পর্ব ১৫: জন্মের আগে যে লিখেছিল
“মানুষের জন্মের আগে তার নাম লেখা থাকতে পারে। কিন্তু যে হাত তখনও পৃথিবীতে আসেনি, সেই হাতের লেখায় যদি তার ভবিষ্যৎ লেখা থাকে—তবে কি সময় মিথ্যা বলে, নাকি আমরা?”
১. যে তারিখের কোনো ব্যাখ্যা নেই
২৮ অক্টোবর ২০২৬।
রাত তখন ১২টা পেরিয়ে গেছে।
রৌদ্রময়ী আহমাদ বসে আছে তার নানাভাইয়ের পুরোনো বাড়ির সেই বন্ধ ঘরে। সামনে খোলা পড়ে আছে ১৯৯৮ সালের পাণ্ডুলিপি। হলদে হয়ে যাওয়া প্রথম পাতার একেবারে নিচে লেখা—
লেখক: রৌদ্রময়ী আহমাদ।
তারিখ—২৮ অক্টোবর ১৯৯৮।
অথচ রৌদ্রময়ীর জন্ম ২০০৫ সালে।
সে নিজের হাতের দিকে তাকাল। তারপর পাণ্ডুলিপির ওপরের নামটার দিকে।
হাতের লেখা তারই।
শুধু অক্ষরের গড়ন নয়, ‘র’-এর বাঁক, ‘ম’-এর শেষ টান, এমনকি ‘আহমাদ’ শব্দের শেষ অক্ষরটিতে তার কলম থামিয়ে দেওয়ার অদ্ভুত অভ্যাসটাও একই।
যে অভ্যাস সে নিজেও জানত না, যতক্ষণ না নিজের পুরোনো ডায়েরিগুলো পড়তে শুরু করেছে।
রৌদ্রময়ী কাঁপা হাতে ফোন তুলে নিল।
আহমাদ মূসার বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রোফাইল আর খোলা যাচ্ছে না। কিন্তু তার ইনবক্সে পুরোনো কথোপকথনগুলো রয়ে গেছে।
সে লিখল—
“তুমি বলেছিলে, আমার বাবা নিজেই গল্পের একটা চরিত্র। এখন বলো, ১৯৯৮ সালে আমার হাতের লেখা সেখানে এল কীভাবে?”
মেসেজটি পাঠানো হলো না।
লাল অক্ষরে ভেসে উঠল—
এই অ্যাকাউন্টে আর মেসেজ পাঠানো যাবে না।
রৌদ্রময়ী হেসে ফেলল।
হাসিটা আনন্দের ছিল না। বরং এমন একটা হাসি, যখন মানুষ বুঝতে পারে, এত দিন ধরে যে দরজায় সে উত্তর খুঁজেছে, সেই দরজাটাই আসলে দেয়ালে আঁকা।
ঠিক তখনই ঘরের বাইরে থেকে তিনবার টোকা পড়ল।
টক। টক। টক।
“রৌদ্রময়ী?”
আরিফের কণ্ঠ।
সে দরজা খুলল না।
“তুমি বলেছিলে, আমার জন্মের আগে লেখা পাণ্ডুলিপিটা তুমি দেখোনি,” রৌদ্রময়ী বলল। “মিথ্যা বলেছিলে?”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর আরিফ বলল, “আমি পাণ্ডুলিপিটা দেখেছি। কিন্তু ওটা কে লিখেছিল, সেটা জানি না।”
“আমার হাতের লেখা কে নকল করেছে?”
“আমি জানি না।”
“তুমি কি সত্যিই কিছুই জানো না, আরিফ?”
দরজার ওপাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।
“একটা জিনিস জানি। তোমার নানাভাই মৃত্যুর আগে আমাকে বলেছিলেন, কোনো দিন তুমি এই পাতা খুঁজে পেলে যেন তোমাকে প্রথমেই লেখকের নামটা বিশ্বাস করতে নিষেধ করি।”
রৌদ্রময়ীর বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।
“তাহলে তিনি জানতেন আমি এটা খুঁজে পাব?”
“হ্যাঁ।”
“কীভাবে?”
আরিফ উত্তর দিল না।
তারপর ধীরে ধীরে বলল, “কারণ তিনি শুধু গল্পটা লেখেননি, রৌদ্রময়ী। তিনি গল্পটা খুঁজে পাওয়ার পথটাও লিখে রেখেছিলেন।”
২. পাণ্ডুলিপির নিচে আরেকটি পাণ্ডুলিপি
রৌদ্রময়ী আবার টেবিলে ফিরে এল।
প্রথম পাতাটা তুলে আলোয় ধরল। কাগজের নিচে অদ্ভুত কিছু রেখা দেখা যাচ্ছে। যেন পাতাটার পেছনে আরেকটি লেখা আছে, যা বহু বছর ধরে চাপা পড়ে রয়েছে।
সে আলমারি থেকে একটা পুরোনো পেন্সিল বের করল। পাতার ওপর পাশ ফিরিয়ে আলতো করে ঘষতে শুরু করল।
ধীরে ধীরে অক্ষরগুলো ফুটে উঠল।
“প্রথম লেখক সে নয়, যার হাতে কলম ছিল।”
তার নিচে—
“প্রথম লেখক সে, যে প্রথম বিশ্বাস করেছিল গল্পের মানুষ বাস্তবে ফিরে আসতে পারে।”
রৌদ্রময়ী থেমে গেল।
এই কথাটা সে আগে কোথাও পড়েছে।
কোথায়?
তার লাল ডায়েরিতে?
নাকি আরিফের চিঠিতে?
হঠাৎ তার মনে পড়ল, সাত বছর আগে নিজের ডায়েরির শেষ দিকে সে লিখেছিল—
“আমি আরিফকে মরতে দেখিনি। আমি শুধু দেখেছিলাম, একটা গল্পের শেষ পাতা ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে।”
রৌদ্রময়ী তাড়াতাড়ি নিজের ব্যাগ থেকে সেই ডায়েরি বের করল। পুরোনো পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে ২৮ অক্টোবর ২০১৯-এর লেখাটা খুঁজে পেল।
তারপর তার চোখ আটকে গেল ডায়েরির একেবারে ভেতরের মলাটে।
সেখানে ছোট করে লেখা—
“রৌদ্রময়ী আহমাদ—প্রথম খসড়া, ১৯৯৮।”
তারিখের নিচে একটা ছোট্ট বাক্য।
“যদি সে কখনো নিজের নাম পড়তে পারে, বুঝতে হবে গল্পটা আবার শুরু হয়েছে।”
রৌদ্রময়ীর আঙুল অবশ হয়ে এল।
সে তো এই ডায়েরি লিখেছিল ২০১৯ সালে।
তাহলে মলাটে ১৯৯৮ সালের কথা এল কীভাবে?
আরও ভালো করে দেখতেই বুঝল, লেখাটা তার নিজের হাতের লেখা হলেও কালি অন্য রকম। যেন পরে লেখা হয়েছে।
সে মোবাইলের আলো জ্বেলে অক্ষরগুলো পরীক্ষা করল।
তারপর হঠাৎ একটা অস্বাভাবিক বিষয় চোখে পড়ল।
‘রৌদ্রময়ী’ নামটার ‘য়’ অক্ষরটি সে ২০১৯ সালে যেভাবে লিখত, ঠিক সেভাবেই লেখা। কিন্তু পাণ্ডুলিপির প্রথম পাতায় ‘য়’ অক্ষরটি লেখা হয়েছে তার বর্তমান হাতের লেখার মতো।
দুটি লেখা একই মানুষের।
কিন্তু একই সময়ের নয়।
কেউ তার হাতের লেখার পরিবর্তনও জানত।
কেউ জানত, সে ভবিষ্যতে কেমন করে লিখবে।
রৌদ্রময়ী এবার বুঝতে পারল, সমস্যাটা শুধু এই নয় যে তার জন্মের আগে তার নাম লেখা হয়েছিল।
সমস্যাটা হলো—কেউ একজন তার ভবিষ্যতের হাতের লেখাও নকল করতে পেরেছিল।
৩. যে মানুষটি কখনো লেখক ছিল না
পরদিন সকাল আটটা সতেরো মিনিটে আরিফ তাকে নিয়ে গেল পুরোনো প্রকাশনা সংস্থা ‘অলিখিত অধ্যায়’-এর বেসমেন্টে।
সেখানে একসময় পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করা হতো। এখন ধুলো, ভাঙা তাক আর বাতিল কাগজের স্তূপ ছাড়া কিছু নেই।
আরিফ একটা লোহার আলমারির সামনে থামল।
“নানাভাই এই আলমারিটা কাউকে খুলতে দিতেন না,” সে বলল। “আমাকে একবার চাবি দিয়েছিলেন। কিন্তু একটা শর্তে—তুমি না আসা পর্যন্ত যেন এটা না খুলি।”
রৌদ্রময়ী তাকাল।
“তুমি চাবি পেয়েছিলে কবে?”
“২০১৯ সালে।”
“তাহলে সাত বছর ধরে অপেক্ষা করেছ?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
আরিফ পকেট থেকে একটা পুরোনো চাবি বের করল।
“কারণ তিনি বলেছিলেন, তুমি যদি ফিরে আসো, তবে বুঝতে হবে তুমি নিজের গল্প থেকে পালানো বন্ধ করেছ।”
চাবি ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে আলমারির দরজা খুলে গেল।
ভেতরে তিনটি জিনিস।
একটা পুরোনো টাইপরাইটার।
একটি ছোট টেপ রেকর্ডার।
আর একটি সাদা খাম।
খামের ওপরে লেখা—
“যে মেয়েটি আমার জন্মের আগেই আমার গল্প লিখেছিল, তার জন্য।”
রৌদ্রময়ী খামটা খুলল।
ভেতরে একটি মাত্র পাতা।
রৌদ্রময়ী,তুমি যখন এই চিঠি পড়বে, তখন হয়তো আমাকে মিথ্যাবাদী ভাববে।তোমার জন্মের আগে আমি তোমার হাতের লেখা জানতাম না। তোমার নামও জানতাম না।কিন্তু আমি জানতাম, একদিন এমন একটি মেয়ে জন্মাবে, যে নিজের জীবনের চেয়ে একটি গল্পকে বেশি বিশ্বাস করবে।সেই মেয়েটির জন্য আমি একটি চরিত্র তৈরি করেছিলাম।তার নাম দিয়েছিলাম আহমাদ মূসা।আমি চেয়েছিলাম, সে যেন তোমাকে এমন এক রাতে কথা বলে, যে রাতে তুমি আর কারও কথা শুনতে চাইবে না।কিন্তু একটা ভুল করেছিলাম।আমি ভেবেছিলাম, চরিত্রের জীবন লেখক নিয়ন্ত্রণ করে।পরে বুঝেছি, চরিত্র একবার মানুষের মনে বেঁচে উঠলে লেখকেরও আর তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থাকে না।আর তোমার হাতের লেখার রহস্য?উত্তরটা টাইপরাইটারের নিচে।— তোমার নানাভাই।
চিঠির শেষে কোনো তারিখ নেই।
শুধু একটি নাম—
আহমাদ মূসা।
রৌদ্রময়ী টাইপরাইটারের নিচে হাত ঢোকাল।
সেখানে একটি ছোট খাতা।
খাতার প্রথম পাতায় লেখা—
“হাতের লেখার নমুনা সংগ্রহ: ২০০৫–২০১৯।”
তারপর একের পর এক তারিখ।
২০০৫।
২০১০।
২০১৪।
২০১৭।
২০১৯।
প্রতিটি তারিখের পাশে রৌদ্রময়ীর নাম, এবং তার হাতে লেখা কোনো না কোনো বাক্য।
কোনোটি স্কুলের খাতা থেকে নেওয়া। কোনোটি জন্মদিনের কার্ড থেকে। কোনোটি পুরোনো ডায়েরি থেকে।
অর্থাৎ কেউ একজন বহু বছর ধরে তার হাতের লেখা সংগ্রহ করেছে।
কিন্তু ১৯৯৮ সালের পাণ্ডুলিপিতে তার বর্তমান হাতের লেখা কীভাবে এল?
খাতার শেষ পাতায় উত্তরটা লেখা ছিল—
“১৯৯৮ সালের মূল পাণ্ডুলিপিতে লেখকের নাম ছিল না। নামটি ২০১৯ সালে যোগ করা হয়েছে। পুরোনো কাগজ, নতুন কালি। পুরোনো গল্প, ভবিষ্যতের স্বাক্ষর।”
রৌদ্রময়ী নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলল।
এত দিন ধরে সে যেটাকে অসম্ভব ভেবে এসেছে, তার একটি ব্যাখ্যা আছে।
কেউ ভবিষ্যৎ থেকে লেখেনি।
কেউ ভবিষ্যৎকে অতীতের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে।
কিন্তু কে?
আর কেন?
৪. নানাভাইয়ের শেষ রেকর্ডিং
টেপ রেকর্ডারের বোতাম চাপতেই প্রথমে শোঁ শোঁ শব্দ হলো। তারপর এক বৃদ্ধের কণ্ঠ ভেসে এল।
তার নানাভাই।
“যদি রৌদ্রময়ী এই রেকর্ডিং শুনে থাকে, তাহলে আমার সবচেয়ে বড় ভয়টাই সত্যি হয়েছে।”
কণ্ঠ থেমে গেল।
তারপর আবার শুরু হলো।
“আমি জানতাম, আহমাদ মূসার নাম একদিন এমন একজনের হাতে যাবে, যে জানে না এই নামের শুরু কোথায়। আমি জানতাম, আমার নাতনি একদিন ভাববে, তার জীবন কোনো মৃত মানুষের লেখা গল্প।”
রৌদ্রময়ী চোখ বন্ধ করল।
“কিন্তু আমি তাকে সত্যিটা বলতে পারিনি। কারণ সত্যিটা বললে সে হয়তো আরিফকে খুঁজতে যেত না। আর আরিফকে না খুঁজলে, সে কখনো জানতে পারত না—তার নিজের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি কে।”
রেকর্ডিংয়ে কাগজ ওলটানোর শব্দ।
তারপর নানাভাই বললেন—
“আহমাদ মূসা কোনো একক মানুষ নয়। এই নামটি প্রথম ব্যবহার করেছিল একজন। পরে আরেকজন সেটিকে নিজের পরিচয় বানিয়েছিল। তারপর সেই নাম এমন এক গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল, যেখান থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারেনি।”
একটু থেমে তিনি বললেন—
“কিন্তু তোমার জীবনে যে আহমাদ মূসা ফিরে এসেছে, রৌদ্রময়ী, সে আমার তৈরি চরিত্র নয়।”
রৌদ্রময়ী চমকে উঠল।
আরিফ তার দিকে তাকাল।
রেকর্ডিং চলতে থাকল।
“সে তোমার বাবারও নয়। আরিফেরও নয়। সে এমন একজনের লেখা, যে তোমাদের প্রত্যেকের জীবন সম্পর্কে এমন কিছু জানত, যা জানার কথা ছিল না।”
হঠাৎ শব্দ কেটে গেল।
তারপর খুব নিচু স্বরে নানাভাই বললেন—
“কারণ এই গল্পের প্রথম পাঠক ছিল তোমাদের মধ্যেই একজন।”
রেকর্ডিং শেষ।
রৌদ্রময়ী স্থির হয়ে বসে রইল।
প্রথম পাঠক।
যে প্রথম গল্পটা পড়েছিল, সে-ই কি পরে গল্পের মানুষদের জীবন বদলে দিয়েছে?
সে আরিফের দিকে তাকাল।
“তুমি কি জানো, প্রথম পাঠক কে ছিল?”
আরিফ মাথা নাড়ল।
“না। কিন্তু নানাভাই একটা নাম বলেছিলেন।”
“কার নাম?”
আরিফ উত্তর দেওয়ার আগে পকেট থেকে একটি ছোট কাগজ বের করল।
কাগজটি বহুবার ভাঁজ করা। তার ওপরে কেবল একটি নাম—
মীরা।
রৌদ্রময়ীর মা।
৫. মায়ের স্বীকারোক্তি
সেদিন সন্ধ্যায় রৌদ্রময়ী মায়ের সামনে পাণ্ডুলিপি, চিঠি আর হাতের লেখার খাতাটা সাজিয়ে রাখল।
মীরা দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বললেন না।
তারপর পাণ্ডুলিপির প্রথম পাতায় আঙুল রেখে বললেন, “আমি জানতাম, একদিন তুমি এটা খুঁজে পাবে।”
“তুমি কি ১৯৯৮ সালের পাণ্ডুলিপি পড়েছিলে?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি কি আমার হাতের লেখা নকল করেছিলে?”
মীরা মাথা নাড়লেন।
“না।”
“তাহলে কে করেছে?”
মীরা এবার মেয়ের চোখের দিকে তাকালেন।
“তোমার নানাভাই নয়।”
রৌদ্রময়ীর মনে হলো, ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠেছে।
“তাহলে?”
মীরা ধীরে ধীরে বললেন, “এই নামটা আমি প্রথম শুনেছিলাম তোমার জন্মের অনেক আগে। তোমার নানাভাইয়ের কাছ থেকে নয়। তোমার বাবার কাছ থেকেও নয়।”
“কার কাছ থেকে?”
“একটি ছোট মেয়ের কাছ থেকে।”
রৌদ্রময়ী হতবাক।
“কোন মেয়ে?”
মীরা উত্তর দিলেন না। বরং উঠে আলমারি থেকে একটি পুরোনো ছবি নিয়ে এলেন।
ছবিতে একটি হাসপাতালের করিডর। দেয়ালে ঘড়ি—৮টা ১৭ মিনিট।
এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে তরুণী মীরা।
তার পাশে এক অচেনা মেয়ে। বয়স বড়জোর আট বা নয়।
মেয়েটির মুখ ঝাপসা। কিন্তু তার হাতে একটি লাল ডায়েরি।
ছবির পেছনে লেখা—
“২৮ অক্টোবর ১৯৯৮। প্রথম সাক্ষাৎ।”
রৌদ্রময়ীর হাত থেকে ছবিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
“এই মেয়েটা কে?”
মীরা ফিসফিস করে বললেন, “সে নিজেকে রৌদ্রময়ী আহমাদ বলে পরিচয় দিয়েছিল।”
“কিন্তু আমি তো তখন জন্মাইনি!”
“আমি জানি।”
“তাহলে সে কে ছিল?”
মীরার চোখে জল জমল।
“আমি ভেবেছিলাম, সে কোনো অসুস্থ শিশুর কল্পনা। সে আমাকে বলেছিল, একদিন আমার একটি মেয়ে হবে। সেই মেয়ের নাম হবে রৌদ্রময়ী। আর তার জীবনে আহমাদ মূসা নামে একজন ফিরে আসবে।”
রৌদ্রময়ী মায়ের হাত চেপে ধরল।
“তুমি তাকে আর কখনো দেখেছিলে?”
মীরা মাথা নাড়লেন।
“না। কিন্তু যাওয়ার আগে সে আমাকে একটা কথা বলেছিল।”
“কী কথা?”
মীরা ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“আপনার মেয়ে যখন জন্মাবে, তাকে কখনো বলবেন না যে সে প্রথমবার পৃথিবীতে এসেছে।”
রৌদ্রময়ীর মনে হলো, তার বুকের ভেতর কেউ বরফের টুকরো রেখে দিয়েছে।
প্রথমবার পৃথিবীতে এসেছে?
তাহলে কি তার দুটি জন্মের রহস্য কেবল পরিচয় বদলের বিষয় নয়?
তাহলে কি ১৯৯৮ সালের সেই শিশুটি—
ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠল।
একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ।
“তোমার মা এবারও পুরো সত্য বলেননি।”
রৌদ্রময়ী দ্রুত লিখল—
“তুমি কে?”
উত্তর এল সঙ্গে সঙ্গে।
“আমি সেই মেয়ে, যে তোমার জন্মের সাত বছর আগে তোমার সঙ্গে দেখা করেছিল।”
রৌদ্রময়ীর আঙুল কাঁপতে লাগল।
আরেকটি মেসেজ এল।
“তোমার নানাভাই আমার নাম চুরি করেছিলেন। তোমার বাবা আমার গল্প চুরি করেছিলেন। আর তুমি—”
মেসেজটি থেমে গেল।
তারপর শেষ লাইনটি এল—
“তুমি আমার জীবন নিয়ে জন্মেছ, রৌদ্রময়ী।”
রৌদ্রময়ী নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
ফোনের স্ক্রিনে নতুন একটি ছবি ভেসে উঠল।
একটি মেয়ে। লাল ডায়েরি হাতে। হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে আছে।
ছবির নিচে তারিখ—
২৮ অক্টোবর ১৯৯৮।
আর ছবির পেছনে লেখা—
“রৌদ্রময়ী আহমাদ — বয়স ৮ বছর।”
রৌদ্রময়ী ধীরে ধীরে নিজের মুখে হাত রাখল।
তারপর স্ক্রিনে আরেকটি মেসেজ ভেসে উঠল—
“আগামীকাল তোমাকে নিজের জন্মসনদ নয়, নিজের মৃত্যুসনদ খুঁজতে হবে।”
প্রেরকের নাম দেখে তার শরীর অবশ হয়ে গেল।
আহমাদ মূসা।
বন্ধ হয়ে যাওয়া অ্যাকাউন্ট থেকে মেসেজটি এসেছে।
আর নিচে একটি শেষ বাক্য—
“কারণ ১৯৯৮ সালে যে রৌদ্রময়ী মারা গিয়েছিল, ২০০৫ সালে জন্ম নেওয়া মেয়েটি তার নামেই বেঁচে আছে।”
পরবর্তী পর্ব: “যে মেয়েটি দুবার জন্মেছিল”
রৌদ্রময়ী কি সত্যিই অন্য কারও নাম নিয়ে বেঁচে আছে? ১৯৯৮ সালের হাসপাতালের সেই অচেনা মেয়েটি কে? আর বন্ধ হয়ে যাওয়া আহমাদ মূসার অ্যাকাউন্ট থেকে কে মেসেজ পাঠাচ্ছে—একজন জীবিত মানুষ, নাকি এমন কেউ, যার অস্তিত্বের কোনো নথিই নেই?

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।