পর্ব ১৪: আমার ছেলে আহমাদ
“সবচেয়ে ভয়ংকর স্মৃতি সেই স্মৃতি নয়, যা তুমি ভুলে গেছ। সবচেয়ে ভয়ংকর হলো সেই স্মৃতি, যা তোমার জীবনে কখনো ঘটেনি—অথচ তার প্রমাণ তোমার হাতে।”
১. একটি চিঠি, একটি অসম্ভব সম্বোধন
“মা, তুমি যদি এই চিঠি পড়ে থাকো, তাহলে বুঝব আমি তোমার কাছে ফিরতে পারিনি।”
চিঠির প্রথম লাইনটা আমি বারবার পড়ছিলাম।
নিচে লেখা—“তোমার ছেলে, আহমাদ।”
আমার ছেলে!
আমি তো কখনো মা হইনি। আমার জীবনে এমন কোনো সম্পর্ক ছিল না, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যার পরিণতিতে একটা সন্তান পৃথিবীতে আসতে পারে।
তাহলে এই চিঠি কোথা থেকে এল?
আমি আরিফের দিকে তাকালাম।
—তুমি জানো, এই চিঠিতে কী লেখা আছে?
আরিফ মাথা নাড়ল।
—পুরোটা জানি না। তোমার বাবা আমাকে শুধু চিঠিটা দিতে বলেছিলেন।
—আমার বাবা কে, সেটা তুমি জানো?
আরিফ এবার চোখ নামিয়ে নিল।
—জানি না।
—মিথ্যে বলছ!
আমার কণ্ঠ এত জোরে বেরিয়ে এল যে ঘরের বৃদ্ধটিও চমকে উঠলেন।
—সবাই একই কথা বলছে। কেউ জানে না আমার বাবা কে, কেউ জানে না আমার ছেলে কোথায়, কেউ জানে না আহমাদ মূসা কে! তাহলে এতগুলো মানুষ সাত বছর ধরে কী লুকিয়ে রেখেছে?
আরিফ শান্ত গলায় বলল,
—আমরা সবাই সবটা জানি না, রৌদ্রময়ী। কিন্তু আমরা সবাই জানি, তুমি একটা গল্পের মধ্যে আটকে গিয়েছিলে।
—আমি গল্পের মধ্যে আটকে যাইনি। তোমরা আমাকে আটকে রেখেছ!
আরিফ কোনো উত্তর দিল না।
আমি চিঠিটা ভাঁজ করে ব্যাগে রাখলাম।
—আমাকে আমার ছেলের কাছে নিয়ে চলো।
আরিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—তাকে খুঁজে পাওয়ার আগে তোমাকে জানতে হবে, সে সত্যিই তোমার ছেলে কি না।
২. যে ঘরে শিশুর কান্না শোনা যেত
প্রকাশনা সংস্থার বৃদ্ধ লোকটি অবশেষে কথা বললেন।
—নানাভাইয়ের বাড়িতে একটা ঘর আছে, যেটা তুমি কখনো দেখোনি।
আমি তাঁর দিকে তাকালাম।
—কোন ঘর?
—বাড়ির উত্তর দিকের ঘর। দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ। তোমার মা বলেছিলেন, সেখানে পুরোনো আসবাব রাখা আছে। কিন্তু আসলে সেখানে একটা শিশুর ঘর তৈরি করা হয়েছিল।
আমার বুকের ভেতর কেমন যেন হলো।
—কোন শিশুর?
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।
শুধু একটা চাবি আমার হাতে দিলেন।
—এটা তোমার নানাভাইয়ের কাছে ছিল। আর একটা কথা মনে রেখো—ঘরে যা দেখবে, তার সবকিছুর অর্থ সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারবে না।
আমি আরিফের সঙ্গে বাড়িতে ফিরে এলাম।
উত্তরের ঘরটা বাড়ির অন্য অংশ থেকে আলাদা। সরু করিডর পেরিয়ে যেতে হয়। দরজায় তালা, কাঠে ধুলো জমে আছে।
চাবি ঘোরাতেই তালাটা খুলে গেল।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে আমি থমকে দাঁড়ালাম।
ঘরটা কোনো স্টোররুম নয়।
একটা ছোট্ট খাট।
দেয়ালে ঝোলানো রঙিন কাগজের তারা।
কাঠের তাকের ওপর সারি সারি শিশুতোষ বই।
আর খাটের পাশে একটা নীল রঙের খেলনা গাড়ি।
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো, এখানে কেউ একসময় খুব যত্ন করে একটা শিশুর জন্য অপেক্ষা করেছিল।
খাটের ওপর একটা সাদা কম্বল ভাঁজ করে রাখা। তার ওপরে ছোট্ট একটা কার্ড।
কার্ডে লেখা—
“আহমাদের প্রথম জন্মদিন।”
তারিখ—২৮ অক্টোবর ২০০৬।
আমার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে এল।
২০০৬ সালে আমার বয়স এক বছর হতো—যদি আমার জন্ম ২০০৫ সালে হয়ে থাকে।
তাহলে এই ঘর কি আমার জন্য তৈরি করা হয়েছিল?
নাকি অন্য কোনো আহমাদের জন্য?
আমি খাটের নিচে হাত ঢুকিয়ে একটা কাঠের বাক্স বের করলাম।
ভেতরে কয়েকটি শিশুর পোশাক, একটা রুপার চামচ আর ছোট্ট একটা ডায়েরি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
“আমার ছেলে আহমাদের জন্য। যখন সে বড় হবে, তখন যেন জানতে পারে, তার মা তাকে কখনো ভুলে যায়নি।”
লেখার নিচে স্বাক্ষর—
রৌদ্রময়ী।
আমার হাত কাঁপতে শুরু করল।
এটা আমার হাতের লেখা।
কিন্তু আমি কখনো এই ডায়েরি লিখিনি।
৩. মায়ের স্বীকারোক্তি
আমি সঙ্গে সঙ্গে মাকে ফোন করলাম।
—মা, উত্তর দিকের ঘরটা কী?
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
—তুই সেখানে গেছিস?
—হ্যাঁ। সেখানে একটা শিশুর ঘর আছে। একটা ডায়েরি আছে, যেখানে আমি লিখেছি, আহমাদ আমার ছেলে।
মা কাঁদতে শুরু করলেন।
—আমি তোকে বলতে চেয়েছিলাম।
—কী বলতে চেয়েছিলে? আমি কি কোনো শিশুর জন্ম দিয়েছিলাম?
—না, মা।
মায়ের উত্তরটা এত দ্রুত এল যে আমি থমকে গেলাম।
—তাহলে ডায়েরিতে আমার হাতের লেখা কেন?
—কারণ তুই ওই শিশুটার জন্য গল্প লিখেছিলি।
—কোন শিশুর জন্য?
মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তোর নানাভাইয়ের এক আত্মীয়ের ছেলে ছিল। তার মা মারা যাওয়ার পর শিশুটাকে কিছুদিন আমাদের কাছে রাখা হয়েছিল। তুই তখন খুব ছোট। শিশুটাকে তুই নিজের ভাইয়ের মতো ভালোবাসতিস। তুই তার জন্য গল্প লিখতিস, ঘুম পাড়ানোর গান বানাতিস। তাকে তুই আহমাদ বলে ডাকতিস।
আমি চুপ করে রইলাম।
—কিন্তু সে কোথায় গেল?
মা বললেন,
—একদিন শিশুটাকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তারপর আর কোনো যোগাযোগ ছিল না।
—তাহলে সবাই বলছে সে আমার ছেলে কেন?
মা উত্তর দিতে পারলেন না।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,
—মা, তুমি কি সত্যি বলছ?
মায়ের কণ্ঠ ভেঙে গেল।
—আমি যতটুকু জানি, সেটুকুই বলছি। কিন্তু একটা কথা আমি তোকে কখনো বলিনি।
—কী কথা?
—শিশুটাকে নিয়ে যাওয়ার আগের রাতে তুই একটা স্বপ্ন দেখেছিলি। স্বপ্নে তুই বলেছিলি, বড় হয়ে তোর একটা ছেলে হবে, তার নাম হবে আহমাদ। আর সে একদিন তোর লেখা গল্পের মধ্যে ফিরে আসবে।
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
শৈশবের একটা অস্পষ্ট ছবি মনে পড়ল—ছোট্ট একটা হাত আমার আঙুল ধরে আছে। কেউ একজন হাসছে। আর আমি তাকে বলছি,
“তুমি হারিয়ে গেলেও আমি তোমাকে গল্পে রেখে দেব।”
কিন্তু সেই শিশুর মুখটা মনে করতে পারলাম না।
৪. ডায়েরির শেষ পাতায়
আমি আবার ডায়েরিটা খুললাম।
প্রথম কয়েকটি পাতায় শিশুটাকে নিয়ে ছোট ছোট গল্প লেখা। কোথাও একটা পাখি হারিয়ে গেছে, কোথাও একটা ছেলে তার মাকে খুঁজছে, কোথাও একটা অদ্ভুত বাড়ি আছে যার সব দরজা অন্য সময়ে খুলে যায়।
তারপর একটি পাতায় লেখা—
“আজ আহমাদ চলে গেল। সবাই বলছে, সে আর ফিরবে না। কিন্তু আমি জানি, সে ফিরবে। কারণ আমি তার জন্য একটা গল্প লিখেছি। গল্পের শেষ পাতায় আমি তাকে একটা দরজা দিয়ে রেখেছি। একদিন সে সেই দরজা দিয়ে ফিরে আসবে।”
পাতার তারিখ—২৮ অক্টোবর ২০০৬।
আমি পাতা উল্টালাম।
শেষ পাতায় মাত্র একটি বাক্য—
“যদি কোনোদিন আহমাদ মূসা আমার সঙ্গে কথা বলে, তাহলে বুঝব, আমার গল্পের শিশুটি আর শিশু নেই।”
আমার গায়ে কাঁটা দিল।
আমি তো সেই মেসেজ পেয়েছি।
আহমাদ মূসা আমার সঙ্গে কথা বলেছে।
কিন্তু তার মানে কি সেই শিশুই বড় হয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে?
নাকি কেউ আমার শৈশবের গল্পগুলো পড়ে আমার বিশ্বাসকে ব্যবহার করেছে?
ঠিক তখন আরিফ আমার পাশে এসে দাঁড়াল।
—রৌদ্রময়ী, একটা কথা বলব?
—বলো।
—তুমি যে শিশুটার কথা মনে করতে পারছ না, তার একটা ছবি আমার কাছে আছে।
সে পকেট থেকে একটা পুরোনো ছবি বের করল।
ছবিতে একটা ছোট্ট শিশু, বয়স এক বা দুই বছর। কোলে বসে আছে আমার ছোটবেলার সংস্করণ—হাসিমুখে, হাতে একটা লাল বই।
শিশুটার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার বুক কেঁপে উঠল।
তার চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে পরিচিত।
আমি ছবিটা উল্টে দেখলাম।
পেছনে লেখা—
“আহমাদ ও রৌদ্রময়ী। ২৮ অক্টোবর ২০০৬।”
নিচে আরেকটা নাম।
“ছবিটি তুলেছেন—আনিরুদ্ধ সেন।”
আমি আরিফের দিকে তাকালাম।
—অনিরুদ্ধ সেন এই শিশুটাকে চিনতেন?
আরিফ বলল,
—শুধু চিনতেন না। শিশুটার পরিবারকে খুঁজে বের করার দায়িত্বও তাঁর ছিল।
—তাহলে তিনি জানেন, আহমাদ কোথায়?
আরিফ মাথা নাড়ল।
—সম্ভবত।
আমি ছবিটা ব্যাগে রাখলাম।
এবার আমাকে অনিরুদ্ধ সেনকে খুঁজতে হবে।
৫. যে মেসেজের প্রেরক নেই
সন্ধ্যার দিকে আমার ফোনে একটা নতুন মেসেজ এল।
প্রেরক—আহমাদ মূসা।
কিন্তু অ্যাকাউন্ট তো মুছে গেছে!
মেসেজে লেখা—
“তুমি উত্তর দিকের ঘরটা পেয়েছ। এবার বুঝতে পারছ, কেন তোমাকে আহমাদ বলে ডাকা হতো?”
আমি লিখলাম,
“তুমি কি সেই শিশুটি?”
উত্তর এল—
“আমি সেই শিশুটি নই, রৌদ্রময়ী। আমি সেই গল্প, যেটা তুমি তার জন্য লিখেছিলে।”
আমি লিখলাম,
“তাহলে আমার ছেলে কোথায়?”
উত্তর এল—
“তুমি যে ছেলেকে খুঁজছ, তার নাম আহমাদ নয়।”
আমি ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আরেকটা মেসেজ এল।
“তার নাম আরিফ।”
আমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
আরিফ তো আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তাহলে?
আমি দ্রুত আরিফের দিকে তাকালাম।
—তোমার পুরো নাম কী?
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—আরিফ আহমাদ রহমান।
আমি পিছিয়ে গেলাম।
—তুমি?
আরিফ মাথা নাড়ল।
—আমি সেই শিশুটি, রৌদ্রময়ী। যে একসময় তোমার সঙ্গে ওই ঘরে থাকত। কিন্তু আমি তোমার ছেলে নই। আমি তোমার চেয়ে সাত বছরের বড়।
আমার চোখে পানি চলে এল।
—তাহলে এতদিন তুমি আমাকে কেন বলোনি?
আরিফের কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল।
—কারণ তোমার মনে আমার শৈশবের কোনো স্মৃতি নেই। তুমি আমাকে শুধু সেই লেখক হিসেবে চিনেছ, যার মৃত্যু হয়েছিল ২০১৯ সালে।
আমি ছবিটা আবার দেখলাম।
ছবির শিশুটি।
আমার হাত ধরে থাকা ছোট্ট আরিফ।
যে একদিন চলে গিয়েছিল।
যে নিজের মৃত্যু সাজিয়েছিল।
যে সাত বছর পর ফিরে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়েছে।
আরিফ বলল,
—তোমার ছেলে আহমাদ বলে কেউ নেই। কিন্তু তোমার গল্পে সে আছে। আর সেই গল্পের মধ্যে এমন একটা সত্য লুকানো আছে, যেটা তোমার বাবাও জানতেন না।
আমি ফিসফিস করে বললাম,
—কী সত্য?
আরিফ আমার হাতে একটা নতুন খাম দিল।
—এটা অনিরুদ্ধ সেন তোমার জন্য রেখে গেছেন। তিনি বলেছেন, এটা খোলার পর তুমি আর কখনো আহমাদ মূসাকে আগের মতো দেখতে পারবে না।
খামের ওপরে লেখা—
“রৌদ্রময়ীর জন্য—তার গল্পের শেষ লেখকের কাছ থেকে।”
আমি খাম খুললাম।
ভেতরে একটা মাত্র লাইন—
“আহমাদ মূসার প্রথম পাণ্ডুলিপি লিখেছিল রৌদ্রময়ী নিজেই—কিন্তু সে তখনও জন্মায়নি।”
আমার হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল।
কারণ নিচে তারিখ লেখা ছিল—
২৮ অক্টোবর ১৯৯৮।
পরবর্তী পর্ব: ১৫ — “জন্মের আগে যে লিখেছিল”
রৌদ্রময়ী যদি ২০০৫ সালে জন্মে থাকে, তাহলে ১৯৯৮ সালের পাণ্ডুলিপিতে তার হাতের লেখা এল কীভাবে?
আরিফ কি সত্যিই সেই হারিয়ে যাওয়া শিশু, নাকি সেও এমন একটি পরিচয় বহন করছে, যা তার নিজের নয়?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—একজন মানুষ কি জন্মের আগেই নিজের গল্প লিখতে পারে, নাকি কেউ তার হয়ে সেই গল্প লিখে রেখে যায়?

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।