পর্ব ১৬: যে মেয়েটি দুবার জন্মেছিল
“একজন মানুষ একবার জন্মায়, একবার মারা যায়। কিন্তু তার নাম যদি অন্য কেউ পরে নিয়ে বেঁচে থাকে, তবে মৃত্যুসনদে কার নাম লেখা হয়—মৃত মানুষের, নাকি জীবিত মিথ্যার?”
১. বন্ধ অ্যাকাউন্টের মেসেজ
রাত ১১টা ৪৩ মিনিট।
রৌদ্রময়ীর ফোনের স্ক্রিনে এখনও সেই মেসেজটা জ্বলছে।
“কারণ ১৯৯৮ সালে যে রৌদ্রময়ী মারা গিয়েছিল, ২০০৫ সালে জন্ম নেওয়া মেয়েটি তার নামেই বেঁচে আছে।”
তার নিচে প্রেরক—আহমাদ মূসা।
কিন্তু অ্যাকাউন্টটি তো বন্ধ।
সাত বছর ধরে যার সঙ্গে সে কথা বলেছে, যে তাকে আত্মহত্যার অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে এনেছে, যে তার অতীতের প্রতিটি গোপন দরজার সামনে দাঁড় করিয়েছে—সেই মানুষটি আসলে কে?
নাকি মানুষই নয়?
রৌদ্রময়ী মেসেজটার স্ক্রিনশট নিল। তারপর অ্যাকাউন্টের প্রোফাইলে ঢুকল।
প্রোফাইল ছবি নেই।
কোনো পোস্ট নেই।
বন্ধুত্বের তালিকা নেই।
শুধু বায়োতে সেই পুরোনো বাক্য—
“আমি সেই মানুষ, যার সঙ্গে তোমার পরিচয় হওয়ার কথা ছিল।”
হঠাৎ বায়োটি বদলে গেল।
নতুন বাক্য ফুটে উঠল—
“এবার নিজের মাকে জিজ্ঞেস করো, ২৮ অক্টোবর ১৯৯৮-এ হাসপাতালের ঘর নম্বর ১৭-তে কে মারা গিয়েছিল।”
রৌদ্রময়ী ফোনটা মায়ের সামনে রাখল।
মীরা প্রথমে স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। তারপর এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নিলেন, যেন সাত বছর নয়, সাত দশক ধরে তিনি এই মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিলেন।
“তুমি জানো,” রৌদ্রময়ী বলল।
“সবটা জানি না।”
“কিন্তু তুমি জানো, আমার আগে আরেকজন রৌদ্রময়ী ছিল।”
মীরা চুপ করে রইলেন।
“সে কি আমার বোন ছিল?”
“না।”
“তাহলে?”
মীরা কাঁপা হাতে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন।
“সে ছিল এমন একজন, যার নাম তোমাকে দেওয়া হয়েছিল।”
রৌদ্রময়ী এবার উঠে দাঁড়াল।
“নাম কি কাউকে দেওয়া যায়, মা? নাকি নামের সঙ্গে তার জীবনটাও দিয়ে দেওয়া যায়?”
মীরা কোনো উত্তর দিলেন না।
রৌদ্রময়ী বুঝল, উত্তরটা খুঁজতে হলে তাকে আবার সেই হাসপাতালে যেতে হবে।
যেখানে সময় থেমে আছে সকাল ৮টা ১৭ মিনিটে।
যেখানে তার নাম লেখা একটি মৃত্যুসনদ হয়তো এখনও কোথাও পড়ে আছে।
আর যেখানে হয়তো তার নিজের জীবনের প্রথম মিথ্যেটি লেখা হয়েছিল।
২. ঘর নম্বর ১৭
পরদিন সকাল ৮টা ১৭ মিনিটে রৌদ্রময়ী পৌঁছাল পুরোনো হাসপাতালটায়।
বহু বছর ধরে ভবনটি পরিত্যক্ত। জানালার কাচ ভাঙা, করিডরে ধুলো জমে আছে, দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে দাগ। তবু আশ্চর্যভাবে মূল প্রবেশদ্বারের পাশে একটি পুরোনো ঘড়ি এখনও ঝুলছে।
ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে ঠিক ৮টা ১৭ মিনিটে।
রৌদ্রময়ী একা আসেনি। আরিফ তার সঙ্গে আছে।
“তুমি নিশ্চিত, এখানেই আসতে হবে?” আরিফ জিজ্ঞেস করল।
“আমার মৃত্যুসনদ এখানে থাকলে, এখানেই।”
“তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো, ১৯৯৮ সালে তোমার মৃত্যু হয়েছিল?”
রৌদ্রময়ী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু আমি এটাও জানি না, আমার জন্মের আগের একটা ছবিতে আমার মুখ কেন আছে।”
তারা করিডর ধরে এগোল।
ঘর নম্বর ১৭-এর দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। তালার গায়ে মরচে। দরজার পাশে ছোট একটা ফলকে লেখা—
বিশেষ পর্যবেক্ষণ কক্ষ। ২৮ অক্টোবর ১৯৯৮।
আরিফ তালাটার দিকে তাকাল।
“চাবি নেই।”
রৌদ্রময়ী নিজের ব্যাগ থেকে নানাভাইয়ের আলমারিতে পাওয়া সেই পুরোনো চাবিটা বের করল।
“এই চাবিটা আমার কাছে কেন ছিল, জানি না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এর কাজ এখানেই।”
চাবি ঘোরাতেই তালা খুলে গেল।
দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে তারা থমকে দাঁড়াল।
ঘরের মাঝখানে একটি লোহার বিছানা।
পাশে ছোট টেবিল।
দেয়ালে অক্সিজেনের পুরোনো সংযোগ।
আর টেবিলের ওপর একটি ফাইল।
ফাইলের ওপরে লেখা—
রোগীর নাম: রৌদ্রময়ী আহমাদ।
জন্মতারিখ: ২৮ অক্টোবর ১৯৯০।
মৃত্যুর তারিখ: ২৮ অক্টোবর ১৯৯৮।
বয়স: আট বছর।
রৌদ্রময়ীর হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে ফাইল খুলল।
ভেতরে একটি শিশুর ছবি।
ছবির মেয়েটি সেই একই মেয়ে—লাল ডায়েরি হাতে, হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা।
কিন্তু ছবিটা ভালো করে দেখতেই রৌদ্রময়ী লক্ষ করল, মেয়েটির বাম ভ্রুর ওপর ছোট একটি কাটা দাগ।
তার নিজেরও সেই জায়গায় ছোট্ট দাগ আছে।
শৈশবে পড়ে গিয়ে হয়েছিল বলে মা জানিয়েছিলেন।
“আরিফ,” সে ফিসফিস করে বলল, “আমার এই দাগটা কীভাবে হয়েছিল?”
আরিফ তার দিকে তাকাল।
“তুমি বলেছিলে, ছোটবেলায় পড়ে গিয়েছিলে।”
“আমি বলেছিলাম, নাকি মা বলেছিলেন?”
আরিফ উত্তর দিল না।
ফাইলের পরের পাতায় মৃত্যুর কারণ লেখা—
অজ্ঞাত কারণে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ।
তার নিচে চিকিৎসকের স্বাক্ষর।
ডা. অনিরুদ্ধ সেন।
রৌদ্রময়ীর বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল।
অনিরুদ্ধ সেন—যে মানুষটি নিজেকে তার বাবা বলেছিল। যে বলেছিল, আহমাদ মূসা তার ছদ্মনাম ছিল। যে পরে স্বীকার করেছিল, সে-ও পুরো গল্পের নিয়ন্ত্রক নয়।
কিন্তু এই নথি আটাশ বছর আগের।
তখন সে কোথায় ছিল?
আর কেন তার স্বাক্ষর একটি মৃত শিশুর ফাইলে?
রৌদ্রময়ী ফাইলের শেষ পাতাটা উল্টাতেই একটি হাতে লেখা নোট পেল।
“মৃত শিশুটির পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। পরিবারের অনুরোধে নথিটি সিলগালা করা হলো। একই রাতে অন্য এক শিশুকে নতুন পরিচয়ে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”
নিচে আরও একটি লাইন—
“দুটি শিশুর মধ্যে একজনের নাম রৌদ্রময়ী। অন্যজনের নাম আহমাদ।”
আরিফ হঠাৎ ফাইলটা বন্ধ করে দিল।
“এটা আর পড়ো না।”
রৌদ্রময়ী তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
“কেন?”
আরিফের চোখে এমন ভয়, যা সে আগে কখনও দেখেনি।
“কারণ পরের পাতায় আমার নাম আছে।”
৩. আরিফের জন্মসনদ
রৌদ্রময়ী ফাইলটা আবার খুলল।
পরের পাতায় সত্যিই আরেকটি নথি।
শিশুর নাম: আহমাদ।
জন্মতারিখ: ২৮ অক্টোবর ১৯৯৮।
মায়ের নাম: অজ্ঞাত।
পিতার নাম: অনিরুদ্ধ সেন।
পরিচয় পরিবর্তনের নথিতে আরেকটি নাম—
আরিফ আহমেদ রহমান।
রৌদ্রময়ী ধীরে ধীরে আরিফের দিকে তাকাল।
“তুমি জন্মেছিলে ১৯৯৮ সালে?”
আরিফ চোখ নামিয়ে রাখল।
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু তুমি তো বলেছিলে, তোমার জন্ম—”
“আমি যা বলেছি, তার অনেকটাই আমার নিজের মনে থাকা তথ্য। সব তথ্য সত্যি নয়।”
“তাহলে তুমি আমার চেয়ে সাত বছর বড় নও?”
আরিফ মাথা নাড়ল।
“আমি তোমার চেয়ে পনেরো বছর বড়।”
ঘরটা যেন আরও ছোট হয়ে এল।
রৌদ্রময়ী ফিসফিস করে বলল, “তাহলে ছোটবেলায় যে শিশুটিকে আমি কোলে নিয়ে ছবি তুলেছিলাম, সে কে ছিল?”
“আমি।”
“আর আমার ডায়েরিতে যে লেখা আছে, তুমি আমার জীবনে এসেছিলে সাত বছর আগে?”
“তুমি আমাকে চিনতে শুরু করেছিলে ২০১২ সালের দিকে। কিন্তু তার আগেই তুমি আমাকে একবার দেখেছিলে।”
রৌদ্রময়ীর মাথায় অসংখ্য প্রশ্ন একসঙ্গে আছড়ে পড়ল।
“তাহলে ১৯৯৮ সালে মারা গিয়েছিল কে?”
আরিফ অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
“যে মেয়েটির নাম ছিল রৌদ্রময়ী আহমাদ।”
“সে কে ছিল?”
“আমি জানি না।”
“তুমি কি তাকে দেখেছিলে?”
“হ্যাঁ।”
“কোথায়?”
আরিফ বিছানার দিকে তাকাল।
“এই ঘরে।”
তার কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এল।
“আমি জন্মানোর দিন।”
রৌদ্রময়ী বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
মনে হলো, ঘরটার ভেতর এখনও একটা শিশুর কান্না আটকে আছে। যেন বহু বছর আগে কেউ কেঁদেছিল, কিন্তু সেই কান্নার শব্দ কখনো শেষ হয়নি।
“তুমি কীভাবে জানলে?”
আরিফ পকেট থেকে একটা ছোট্ট রুপালি লকেট বের করল।
“এটা আমাকে দেওয়া হয়েছিল।”
লকেট খুলতেই ভেতরে দুটি ক্ষুদ্র ছবি।
একটিতে একটি সদ্যোজাত শিশু।
অন্যটিতে আট বছরের একটি মেয়ে।
ছবির পেছনে লেখা—
“একজনকে বাঁচাতে অন্যজনের নাম মুছে ফেলতে হয়েছে।”
নিচে স্বাক্ষর—
মীরা।
রৌদ্রময়ীর চোখে জল এসে গেল।
“আমার মা কি একটা শিশুর নাম মুছে দিয়েছিলেন?”
আরিফ বলল, “সম্ভবত।”
“আর আমাকে সেই নাম দিয়েছিলেন?”
“সম্ভবত।”
“কিন্তু কেন?”
আরিফ এবার তার চোখের দিকে তাকাল।
“হয়তো যে শিশুটিকে সবাই মৃত ভেবেছিল, সে আসলে মারা যায়নি।”
“তুমি বলতে চাইছ, ১৯৯৮ সালের রৌদ্রময়ী বেঁচে ছিল?”
“আমি বলছি, এই ফাইলে একটা জিনিস নেই।”
“কী?”
আরিফ ফাইলের প্রথম পাতাটা আবার খুলল।
মৃত্যুর কারণের নিচে ছোট একটি ঘর।
মৃতদেহ শনাক্ত করেছেন: ———
ঘরটি ফাঁকা।
কেউ মৃতদেহ শনাক্ত করেনি।
কেউ নিশ্চিত করেনি যে শিশুটি সত্যিই রৌদ্রময়ী আহমাদ।
কেউ নিশ্চিত করেনি যে মৃত শিশুটি মেয়ে ছিল।
শুধু একটি নাম লিখে দেওয়া হয়েছিল।
আর সেই নামটাই আটাশ বছর ধরে আরেকজনের জীবন হয়ে বেঁচে আছে।
৪. যে কণ্ঠস্বরটি রৌদ্রময়ীর ছিল
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসার সময় রৌদ্রময়ীর ফোনে একটি অডিও ফাইল এল।
প্রেরক অজানা।
ফাইলের নাম—
RAUDRAMOYI_FINAL_1998.wav
সে ইয়ারফোন লাগিয়ে প্লে করল।
প্রথমে শিশুর কান্না।
তারপর একটি মেয়ের কণ্ঠ।
“মা, তুমি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছ?”
রৌদ্রময়ীর পা থেমে গেল।
কণ্ঠটা অস্বাভাবিকভাবে তার নিজের মতো।
“মা, ওরা বলছে আমার নাম ভুল। ওরা বলছে, আমি রৌদ্রময়ী নই।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর মেয়েটি আবার বলল—
“কিন্তু আমি জানি, আমার নাম রৌদ্রময়ী। কারণ আহমাদ আমাকে এই নামেই ডাকে।”
রৌদ্রময়ী ইয়ারফোন খুলে ফেলল।
আরিফ তার মুখের দিকে তাকাল।
“কী হয়েছে?”
রৌদ্রময়ী অডিওটা আবার চালাল।
এবার শেষ পর্যন্ত শুনল।
মেয়েটির কণ্ঠ বলল—
“মা, তুমি যদি আমাকে বাঁচাতে না পারো, তাহলে আমার নামটা বাঁচিয়ে রেখো। একদিন আমি ফিরে আসব। তখন কেউ যেন আমাকে চিনতে না পারে, এমন কোনো নাম আমাকে দিও না।”
এরপর আরেকটি কণ্ঠ।
একজন পুরুষ।
“শিশুটির পরিচয় বদলাতে হবে। এই নাম থাকলে ওকে খুঁজে বের করা সহজ হবে।”
মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বলল—
“না! আমার নাম নিও না!”
তারপর তীব্র একটা শব্দ।
অডিও শেষ।
রৌদ্রময়ী ফোনটা নামিয়ে ফেলল।
তার চোখে জল, কিন্তু কান্না আসছে না।
“এই কণ্ঠটা আমার,” সে বলল।
আরিফ মাথা নাড়ল।
“হয়তো।”
“না। এটা আমারই কণ্ঠ।”
“তুমি তো ১৯৯৮ সালে জন্মাওনি।”
রৌদ্রময়ী তার দিকে তাকাল।
“তাহলে আমার কণ্ঠ সেখানে কীভাবে রেকর্ড হলো?”
আরিফের কাছে কোনো উত্তর ছিল না।
ফোন আবার কেঁপে উঠল।
এবার একটি মেসেজ।
“কারণ তুমি ২০০৫ সালে প্রথম জন্মাওনি, রৌদ্রময়ী। ২০০৫ সালে তোমাকে শুধু নতুন নাম দেওয়া হয়েছিল।”
প্রেরক—আহমাদ মূসা।
রৌদ্রময়ী দ্রুত লিখল—
“তুমি কে? তুমি কি সেই শিশুটিকে চিনতে?”
উত্তর এল—
“আমি তাকে চিনতাম।”
“তারপর?”
“সে আমাকে তৈরি করেছিল।”
“কীভাবে?”
কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল।
“সে যখন আট বছর বয়সে ছিল, তখন সে একটি গল্প লিখেছিল। সেই গল্পের ছেলেটির নাম দিয়েছিল আহমাদ মূসা। গল্পের ছেলেটিকে সে বলেছিল—একদিন যদি আমি হারিয়ে যাই, তুমি আমাকে খুঁজে বের করবে।”
রৌদ্রময়ীর চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
আরেকটি মেসেজ এল।
“আমি সেই প্রতিশ্রুতি রাখতে ফিরে এসেছি।”
রৌদ্রময়ী লিখল—
“তাহলে তুমি কি গল্পের চরিত্র?”
উত্তর এল—
“আমি জানি না।”
তারপর আরও একটি লাইন।
“কিন্তু আমি জানি, যে মেয়েটি আমাকে লিখেছিল, সে এখনও কোথাও বেঁচে আছে।”
৫. মৃত মানুষের স্বাক্ষর
সেদিন রাতেই রৌদ্রময়ী মায়ের কাছে ফিরে গেল।
মীরা বসার ঘরে একা বসে ছিলেন। সামনে পুরোনো একটি খাম।
রৌদ্রময়ী কোনো ভূমিকা না করেই হাসপাতালের ফাইলটা টেবিলে রাখল।
“এবার সত্যিটা বলো।”
মীরা ফাইল খুললেন। মৃত শিশুর নাম পড়লেন। তারপর চোখ বন্ধ করলেন।
“তুমি কী জানতে পেরেছ?”
“১৯৯৮ সালে রৌদ্রময়ী আহমাদ নামে একটা শিশু মারা গিয়েছিল। তার মৃতদেহ কেউ শনাক্ত করেনি। একই দিনে আহমাদ নামে আরেকটি শিশুর জন্ম হয়েছিল। পরে তার পরিচয় বদলে আরিফ আহমেদ রহমান করা হয়।”
মীরা চুপ করে রইলেন।
“আমি কি সেই মৃত শিশুটির নাম নিয়ে বেঁচে আছি?”
মীরা এবার মুখ তুললেন।
“আমি জানি না।”
রৌদ্রময়ী বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
“তুমি জানো না?”
“আমি শুধু জানি, ১৯৯৮ সালের ২৮ অক্টোবর আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেখানে একটি শিশু ছিল, যার নাম রৌদ্রময়ী। আরেকটি শিশু ছিল, যার নাম আহমাদ। সেই রাতে একজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু কে মারা গিয়েছিল, আমি নিজের চোখে দেখিনি।”
“তুমি কেন সেখানে গিয়েছিলে?”
মীরা খামটা তার দিকে এগিয়ে দিলেন।
“এই চিঠিটা পড়ো।”
খামের ওপরে লেখা—
“মীরার কাছে। ২৮ অক্টোবর ১৯৯৮।”
ভেতরে একটি ছোট্ট চিঠি।
মীরা,তুমি যদি এই চিঠি পড়ো, তাহলে বুঝব, আমি আমার প্রতিশ্রুতি রাখতে পারিনি।শিশুটিকে বাঁচিয়ে রেখো।তার নাম রৌদ্রময়ী রেখো না, যদি না তুমি নিশ্চিত হও যে এই নাম তার নিজের।কারণ এই নামের সঙ্গে এমন একটি গল্প জড়িয়ে আছে, যা একদিন তাকে নিজের পরিচয়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করাবে।আর যদি কখনো আহমাদ মূসা ফিরে আসে, তাকে জিজ্ঞেস কোরো—সে কাকে খুঁজছে?শিশুটিকে, নাকি লেখককে?— অনিরুদ্ধ।
চিঠির তারিখ ১৯৯৮।
স্বাক্ষর অনিরুদ্ধ সেন।
রৌদ্রময়ী ধীরে ধীরে মায়ের দিকে তাকাল।
“তুমি বলেছিলে, অনিরুদ্ধ আমার বাবা। কিন্তু এই চিঠিতে সে এমনভাবে লিখেছে, যেন সে আমাকে চিনতই না।”
মীরা চোখ নামিয়ে বললেন, “অনিরুদ্ধ তোমার বাবার পরিচয়ে তোমার জীবনে এসেছিল। কিন্তু সে তোমার জন্মের গল্প জানত।”
“তাহলে আমার বাবা কে?”
মীরা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন—
“যে মানুষটি তোমাকে জন্ম দিয়েছিল, সে তোমাকে নিজের মেয়ে বলে স্বীকার করেনি।”
“কেন?”
“কারণ সে বিশ্বাস করত, তুমি তার মেয়ে নও। তুমি তার লেখা গল্পের মেয়ে।”
রৌদ্রময়ীর মাথার ভেতর যেন সব শব্দ একসঙ্গে থেমে গেল।
“কে বিশ্বাস করত?”
মীরা উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির সব আলো নিভে গেল।
অন্ধকারে কোথাও একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
তারপর বসার ঘরের পুরোনো টেলিফোন বেজে উঠল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
মীরা ফোন তুললেন।
ওপাশ থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল।
“মীরা, সময় শেষ।”
মীরার মুখ সাদা হয়ে গেল।
“তুমি?”
কণ্ঠটি বলল, “রৌদ্রময়ীকে আর লুকিয়ে রাখা যাবে না।”
রৌদ্রময়ী ফোনটা মায়ের হাত থেকে নিয়ে বলল, “আপনি কে?”
ওপাশের মানুষটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর এমন একটি নাম বলল, যা শুনে রৌদ্রময়ী যেন নিজের শরীরের ভেতর থেকে ছিটকে বাইরে চলে গেল।
“আমি আহমাদ।”
“কোন আহমাদ?”
“যে শিশুটিকে ১৯৯৮ সালে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল।”
রৌদ্রময়ীর হাত কাঁপতে লাগল।
“আপনি কি বেঁচে আছেন?”
“হ্যাঁ।”
“আপনি কোথায়?”
ওপাশের কণ্ঠ ধীরে ধীরে বলল—
“তোমার ঘরের ভেতর।”
রৌদ্রময়ী পিছন ফিরে তাকাল।
তার শোবার ঘরের দরজাটা আধখোলা।
ভেতরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
একটি ছোট ছেলে।
হাতে লাল ডায়েরি।
মুখটা অন্ধকারে ঢাকা।
ছেলেটি ধীরে ধীরে মুখ তুলল।
আর রৌদ্রময়ী দেখল—
ছেলেটির মুখ তার নিজের শৈশবের ছবির মতো।
কিন্তু তার চোখ দুটো—
আহমাদ মূসার প্রোফাইল ছবিতে কখনো দেখা না যাওয়া সেই চোখ।
ছেলেটি মৃদু হেসে বলল,
“অনেক দেরি করে ফেলেছ, রৌদ্রময়ী।”
তারপর লাল ডায়েরিটা মেঝেতে রেখে বলল—
“এবার তোমার মনে করার পালা—১৯৯৮ সালের সেই রাতে তুমি কাকে মেরেছিলে?”
পরবর্তী পর্ব: “যে স্মৃতি আমার ছিল না”
রৌদ্রময়ী কি সত্যিই ১৯৯৮ সালের সেই রাতের সঙ্গে জড়িত? আট বছর বয়সী একটি মেয়ে কীভাবে নিজের মৃত্যুর গল্প লিখতে পারে? আর তার ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটি কি বাস্তব, নাকি বহু বছর চাপা পড়ে থাকা স্মৃতির রূপ?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যদি আহমাদ মূসা বেঁচে থাকে, তাহলে এত দিন ধরে রৌদ্রময়ীর সঙ্গে কথা বলছিল কে?

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।