ বেয়ে জল পড়ছে।

“রৌদ্রময়ী, ওর কথা শুনে সব বিশ্বাস করিস না।”

শিশুটি মায়ের দিকে তাকাল।

“আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না?”

মীরা মুখ ঢেকে ফেললেন।

“চুপ করো।”

“আপনি আমাকে কোলে নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আমার নাম কখনো বদলাবেন না।”

“চুপ করো!”

“তারপর আমার নাম অন্য একজনকে দিয়ে দিয়েছিলেন।”

মীরা হঠাৎ মেঝেতে বসে পড়লেন।

রৌদ্রময়ী মায়ের কাছে ছুটে গেল।

“মা, কী হচ্ছে এসব? ও কে?”

মীরা অনেকক্ষণ পর বললেন, “আমি জানি না ও কে। কিন্তু ১৯৯৮ সালের ২৮ অক্টোবর আমি একটা শিশুকে হারিয়েছিলাম।”

“কোন শিশুকে?”

“একটা মেয়েকে। তার নাম ছিল রৌদ্রময়ী আহমাদ।”

“সে কি আমার—”

“তুই ছিলি না, মা। অন্তত যেভাবে তুই নিজেকে চিনিস, সেভাবে নয়।”

মীরা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “সেদিন হাসপাতালে দুটি শিশু ছিল। একটি মেয়ে, একটি ছেলে। মেয়েটির জন্ম হয়েছিল আট বছর আগে। ছেলেটি সদ্যোজাত। তাদের দুজনের জীবন জড়িয়ে গিয়েছিল একটি গল্পের সঙ্গে।”

“কী গল্প?”

“আহমাদ মূসার গল্প।”

মীরা জানালেন, আট বছরের রৌদ্রময়ী ছিল এক নিঃসঙ্গ শিশু। তার বাবা-মায়ের সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছিল। অনিরুদ্ধ সেন তখন তাদের পরিবারের পরিচিত একজন লেখক। শিশুটিকে শান্ত করতে তিনি তার সঙ্গে গল্প লিখতেন।

সেই গল্পের নায়ক ছিল আহমাদ মূসা।

একদিন মেয়েটি বিশ্বাস করতে শুরু করে, আহমাদ মূসা শুধু গল্পের চরিত্র নয়। সে বাস্তবেও আছে। সে তার সঙ্গে কথা বলে, তার দুঃখ বোঝে, তাকে একা থাকতে দেয় না।

অনিরুদ্ধ প্রথমে বিষয়টিকে শিশুমনের কল্পনা ভেবেছিলেন।

কিন্তু মেয়েটি যখন এমন কিছু তথ্য বলতে শুরু করে, যা সে জানার কথা নয়, তখন তিনি ভয় পেয়ে যান।

বিশেষ করে একটি কথা—

“আমার নাম একদিন অন্য একজন পাবে। সে আমার জীবন নিয়ে বাঁচবে। কিন্তু সে জানবে না, আমি তার ভেতরে আছি।”

অনিরুদ্ধ ভেবেছিলেন, মেয়েটির মানসিক সমস্যা হচ্ছে। তিনি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।

সেই রাতেই হাসপাতালের একটি কক্ষে দুর্ঘটনা ঘটে।

কী ঘটেছিল, তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনি। মেয়েটি নিখোঁজ হয়। আর সদ্যোজাত ছেলেটিকে অন্য পরিচয়ে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল পরে।

অনিরুদ্ধ একটি নতুন পাণ্ডুলিপি লিখেছিলেন।

তার নাম—

“অস্তিত্বহীন আহমাদ মূসা।”

পাণ্ডুলিপির নায়িকা ছিল সেই আট বছরের মেয়ে।

আর গল্পের শেষ পাতায় লেখা ছিল—

“মেয়েটি মারা যায়নি। সে অন্য একটি জীবনে ফিরে আসবে।”

রৌদ্রময়ী ফিসফিস করে বলল, “তাহলে আমি কে?”

মীরা উত্তর দেওয়ার আগেই শিশুটি বলল—

“তুমি সেই মেয়েটির জীবন পাওয়া মানুষ। তার স্মৃতি তোমার মধ্যে আছে। কিন্তু তুমি সে নও।”

রৌদ্রময়ী শিশুটির দিকে তাকাল।

“তুমি কি আমার কল্পনা?”

শিশুটি মৃদু হাসল।

“তুমি আমাকে কল্পনা করলে আমি তোমার কল্পনা। তুমি আমাকে স্মৃতি বললে আমি তোমার স্মৃতি। আর তুমি যদি আমাকে মানুষ বলে বিশ্বাস করো—তাহলে আমাকে খুঁজে বের করো।”

“কোথায়?”

শিশুটি দরজার দিকে তাকাল।

“যেখানে আমার নামটা শেষবার লেখা হয়েছিল।”

তারপর ঘরের আলো নিভে গেল।

আবার আলো জ্বলার সময় শিশুটি আর সেখানে ছিল না।

শুধু মেঝেতে পড়ে ছিল লাল ডায়েরি।

আর তার শেষ পাতায় নতুন একটি বাক্য—

“আসল আহমাদ মূসা এখনও বেঁচে আছে।”

৩. যে মানুষটি নিজের নাম অস্বীকার করেছিল

রৌদ্রময়ী আরিফকে ফোন করল।

“তুমি জানো অনিরুদ্ধ কোথায়?”

আরিফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “জানি।”

“আমাকে সেখানে নিয়ে চলো।”

এক ঘণ্টা পর তারা শহরের বাইরে একটি পুরোনো বাড়িতে পৌঁছাল। বাড়ির সামনে কোনো নামফলক নেই। জানালাগুলো বন্ধ। দরজার পাশে একটি শুকনো গাছ।

আরিফ দরজায় কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে কণ্ঠ এল—

“আমি জানতাম, তুমি আসবে।”

দরজা খুললেন অনিরুদ্ধ সেন।

বয়স বেড়েছে। চুল সাদা। মুখে ক্লান্তি। কিন্তু চোখ দুটো একই রকম—যেন তিনি অনেক দিন ধরে এমন একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন, যার উত্তর তিনি নিজেই জানেন।

রৌদ্রময়ী বলল, “আপনি কি আমাকে চিনতেন ১৯৯৮ সাল থেকেই?”

অনিরুদ্ধ ধীরে মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ।”

“আমার নাম কি সত্যিই রৌদ্রময়ী আহমাদ?”

“হ্যাঁ।”

“আমি কি সেই আট বছরের মেয়েটি?”

অনিরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“না। তুমি তার নাম পেয়েছ, তার গল্প পেয়েছ, তার কিছু স্মৃতির ছায়া পেয়েছ। কিন্তু তুমি নিজের জীবন নিয়ে জন্মেছ।”

“তাহলে সেই মেয়েটি কোথায়?”

অনিরুদ্ধ উত্তর দিলেন না।

রৌদ্রময়ী টেবিলের ওপর লাল ডায়েরিটা রাখল।

“আমি সব জানতে চাই।”

অনিরুদ্ধ বসে পড়লেন।

তারপর বললেন, “১৯৯৮ সালের সেই রাতে মেয়েটি নিখোঁজ হয়েছিল। হাসপাতালে তার মৃত্যুর নথি তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু মৃতদেহ শনাক্ত করা হয়নি। পরে আমি জানতে পারি, তাকে অন্য নামে একটি প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছিল। আমি তাকে খুঁজেছিলাম। পাইনি।”

“কেন?”

“কারণ আমি ভুল জায়গায় খুঁজছিলাম। আমি ধরে নিয়েছিলাম, সে কোথাও বেঁচে আছে। কিন্তু সত্যিটা ছিল আরও কঠিন—সে হয়তো আর বেঁচে ছিল না। অথবা বেঁচে থেকেও নিজের নাম ভুলে গিয়েছিল।”

“তাহলে আপনি আমার নাম তার নামে রাখলেন কেন?”

অনিরুদ্ধ চোখ নামিয়ে বললেন, “আমি রাখিনি। তোমার মা রেখেছিলেন।”

“কেন?”

“কারণ তোমার মা বিশ্বাস করতেন, সেই মেয়েটি একদিন ফিরে আসবে। তিনি চেয়েছিলেন, তুমি বড় হলে যদি কখনো তার সঙ্গে দেখা হয়, তাহলে নামের মধ্যে একটা যোগসূত্র থাকবে।”

রৌদ্রময়ীর চোখ ভিজে উঠল।

“আপনি কি আহমাদ মূসা?”

অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“আমি সেই নাম ব্যবহার করেছি। কিন্তু আমি প্রথম আহমাদ মূসা নই।”

“তাহলে প্রথম কে?”

অনিরুদ্ধ একটা পুরোনো খাম বের করলেন।

ভেতরে একটি ছবি।

একজন তরুণ লেখক, পাশে আট বছরের মেয়ে। মেয়েটির হাতে লাল ডায়েরি।

ছবির পেছনে লেখা—

“আহমাদ মূসা ও রৌদ্রময়ী। ১৯৯৮।”

রৌদ্রময়ী ছবিটা হাতে নিতেই তার আঙুল কেঁপে উঠল।

“এই মানুষটি কে?”

অনিরুদ্ধ বললেন, “এই মানুষটির আসল নাম আমি জানি না। সে নিজেকে আহমাদ মূসা বলত। সে মেয়েটির সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। আর সেদিনের পর থেকেই সব বদলে যায়।”

“আপনি কি তাকে খুঁজেছেন?”

“হ্যাঁ। কিন্তু তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমি কেবল তার লেখা কিছু পাণ্ডুলিপি পেয়েছিলাম। সেগুলোতে এমন সব ঘটনা লেখা ছিল, যা পরে সত্যি হয়ে যায়।”

রৌদ্রময়ী ছবির মানুষটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

মুখটা স্পষ্ট নয়। কিন্তু তার চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, সে ক্যামেরার দিকে নয়—ছবির ওপাশে দাঁড়ানো কারও দিকে তাকিয়ে আছে।

“তাহলে এত দিন ধরে আমাকে কে মেসেজ পাঠাচ্ছিল?”

অনিরুদ্ধ বললেন, “আমি নই।”

“আরিফ?”

“না।”

“তাহলে কে?”

অনিরুদ্ধের চোখে ভয় ফুটে উঠল।

“আমি জানি না। কিন্তু একটা কথা জানি—যে অ্যাকাউন্ট থেকে তোমাকে মেসেজ পাঠানো হয়েছে, সেটি প্রথম তৈরি হয়েছিল ২০১৯ সালে। আর সেই অ্যাকাউন্টের প্রথম মেসেজটি পাঠানো হয়েছিল তোমার নিজের ফোন থেকেই।”

রৌদ্রময়ী স্তব্ধ।

“অসম্ভব।”

“আমি সেটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু প্রযুক্তিগত নথিতে সেটাই লেখা।”

“আমার ফোন থেকে কে মেসেজ পাঠিয়েছিল?”

অনিরুদ্ধ ধীরে বললেন, “তুমি।”

রৌদ্রময়ী মাথা নাড়ল।

“আমি কখনো সেই অ্যাকাউন্ট তৈরি করিনি।”

“তুমি হয়তো মনে করতে পারছ না।”

“তাহলে আমি নিজেকেই মেসেজ পাঠাচ্ছিলাম?”

অনিরুদ্ধ বললেন, “হয়তো। অথবা কেউ তোমার পরিচয় ব্যবহার করেছে। কিন্তু যে কথাগুলো তোমাকে বলা হয়েছে, সেগুলো এমনভাবে লেখা, যেন লেখক তোমার ভেতরের প্রতিটি ভয় জানত।”

রৌদ্রময়ী চুপ করে গেল।

সে হঠাৎ বুঝতে পারল, এই গল্পের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্নটা আহমাদ মূসা কে, তা নয়।

প্রশ্নটা হলো—

সে কি সত্যিই কখনো অন্য কারও সঙ্গে কথা বলেছিল, নাকি নিজের ভেতরের অন্ধকার থেকে নিজেকেই ফিরিয়ে এনেছিল?

৪. শেষ পাণ্ডুলিপি

অনিরুদ্ধ তাকে বাড়ির ভেতরের একটি ছোট ঘরে নিয়ে গেলেন।

সেখানে কাঠের টেবিলের ওপর রাখা একটি পাণ্ডুলিপি।

মলাটে লেখা—

“অস্তিত্বহীন আহমাদ মূসা: শেষ অধ্যায়।”

“এটা কে লিখেছে?” রৌদ্রময়ী জিজ্ঞেস করল।

“আমি জানি না।”

“আপনার বাড়িতে আছে, অথচ আপনি জানেন না?”

“এটা গত রাতে আমার দরজার সামনে রেখে যাওয়া হয়েছে।”

রৌদ্রময়ী পাণ্ডুলিপি খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা—

“যে মেয়েটি নিজের জন্মের আগে নিজের নাম পড়েছিল, সে একদিন বুঝবে—মানুষের পরিচয় তার জন্মসনদে নয়, তার সিদ্ধান্তে লেখা থাকে।”

পরের পাতায়—

“রৌদ্রময়ী আহমাদ একদিন জানতে পারবে, আহমাদ মূসা বাস্তব মানুষ কি না, তা জানার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সে নিজের জীবনকে কার হাতে তুলে দিয়েছে।”

আরও কয়েকটি পাতা উল্টিয়ে রৌদ্রময়ী থেমে গেল।

সেখানে তার জীবনের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো লেখা।

আরিশের চলে যাওয়া।

সেই অন্ধকার রাত।

ফেসবুকে অচেনা মেসেজ।

নানাভাইয়ের লাল ডায়েরি।

হাসপাতালের ঘর নম্বর ১৭।

সব।

কিন্তু শেষ পাতাটি ফাঁকা।

রৌদ্রময়ী অনিরুদ্ধের দিকে তাকাল।

“এখানে কিছু লেখা নেই কেন?”

“কারণ গল্পটা শেষ হয়নি।”

“কে শেষ করবে?”

অনিরুদ্ধ তার দিকে তাকালেন।

“তুমি।”

রৌদ্রময়ী কলম তুলে নিল।

তারপর ফাঁকা পাতায় লিখল—

“আমি জানি না আহমাদ মূসা বাস্তব মানুষ ছিল কি না। আমি জানি না ১৯৯৮ সালের মেয়েটি বেঁচে আছে কি না। আমি জানি না আমার স্মৃতির কোন অংশ আমার, আর কোন অংশ অন্য কারও। কিন্তু আমি জানি, আমার জীবনকে আর কোনো অজানা লেখকের হাতে ছেড়ে দেব না।”

সে থামল।

তারপর আরও লিখল—

“যদি আহমাদ মূসা সত্যিই থাকে, তবে সে আমার গল্পের শেষ নির্ধারণ করতে পারবে না। আর যদি সে না-ও থাকে, তবে সে আমাকে যে কথাটা শিখিয়েছে, তা সত্যি—একটি অন্ধকার রাত কখনো মানুষের পুরো জীবন নয়।”

লেখা শেষ করে রৌদ্রময়ী কলম নামিয়ে রাখল।

ঘরের মধ্যে হঠাৎ একটা শব্দ হলো।

টেবিলের পাশে রাখা পুরোনো টাইপরাইটার নিজে থেকেই নড়ে উঠল।

একটি কাগজ ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল।

তাতে লেখা—

“তুমি শেষ অধ্যায় লিখেছ। কিন্তু প্রথম লেখককে এখনও খুঁজে পাওনি।”

রৌদ্রময়ী কাগজটা হাতে নিল।

তারপর দেখল, টাইপরাইটারের নিচে আরেকটি ছবি রাখা।

একজন তরুণী, বয়স প্রায় তিরিশ। হাতে লাল ডায়েরি। পেছনে একটি পুরোনো বাড়ি।

ছবির নিচে লেখা—

“রৌদ্রময়ী আহমাদ। ২০২৬।”

কিন্তু ছবির মেয়েটি রৌদ্রময়ী নয়।

তার মুখ আলাদা।

তার চোখ আলাদা।

শুধু বাম ভ্রুর ওপর সেই একই কাটা দাগ।

ছবির পেছনে একটি ঠিকানা।

আর একটি বাক্য—

“যদি জানতে চাও প্রথম আহমাদ মূসা কে ছিল, তবে তার মেয়ের কাছে যাও।”

রৌদ্রময়ী অনিরুদ্ধের দিকে তাকাল।

“আহমাদ মূসার মেয়ে?”

অনিরুদ্ধের মুখে এমন এক অভিব্যক্তি ফুটে উঠল, যা রৌদ্রময়ী আগে কখনো দেখেনি।

“আমি ভেবেছিলাম, সে মারা গেছে।”

“কে?”

অনিরুদ্ধ ফিসফিস করে বললেন—

“যে মেয়েটি তোমার নামের প্রথম মালিক ছিল।”

৫. যে প্রশ্নের উত্তর নেই

সেদিন রাতেই রৌদ্রময়ী বাড়ি ফিরল।

মা ঘুমিয়ে পড়েছেন। আরিফ আর অনিরুদ্ধও চলে গেছে।

সে একা বসে শেষ পাণ্ডুলিপিটা পড়তে লাগল।

প্রতিটি পাতায় তার জীবনের ঘটনা, তার প্রশ্ন, তার ভয়—সব লেখা আছে।

কিন্তু লেখক কে, তার কোনো নাম নেই।

রাত ১২টা ১৭ মিনিটে ফোন কেঁপে উঠল।

একটি নতুন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে মেসেজ।

নাম—

আহমাদ মূসা।

রৌদ্রময়ী দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর লিখল—

“তুমি কি সত্যিই আছ?”

উত্তর এল—

“তুমি কী বিশ্বাস করতে চাও?”

রৌদ্রময়ী লিখল—

“আমি সত্য জানতে চাই।”

উত্তর এল—

“সত্য সব সময় বিশ্বাসের বিপরীত নয়।”

“তুমি কি সেই আট বছরের মেয়েটিকে চিনতে?”

“হ্যাঁ।”

“সে কি বেঁচে আছে?”

কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।

তারপর—

“যদি সে বেঁচে থাকে, তুমি কি তার জীবন ফিরিয়ে দেবে?”

রৌদ্রময়ী লিখল—

“আমি তার জীবন নিইনি।”

উত্তর এল—

“তুমি তার নাম নিয়ে বেঁচে আছ। কখনো কখনো সেটাই যথেষ্ট।”

রৌদ্রময়ী চোখ বন্ধ করল।

তারপর লিখল—

“তুমি কি আমার কল্পনা?”

এবার উত্তর আসতে সময় লাগল।

এক মিনিট।

দুই মিনিট।

তিন মিনিট।

অবশেষে মেসেজ এল—

“আমি যদি তোমার কল্পনা হই, তবে তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাকে বাস্তব হওয়ার দরকার নেই।”

রৌদ্রময়ীর চোখ ভিজে উঠল।

সে শেষবারের মতো লিখল—

“তোমার নাম কী?”

উত্তর এল—

“আহমাদ মূসা।”

“এটা তোমার আসল নাম নয়।”

“নামই কি মানুষকে বাস্তব করে?”

“না।”

“তাহলে আমাকে খুঁজে বেড়ানো বন্ধ করো। এবার নিজেকে খুঁজে বের করো।”

অ্যাকাউন্টটি অদৃশ্য হয়ে গেল।

রৌদ্রময়ী আর কোনো মেসেজ পাঠাতে পারল না।

সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ভোরের আলো ধীরে ধীরে আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে।

তার মনে পড়ল, বহু বছর আগে এক অন্ধকার রাতে একজন অচেনা মানুষ তাকে বলেছিল—আজকের রাতটা পার করে দাও।

তখন সে জানত না, মানুষটি বাস্তব কি না।

আজও সে জানে না।

কিন্তু সে বেঁচে আছে।

আর এই বেঁচে থাকাটাই তার প্রথম সত্য।

ঠিক তখনই দরজার নিচ দিয়ে একটি খাম ঢুকে এল।

রৌদ্রময়ী খাম খুলল।

ভেতরে একটি পুরোনো জন্মসনদের অনুলিপি।

নাম—

রৌদ্রময়ী আহমাদ।

জন্মতারিখ—

২৮ অক্টোবর ১৯৯০।

নিচে একটি লাল কালিতে লেখা বাক্য—

“এই নথিটি কখনো বাতিল করা হয়নি।”

রৌদ্রময়ী কাগজটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর সে বুঝতে পারল, গল্পের শেষ পাতা সে লিখেছে ঠিকই।

কিন্তু তার নিজের জন্মের গল্প এখনও শেষ হয়নি।

কারণ জন্মসনদের নিচে আরও একটি লাইন আছে।

বর্তমান অবস্থা: জীবিত।

আর তার পাশে স্বাক্ষর—

আহমাদ মূসা।

পরবর্তী পর্ব: “শেষ অধ্যায়—আহমাদ মূসার মৃত্যু”

পরের পর্বেই এই গল্পের শেষ। রৌদ্রময়ী খুঁজে পাবে প্রথম আহমাদ মূসার পরিচয়, ১৯৯৮ সালের সেই রাতের প্রকৃত ঘটনা এবং নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নের উত্তর হয়তো পাঠকের কাছেও থেকে যাবে—আহমাদ মূসা কি সত্যিই একজন মানুষ ছিল, নাকি সে ছিল এমন একটি গল্প, যে তার পাঠককে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিল?